Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

মুখের রোগ ও ক্ষতিকর ভাইরাস

| প্রকাশের সময় : ২৩ মার্চ, ২০১৮, ১২:০০ এএম

মুখের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণে ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি ভাইরাসও কার্যকর ভ‚মিকা রাখে। মুখের কিছু ভাইরাস সুপ্ত অবস্থায় থাকে কিন্তু যখন তা কার্যকর হয় তখন রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট মুখের রোগগুলো যথাযথভাবে চিকিৎসা প্রদান না করলে কোনো ভাবেই তা ভালো হতে চায় না। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় আমাদের দেশে শরীরের অন্যান্য অংশের পাশাপাশি মুখের কোনো সংক্রমণে রোগ নির্ণয় না করে মুখস্থ এন্টিবায়োটিক প্রদান করা হয়। ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট কোনো রোগে এন্টিবায়োটিক কোনো কাজ করে না। মনে রাখতে হবে যে, এন্টিবায়োটিক শুধুমাত্র ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে থাকে। মুখের ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় প্রদান করলে তা রোগ প্রতিরোধ বা নিরাময়ে কাজ করে। তাই মুখের অভ্যন্তরে কোনো আলসার, গোটা অথবা অন্য যে কোনো সংক্রমণ যদি ভাইরাস দ্বারা হয়ে থাকে তাহলে সেক্ষেত্রে কোনো অবস্থাতেই এন্টিবায়োটিক প্রদান করা যাবে না। তবে কখনো কখনো ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট রোগের জটিলতার চিকিৎসা হিসাবে এন্টিবায়োটিক প্রদান করা হয়ে থাকে। তবে সেটি হতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী। নিম্নে মুখের কিছু ক্ষতিকর ভাইরাস সম্পর্কে আলোচনা করা হলো যা সবার জানা প্রয়োজন:
হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস: হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস মোট ১২০ ধরনের হয়ে থাকে। হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস টাইপ-১৬ এবং টাইপ-১৮ ওরোফ্যারিনজিয়াল (গলা) ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস টাইপ-১৬ কে মুখের ক্যান্সারের রিস্ক ফ্যাক্টর হিসাবে ধরা হয়। মুখের ক্যান্সার প্রধানত টনসিল, জিহ্বা এবং ওরোফ্যারিংস এ হয়ে থাকে। মুখের স্কোয়ামাস সেল কারসিনোমা বা ক্যান্সারের ক্ষেত্রে হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস (HPV) একটি বড় ঝুঁকি। ওরাল সেক্স এ অংশগ্রহণকারী একজন যদি হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস সংক্রমিত অবস্থায় থাকে তাহলে অন্যজনের দেহে তা সংক্রমিত হতে পারে। ৩০ থেকে ৪০ ধরনের প্যাপিওলোমা ভাইরাস যৌন মিলনের সময় সংক্রমিত হতে পারে। যৌন মিলনের সময় সংক্রমিত ভাইরাস মুখে জেনিটাল ওয়ার্টস বা গোটা সৃষ্টি করতে পারে। তাই মুখে যে কোনো ধরনের গোটা দেখা দিলে তার প্রকৃতি এবং উৎস সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা যায় এগারো মিলিয়ন আমেরিকান পুরুষ হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত যা থেকে মাথা, ঘাড়, ও গলায় ক্যান্সার সৃষ্টি হতে পারে। হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস প্রতিরোধে টিকা দেওয়া যেতে পারে। যৌন কার্যক্রম শুরুর আগেই হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস এর টিকা প্রদান করতে হবে। আরেকটু সহজভাবে বললে প্রতি নয় জন আমেরিকান পুরুষের মধ্যে এক জনের ওরাল হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস রয়েছে। অতএব পরিস্থিতি যে কত ভয়ংকর তা সহজেই অনুমান করা যায়। আমাদের দেশে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কারণে এ ভাইরাস বিস্তার লাভ করেছে। তাই মুখের যে কোনো সংক্রমণে না বুঝে কোনো ঔষধ সেবন বা প্রয়োগ করা ঠিক নয়। হিউম্যান প্যাপিওলোমা ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য গার্ডাসিল এবং সার্বারিক্স নামক টিকা ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
সাইটোমেগালা ভাইরাস: সাইটোমেগলালো ভাইরাস হলো হারপিস ভাইরাস পরিবারের অন্তর্ভূক্ত। এটিকে হিউম্যান হারিপিস ভাইরাস ৫ (HHV-5) ও বলা হয়। সাইটোমেগালো ভাইরাসের কারণে মুখের আলসার হতে পারে। মাঝে মাঝে সাইটোমেগালো ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট মুখের আলসারের সাথে অ্যাপথাস আলসারের বিভ্রান্তি হয়ে থাকে। সাইটোমেগালো ভাইরাসের সৃষ্ট আলসারকে দেখতে অনেকটা অ্যাপথাস আলসারের মতো দেখায়। কেবলমাত্র ব্যতিক্রম হলো সাইটোমেগালো ভাইরাস দ্বারা আলসার যখন বোর্ডার বা কিনারার নিকট পঁচন দেখা যায় তখন এটি লাল রঙের হয় না। সাইটোমেগালো ভাইরাস নির্ণয় করতে হলে বায়োপসি প্রয়োজন হয়। সাইটোমেগালো ভাইরাস ও চিকেনপক্স, গ্ল্যান্ডুলার ফিভার এবং কোল্ড সোর করে থাকে।
এপস্টেন বার ভাইরাস: এপস্টেন বার ভাইরাস একটি লিম্ফোট্রফিক গামা হারপিস ভাইরাস। লালার মাধ্যমেই এ ভাইরাস একজন থেকে অন্যজনে সংক্রমিত হয়ে থাকে। এপস্টেন বার ভাইরাস সংক্রমণে মুখে হেয়ারি লিউকোপ্লাকিয়া দেখা যেতে পারে। এছাড়া এ ভাইরাসের কারণে ইনফেকসাজ মনোনিউক্লোসিস, লিম্ফয়েড এবং এপিথেলিয়াল ম্যালিগন্যান্সি এবং ক্যন্সার দেখা দিতে পারে। ইনফেকসাজ মনোনিউক্লোসিসকে মনোডিজিজও বলা হয়। তাছাড়া এটি কিসিং ডিজিজ নামেও পরিচিত। এপস্টেন বার ভাইরাস সংক্রমণে জ্বর, দুর্বলতা, গ্রন্থিগুলো বড় হয়ে যাওয়া এবং সোর থ্রোট হবে। পরীক্ষা করলে রক্তে লিম্ফোসাইটের পরিমাণ বেড়ে যাবে।
হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস: হারপিস এক ধরনের ডিএনএ ভাইরাস, যা প্রধানত লালা এবং শরীরের অন্যান্য নিঃসৃত রসের মাধ্যমে সঞ্চালিত হয়ে থাকে। হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে। (ক) হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস টাইপ-১ (খ) হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস টাইপ-২। হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস দ্বারা প্রাথমিক সংক্রমণের ক্ষেত্রে মাড়ি ও ঠোঁটে প্রদাহ দেখা দিতে পারে, যা জিনজাইভো স্টোমাটাইটিস নামে পরিচিত। বারবার হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে ঠোঁটে ফুসকুড়ি হতে পারে এবং প্রদাহ দেখা দিতে পারে যা চিলাইটিস নামে পরিচিত। সাধারণ মানুষ এটিকে জ্বরঠোসা বলে।
অতএব, মুখের বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস সংক্রমণে সবার আরো বেশি সচেতন হতে হবে। মুখের আলসারের সঠিক কারণ নির্ণয় করে তবেই চিকিৎসা প্রদান করতে হবে।

-ডাঃ মোঃ ফারুক হোসেন
মুখ ও দন্তরোগ বিশেষজ্ঞ
মোবাইল: ০১৮১৭-৫২১৮৯৭
ই-মেইল: dr.faruqu@gmail.com



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর