Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫, ৯ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

মানব জীবনে স্বাধীনতা ও ইসলাম

এইচ. এম. মুশফিকুর রহমান | প্রকাশের সময় : ২৯ মার্চ, ২০১৮, ১২:০০ এএম

প্রত্যেক মানুষ চায় স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকতে, স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে। স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। এ অধিকার যে কত বড় মাপের, তা পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধরাই কেবল অনুধাবন করতে পারেন। তাই স্বাধীনতাকে খর্ব করার অধিকার কারো নেই। এ অধিকার খর্ব করা যেমন মানবাধিকার পরিপন্থী; তেমনি মহান আল্লাহর আইনের বিরোধীও বটে। স্বাধীনতা আল্লাহ প্রদত্ত এক আমানত, যা আল্লাহ তা‘আলা আমাদের দান করেছেন। অমূল্য এ আমানত রক্ষার ব্যাপারে কোনো ধরনের অবহেলা ও বিশ্বাসঘাতকতা মোটেই কাম্য নয়। মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হলে তারা বিভ্রান্ত হয় এবং অধঃপতনের শিকার হয়। উন্নত সমাজ ও জাতি গঠনে স্বাধীনতার কোনো বিকল্প নেই।
আল্লাহ মানুষকে স্বাধীন করেই সৃষ্টি করেছেন এবং এই স্বাধীনতা নিয়েই মানুষ জন্মগ্রহণ করে। তার জন্মগত অধিকার হচ্ছে কেউ তাকে তার এই স্বাধীনতা ভোগের অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে না। জোর-জবরদস্তি করে তাকে দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দি করবে না।
ইসলাম যখন স্বাধীনতাকে তার মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করে তখন সময়টি ছিল এমন যে, অধিকাংশ মানুষ বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনীতিক, সামাজিক, ধর্মীয় এবং অর্থনৈতিকভাবে আক্ষরিক অর্থেই ক্রীতদাসে পরিণত হয়েছিল। মানুষের এই বহুরূপ দাসত্ব-শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে ইসলাম স্বাধীনতা ঘোষণা করল। বিশ্বাসের স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, কথা বলার স্বাধীনতা এবং সমালোচনার স্বাধীনতাসহ সব ক্ষেত্রেই ইসলাম স্বাধীনতা দিয়েছে। আর চিরকাল ধরে এসব বিষয়েই মানুষ তাদের স্বাধীনতা প্রত্যাশা করে আসছে। এটা হলো ব্যক্তি জীবনের স্বাধীনতা। আবার কোন রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রকে জবর দখলের মাধ্যমে সমগ্র জাতিকে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে। কোন একসময় জাতি রুখে দাঁড়ায়, তীব্র প্রতিরোধ বা যুদ্ধের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে শৃঙ্খল মুক্ত করে দেশকে স্বাধীন করে। আর এটাকে বলে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষিত হয়েছিল। তাই ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। বিশ্বের বুকে লাল-সবুজের পতাকা ওড়ানোর দিন। ইতিহাসের পৃষ্ঠা রক্তে রাঙিয়ে, আত্মত্যাগের অতুলনীয় দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে যে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাঙালি, দীর্ঘ ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন তার চূড়ান্ত পরিণতি।
দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় বাংলাদেশের বিজয় ও স্বাধীনতা। পাকিস্তানি শাসন, শোষণ, নির্যাতন ও নিপীড়নের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য স্বাধীনতার সংগ্রামে এ দেশের জনগণ জীবনবাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ইসলাম যে দেশপ্রেম তথা মাতৃভূমির জন্য যুদ্ধের কথা বলেছে এই যুদ্ধ ছিলো সেই চেতনারই শামিল।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাদর্শ ও স্বভাব-চরিত্রে দেশপ্রেমের অনন্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। তিনি মাতৃভূমি মক্কাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তাই স্বজাতি কর্তৃক নির্যাতিত হয়ে জন্মভূমি মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতকালে বারবার মক্কার দিকে ফিরে তাকিয়ে কাতর কণ্ঠে আফসোস করে বলেছিলেন, ‘হে আমার স্বদেশ! আমি তোমাকে ছেড়ে যেতাম না। যদি না আমাকে বাধ্য করা হতো।’
সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে বাধা প্রদান, সত্যের দ্ব্যর্থহীন প্রকাশ ইসলামের এক গুরুত্বপূর্ণ বিধান, যা ইসলামকে বিশেষ বৈশিষ্ট্যে ভূষিত করেছে। ইসলাম স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা ও চর্চা, নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা লাভসহ শাসকগোষ্ঠী ও আমলাদের ওপর জনসাধারণের নজরদারি এবং ভদ্রোচিত পদ্ধতিতে তাদের সমালোচনার শিক্ষা দিয়েছে। যেন এসব থেকে তারা শিক্ষা নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। উদ্দেশ্য একটাই, দেশকে তার গন্তব্য ও সঠিক লক্ষ্যে পরিচালিত করা। এ বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয় খোলাফায়ে রাশেদিনের জীবনাচার ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়টি সামনে আনলে।
ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ চিন্তা, বিশ্বাস ও আদর্শ বেছে নেওয়ার ব্যাপারে স্বাধীন। এমনকি ভিন্নমতের অধিকারী ব্যক্তি অধিকারকেও স্বীকার করে ইসলাম। তবে ইসলাম স্বাধীনতার কিছু সীমারেখা টেনে দিয়েছে, যাতে তা মানুষের বিভ্রান্তি ও অধঃপতন কিংবা অন্যদের ক্ষতির মাধ্যম না হয় বা অন্যদের স্বাধীনতা ও অধিকার হরণ না করে।
ইসলাম গতানুগতিক কোনো স্বাধীনতার স্লোগান গান নিয়ে আসেনি, ইসলাম মানবতার সামগ্রিক জীবনে মুক্তি, সাম্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার বাস্তব কর্মসূচি দিয়ে মানুষকে সৎ পথে চলার দিকনির্দেশনা দিতে এসেছে। ইসলাম মানব জীবনে ধর্মীয় স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ইত্যাদি দিয়ে ধন্য করেছে।
এ অধিকার উপেক্ষা করে যুগে যুগে কিছু পাপাচারী স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থ করতে যেয়ে আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপ করে মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করে পরোক্ষভাবে নাগরিক জীবনকে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করার অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে দেশে দেশে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
ইসলাম শুধু পুরুষদের তার মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা দেয়নি, নারীদেরও তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিয়েছে।
ইসলাম রক্তপাত, হানাহানি, মারামারি, হত্যা অথবা ইসলাম গ্রহণে জবরদস্তির অনুমোদন দেয় না, কিন্তু অন্যায়, হত্যা, স্বাধীনতা হরণ প্রতিরোধে যুদ্ধ করতেও নির্দেশ দেয়। নিজ দেশকে পরাধীনতামুক্ত রাখতে সর্বাত্মক শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। কেননা কোনো জুলুমকেই প্রশ্রয় দেয় না ইসলাম। জালিমদের খপ্পর থেকে মুক্ত ও স্বাধীন করতে লড়াই করার তাগিদ দিয়ে আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের কী হলো যে, তোমরা যুদ্ধ করবে না আল্লাহর পথে এবং অসহায় নর-নারী এবং শিশুদের জন্য যারা বলে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! এই জনপদ-যার অধিপতি জালিম, তার থেকে আমাদেরকে অন্যত্র নিয়ে যাও, তোমার নিকট থেকে কাউকে আমাদের অভিভাবক কর এবং তোমার নিকট থেকে কাউকেও আমাদের সহায় কর।’ [সূরা নিসা : ৭৫]
জুলুম ও শোষণমুক্ত, আল্লাহদ্রোহী মানসিকতামুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রকে কল্যাণরাষ্ট্রে অক্ষুন্ন রাখতে নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। কেননা স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা অধিক কঠিন। তাই তো আল্লাহ আদেশ করেছেন, ‘তোমরা সর্বদাই তোমাদের শত্রুদের প্রতিহত করতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়ে সাবধান থাকবে। এই প্রস্তুতি দ্বারা তোমরা তোমাদের এবং আল্লাহর দুশমনদের ভীতসন্ত্রস্ত করে রাখবে।’ [সূরা আনফাল : ৬০]
ইসলাম স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হলেও সে স্বাধীনতা বল্গাহীন স্বাধীনতা নয়। সে স্বাধীনতা কিছু বিধিনিষেধ দ্বারা সুনিয়ন্ত্রিত। ইসলামে স্বাধীনতা হচ্ছে নিজেকে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে দেশ ও জাতির জন্য কাজ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘বলো, আমার সালাত, আমার ইবাদাত, আমার জীবন ও আমার মরণ জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই উদ্দেশ্যে।’ [সূরা আনয়াম : ১৬২] ইসলাম মানুষকে রাজনীতি করার অধিকার দিয়েছে, কিন্তু স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বৈরতান্ত্রিকতাকে মোটেও প্রশ্রয় দেয়নি। দলের ঊর্ধ্বে উঠে ছোট-বড়, ধনী-নির্ধন, দুর্বল-সবল সকলের প্রতি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আমি তো তোমার প্রতি সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাতে তুমি আল্লাহ তোমাকে যা জানিয়েছেন সে অনুসারে মানুষের মধ্যে বিচার মীমাংসা করো।’ [সূরা নিসা : ১০৫] ইসলাম মানুষকে বৈধভাবে জৈবিক চাহিদা পূরণ করার অনুমতি দিয়েছে, কিন্তু জেনা-ব্যভিচারকে নিষেধ করেছে। বলা হয়েছে, ‘তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না, নিশ্চয় এটা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ।’ [সূরা বনি ঈসরাইল : ৩২] ইসলাম পোশাক পরিধানের স্বাধীনতা দিয়েছে, অশালীন পোশাক পরিধানে বারণ করেছে। ইসলাম মানুষকে অর্থ উপার্জনের স্বাধীনতা দিয়েছে, কিন্তু অবৈধ পথ পরিহারের নির্দেশ দিয়েছে। বলা হয়েছে, ‘সালাত সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করবে।’ [সূরা জুমু’আ : ১০] ইসলাম বৈধভাবে অর্থ ভোগের স্বাধীনতা দিলেও অর্থনৈতিক বৈষম্য রোধে ধনীদের সম্পদে একচ্ছত্র ভোগাধিকার দেয়নি। বলা হয়েছে, ‘তাদের ধনসম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের হক।’ [সূরা জারিয়াত : ১৯] অর্থ উপার্জনে ইসলাম ব্যবসাকে বৈধ করলেও সুদকে চিরতরে হারাম ঘোষণা করেছে। ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ [সূরা বাকারা : ২৭৫]
ইসলাম শোষণমুক্তির কথা বলে। মানুষের দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়ে মানুষকে আল্লাহর কাছে সমর্পিত হতে শিক্ষা দেয়। কাজেই মুসলমানের প্রকৃত মুক্তি ও সফলতা হলো পরকালীন মুক্তি ও সাফল্য। কোনো কাজে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য না হওয়া পর্যন্তই মুসলমানদের স্বাধীনতা রয়েছে।
প্রতিবছর মহান স্বাধীনতা দিবস জাতির জীবনে প্রেরণায় উজ্জীবিত হওয়ার নতুন বার্তা নিয়ে আসে। স্বাধীনতা দিবস তাই বাংলাদেশের মানুষের কাছে মুক্তির প্রতিজ্ঞায় উদ্দীপ্ত হওয়ার ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন ও তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের অঙ্গীকারের দিন। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও আমরা ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, গ্লানি থেকে মুক্তি পাইনি। এবারের স্বাধীনতা দিবসে তাই আমাদের শপথ হওয়া উচিত ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও নিরক্ষর মুক্ত দেশ গড়ার। যে দেশের জনগণ ৩০ লক্ষ মানুষের প্রাণ ও কোটি জনতার ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করে, সে জাতি এক বীরের জাতি। ৭১ আমাদেরকে শিখিয়েছে দেশ, জাতি ও মানুষের কল্যাণের জন্য দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ত্যাগ স্বীকার করা। এবারের স্বাধীনতা দিবসে আমরা তাই নতুন করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ন্যায়, সাম্য প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের জন্য শপথ গ্রহণ করি।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ