Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৭ আশ্বিন ১৪২৫, ১১ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

বৈশাখের কবিতা

সা য়ী দ আ বু ব ক র | প্রকাশের সময় : ১৪ এপ্রিল, ২০১৮, ১২:০০ এএম

পহেলা বৈশাখ এখন বাঙালির প্রাণের উৎসব। বাংলার মুসলমান-হিন্দু-খ্রিষ্টান-বৌদ্ধকে এক মঞ্চে আনার শাশ্বত কোনো উৎসব যদি থেকেই থাকে বাঙালির, তা এই পহেলা বৈশাখ। কালের পরিবর্তনে এ উৎসবের সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন নতুন উপাদান। পিঠাপুলি থেকে শুরু থেকে মাংস-পোলাও খাওয়াখাওয়ির ব্যাপারস্যাপার তো আছেই, সেই সাথে আছে অত্যাবশ্যকীয় পান্তা-ইলিশের ঘনঘটা। এসব প্রতিযোগিতায় যেমনটি থেমে নেই শিশু-কিশোর-কিশোরীরা, তেমনই থেমে নেই তরুণ-তরুণী-বৃদ্ধ-বৃদ্ধারাও। ব্যবসায়ী-বণিকেরা যেমন নতুন হালখাতা খুলে এ দিবসকে উৎযাপন করেন নতুন আবেগে নতুন স্বপ্নে, তেমনি কবি-সাহিত্যিকদেরও জন্যে এ এক নতুন প্রেরণার উৎসব। বৈশাখকে তারা কল্পনা করেন যুগ-পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে। পুরাতন বছরের রোগশোক, অসুখবিসুখ, ব্যথা-ব্যর্থতা, জরাজীর্ণতাকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে শুধু ভালবাসা-প্রেমে, শস্যে-সঙ্গীতে, সুখে-শান্তিতে যেন ভরে দেয় নতুন বছর তাদের জীবনের ঘরগোলা, এই থাকে তাদের একমাত্র আহŸান। এ কারণে বৈশাখ ধরা দেয় কবিদের কাছে রুদ্ররূপে। বৈশাখের রুদ্ররূপে তারা বিচলিত নন। বরং বৈশাখের কালবৈশাখীর জন্য তারা পথ চেয়ে থাকেন উদগ্রীব হয়ে, যাতে জীর্ণ পাতারা ঝরঝর করে ঝরে পড়ে, নতুন পল্লবে ভরে ওঠে জীবনের ডালপালা, নতুন রঙে, নতুন খুশিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায় বাংলার জনপদ। নজরুল তাই গর্জে ওঠেন তার সন্ধ্যা কাব্যের ‘কালবৈশাখী’ কবিতায় তার স্বভাবসিদ্ধ অগ্নিঝরা কণ্ঠে:

বারেবারে যথা কালবৈশাখী ব্যর্থ হলো রে পুব-হাওয়ায়
দধীচি-হাড়ের বজ্র-বহ্নি বারেবারে যথা নিভিয়া যায়,
কে পাগল সেথা যাস হাঁকি-
‘বৈশাখী কালবৈশাখী!’
হেথা বৈশাখী-জ্বালা আছে শুধু, নাই বৈশাখী-ঝড় হেথায়
সে জ্বালায় শুধু নিজে পুড়ে মরি, পোড়াতে কারেও পারিনে, হায়।

কবি আক্ষেপ করেন এই বলে, বৈশাখ তার প্রকৃত রুদ্ররূপ ধরে আবির্ভূত হয়নি বলেই সারা দেশ আজও পুরাতন জং ধরা জরা-জীর্ণতায় পরিপূর্ণ হয়ে আছে। তাই তার ক্ষোভ :

কালবৈশাখী আসেনি হেথায়, আসিলে মোদের তরু-শিরে
সিন্ধু-শকুন বসিত না আসি’ ভিড় করে আজ নদীতীরে।
জানি না কবে সে আসিবে ঝড়
ধুলায় লুটাবে শত্রæগড়,
আজিও মোদের কাটেনি ক’ শীত, আসেনি ফাগুন বন ঘিরে।
আজিও বলির কাঁসর ঘণ্টা বাজিয়া উঠেনি মন্দিরে।
জাগেনি রুদ্র, জাগিয়াছে শুধু অন্ধকারের প্রমথ-দল,
ললাট-অগ্নি নিভেছে শিবের ঝরিয়া জটার গঙ্গাজল।
জাগেনি শিবানী- জাগিয়াছে শিবা,
আঁধার সৃষ্টি- আসেনি ক’ দিবা,
এরি মাঝে হায়, কালবৈশাখী স্বপ্ন দেখিলে কে তোরা বল।
আসে যদি ঝড়, আসুক, কুলোর বাতাস কে দিবি অগ্রে চল।

রবীন্দ্রনাথও বৈশাখকে অবলোকন করেছেন রুদ্ররূপে। কল্পনা কাব্যের ‘বৈশাখ’ কবিতায় বৈশাখকে তার সরাসরি সম্বোধন এ নামেই :

হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ,
ধুলায় ধূসর রুক্ষ উড্ডীন পিঙ্গল জটাজাল,
তপ:ক্লিষ্ট তপ্ত তনু, মুখে তুলি বিষাণ ভয়াল
কারে দাও ডাক-
হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ?

জ্বলিতেছে সম্মুখে তোমার
লোলুপ চিতাগ্নিশিখা লেহি লেহি বিরাট অম্বর-
নিখিলের পরিত্যক্ত মৃতস্ত‚প বিগত বৎসর
করি ভস্মসার-
চিতা জ্বলে সম্মুখে তোমার।

কবিতার শুরুতে কবি বৈশাখের রুক্ষ রূপ তুলে ধরেছেন। কিন্তু তিনি নজরুলের মতো বৈশাখের বজ্রকঠিন আঘাতের পক্ষপাতী নন। স্রেফ নির্বিঘ্ন শান্তির প্রার্থনায় তিনি মগ্ন :

হে বৈরাগী, করো শান্তিপাঠ।
উদার উদাস কণ্ঠ যাক ছুটে দক্ষিণে ও বামে-
যাক নদী পার হয়ে, যাক টলি গ্রাম হতে গ্রামে,
পূর্ণ করি মাঠ।
হে বৈরাগী, করো শান্তিপাঠ।

শান্ত ঋষির মতো বৈশাখের কাছে কবির আবেদন :

দুঃখসুখ আশা ও নৈরাশ
তোমার ফুৎকারক্ষুব্ধ ধুলাসম উড়–ক গগনে,
ভরে দিক নিকুঞ্জের স্খলিত ফুলের গন্ধ-সনে
আকুল আকাশ-
দুঃখ সুখ আশা ও নৈরাশ।
ছাড়ো ডাক, হে রুদ্র বৈশাখ!
ভাঙিয়া মধ্যাহ্ণতন্দ্রা জাগি উঠি বাহিরিব দ্বারে,
চেয়ে রব প্রাণীশূন্য দগ্ধতৃণ দিগন্তের পারে
নিস্তব্ধ নির্বাক-
হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ।

বৈশাখকে নিয়ে প্রচুর গান রচনা করেছেন রবীন্দ্রনাথ। বর্ষবরণের এ গানটি এখন বাঙালির প্রাণের সঙ্গীত :

এসো এসো, এসো হে বৈশাখ।
তাপস নিশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক।

যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে যাওয়া গীতি,
অশ্রæবাষ্প সুদূরে মিলাক।
মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,
অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।
রসের আবেশরাশি শুষ্ক করি দাও আসি
আনো আনো আনো তব প্রলয়ের শাঁখ।
মায়ার কুজ্ঝটিজাল যাক দূরে যাক।

রবীন্দ্র-নজরুলের পর বাংলা ভাষায় পহেলা বৈশাখকে নিয়ে যারা দীর্ঘতম কবিতা লিখে বিখ্যাত হয়েছেন, তাদের অন্যতম ফররুখ আহমদ। রবীন্দ্রনাথের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে বসে তিনি ‘বৈশাখ’ ও ‘বৈশাখের কালো ঘোড়া’ নামে যে-দুটি কবিতা রচনা করেন তা বৈশাখের কবিতায় নতুন মাত্রা দান করেছে। অনেকটা রবীন্দ্রনাথের আদলে রচিত হলেও ভিন্নতর বার্তা ও আলাদা কণ্ঠস্বর ধারণ করে আছে তার ‘বৈশাখ’ কবিতাটি। বৈশাখকে ফররুখও দেখেছেন রুদ্ররূপে। বৈশাখ তার কাছে মহাশক্তির প্রতীক, যা মহাকল্যাণ সাধনের জন্যেই আবির্ভূত হয়েছে মর্ত্য।ে শুরুতেই কবি বৈশাখকে সম্বোধন করেছেন এভাবে :

ধ্বংসের নকীব তুমি হে দুর্বার, দুর্ধর্ষ বৈশাখ
সময়ের বালুচরে তোমার কঠোর কণ্ঠে
শুনি আজ অকুণ্ঠিত প্রলয়ের ডাক।

কিন্তু তিনি যখন এরকম করে বলেন :

রোজ হাশরের দগ্ধ তপ্ত তাম্র মাঠ, বন, মৃত্যুপুরী, নিস্তব্ধ নির্বাক;
সূরে ইস্রাফিল কণ্ঠে পদ্মা মেঘনার তীরে
এস তুমি হে দৃপ্ত বৈশাখ।

তখন টের পাওয়া যায় নিজস্ব ঐতিহ্যের ঘরানায় থেকেই অবলোকন করেছেন তিনি বৈশাখকে। তার আহŸান অনেকটা নজরুলের মতো; বিপ্লবের স্বপ্নে তিনি বিভোর; তার দুচোখ জুড়ে জরাজীর্ণতাকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার তীব্র কামনা :

এস তুমি সাড়া দিয়ে বিজয়ী বীরের মতো, এস স্বর্ণ শ্যেন,
বাজায়ে নাকাড়া কাড়া এস তুমি দিগি¦জয়ী জুলকারনায়েন,
আচ্ছন্ন আকাশ নীলে ওড়ায়ে বিশাল ঝান্ডা শক্তিমত্ত ও প্রাবল্যে প্রাণের
সকল প্রাকার বাধা চূর্ণ করি মুক্ত কর পৃথিবীতে সরণি প্রাণের,
সকল দীনতা, ক্লেদ লুপ্ত কর, জড়তার চিহ্ন মুছে যাক;
বিজয়ী বীরের মতো নির্ভীক সেনানী তুাম
এস ফিরে হে দৃপ্ত বৈশাখ।

ফররুখ যে-বৈশাখের কল্পনা করেছেন তার সাথে নজরুলের চেয়ে পি বি শেলির বেশি মিল পাওয়া যায়। শেলির ‘ওড টু দ্য ওয়েস্ট উয়িন্ড’ জগদ্বিখ্যাত বিপ্লবী কবিতা। শেলি ওয়েস্ট উয়িন্ডকে বিশাল শক্তির প্রতীক বলে মনে করেন; সে যখন পৃথিবীতে আগমন করে, আটলান্টিক মহাসাগর আতঙ্কিত হয়ে তার জন্যে রাস্তা করে দেয়; সে যখন আটলান্টিক মহাসাগরের উপর দিয়ে যাত্রা করার প্রস্তুতি নেয় তখন মহাসাগরের তলদেশে যত জলজ উদ্ভিদ আছে তারা ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে ডালপালার সমস্ত পাতা ঝরিয়ে দেয়; এমনই ভয়ঙ্কর ওয়েস্ট উয়িন্ড। ফররুখ তার ‘বৈশাখের কালো ঘোড়া’ কবিতায় বৈশাখকে তেমনি মহাশক্তিধররূপে চিত্রায়িত করেছেন। ‘বৈশাখের কালো ঘোড়া’ ফররুখের একটি অনন্য সনেট। যেমন এর ছন্দের গাঁথুনি ও নিখুঁত অন্তমিলের ব্যবহার তেমনই এর গুরুগম্ভীর বিষয়বস্তু, যা অসাধারণ চিত্রকল্পে সমৃদ্ধ হয়ে বাংলা ভাষার একটি অমূল্য শিল্প হয়ে উঠেছে।

বৈশাখের কালো ঘোড়া উঠে এলো। বন্দর, শহর
পার হয়ে সেই ঘোড়া যাবে দূর কোকাফ মুলুকে,
অথবা চলার তালে ছুটে যাবে কেবলি সম্মুখে
প্রচন্ড আঘাতে পায়ে পিষে যাবে অরণ্য, প্রান্তর।
দূর সমুদ্রের বুকে নির্বাসিত যুগ যুগান্তর
শুনেছে ঘরের ডাক দূর দিগন্তের পার থেকে,
বাঁকায়ে বঙ্কিম গ্রীবা বজ্রের আওয়াজে উঠে ডেকে
শূন্যে ওড়ে বুকে নিয়ে সুলেমান নবীর স্বাক্ষর।

শূন্য হতে শূন্য স্তরে-আরো উর্ধ্বে পরেনদা তাজীর
পাখার ষাপট শুনে শিহরায় পল্লীপথ, গ্রাম,
শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসে আতঙ্কে বিশাল পৃথিবীর;
ভেঙে পড়ে অরণ্যানি। ছেড়ে সুখশয্যার আরাম
অচেনা গতির স্রোতে হয় বন্দী এমন অধীর;
ঝড় বেগে ওড়ে ঘোড়া (জানি না তো সে ঘোড়ার নাম)।

রবীন্দ্রনাথেরই মতো সমস্ত বাঙালির হৃদয় কেঁদে ওঠে এই দিনে দুঃখক্লিষ্ট মানুষের যন্ত্রণায়। আমরা পান্তা-ইলিশ খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলি বটে, কিন্তু জাতির দুঃখ-দুর্দশার কথা ভুলি না, নিপীড়িত মানবতার কথা ভুলি না। নতুন স্বপ্নে জ্বলজ্বল করে ওঠে আমাদেরও দুই চোখ, আমাদেরও হৃদয় নত হয় এই প্রার্থনায় :


মাঠঘাটবন
পুড়ছে যখন
অগ্নিখরায়
তাপে

পুড়ছে পৃথিবী
পুড়ছে জীবন
পারমাণবিক
পাপে

যখন মানুষ,
পশু ও পাখির
জীবন ওষ্ঠা-
গত

তখন বোশেখ
এলো পৃথিবীতে
হাতেমতায়ীর
মতো।

বোশেখ এসেছে-
ফুলবৃষ্টিতে
ধুয়ে যাক শোক-
তাপ

কালবৈশাখী
এনেছে সঙ্গে,
উড়ে যাক যত
পাপ।



 

Show all comments

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর