Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৫, ১৪ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

এইচ এম গোলাম কিবরিয়া রাকিব | প্রকাশের সময় : ৩ এপ্রিল, ২০১৮, ১২:০০ এএম

স্বাধীনতা মানে অন্যের দাসত্ব থেকে মুক্তি এবং সকল নাগরিকের মৌলিক-মানবিক অধিকার নিশ্চিত করা। ইসলামে কেবলমাত্র স্বাধীনতার রক্ষাই নয়, বরং ইসলামই কেবলমাত্র পৃথিবীতে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার বার্তা নিয়ে এসেছে এবং মানবতার সার্বিক মুক্তির পথনির্দেশ করেছে। এটা মোটেও অত্যুক্তি না যে, পৃথিবী যদি ইসলামের আলোয় উদ্ভাসিত না হতো তাহলে মানব মস্তিষ্কে স্বাধীনতার কোন মর্ম স্থির হতো না। ইসলাম গতানুগতিক কোন স্বাধীনতার শ্লোগান নিয়ে আসেনি, বরং ইসলাম মানবতার সামগ্রিক মুক্তি, সাম্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার বাস্তব কর্মসূচি নিয়ে মানুষের সৎ প্রবৃত্তিগুলোর অবাধ বিকাশের মধ্য দিয়ে সত্যচর্চার পথ উন্মুক্ত করতে এসেছে। তাই ইসলামে স্বাধীনতার অর্থ হচ্ছে, ‘সর্বপ্রকার অসাম্য ও অনাচার দূরীভূত করে প্রত্যেককে তার প্রাপ্য অধিকার প্রদানের মাধ্যমে সুষম সমাজ প্রতিষ্ঠার করে সত্য চর্চার সুযোগ লাভ নিশ্চিত করা।’
পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াত ও ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা যা পাই তা হচ্ছে, নির্যাতিত মানবতার জাগরণের মধ্যে দিয়ে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা হবে, যাতে পৃথিবীর অধিকার বঞ্চিত মানুষ মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে। আর স্বাধীনতার এটাই প্রকৃত অর্থ। সুতরাং দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা যায় যে, বিশ্বসভ্যতার সুদীর্ঘ ইতিহাসে স্বাধীনতা, তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও তা অর্জনের বাস্তবিক ও নৈতিক কর্মসূচি পূর্ণাঙ্গভাবে একমাত্র ইসলামই দিয়েছে। ইসলামের বিজয়ের স্বর্ণযুগসমূহে তার পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন দেখতে পেরেছে বিশ্ববাসী।
ইসলামে মানুষের আভ্যন্তরীণ স্বাধীনতার অর্থ হচ্ছে, তার বুদ্ধি বিবেক ও চিন্তার স্বাধীনতা, যার দ্বারা সে নির্ভয়ে বিবেকের প্রতিধ্বনি করতে পারে। সত্য-ন্যায়ের আদেশ এবং অন্যায়-অসত্যের প্রতিরোধ নীতি মানুষকে এই স্বাধীনতা দান করে। আর বাহ্যিক তথা কর্মের স্বাধীনতার অর্থ হলো, নিজের সেই চিন্তা ও বিবেকের আলোকে গৃহীত কার্যাবলী বাস্তবায়নে এমন নির্ভিক ও সাহসী হতে পারা, যাতে সত্য গ্রহণ ও সত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সে দ্বিধাগ্রস্থ না হয় এবং কোন নিন্দাবাদ বা ধন্যবাদের পরোয়া না করে। অতএব সত্যের গোলামীর অপর নামই হলো স্বাধীনতা। প্রত্যেক সত্যানুসারী ও সত্যচর্চায় সক্ষম ব্যক্তি বা জাতি মাত্রই স্বাধীন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি বা জাতি সত্য পরিত্যাগ করে প্রবৃত্তি ও অসত্যের তাবেদারী করে সে ব্যক্তি বা জাতি নিঃসন্দেহে পরাধীন, গোলাম।
দেশপ্রেম ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব: যে ব্যক্তি, জাতি বা জনগোষ্ঠির মধ্যে দেশপ্রেম নেই তাদের দ্বারা দেশ স্বাধীন করা বা স্বাধীনতা ও সার্ভৌমত্ব রক্ষা করা কখনো সম্ভব নয়। কারণ দেশপ্রেমের অপরিহার্য উপাদান হচ্ছে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখা। দেশের সীমান্ত অটুট ও সুদৃঢ় রাখার সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। মহানবী (সা.) এর মাদানী জীবনের দিকে দৃষ্টিপাত করলে আমরা তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। তাঁর মাদানী জীবনে ছোট-বড় যতগুলো যুদ্ধ হয়েছে তার সিংহভাগই ছিল উপরোক্ত চেতনায় সমৃদ্ধ। বদর, ওহুদ ও খন্দকের যুদ্ধ তারই দৃষ্টান্ত। ইসলামের প্রায় সকল যুদ্ধই ছিল আত্মরক্ষামূলক, দেশ ও জাতির হিফাজতের স্বার্থে। স্বয়ং নবী করীম (সা.) দেশের সীমান্ত প্রহরায় আত্মনিয়োগ করেছেন, তাঁর সাহাবায়ে কিরামদেরও এ কাজে উৎসাহিত করেছেন। তিনি মুসলিম উম্মাহর জন্য এ পর্যায়ে যে বিধান রেখে গেছেন তা হচ্ছে মুমিন-মুসলিমরা যে দেশে, যে রাষ্ট্রে বসবাস করবে সে দেশের বা সে সীমান্ত অটুট ও অক্ষুণœ রাখার দায়িত্বও তারা গ্রহণ করবে। মুসলিমদের নিজেদের দেশের সীমানা যদি সীসাঢালা প্রাচীরের মতো মজবুত না থাকে তবে সেই দেশের অধিবাসীদের জান-মাল ও মান-ইজ্জতের হেফাজত হবে কীভাবে? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর পথে সকাল বা এক বিকেল সীমান্ত পাহারা দেয়া দুনিয়া ও দুনিয়াতে যা কিছু আছে সবকিছু থেকে উত্তম’ (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।
কোন দেশকে স্বাধীন করতে হলে গোলাবারুদ, বোমা, বন্দুক, বিমান হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র ইত্যাদির মাধ্যমে স্বাধীন করা যায় না। দেশকে স্বাধীন করতে হলে শত্রæর মোকাবেলায় সর্বপ্রথম প্রয়োজন (হাতিয়ার) হচ্ছে দেশপ্রেম বা দেশের প্রতি ভালোবাসা। যেমনটা ঘটেছিল বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। এ দেশের কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসা না থাকলে আজও স্বাধীনতা অর্জনে সক্ষম হতো কিনা তা বলা খুবই কঠিন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের হাজার হাজার মা-বোন, লাখো যুবক ও কোটি মানুষ দেশের প্রতি ভালোবাসার কারণেই বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে অস্ত্র, বোমা ও গোলাবারুদকে স্তব্ধ করে দিয়ে বিজয় অর্জন করেছিল। ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশের জনগণের সার্বিক অংশগ্রহণ তাদের দেশপ্রেমেরই এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
স্বাধীনতা আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্জন। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে এটাই শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। শত শত বছরের শোষণ-শাসন, লাঞ্ছনা-গঞ্জনার শিকার বাঙালিরা ১৯৭১ সালে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে। সে ইতিহাস শুধু বিজয়ের আর গর্বেরই নয়, বেদনারও। দীর্ঘ নয় মাস ধরে রক্ত ঝরেছে এ দেশের মাটিতে। শত্রুবাহিনী প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছে এবং তারা চালিয়েছে আরও বড় আকারের নিধনযজ্ঞ। দেশপ্রেমের জন্য চরম মূল্য দিয়েছে এদেশের সাধারণ মানুষ। দেশপ্রেমিক ও স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর মানুষগুলো অকাতরে জীবন দান করেছে। তারা আজো আমাদের কাছে তথা জাতির কাছে স্মরণীয় ও বরণীয়। লেখক: সদস্য, ইসলামিক মিডিয়া সোসাইটি, ঢাকা

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর