Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ০৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

মার্চের সেই দুুপুর

কা জী ই য়া স মী ন | প্রকাশের সময় : ২৩ মার্চ, ২০১৮, ১২:০০ এএম

আমি প্রতিভা চৌধুরী। বয়স বাষট্টি। গান-বাজনা করে জীবন কেটেছে। প্রতি বছর মার্চ মাস এলে আমার মুখে শব্দ থাকে না। হাঁটতে ভুলে যাই। শরীর থরথর করে কাঁপে। বছর ঘুরে এই দিনটি এলে সবাই দেশের কথা ভাবে। পাক হানাদের বকা ছুড়ে। কিন্তু আমার হয় উল্টো। একাত্তরের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে এ দেশের অনেক মানুষ মিথ্যের জাল বুনে দেশি-বিদেশি বহু রকম সুযোগ-সুবিধা নিয়েছে। এখন পর্যন্ত নিয়েই চলেছে। অথচ আমি হতবাক হয়ে জীবন কাটাচ্ছি। একটা ছোট মাছ হয়ে অল্প পানিতে সাঁতার কেটে যাচ্ছি জনম ভর। একমাত্র লজ্জার কারণে।
এখন আমি বসে আছি ফ্ল্যাটের পশ্চিমের বারান্দায়। এখানে বসলে খুব ভালো লাগে। মনটাই অন্য রকম হয়ে যায়। হাইওয়ে রোডের সাথে বাসা বলে, সারাক্ষণ বড় বড় গাড়ির কালো ধোঁয়া অতিরিক্ত ধুলা-ময়লা আর একটানা শব্দদূষণে রাত-দিন আচ্ছন্ন হয়ে থাকতে হয়। মনে মনে ভাবি এতে আমার কিছু যায় আসে না। কেননা যে ধোঁয়া, ধুলা আর তীব্র সেই শব্দদূষণে আমার মন শরীর যেমন জর্জরিত হয়েছিল, একাত্তরের ২৬শে মার্চের সেই দুপুর বেলা। তারপর আর কোনো জায়গা নেই লিক না হওয়া পর্যন্ত।
এই তো দুইবার এসে আমাকে উঁকি দিয়ে দেখে গেল গৃহকর্তা। তিনবারের বারহাতে করে নিয়ে এলো চা। সদ্য সকালের মিষ্টি বাতাসে স্বামীর হাতে বানানো চা পেয়ে আমিতো মুচকি না হেসে পারলাম না। আমার একমাত্র মেয়ের বাবা আমার বন্ধু স্বামী আমাকে চিমটি কেটে বলল, কোনোদিন জিজ্ঞেস করিনি, আজ একটু করব সোনামণি?
কি?
এই দিনটি এলে তুমি দার্শনিক হয়ে যাও কেন?
দর্শন আমার প্রিয় সাবজেক্ট।
আমার সন্দেহ হয়।
কি রকম?
এই ধর, তুমি বিরঙ্গনা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী না তো?
যদি বলি, হ্যাঁ, হয়তো! তাহলে?
তাহলে তো আমি বাংলাদেশের মহান স্বামী। নায়িকা স্ত্রীর নায়ক স্বামী। মেডেল, ক্রেস্ট, সার্টিফিকেট, সরকারি জমি, পত্রিকায় ফলাও, সরকারি কোটা। একেবারে যুৎসই জীবন। বুক উঁচু করা নিশ্চিন্ত ভবিষ্যৎ।
চা শেষ করে ঘরে চলে আসি। খুঁজতে থাকি বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর। না বলা কথার কষ্টকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে থাকি। জানি, প্রশ্নহীন জীবন কোনো জীবনই না। কিন্তু সমাজের একটা ব্যবস্থা থাকা দরকার। দেশের একটা কাঠামো হওয়া উচিত। তা না হলে আমার জীবনের ২৬ই মার্চের সেই দুপুর বেলা অজানায় হারিয়ে যাবে। কাকে বললে হালকা হব জানি না। এই বয়সেও যদি স্বামীকে না বলি তাহলে অপরাধী হয়ে মরতে হবে আমাকে। জীবন সংসারের মোটামুটি ভালো বন্ধু স্বামী। অন্তত তাকে বলা উচিত। বাংলাদেশের ইতিহাসে ২৬শে মার্চ অনেক বেশি অর্থবহ। তার চেয়েও বেশি আমার জীবনের ২৬শে মার্চ।
নিস্তেজ আমি বিছানায় শুয়ে থেকে আবার খানিকটা উঠে কাত হয়ে নিচে ঝুঁকে পড়ে স্বামীর কথাগুলোকে নেড়ে নেড়ে দেখতে লাগলাম।
বুক ভরে শ্বাস নিতে পারি না। জোরে কথা বলতে গেলে থেমে যাই। একমাত্র বিশেষ ওই সময়টাতেই স্বামীর চোখে চোখ রাখতে পেরেছি। অন্য কোনো সময় ইচ্ছা হলেও পারি না, চোখে চোখ রেখে কথা বলতে। আমার জীবনের এমন ঘটনা আর দ্বিতীয়টি নেই।
এরই মধ্যে ছুটা কাজের বুয়া ঘরে ঢুকে বলে, নাই খালা
আমি হকচকিয়ে বলি, কি?
চাইল, আটা, তেল।
তোর খালুকে বল।
খালু তো বাইর অয়া গ্যাছগা।
আমি চুপ।
খালা আপনের কি অইছে? রাইতে গুম আইয়ে নাই?
পরক্ষণেই জরিনা পরামর্শের ভঙ্গি করে বলে, একটা কতা কই, আমার বাড়িয়ালী আইজকা দুপুরে খাওয়ানোর দাওয়াত দিসে। দাওয়াতটা আমারে খাইতে দেন খালা গো, আপনেও যানগা ননদের বাড়ি আর না অইলে উত্তরার বানতুপির বাড়ি।
ঠিক আছে। ঘরটা শুধু পরিষ্কার করে দিয়ে যা।
গুসসা করছেন খালা?
নাহ।
খালা আপনের কাম আমি জীবনেও ছাড়তাম না। আপনে বালা।
হয়েছে যা এখন।
জরিনাকে বিদায় দিয়ে দরজা বন্ধ করে ওয়াল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখি দুপুর হতে আরও ঘণ্টা খানেক বাকি। বিছানায় গা এলিয়ে অন করা সিলিং ফ্যানের দিকে চেয়ে থাকি। হঠাৎ উঠে বসি। ভয় লাগছে অতীতকে। গøাসের ঢাকা পানিটা খাই। কাকতালীয়ভাবে অদ্ভুত একই মিল। উনিশ শ’ একাত্তর সালের ২৬ই মার্চেও ঠিক এই দুপুর বেলাটাই ছিল। আমি চিৎ হয়ে শুয়ে বুকের ওপর ছোট রেডিওটা নিয়ে সিলিং ফ্যানের দিকে চেয়ে থেকে দেশের পরিস্থিতির খবর শুনছিলাম। চোখে স্পষ্ট দেখছি শুরু থেকে শেষ।
মা-বাবার ঘরে আমরা দুটি বোন। বাবু আর আমি ছোট থেকেই ভালো গান গাইতে পারতাম। বুবুর বিয়ে হয়ে যাওয়াতে আমি একা হয়ে যায়। দিনাজপুরের মফস্বল শহরে আমাদের জন্ম এবং বড় হওয়া। যুদ্ধের সময় আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। সবাই বলত আমরা দুই বোনই মার মতো সুন্দরী। যুদ্ধের সময় মা-বাবা দিনাজপুরেই ছিল। শুধু আমাকে নিয়ে আসা হয় ঢাকায়। এলিফ্যান্ট রোডে বুবুর কাছে। দ্বিতীয় বারের মতো দুলাভাইয়ের সাথে ঢাকায় এসে আমি তো খুব খুশি। আমাকে দেখে বুবুর ছেলে-মেয়েরা যেন একটা নতুন খেলনা পেয়েছে। সারাক্ষণ ওদের সাথে খেলতে হতো। কিছুদিন পর ছোট খালা এসে বুবুর কাছ থেকে আমাকে নিয়ে যায় ওদের পশ্চিম ধানমন্ডির বাসায়। তিন দিন থাকার পর এলিফ্যান্ট রোডে এসে দেখি বুবুরা নেই। বিল্ডি য়ের কেউই নেই। পাক হানাদার বাহিনীর ভয়ে এলাকার সবাই পালিয়েছে। দরজায় দাঁড়িয়ে আমি কাঁদছিলাম। বুবু থাকত নিচতলায়। ফ্ল্যাটের দরজাটাও তালা দেয়ার সময় পায়নি অথবা প্রয়োজন মনে করেনি। ঘরে এসে বসতেই এলাকার মধ্য বয়সী মুদির দোকানদার একটা চিঠি আর কিছু টাকা এনে আমার হাতে দিলো। লও তোমার বোইনে এটি দিয়া গেছে। তোমার যদি একলা থাকতে ডর করে, তাইলে আমার পরিবারের লগে থাকতে পারো। তোমার মর্জি।
বুবুর চিঠি পড়ে বুঝলাম, বুবুরা জিনজিরা থেকে না আসা পর্যন্ত আমাকে এই বাড়ির চিলেকোঠায় লুকিয়ে থাকার মতো করে একজন মুক্তিযোদ্ধা মেয়ের সাথে থাকতে হবে। মেয়েটির নাম পারুল। বয়স আঠারো-উনিশ।
পারুল শুধু রাতে থাকত আমার সাথে। সারাদিন আমি একা। বেশির ভাগ শুধু ডাল রান্না করে ভাত খেতে হতো। কোনো খাবার পাওয়া যেত না। কোনোভাবেই মনের অবস্থা ভালো রাখতে পারতাম না। মুক্তিযোদ্ধা মেয়েটিও চুপ করে থাকত। কথা বলত কম। খালার বাড়িটি হানাদারদের দখলে চলে যাওয়াতে ফিরে যেতে পারিনি খালার কাছে। সবচেয়ে বেশি গুলির শব্দ পেয়েছিলাম ২৫ই মার্চের রাতে। সারা রাত কান বন্ধ করে খাটের নিচে লুকিয়ে ছিলাম।
অবশেষে পরের দিন এলো ২৬শে মার্চের সেই দুপুর বেলা। আমাকে হানা দেয়। বাহিনী ছাড়া। একজনই। আমি তো বলব, এই একজন দশজন পাক বাহিনীর চেয়েও নির্মম। পাক বাহিনীরা বাংলাদেশের সাথে যা করেছে তা ইতিহাসে আছে। সবাই জানে। লজ্জা তো তাদেরই বেশি হওয়া উচিত যারা নিজের ঘরে নিজেই চোর। নিজেরাই নিজেদের ছাড় দেয়নি।
মাথা ঝিম ধরেছে। বাথরুমে যাওয়ার জন্য উঠে দেখি বিকেল পাঁচটা বাজে। এতকাল বার বার বুবুকে বলতে চেয়েও বলতে পারিনি। আর এখন তো বুবু বেঁচে নেই। ধর্ষকও বেঁচে নেই। যেভাবেই হোক আজ রাতে আমি মুখ খুলব। যারটা খাই, পড়ি। ভালোভাবে বেঁচে আছি যার ব্যবহারের কারণে।
বেসিনের লুকিং গøাসে দেখছি। আমি একটুও অস্বাভাবিক না। এভাবেই বলব, শোনো, একাত্তরের ২৬শে মার্চ দুপুর বেলা আমার দুলাভাই, বুবুর বর আমাকে ধর্ষণ করেছিল। জীবনে কাউকে বলা হয়নি। এত বছর পর এই প্রথমবারের মতো তোমাকে বলছি। আমার একটা জারজ সন্তান আছে কানাডায়। ও ভালোই আছে ওর ঘর-সংসার নিয়ে। আমাকে ছেলেটি মনে রেখে মাঝে মাঝে ফোনে খোঁজখবর নেয়।
এখন তুমি যদি আমাকে ভালো না বাসতে পারো তাহলে আমি কানাডায় চলে যাব। আর তোমাকে যদি আমি না জানাতাম, তাহলে এত বছর যেমন, তেমন করেই আমার সারাজীবনের ২৬শে মার্চের সেই দুপুর বেলা অন্ধকার হয়েই নিভে থাকত।
এখন তুমি যদি আমাকে ভালো না বাসতে পারো তাহলে আমি কানাডায় চলে যাব। আর তোমাকে যদি আমি না জানাতাম, তাহলে এতে বছর যেমন, তেমন করেই আমার সারা জীবনের ২৬শে মার্চের সেই দুপুর বেলা অন্ধকার হয়েই নিভে থাকত।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর