Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ২৩ মার্চ ২০১৯, ০৯ চৈত্র ১৪২৫, ১৫ রজব ১৪৪০ হিজরী।

ফেনী নদীতে ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সেতু অর্থনৈতিক ও যোগাযোগের দ্বার খুলবে

পার্বত্য এলাকায় প্রথম স্থল বন্দরের কাজ শুরু

মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন ছাগলনাইয়া থেকে | প্রকাশের সময় : ৯ এপ্রিল, ২০১৮, ১২:০০ এএম

খাগড়াছড়ির রামগড়ে নির্মিত হচ্ছে পার্বত্য এলাকার প্রথম স্থল বন্দর। এই বন্দরকে কেন্দ্র করে রামগড় খাগড়াছড়িসহ পুরো পার্বত্য এলাকায় তৈরি হবে নতুন সম্ভাবনা। অর্থনৈতিক এবং যোগাযোগের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই স্থল বন্দর। এটিকে সরকারের অন্যতম সফলতা হিসেবে দেখছেন পাহাড়ি জনপদের মানুষ। বন্দর স্থাপন কার্যক্রমের অগ্রগতি হওয়ায় আশায় বুক বাঁধছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। জানা যায়, ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সরকারী প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে রামগড়ে স্থলবন্দর স্থাপনের ঘোষনা দেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ১৯৯৬ সালের ২৮শে জুলাই স্থলপথ বা অভ্যন্তরীন জলপথে ভারত ও মায়ানমার থেকে আমদানি রপ্তানি বা পন্য সামগ্রী ছাড় করণের উদ্দেশ্যে দেশে ১৭৬টি শুল্ক ষ্টেশনের তালিকা ঘোষনা করে তালিকার ৮৪নং ক্রমিক ছিল রামগড় স্থল শুল্ক ষ্টেশন। সরকার ঘোষিত ১৭৬টি শুল্ক ষ্টেশনের বেশ কিছু ইতোমধ্যে চালু হয়ে গেছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় রামগড় স্থলবন্দর স্থাপনের কাজ দীর্ঘ দিন ফাইল বন্ধি থাকলেও আবারও আওয়ামীলীগ সরকার ২০১০ সালে বন্দরের কার্যক্রম বাস্তবায়নের উদ্যোগ শুরু করে দীর্ঘ দিনে ধীর গতির পর স¤প্রতি বাংলাদেশ ভারত তড়িৎ গতিতে স্থল বন্দর বাস্তবায়নের কাজ শুরু করায় এলাকার ব্যবসায়ী মহল আশার আলো দেখছে। খাগড়াছড়ির সদর থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরে রামগড় পৌরসভা। পৌরসভার অদূরে চলছে বন্দর নির্মাণ কাজের প্রস্তুতি। বাংলাদেশে প্রস্তুতি চললেও ভারত অংশের সিংহভাগ কাজই শেষ পর্যায়ে। সেতু স্থাপন হলেই দ্বার খুলবে বন্দরের। সরকারের ধারাবাহিক সাফল্যের ভান্ডারে যুক্ত হতে যাচ্ছে ভারত বাংলাদেশ মৈত্রী সেতু - ১। গত ৩ জানুয়ারি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা রামগড় সফরে এসে ভারত বাংলাদেশ মৈত্রী সেত–- ১ নির্মাণ ও স্থল বন্দর কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন। খুব সহসাই এ সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হবে। ২০১৯ সালের শেষ নাগাদ এর নির্মাণ কাজ শেষ হবে বলে জানা যায়। নির্মাণ কাজ শেষ হলে ভারতের দক্ষিণ ত্রিপুরা ও চট্টগ্রামের মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে নবদিগন্ত উন্মোচিত হবে। পাশাপাশি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্য, যোগাযোগ ও পর্যটন ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হবে। এছাড়া এই স্থল বন্দর দুই দেশের বন্ধন আরো সুদৃঢ় করবে বলে মত প্রকাশ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা। ভারতীয় হাই কমিশনারের আশা, সেতুটি নির্মাণের ফলে দু’দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য অনেক বেশি গতি পাবে। ৪১২ মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণ হলে একদিকে পাহাড়ি এই জেলার সাথে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের যোগাযোগ আরও সহজ হবে, অন্যদিকে স্থলবন্দর হলে আসবে অর্থনৈতিক গতি-এমন আশা স্থানীয়দের। একইসাথে বন্দর থেকে মিরসরাইয়ের বারৈয়ারহাট পর্যন্ত ৩৮ কিলোমিটার চারলেনের সড়ক করা হবে। এসব মিলে ব্যয় হবে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ। দুই পাড়ের মানুষ বাংলাভাষী তাদের শিক্ষা, সংস্কৃতিও বাংলায়। দুপাড়ে পরিবশেগত মিলও রয়েছে ব্যাপক। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় শরণার্থীরা রামগড় সীমান্ত দিয়ে ত্রিপুরায় আশ্রয় নিয়েছিল। মুক্তিবাহিনী সেখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশে ফিরে যুদ্ধ করেছে। বাংলাদেশ থেকে ত্রিপুরা রাজ্যে গিয়ে স্থায়ী ভাবে বসবাস করছে এবং এখনো বাংলাদেশে তাদের ভিটে মাটি আছে এমন মানুষের সংখ্যাও কম নয়। আইনি জটিলতার কারণে তারা এপাড়-ওপাড় হতে পারেনা। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বারুনী স্নানের দিন প্রতি বছর ফেনী নদীতে পুলিশ, বিজিবি, বিএসএফ এর সকল বাধা অতিক্রম করে দুই পাড়ের লাখো বাংলা ভাষাভাষী মানুষ এক মহামিলন মেলায় মিলিত হয়। দুই পাড়ে বসে বিশাল মেলা। এদিকে রামগড়সহ দেশের চার স্থলবন্দরের উন্নয়নে সহায়তা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। বন্দরগুলো হচ্ছে, শেওলা, ভোমরা, রামগড় স্থলবন্দর উন্নয়ন এবং বেনাপোল স্থলবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন। এ সংক্রান্ত একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ১০০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা এবং বিশ্বব্যাংক ৫৯২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। বাংলাদেশ রিজিওনাল কানেক্টিভিটি প্রজেক্ট-১ শীর্ষক প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) আগামী সভায় উপস্থান করা হবে বলে জানা গেছে পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে। অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে ২০২১ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের কাজ শেষ করবে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশের সাথে ভারতের ৪ হাজার ৯৫ কিলোমিটার মায়ানমারের ২৫৬ কিলোমিটার এবং উপকূলীয় এলাকায় ৫৮০ কিলোমিটার আন্তর্জাতিক সীমারেখা রয়েছে। এই সকল সীমারেখার মধ্যে অনেকগুলো স্থলবন্দর রয়েছে যেখান দিয়ে প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি-রফতানি হয়। এ ছাড়াও প্রতিনিয়ত অনেক পর্যটক স্থল বন্দরগুলো দিয়ে চলাচল করে। প্রস্তাবিত প্রকল্পের মাধ্যমে শেওলা, ভোমরা, রামগড় ও বেনাপোল স্থলবন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। জানা যায়, চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরকে ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ত্রিপুরা রাজ্যসহ মেঘালয়,আসাম, মনিপুর মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং অরুনাচল এ সাত রাজ্যের (সেভেন সিস্টার্স) সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্য স¤প্রসারণ করতে বাংলাদেশ ও ভারত সরকার বহু আগেই রামগড়-সাবরুম স্থলবন্দর স্থাপনে উদ্যোগী হয়। যদিও রাজনৈতিক ও নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এ প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন থমকে ছিল। বর্তমান সরকারের আন্তরিক উদ্যোগে চলতি বছরেই বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে রামগড়-সাবরুম স্থলবন্দরের দৃশ্যমান অবকাঠামো। এ জন্য ভারত সরকার ফেনী নদীর ওপর চারলেন বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক মানের একটি সেতু নির্মাণ করে বাংলাদেশের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের কাজ হাতে নিয়েছে। রামগড় পৌরসভার মহামুনি ও সাবরুমের আনন্দপাড়া এলাকা হয়ে সেতুটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। এ জন্য ভারত সরকারের খরচ হবে ১১০ কোটি রুপি। আর নির্মাণ সময় ধরা হয়েছে দুইবছর পাঁচমাস। বাংলাদেশ ও ভারত সরকার ইতিমধ্যে স্থলবন্দরকে ঘিরে বন্দর টার্মিনাল, গুদামঘর সহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে ভূমি অধিগ্রহণ কাজও চূড়ান্ত করেছে। এ প্রসঙ্গে রামগড় সড়ক বিভাগের প্রকৌশলী মুসলেহ উদ্দিন চৌধুরী ও জাইকা প্রতিনিধি সুদীপ্ত চাকমা জানান, রামগড় স্থল বন্দরের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের সংযোগ সড়ক (রামগড়-বারৈয়ারহাট পর্যন্ত) উন্নয়নের কাজ বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে জাপানি উন্নয়ন সংস্থা জাইকা কর্তৃক বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হওয়ায় আশা করা যায় কাঙ্খিত সময়ের মধ্যেই এটি সম্পন্ন হবে। এ সড়কটি চারলেনে রুপান্তরের কথা রয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রামের নাজিরহাট থেকে রামগড় স্থলবন্দর পর্যন্ত রেললাইন স¤প্রসারণের মহাপরিকল্পনার কথা হাটহাজারীতে গত ৬ জানুয়ারি এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন, রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক। অন্যদিকে ত্রিপুরার আগরতলা থেকে সাবরুম পর্যন্ত রেল লাইনের কাজ দ্রæতগতিতে এগিয়ে চলছে। এছাড়া সাবরুম-উদয়পুর-আগরতলা সড়কগুলো এ মহকুমার সঙ্গে অন্য মহকুমা ও জেলার সড়ক উন্নয়নের কাজ হাতে নিয়েছে। সড়ক পথে রামগড় চট্টগ্রাম বন্দরের দূরুত্ব ৭২ কিলোমিটার এবং সাবরুম-আগরতলা ১৩৩ কিলোমিটার। বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান তপন কুমার চক্রবর্তী গত ২ জানুয়ারি খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক সভায় জানিয়েছিলেন, রামগড় স্থলবন্দর বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ২৩তম। দীর্ঘদিন ধীরগতিতে কাজ চললেও সম্প্রতি ভারত-বাংলাদেশ উভয় পক্ষ তড়িৎ গতিতে স্থলবন্দর বাস্তবায়নের কাজ শুরু করায় ব্যবসায়ীসহ সকল মহল আশার আলো দেখছেন। খাগড়াছড়ির রামগড়-সাব্রæম স্থলবন্দর চালুর লক্ষ্যে সীমান্তবর্তী ফেনী নদীর ওপর ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সেতু-১ নির্মাণ কাজের জন্য ইতোমধ্যে আগরওয়াল কনস্ট্রাকশন নামে গুজরাটের একটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিয়েছে ভারত। ১৯২০ সালের মহকুমা শহর রামগড়ের সীমান্তবর্তী মহামুনি এবং ওপারের আনন্দপাড়া এলাকায় ফেনী নদীর ওপর সেতুটি নির্মাণের স্থান ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে। সেতু থেকে ওপারে প্রায় ১২শ মিটার অ্যাপ্রোচ রাস্তা নবীনপাড়া-ঠাকুরপল্লী হয়ে সাব্রæম-আগরতলা জাতীয় সড়কে যুক্ত হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ অংশে রামগড়-বারৈয়ারহাট গিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত হবে। ইতোমধ্যে ভারত-বাংলাদেশের যৌথ সার্ভের মাধ্যমে ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সেতু-১ নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ অংশের অ্যালাইনমেন্ট চূড়ান্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ অংশে ২শ ৮৯ মিটার অ্যাপ্রোচ সড়কের জন্য দুই একর ৮৬ শতক জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ জেলা প্রশাসন জমি মালিকদের তাদের জমি অধিগ্রহণ হয়েছে মর্মে চিঠি ইস্যু করে কিন্তু জেলা প্রশাসনের কাছে বারবার ধর্ণা দিয়েও জমির অধিগ্রহণের টাকা পাচ্ছেন না। প্রসঙ্গত, ২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লি সফরকালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে রামগড়-সাবরুম স্থলবন্দর চালুর যৌথ সিদ্ধান্তের পর ২০১৫ সালের ৬ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ ভারত মৈত্রী সেতু-১ নামে ফেনী নদীর ওপর প্রস্তাবিত সেতুটির ভিত্তিপ্রস্তর ফলক উন্মোচন করেন। এদিকে, ফেনী নদীর ওপর মৈত্রী সেতু নির্মাণ প্রকল্পে বাংলাদেশ অংশের অগ্রগতি সম্পর্কে রামগড় উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. আল মামুন মিয়া দৈনিক ইনকিলাব কে জানান, ইতিমধ্যে দুদেশের যৌথ সার্ভের মাধ্যমের সেতু নির্মাণের এলাইমেন্ট চূড়ান্ত করা হয়েছে। সংযোগ সেতুর পার্শে¦ কাটা তারের বেড়া নির্মাণের কাজ চলছে। সংযোগ রাস্তার জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। তবে কতটুকু জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়েছে তা আমার জানা নেই। তার সঠিক পরিসংখ্যান ভূমি অফিস বলতে পারবে। অধিগ্রহণের টাকা জনগণ পাইছে কিনা এ বিষয়ে আমার জানা নেই।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন