Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ০১ কার্তিক ১৪২৬, ১৬ সফর ১৪৪১ হিজরী
শিরোনাম

৪৬ বছরেও হয়নি বিচারপতি নিয়োগের নীতিমালা

রাজনৈতিক কারণেই নীতিমালা প্রণয়নের উদাসিনতা -আইনজ্ঞরা/ আগামী মাসেই বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়ার সম্ভাবনা

মালেক মল্লিক | প্রকাশের সময় : ৩১ মার্চ, ২০১৮, ১২:০০ এএম

সংবিধান প্রণয়নের ৪৬ বছর পরেরও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগ আইন বা নীতিমালা করা হয়নি। অথচ সংবিধানে উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগে সুস্পষ্ট আইন করার জন্য নির্দেশনা রয়েছে। সর্বপ্রথম ১৯৭৮ সালে আইন করার বিষয়টি সংবিধানে যুক্ত হয়। বছরের পর বছর এটা কাগজে কলমে থাকে। সর্বশেষ ২০১৪ সালে নিয়োগের নীতিমালার তৈরির উদ্যোগ নেয় বর্তমান সরকার। খসড়াটি প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে পাঠায় আইন মন্ত্রনালয়। তবে তা এখন পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি নিয়োগের পর পরই উচ্চ বিচারপতি নিয়োগের উদ্যোগ নেয় সরকার। আগামী মাসেই বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়ার কার্যক্রম শুরুর সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে প্রস্তাবিত বিচারপতিদের যোগ্যতার পাশাপাশি অতীতের রাজনৈতিক ভূমিকা গভীরভাবে খতিয়ে দেখছে সরকার এমনটাই জানিয়েছে একটি সূত্র।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এত বছরের মধ্যে কোন সরকারই বিচারপতি নিয়োগ আইন করেনি। এটা মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই কারনেই। কারণ এটা হলে পছন্দের ব্যক্তিকে বিচারপতি করা যাবে না। এদিকে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির দাবি জানিয়ে আসছে আইন প্রনয়নের আগে উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগ নয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক আইন মন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ ইনকিলাবকে বলেন, আমি আইনমন্ত্রী থাকার সময়ে বিচারপতি নিয়োগে নীতিমালা চূড়ান্ত খসড়া করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যলায়ে পাঠিয়েছিলাম। আমি যতদুর জানি সেটি প্রেসিডেন্ট এর কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছিল। এরপর কি হল আমার জানা নেই। তিনি আরো বলেন, উচ্চ আদালতের বিচারপতি নীতিমালা করাটা জুরুয়ী। এটা করলে ক্ষতি নেই বরং লাভ । রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রতিটি সরকার এই নীতিমালা করতে রাজি এমন প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের সরকারের সাবেক এই আইনমন্ত্রী বলেন, আমি এটা বলব না। তবে কেন নীতিমালা করনে না এটা আমার বোধগম্য নয়।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ও বিএনপি যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন ইনকিলাবকে বলেন, কোন সরকারই বিচারপতি নিয়োগ নীতিমালা করেনি। এটা দু:খজনক। কারণ বিচারপতি রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ করা হলে আদালতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যাবে। তিনি আরো বলেন, বিএনপি উচিত ছিল নীতিমালা করা।তারা করেনি। ওইসময় আদালতের কোন নির্দেশনা ছিল না। এখন হাইকোর্টের রায় আছে সেই অনুযারী বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে। অন্যথায় আদালত অবমাননা হবে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা আইনজীবীরা আইনে শাসনের বিশ্বাসী। নীতিমালা করে বিচারপতি নিয়োগ করা হোক। অন্যথায় আমরা(আইনজীবীরা) সারা দেশে প্রতিবাদ কর্মসূচির মতো কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবো।
সূত্রে জানা যায়, সুুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগে বর্তমানে মোট ৮৪ জন বিচারপতি রয়েছেন। আপিলে ৪ জন ও হাইকোর্টে ৮০ বিচারর্প্যতি রয়েছেন। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা ও চলতি বছর ২ ফেব্রুয়ারী আপিল বিভাগের সিনিয়র বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা হঠাৎ পদত্যাগের পর আপিলে বিচারপতির সংকট দেখা দিয়েছে। বিচারপতির অভাবের ইতোমধ্যে আপিলের একটি বেঞ্চে বিচারকার্য বন্ধ রয়েছে। অথচ উচ্চ আদালতে প্রায় ৫ লক্ষাধিক মামলার বিচাররের জন্য অপেক্ষা রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবীরদের মতে, বিচারপতি নিয়োগ না হওয়ার এতে করে ব্যাহত হচ্ছে উচ্চ আদালতের বিচারকার্য। বাড়ছে মামলার জট ও বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি। বিচারিক সেবার মান বৃদ্ধি ও মামলার জট নিরসণে দ্রæত বিচারক নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন। ২২তম প্রধান বিচারপতি নিয়োগ হওয়ার পর পরই উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগের কার্যক্রম শুর হয়। বিচারপতি নিয়োগ আইনের খসড়া কাজ চলছে বলে জানা গেছে। আপিল বিভাগে ৪ জন এবং হাইকোর্ট বিভাগে ১২ থেকে ১৫ জন বিচারপতি নিয়োগের একটি তালিকা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বলে কয়েকটি সূত্রে জানা গেছে। প্রধান বিচারপতির পরামর্শক্রমে প্রেসিডেন্ট এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন। উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো আইন বা নীতিমালা না থাকায় দীর্ঘ দিন ধরে আইনজ্ঞ সুশীলসমাজসহ নানা মহলে আইন করার দাবি ওঠে। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির বিচারপতি নিয়োগ নীতিমালা করার দাবি জানিয়েছে।
তিন বছর যাবত বিচারপতি নিয়োগ বন্ধ :
সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার আমলে হাইকোর্টে দুই বছরের বেশি সময় বিচারক নিয়োগ বন্ধ ছিল ২০১৫ সালের ৮ ফেব্রæয়ারি সরকার ১০ জনকে হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে দু’বছরের জন্য নিয়োগ দেয় সরকার। গত দুই বছরে উচ্চ আদালতে আর কাউকে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়নি। যদিও গতবছরের আগস্টে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে সেপ্টেম্বরে প্রধান বিচারপতির কার্যালয় থেকে হাইকোর্টে নিয়োগের জন্য আটজনের নাম প্রস্তাব করে সুপারিশ পাঠানো হয়। তবে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে এই সুপারিশ প্রেরণ করা হলেও নিয়োগ প্রক্রিয়া আলোর মুখ দেখেনি এখনো।
সংবিধান অনুসারে, বিচারপতিদের চাকরির বয়সসীমা ৬৭ বছর করা হলেও নিয়োগ নিয়ে কোন আইন নেই। এ সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের জন্য দীর্ঘদিন থেকে আইনজীবীরা দাবি জানানো হচ্ছে। ২০১০ সালের প্রথমবারের মতো তৎকালীন প্রধান বিচারপতি বিচারপতি এমএম রুহুল আমীন, বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিম, বিচারপতি মো. তাফাজ্জাল ইসলাম, বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীন ও বিচারপতি এম এ মতিন সমন্বয়ে গঠিত পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ এক রায়ে বিচারপতি নিয়োগে একটি গাইডলাইন (নীতিমালা) দেন। এর পর আরও কয়েকটি রায়ে এ বিষয়ে নিদের্শনা দেয়া হয়। এর মধ্যে সবশেষ গত বছরের ১৩ এপ্রিল বিচারক নিয়োগে আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত একটি রিটে সাত দফা নির্দেশনা দেন হাইকোর্ট। ২০১৪ সালের ১৯ আগস্ট উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগে সরকারের কাছে নীতিমামলা প্রণয়নের সুপারিশ করে আইন কমিশন। সুপারিশে বলা হয়, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কমিটির মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তিদের বিচারপতি পদে নিয়োগ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিচারপতি পদে নিয়োগে কমপক্ষে ৫০ বছর এবং অবসর গ্রহণের বয়স ৭৫ বছর নির্ধারণ করলে অভিজ্ঞ বিচারক দক্ষতার সঙ্গে অধিক সময় বিচারিক দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবেন বলেও সুপারিশে উল্লেখ করা হয়। ১৯৭৮ সালের ২০ আগস্ট জিয়াউর রহমান একটি সামরিক ফরমান দিয়ে সংবিধানে ৯৫(২)গ অনুচ্ছেদ যুক্ত করে বিচারক নিয়োগে নীতিমালার বিধান আনেন। এই অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‹বিচারক পদে নিয়োগ লাভের জন্য আইনের দ্বারা নির্ধারিত যোগ্যতা না থাকলে তিনি বিচারক পদে নিয়োগ লাভের যোগ্য হবেন না। এরপর ৪০ বছর আইন প্রণয়নের এ বিষয়টি উপেক্ষিত রয়েছে। যদিও ২০১২ সালের সুপিরিয়র জুডিসিয়াল কমিশন বিল-২০১২› নামের একটি বেসরকারি বিল সংসদ সচিবালয়ের আইন শাখায় জমা দেন একজন এমপি। তবে সেটি সংসদে পাস হয়নি।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: রাজনৈতিক

১৯ এপ্রিল, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ