Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৮ আশ্বিন ১৪২৫, ১২ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

মুসলিম বিশ্বের স্বাধীনতা পরিস্থিতি

ড. মু হা ম্মা দ সি দ্দি ক | প্রকাশের সময় : ২৬ মার্চ, ২০১৮, ১২:০০ এএম

মুসলমানদের স্বাধীনতা ব্যক্তিগতভাবে বা রাষ্ট্র ও সম্পদায়গতভাবে, তা এখন ‘ক্রাইসিস’-এর ভেতরে। সতের শ’ সাল থেকেই এ অবস্থা। এখনও সঠিক পথ পায়নি মুসলিমরা। বহু মুসলিম দেশে ও এলাকায় নেই গণতন্ত্র, নেই মানবাধিকার। একনায়কত্ব বা রাজতন্ত্র মুসলমানদের আশা-আকাক্সক্ষা উড়িয়ে দিয়েছে। যেসব দেশে সামান্য যেটুকু গণতন্ত্র রয়েছে তা টেকসই নয়, তা ভঙ্গুর। মানবাধিকার লংঘন, জেল-জুলুম, খুন, গুম, পুলিশি ও গোয়েন্দা নির্যাতন, রাজনৈতিক অধিকারহীনতা ইত্যাদি ডাল-ভাতের মতো। অনেক মুসলিম দেশকে আবার বেইনসাফি মুসলিম ও অমুসলিম দেশসমূহ চাপের মুখে রেখে এমনকি সন্ত্রাস ও সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে, তাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বই নস্যাতে লিপ্ত। ফলে না ব্যক্তি মুসলমান, না মুসলমান রাষ্ট্র বা সম্প্রদায়, স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ পাচ্ছে। এমনকি তাদের জীবন ও দেশ উভয়ই বিপন্ন হয়ে পড়েছে।
হালে ওআইসি’র মূল প্রেরণাদায়ী রাষ্ট্র সউদী আরবের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতি লক্ষ্য করে চিন্তাশীল মুসলিমরা হতবাক। কাবার মসজিদ ও নবী (সা:)-এর মসজিদের খাদেমের এখন ইসরাইল ও ইহুদিদের বিশ্বস্ত বন্ধু। ইহুদিদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা যাবে না, ব্যাপারটা তা নয়। অতীতে মুসলিম শাসকরা স্পেন-পর্তুগালের ইহুদিদের বিরুদ্ধে খ্রিষ্টান সন্ত্রাস থেকে সুরক্ষা দিয়েছে। এমনকি স্পেন-পর্তুগাল থেকে মুসলিম-ইহুদি উভয়ই উৎখাত হলে, ইহুদি-মুসলিম শরণার্থীদের জায়গা দিয়েছে নিজেদের দেশে। এভাবে লক্ষ লক্ষ ইহুদি-খ্রিষ্টান সন্ত্রাস থেকে বেঁচে মরক্কো, তুরস্কের উসমানী সা¤্রাজ্য ও আরো মুসলিম দেশে ইজ্জত নিয়ে বসবাস করেছে। আমার স্ত্রী ও আমি মুসলিম স্পেনের রাজধানী কর্ডোভা শহরে দেখেছি কিভাবে স্পেনের খলিফা তার প্রাসাদের লাগোয়া প্রাচীরের পাশে ইহুদিদের মহল্লা রেখে ইনসাফের পরিচয় দেন। বর্তমান যুগের ইহুদিরা সাংঘাতিক মুসলিম বিদ্বেষী। কিভাবে কাবা শরীফ ও মসজিদে নববীর খাদেমরা মুসলমানকে ছুড়ে ফেলে ইহুদিদের এক নম্বর বন্ধু জানাতে পারে? অবশ্য এর আগেই ইহুদিরা কাবা শরীফ পর্যন্ত পৌঁছেছে কাবার পাশেই হিলটন হোটেলের ব্যবসা করে। বর্তমান মিত্রতায় ইসরাইল, সউদী আরব, মিসর, সংযুক্ত আমিরাত ও বাহরাইন এক হয়েছে। এটি মুসলিম সংহতি ধ্বংসের নজিরবিহীন নমুনা। এটাই হলো নিজের পায়ে কুড়াল মারা, খাল কেটে কুমির আনা। অতীতে এই নীতি ধারণ করার জন্য মুসলমানরা পর্তুগাল থেকে গ্রিস পর্যন্ত উত্তর ভ‚মধ্যসাগর তীরবর্তী ইউরোপ থেকে উৎখাত হয়েছে। স্পেন তথা ইতালির সিসিলি দ্বীপের পার্লামেন্ট শহরে আমার স্ত্রী ও আমি দেখেছি কিভাবে মসজিদগুলো গির্জাতে পরিণত হয়েছে। কর্ডোভা ও পালার্মোর মসজিদ-গির্জাতে এখন শত শত মূর্তি। কর্ডোভা ও পালার্মোর মসজিদ-গির্জাতে এখনও মেহরাব ও মিনার আছে, কিন্তু নেই কোনো মুসল্লি।
সউদী পররাষ্ট্রনীতিতে মুসলিম বিশ্ব ছিন্নভিন্ন হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সউদী আরব সফরের পর এই ধ্বংসাত্মক নীতি গতি পায়, ইসরাইল ও মিসরীয় জেনারেল সিসি (যিনি আবার ইহুদি মাতার পুত্র এবং যাকে নিয়ে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু গর্বিত) লাই পেয়ে যায়। শুধু একটু আশার খবর এসেছে যে, ইয়েমেনে ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ বন্ধে সউদী ও হাউসি বিদ্রোহীদের ভেতর ওমানে সরাসরি গোপন আলোচনা হচ্ছে। তবে তা কি ইসরাইল নস্যাৎ করবে?
মুসলিশ বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা আরবরা বহু আগেই হারিয়ে ফেলেছে। সংগল হালাকু খান কর্তৃক ১২৫৮ সালে বাগদাদ ধ্বংসের পর আরবরা আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। আরবদের পরে তুর্কি আফগানদের নেতৃত্ব আসে। এখন একমাত্র ইরানই মাথা উঁচু করে রয়েছে। অথচ তাকে ধ্বংস করতে আরবের একাংশ ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। সিরিয়ার সরকার ইরানের ও রাশিয়ার বন্ধু। আন্তর্জাতিক এই এলাইনমেন্ট (সরলরেখায় শ্রেণীবদ্ধভাবে অবস্থান)-এর জন্য সুন্নি আরবদের উচিত হয়নি এই আত্মঘাতী যুদ্ধে লিপ্ত হতে। পাশ্চাত্যের পরামর্শে তাদের কান পাতা ক্ষতিজনক হয়েছে। অতীতে তারা পাশ্চাত্য বন্ধু জেনারেল এলেনবি, লরেন্স অব এরাবিয়া প্রমুখদের কারণে জেরুজালেম তথা ফিলিস্তিন হারিয়েছিল। সিরিয়ার সুন্নি আরব যদি শিয়া শাসনে সিরিয়ায় অধিকার না পেয়েই থাকে, তাই বলে সেই গৃহযুদ্ধে সুন্নি আরব কেন ঘি ঢালবে? সউদী আরব, মিসর ও আরব-আমিরাতের সাধারণ সুন্নিরা কি মানবাধিকার ও গণতন্ত্র পাচ্ছে? পারমাণবিক বোমায় সজ্জিত রাশিয়া আফগানিস্তান থেকে উৎখাত হয়েছে। এখন সিরিয়া ও ইরান থেকে রাশিয়া উৎখাত হতে চায় না। প্রয়োজনে সে পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করবে। এই পরিস্থিতিতে সুন্নি আরবদের তাদের কাছে ভাই শিয়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইসরাইল ও পাশ্চাত্যের ষড়যন্ত্রে যাওয়া মারাত্মক, কৈশলগত ভুল হয়েছে। আরবরা পাশ্চাত্যের ইতিহাস থেকে এখনও শিক্ষা নিলো না। আরবরা পাশ্চাত্যকে এত তোয়াজ করে, অথচ আরব-তুর্কিরা পাশ্চাত্যের নিকট ঘৃণ্য, কারণ অতীতে প্রাচ্যের একমাত্র আরব ও তুর্কিরাই ইউরোপের মাটিতে বীরদর্পে বিচরণ করছে। এখন তারই প্রতিশোধ তারা নিচ্ছে। অথচ হতভাগা আরব মুসলমানদের এক অংশ তা বুঝতেই পারছে না। হতভাগা!
ইরানকে কোণঠাসা করে স্বাধীনতা নস্যাৎ করার চেষ্টা করা হলেও বর্তমান আন্তর্জাতিক ‘এলাইনমেন্ট’ তার পক্ষে। তার পক্ষে রয়েছে রাশিয়া ও চীন, তুরস্ক ও সিরিয়া। এমনকি পাকিস্তান ও ইন্ডিয়াও ইরানের সাথে কোনো না কোনোভাবে থাকবে। চীন জানে, ইরান ধ্বংস হলে চীন ও রাশিয়া আরব সাগর তথা ভারত মহাসাগরে সরাসরি নামতে পারবে না। আর চীনের কোটি কোটি ডলারের তৈরি গিলগিট-গোয়াদরের সড়ক অকেজো হয়ে পড়বে। সিরিয়া ও ইরানকে সম্পূর্ণ উৎখাতের চেষ্টা নিলে বিশ্বে পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে, কারণ রাশিয়া-চীন এই পরিস্থিতিতে তাদের জন্য বিপজ্জনক মনে করবে।
আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা দিয়েও বলা যেতে পারে যে, আরবদের দিন শেষ। আল্লাহ অন্য জাতিকে আনবেন ইসলামের মর্যাদা রক্ষা করতে। ইরানিরা আহলে বায়েতকে ভালোবাসে। আহলে বায়েতের বংশেই ইমাম মেহেদীর আগমন হবে। ইসরাইলি-ইহুদি দাম্ভিকতা ইমাম মেহেদীর হাতেই খতম হবে। এসব তো হাদিস-কুরআনের কথা। আর কে আছে সেই মুসলমান যে নবী (সা:)-এর মুখ নিঃসৃত বাণীকে সন্দেহ করে?
অতীতে পাশ্চাত্য দেখানো মুসলিম দেশগুলোর স্বাধীনতা নস্যাতে ষড়যন্ত্র করে। এখনও তা অব্যাহত রয়েছে। কেননা কোনোভাবে অতীতে আরবদের বন্ধু সেজে তারা তুর্কি ও কুর্দিবিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে। অতীতে জেরুজালেম জয়ী কুর্দিদের টুকরা টুকরা করে তাদের এলাকা তুরস্ক, সিরিয়া, ইরাক ও ইরানের ভেতর ভাগ করে দেয়। এখন আবার এই চারটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতাকে দুর্বল করতে কুর্দিদের উসকাচ্ছে ও সশস্ত্র সাহায্য দিচ্ছে সন্ত্রাস, জব্দ করতে। সন্ত্রাস ও যুদ্ধ যে পাশ্চাত্যই করে এই তার প্রমাণ। ইরাক ও সিরিয়া এর ভেতরই দুর্বল হয়ে গেছে কুর্দিরা পাশ্চাত্যের ফাঁদে পড়ার অবস্থায়।
অতীতে কুর্দিদের স্বাধীনতা দিলে কোনো সমস্যা হতো না। কিন্তু এখন তাদের উসকানি দিলে চার-চারটি মুসলিম রাষ্ট্রের স্বাধীনতা হুমকির মুখে আসবে। ‘এথলিসিটি’ বা ভাষা দিয়ে রাষ্ট্রের সীমানা ঠিক করলে পৃথিবীর বহু রাষ্ট্রের সীমানা পরিবর্তন করতে হবে। এতে তো ‘প্যানডোরার বাক্স’ খুলে যাবে। শত শত নতুন রাষ্ট্রের জন্ম দেবে এই নীতি।
তুরস্ক কামাল পাশার আমল থেকে পাশ্চাত্যের মিত্রের দায়িত্ব পালন করেছে। এটা করতে গিয়ে কামাল পাশা তার নাম বদলিয়েছেন (‘পাশা’ উপাধীন ছুড়ে ফেলে) ধর্ম ত্যাগ করেছেন, দেশের সংস্কৃতি, লিপি, পোশাক সবকিছু পরিত্যাগ করে ইউরোপীয় হলেন। তবু তুরস্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশ পেল না। কারণ এখনও তার গায়ে তুর্কি ও মুসলমানী গন্ধ। এটা কি পাশ্চাত্যের সেকুলার নীতি নয়? পাশ্চাত্য যে এখনও খ্রিষ্টান, তাদের তুরস্কনীতি তাই প্রমাণ করে। আসলে ইউরোপ আরব ও তুর্কিদের পছন্দ করে না, কারণ তারাই তো প্রাচ্যের জাতিসমূহের মধ্যে ইউরোপে দাপিয়ে বেরিয়েছে। এ ইতিহাস তাদের আঁতে ঘা দেয়। যারা দীপ্ত টিভিতে ‘সুলতান সুলেমান’ নামক সিরিয়াল দেখছেন তারা এটা কিছুটা অনুধাবন করবেন। আর যারা ইউরোপের ইতিহাস পড়েছেন তারা বেশি জানবেন।
সাবেক জার্মান রাষ্ট্রদূত নব্য মুসলিম মুরাদ উইলফ্রেড হফম্যান খাঁটি কথা বলেছেন, ‘ঐতিহাসিকভাবে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে খ্রিষ্টানদের মনে যে শত্রæতা রয়েছে, তার মূলে রয়েছে এই ধারণা যে, মুহাম্মদ (সা:) একজন ভÐ ছিলেন। খ্রিষ্টানদের চোখে মুসলমানদের শত্রæ হিসেবে দেখার জন্য এটুকুই যথেষ্ট ছিল। ..... ক্রুসেডের অনুপ্রেরণা খ্রিষ্টান হৃদয় থেকে মুছে গেছে বা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, এমন বিশ্বাস করাটা এক বিপজ্জনক কল্পনাবিলাস ছাড়া কিছুই নয়।..... বাস্তব কথা হচ্ছে এই যে, ক্রুসেড যুগের সমাপ্তি কখনোই ঘটেনি। আসলে সত্যিই কি কেউ এই সত্য উদঘাটন করতে ইচ্ছুক যে ইতিহাসে কাদের অধ্যায় বেশি রক্ত রঞ্জিত? খ্রিষ্টানদের না মুসলমানদের? ফ্রান্স ছাড়া আর কোথাও সত্যিকার অর্থে ধর্মনিরপেক্ষতা মেনে চলা হয় না। বাকি সব পশ্চিমা দেশই খ্রিষ্টান-গণতন্ত্র বা খ্রিষ্টান-প্রজাতন্ত্র, আর তাও তা সেসব দেশের আইন-সংবিধান অনুযায়ী। সুতরাং ধর্মনিরপেক্ষ নয় বলে একটা ইসলামী রাষ্ট্রকে প্রত্যাখ্যান করাটা একটা নির্ভেজাল সাধনা। আমাদের বোকার স্বর্গে বসবাস করা উচিত নয়। বাস্তব সত্য হচ্ছে ইসলামকে হেয় করতে পশ্চিমা মানসে লালিত বৈষম্যমূলক মনোভাব এতই প্রবল যে, যে কোনো দিন পক্ষপাতিত্ব ভীতি এবং নিজেদের উন্নততর মনে করার প্রবণতা থেকে একটি মুসলিমবিরোধী ধ্বংসযজ্ঞের সূচনা হতে পারে। (হফম্যানের ‘ইসলাম ২০০০’ শীর্ষক বইয়ের অনুবাদ থেকে)।
যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ক প্রেসিডেন্ট এরদোগানকে সরিয়ে একজন বশংবদ প্রেসিডেন্ট আনতে তুরস্কে ষড়যন্ত্র, সন্ত্রাস সবই করল। আল্লাহর রহমতে তুরস্কের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা পেলেও, আবার যে যুক্তরাষ্ট্র ঘুঁটি চালবে না, কে বলল। তুরস্কে মার্কিন ঘাঁটি, সৈন্য ও বিমান রয়েছে। ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া ও আফগানিস্তান ধ্বংস। বাংলাদেশও মিয়ানমার ও ইন্ডিয়ার হুমকিতে। ইন্ডিয়ার সেনাপ্রধানের হুমকি স্বাধীনতা বিপন্ন করতে পারে।
লেখক : ইতিহাসবিদ গবেষক



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর