Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৩ আশ্বিন ১৪২৫, ৭ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

বৈশাখী উৎসবে চাঙ্গা অর্থনীতি যোগ হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা

বর্ষবরণের ব্যাপ্তি বাড়ছে

হাসান সোহেল | প্রকাশের সময় : ১৪ এপ্রিল, ২০১৮, ১২:০০ এএম

বাঙালির প্রাণের উৎসব ‘বৈশাখ’। নতুন বর্ষকে বরণের পাশাপাশি উৎসবকে পরিপূর্ণতা দেয় বৈশাখী কেনাকাটা ও মেলা। বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে তাই পষপগা অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। আজ শনিবার পহেলা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। উৎসবমুখর এই দিনটিকে কেন্দ্র করে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছে কেনাকাটা। গতকাল শুক্রবার ছুটির দিনে গভীর রাত পর্যন্ত মার্কেটগুলোতে বেশ ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
বর্ষবরণের উৎসবে নতুন পোশাকের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি থাকে। গত কয়েক দিন রাজধানীর আজিজ সুপার মার্কেট, বসুন্ধরা সিটি, নিউমার্কেট, গুলিস্তান ঘুরে দেখা গেছে, বৈশাখী পোশাক কিনতে ভিড় করছেন নানা বয়সী মানুষ। স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য নগরীর বিভিন্ন এলাকার ফুটপাতে বৈশাখী পোশাক নিয়ে বসেছেন হকার।
ক্রেতাদের চাহিদার জোগান দিতে এবছর বেড়েছে উৎপাদনও। বিশেষ করে তাঁত, ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প এখন বেশ চাঙ্গা। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে অনেক প্রতিষ্ঠান বিশেষ ছাড়ও দিচ্ছে। লাল সাদা আর হলুদ রঙে ছেয়ে গেছে রাজধানীর বড় বড় শোরুম, আউটলেট এবং পাড়া মহল্লার দোকানপাট। বাঙালির চিরায়ত এই উৎসব ঘিরে এবারো নকশায় নতুনত্ব আনার চেষ্টা করেছেন ব্যবসায়ীরা। যা কিনতে ভিড় বেড়েছে নানা বয়সী ক্রেতাদের। তবে, বরাবরের মতো অভিযোগ আছে দরদাম নিয়ে। বৈশাখে রঙিন পোশাক উৎসবের আমেজ বাড়িয়ে দেয়। তাই এই উৎসব ঘিরে বাহারি পোশাক নিয়ে প্রস্তুত দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো। বøক, বুটিক ও হ্যান্ড পেইন্টের শাড়ি ছাড়াও মিলছে পাঞ্জাবি, ফতুয়া, সালোয়ার কামিজ থেকে শুরু করে ছোটদের পোশাক। আছে পোশাকের সঙ্গে মিল রেখে সাজ সজ্জার নানা অনুষঙ্গও। এই রঙ শুধু উৎসবকেই রাঙায় তা নয়, ভিন্ন মাত্রা যোগ করে ব্যবসা বানিজ্যে। উৎসবের এমন রঙে পণ্যের মান নিয়ে অভিযোগ না থাকলেও দাম নিয়ে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। শুধু বড় বড় শপিংমলগুলো নয়, ফুটপাতগুলোও সেজেছে বৈশাখী রঙ্গে।
তিন বছর ধরে সরকারি কর্মচারী, শিক্ষক ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বৈশাখে মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে উৎসব ভাতা পাচ্ছেন। বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তারা-কর্মচারীরাও পাচ্ছেন ভাতা। এভাবে সামাজিক, পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বর্ষবরণের ব্যাপ্তি বাড়ছে। ফলে বৈশাখকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের আকার বড় হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতিকে কিছুটা চাঙা করছে। সরকারি কর্মচারীরা এবার পৌনে ৫০০ কোটি টাকার বৈশাখী ভাতা তুলেছেন। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে তথ্যটি মিললেও পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে সারা দেশে কত টাকার ব্যবসা-বাণিজ্য হয়, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের ধারণা, কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। সব মিলিয়ে এবারের বৈশাখী অর্থনীতিতে বাড়তি যোগ হচ্ছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) হিসাব মতে, বৈশাখী উৎসবে আগের কয়েকটি বছরে অর্থনীতিতে ১০-১২ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত যোগ হতো। এবার যোগ হবে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-বোনাস বাবদ যোগ হবে প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা। ব্যাংক-বীমাসহ অন্য সব প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বৈশাখী বোনাস হিসেবে যোগ হবে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। পোশাক খাতে বিক্রির পরিমাণ হবে ৬-৭ হাজার কোটি টাকা। খাবার ও অন্যান্য কেনাকাটায় ৫-৬ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া ভোগ্যপণ্যে আরও লেনদেন হবে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, রাজধানীর আজিজ সুপার মার্কেট, নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসগুলোতে প্রচন্ড গরম উপেক্ষা করে তরুণ-তরুণীর উপচেপড়া ভিড়। পোশাকে লাল-সাদার ঐতিহ্য থাকলেও নকশা ও ধরনে এবার বৈচিত্র্যের সমাহার ঘটেছে। শুধু পোশাকে নয়, উপহার সামগ্রী, শো-পিস ও বিভিন্ন প্রসাধনীর বাজারেও লেগেছে বৈশাখী মাতম। এছাড়া বৈশাখ উপলক্ষ্যে বাতাসা-কদমা, মুড়ি-মুড়কি এবং খইয়ের দোকানগুলোতেও ভীড় দেখা গেছে। কাপ্তান বাজারের বাতাসা-কদমা, মুড়ি-মুড়কি ও খই বিক্রেতা জালাল মুন্সী জানান, এ বছর অন্যান্যা বছরের তুলনায় এসব পণ্যের বিক্রি অনেক ভালো। শেষ সময়ে অনেককে চাহিদা অনুযায়ী এসব পণ্যও দিতে পারছেন না তিনি। প্রতিবছরই বাড়ছে বৈশাখের কেনাকাটা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বৈশাখকে ঘিরে দেশের অর্থনীতির গতি বৃদ্ধি পায়, যা সার্বিক অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষক নাজনীন আহমেদ এ বিষয়ে বলেন, পহেলা বৈশাখ একটা সময় ছিল গ্রামকেন্দ্রিক উৎসব। এখন এটি সার্বজনীন হয়ে গেছে। তিনি বলেন, বৈশাখ কেন্দ্রিক পণ্যের বেশিরভাগই গ্রামীণ পণ্য। যে কারণে এ সময়ে বাজারে যে টাকার প্রবাহ বাড়ে তার একটি বড় অংশ যায় গ্রামে।
সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বৈশাখের কারণে সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের বোনাস (উৎসবভাতা) প্রাপ্তি ও অন্যান্য কারণে কেনাকাটার পরিমাণ বাড়ে। এই বাড়তি টাকা আসায় কিছু মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও বাড়ে। এতে মূল্যস্ফীতিতেও কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে। সামগ্রিকভাবে বৈশাখে অর্থনীতিতে নতুনভাবে চাঙ্গাভাব নিয়ে আসে।
রাজধানীর বিপণিবিতানগুলো ঘুরে দেখা গেছে, বাঙালির প্রাণের উৎসব ঘিরে লাল-সাদায় ছেয়ে গেছে সর্বত্র। রাজধানীসহ সারাদেশে প্রায় ছয় হাজার বুটিক ও ফ্যাশন হাউস রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিক্রি এখন অনেক বেড়ে গেছে। এ ছাড়া প্রযুক্তির সুবাদে বেড়েছে অনলাইনে বিক্রিও। ফ্যাশন হাউসের কর্মীরা জানান, ঢাকায় বৈশাখ ঘিরে ঈদের মতো জমে ওঠে বিকিকিনি। সারা বছর তাদের যে ব্যবসা হয়, তার অর্ধেকই হয় ঈদ ও পূজায়। পহেলা বৈশাখে হয় প্রায় ২৫ শতাংশ। বৈশাখ ঘিরে দেশে ফুলের ব্যবসাও বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন রাজধানীতে পাইকারি বাজারে ৪০-৫০ লাখ টাকার ফুল কেনাবেচা হয়। পহেলা বৈশাখ ঘিরে ৬০-৭০ লাখ টাকার বাড়তি ফুল বিক্রির টার্গেট করেছে ব্যবসায়ী সমিতি। বর্ষবরণ কেন্দ্র করে দই-মিষ্টিসহ বেকারিজাত পণ্যের বিক্রিতেও বেশ ধুম পড়ে যায়। এবারও এর ব্যত্যয় হবে না।
পয়লা বৈশাখে হালখাতা করতেন ব্যবসায়ীরা। হালখাতায় ক্রেতাদের মিষ্টি-নিমকি খাওয়ান তারা। বর্তমানে হালখাতা উৎসব রং হারালেও মিষ্টি খাওয়ানোর প্রচলন আছে। ফলে বৈশাখে মিষ্টির দোকানের ব্যবসা চার থেকে পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। প্রাণ গ্রæপের মিষ্টির ব্র্যান্ড মিঠাইয়ের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা অনিমেষ সাহা বলেন, বৈশাখ উপলক্ষে প্রায় ২৫টি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ১০ টন মিষ্টির ক্রয়াদেশ পেয়েছি আমরা। সে জন্য সাধারণত প্রতিদিন দুই টন মিষ্টি উৎপাদিত হলেও বৈশাখের আগে উৎপাদন বেড়ে পাঁচ টনে দাঁড়ায়। তা ছাড়া আমাদের বিক্রয়কেন্দ্রে ১২ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত মিষ্টি বিক্রি পাঁচ গুণ বেড়ে যায়।
এদিকে নতুন বর্ষকে বরণের পাশাপাশি উৎসবকে পরিপূর্ণতা দেয় বৈশাখী মেলা। এই মেলা বাঙালির শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্য। পহেলা বৈশাখ কেন্দ্র করে শহর-গ্রামের বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা হয় এ মেলার। মেলা চলে মাসজুড়ে। সেখানে খই-বাতাসা, হাওয়াই মিঠাই, মাটির পুতুল পাওয়া যায়, থাকে নাগরদোলা। মেলায় আরও হরেক রকম জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা।

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ