Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ২ রবিউস সানী ১৪৪০ হিজরী

আমরা এ কোন সমাজে বাস করছি?

মহিউদ্দিন খান মোহন | প্রকাশের সময় : ১৬ এপ্রিল, ২০১৮, ১২:০০ এএম

বন্য পশু-পাখি হত্যা অনেক দেশেই নিষিদ্ধ। তাদের নিধন বন্ধে সেসব দেশে কঠোর আইন এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা আছে। শুধু কঠোর আইন ও শাস্তির ব্যবস্থাই নয়, আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করার নজিরও আছে ভুরি ভুরি। আইন আছে, শাস্তির ব্যবস্থা আছে অথচ আইনের প্রয়োগ বা বাস্তবায়ন নেই এমন দেশও বিশ্বে কম নেই। বাংলাদেশ সেইসব দেশের একটি। আমাদের দেশে বন্যপ্রাণী শিকার নিষিদ্ধ এবং আইনতঃ দন্ডনীয় অপরাধ। তারপরও অহরহ বন্যপ্রাণী হত্যা করা হচ্ছে। শীতের সময় অতিথি পাখি শিকার করা হয়, আবার তা প্রকাশ্যে বিক্রিও হয়। কিন্তু শিকারী বা ক্রেতাকে আইন বা বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে- এমন নজির নেই বললেই চলে। অবশ্য আমাদের দেশে এমন অনেক আইন রয়েছে, যেগুলোর অস্তিত্ব কেবল আইনের খাতায়, বাস্তবে কোনো প্রয়োগ নেই। হাতের কাছেই উদাহরণ মজুদ আছে। ধরুন ধূমপান বিরোধী আইনের কথা। এ আইনে বলা আছে, পাবলিক প্লেসে অর্থাৎ প্রকাশ্য স্থানে ধূমপান করা যাবে না, করলে তিন শ’ টাকা জরিমানা। কিন্তু এ আইন কেউ মানছে কি? এ আইনে কারো সাজা অর্থাৎ জরিমানা হয়েছে, এমন খবর আজতক পাওয়া যায় নি। এখনও প্রকাশ্য স্থানে নির্বিকার ধূমপান করতে দেখা যায় অনেককে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, যারা এ আইনটি প্রয়োগ করবে, সেই পুলিশ বাহিনীর অনেক সদস্যকেও যত্রতত্র দেখা যায় সিগারেট টানতে। তো, যারা আইনের প্রয়োগ করবে, তারাই যদি আইন ভঙ্গ করে তাহলে সে আইনের কি কোনো অর্থ থাকে?
যাক পশু-পাখির কথা। এবার মানুষের কথায় আসা যাক। আমাদের দেশে মানুষ মেরে ফেললেও কি তার বিচার সব সময় হয়? সন্ত্রাসী-দুর্বৃত্তদের হাতে প্রতিনিয়ত কত মানুষ মারা যাচ্ছে! কিন্তু খুনিদের বিচার কি হচ্ছে? যেসব হত্যাকান্ড দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে, গণমাধ্যমের কারণে ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র, সেগুলো আইনের আওতায় আসে। সাজাও হয় অপরাধীদের। কিন্তু সাজা ভোগ করে ক’জন? নানাভাবে তারা সাজা এড়িয়ে যায়। কাউকে কাউকে তো বিচারের সম্মুখিনই হতে হয় না।
দেশে আজ স্বাভাবিক পরিবেশ নেই, এটা অস্বীকার করা যাবে না। নাগরিকগণ এখন হতবিহ্বল, ভীত-সন্ত্রস্ত। জীবনের নিরাপত্তা উধাও হয়েছে অনেক আগেই। চলাফেরা করতে হয় জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে। রাস্তা-ঘাট তো বটেই, নিজ বাসা-বাড়িও আর নিরাপদ নেই। দুর্বৃত্তদের হিংস্র থাবা সেখানেও বিস্তার লাভ করেছে। পথে-ঘাটে দুর্বৃত্তদের হাতে জীবন যাচ্ছে নিরীহ মানুষের। সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, অধিকাংশ সময়ই খুনিরা ধরা পড়ছে না। যদিও কোনো হত্যাকান্ড সংঘটিত হওয়ার পর সরকারের পদস্থ ব্যক্তিদের সেই একই বাণী শোনা যায়- খুনি যে-ই হোক, তাকে ধরা হবে, আইনের আওতায় আনা হবে। পুলিশের পক্ষ থেকে ‘জোর তদন্ত’ চলছে। তবে, সে জোর তদন্তে প্রকৃতপক্ষে জোর কতটা থাকে তা একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন। কারণ, ওই ঘটনার তদন্ত কতদূর আগায়, অপরাধীরা চিহ্নিত হয় কীনা এবং তারা ধরা পড়ে কীনা, তা আর জানা যায় না।
ঢাকার মতিঝিলের একটি বিখ্যাত রেস্তোরাঁর নাম ঘরোয়া। সে রেস্তোরাঁ মালিক বছর দুয়েক আগে গুলি করে মেরে ফেলল তার কিশোর কর্মচারীকে। তারপর সে সদম্ভে ঘোষণা করলো, তাকে কেউ স্পর্শ করতে পারবে না। বাস্তবেও ঘটলো তাই। হত্যাকারীর কোনো হদিস পাওয়া গেল না। রেস্তোরাঁটি বন্ধ আছে বর্তমানে। পুলিশ ওটা বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু খুনিকে ধরতে পারেনি। সে কি দেশে আছে, নাকি বিদেশে চলে গেছে, তাও কেউ বলতে পারে না। এই নির্মম হত্যাকান্ডের বিচার আদৌ হবে কীনা কেউ বলতে পারে না।
এ রকম ঘটনার অভাব নেই আমাদের দেশে। কুমিল্লার সোহাগী জাহান তনুর কথা নিশ্চয়ই কেউ ভুলে যাননি। পাশবিক অত্যাচারের পর তাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্ত বা দুর্বৃত্তরা। দুই বছর পার হয়ে গেছে, কিন্তু আজও জানা গেল না, ওই বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের হোতা কে বা কারা। কতবার পোস্ট মর্টেম হলো, ভিসেরা পরীক্ষা হলো, ফরেনসিক পরীক্ষা হলো, এমন কি ডিএনএ টেস্টও হলো। কিন্তু হত্যাকান্ডটির কোনো কূল-কিনারা আজো করতে পারেনি আমাদের চৌকষ গোয়েন্দারা। কেউ বলতে পারে না তনু হত্যার রহস্য কোনোদিন উদঘাটিত হবে কীনা। বলা হয়ে থাকে, খুনি খুন করে যাবার সময় নিজের অজান্তেই এমন কিছু চিহ্ন রেখে যায় যাকে বলা হয় ক্লু, যার সূত্র ধরে তদন্তকারীরা খুনিকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। তনুর খুনিরা কি সে রকম কোনো চিহ্ন রেখে যায়নি? জানি না, তদন্তকারী দলের সদস্যরা সে রকম কিছু পেয়েছিলেন কীনা।
সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনীর হত্যাকান্ডের কথা প্রাসঙ্গিকভাবেই এসে যায়। অনেকেই মনে করেন, যতদিন তাদের হত্যাকান্ডের রহস্য উন্মোচন না হবে, ততদিন তা উদাহরণ হয়েই থাকবে। আলোড়ন সৃষ্টিকারী ওই হত্যাকান্ডের হোতাদের যে কোনো মূল্যে ধরা হবে- এমন আশ্বাসবাণী শোনা গিয়েছিল সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে। কিন্তু অর্ধযুগ অতিবাহিত হলেও আজো অনুদঘাটিত রয়ে গেছে সে লোমহর্ষক হত্যাকান্ডের রহস্য। খুনিরা রয়ে গেছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এখনও প্রতি বছর ১১ ফেব্রুয়ারি এলে সাংবাদিকসমাজ সাগর-রুনীর স্মরণে সভা করে, তাদের হত্যার বিচার দাবি করে। কিন্তু সে বিচারের দাবি প্রেসক্লাব অথবা ডিআরইউ মিলনায়তনের দেয়ালে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে গুমরে গুমরে কাঁদে। চাঞ্চল্যকর এ জোড়া খুনের হোতারা আদৌ ধরা পড়বে কীনা কেউ জানে না। বিচার তো অনেক দূরের কথা।
এমন উদাহরণ দিলে অনেক দেয়া যাবে। তাতে বিশেষ কোনো লাভ আছে বলে মনে হয় না। আজকে সমাজে যে দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে তার পেছনে রয়েছে বিচারহীনতা। অপরাধ করেও পার পাওয়া যায়-এমন একটি ধারণা বেশিরভাগ অপরাধীর মনে বদ্ধমূল হয়ে গেছে। তাদের এ ধারণা এমনি এমনি সৃষ্টি হয়নি। অপরাধীদের পার পেয়ে যাবার দৃষ্টান্তই এ ধারণার জন্ম দিয়েছে। নানা উপায়ে অপরাধীরা আইনের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে। অপরাধী যখন উঁচুতলার কেউ হয়, তখন আইন তাকে স্পর্শ করতে পারে খুব কমই। আর তার সাথে যদি থাকে রাজনৈতিক কানেকশন, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের সাথে সম্পৃক্তি, তাহলে আর পায় কে! আইনের সাধ্য কি তার গায়ে আঁচড় কাটে? চিহ্নিত অপরাধীদের যখন দেখা যায় সরকারের মন্ত্রী বা সরকার দলীয় আইন প্রণেতার সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে, তখন আইনের হাত খাটো হয়ে যাবার কারণটি আর অজানা থাকার কথা নয়। বলা বাহুল্য, এসব কারণেই আমাদের সমাজে সন্ত্রাসী-অপরাধীদের প্রতাপ ভয়ঙ্করভাবে বেড়ে গেছে।
সবচেয়ে দুর্ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে হঠাৎ করে কাউকে তুলে নিয়ে গুম করে ফেলার ঘটনাগুলো। এ ক্ষেত্রে শিকার প্রধানত বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীরা। যাদেরকে তুলে নেয়া হয়, তাদের মধ্যে কেউ কিছুদিন পর ফিরে আসেন, আবার কেউ বা হারিয়ে যান চিরতরে। আবার কারো নিষ্প্রাণ দেহ উদ্ধার করা হয় ঝোঁপ-জঙ্গল, রাস্তার ধার কিংবা নদীর তীর থেকে। কারা এসব হত্যাকান্ড ঘটায় তা জানা যায় না। ফলে হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় আনারও কোনো সম্ভাবনা থাকে না। আইন সবার জন্য সমান বলে প্রচারণা চালানো হলেও এ ক্ষেত্রে তা লক্ষণীয় হয়ে উঠে না। বরং অজ্ঞাতনামা আততায়ীর দ্বারা সংঘটিত ওইসব হত্যাকান্ডের আর কোনো তদন্তও হয় না। এ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে, হচ্ছে। মানবতার প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে মানুষের মানবিক অধিকারের কথা। কিন্তু তাতে কেউ কর্ণপাত করছে বলে মনে হয় না।
সাধারণ মানুষের মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত একটি কথা হলো, বাংলাদেশে অনেক কিছুর দাম বাড়লেও মানুষের জীবনের দাম কেবল কমে। অতি তুচ্ছ ঘটনায় একজন আরেকজনকে খুন করে ফেলে। এসব খুনের ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে তেমন কোনো আইনী পদক্ষেপ নেয়া হয় না। খুনিরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। আর এসব হত্যাকান্ডের পেছনে যদি প্রভাবশালী কারো হাত থাকে, তাহলে হত্যকারীদের দিকে তাকায় এমন সাধ্যি কার? তখন অপরাধীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায় বীরদর্পে।
আইনের শাসনের কথা আমরা প্রায়ই শুনি। সরকারের পক্ষ থেকে যেমন, বিরোধী রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও তেমনি। একপক্ষ বলে দেশে আইনের শাসন কায়েম হয়েছে, আরেক পক্ষ বলে আইনের শাসনের ছিটেফোঁটাও নেই দেশে। আইনের শাসন আছে কি নেই সে বিতর্কে আমরা যাবো না। আমরা শুধু বলতে চাই, এখনও আমাদের দেশে মানুষ নির্ভয়ে নির্ভাবনায় পথ চলতে পারছে না, গৃহে বসবাস করতে পারছে না। এটা স্বাভাবিক কোনো সমাজের প্রতিচ্ছবি নয়। ভয়, শঙ্কা সর্বদা ঘিরে আছে সবাইকে। নাগরিকদের জীবন-সম্পদের সুরক্ষা দেয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আর সে রাষ্ট্রের পরিচালক সরকার। সুতরাং এর দায়ভার সরকারের ওপর বর্তায় সঙ্গত কারণেই।
বন্য পশু-পাখি সংরক্ষণের আইন রয়েছে, তা মেনে চলার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। বিপন্ন প্রাণীদের রক্ষার আন্দোলনও বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেশ জোরদার রয়েছে। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বিপন্ন প্রাণী বোধকরি মানুষ। তাদেরকে রক্ষার জন্য আমরা কি করছি? এ এক বিরাট প্রশ্ন। প্রশ্ন আছে, কিন্তু উত্তর দেবে কে?
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর