Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৪ আশ্বিন ১৪২৫, ৮ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

মালদ্বীপের গল্প: চিন্তা

মরিয়ম নাজরাথ/ অনুবাদ : হো সে ন মা হ মু দ | প্রকাশের সময় : ২০ এপ্রিল, ২০১৮, ১২:০০ এএম

সে ফাইলের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রগুলো একের পর এক দেখছিল আর একেকবার তার গায়ের কোঁচকানো পোশাক, টেবিলের ওপর অগোছালো অবস্থায় পড়ে থাকা কলমদানি, পিনস্ট্যান্ড, ফাইলসহ নানা জিনিসের দিকে বিমর্ষ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল।
তার কাজের কোনো শেষ ছিল না। নিজেকে তার রূপকথার প্যান্ডোরা মনে হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল তার জাদুর বাক্স খুলতে যাচ্ছে। তার মনে নানা প্রশ্ন ও সেসবের জবাব ভিড় করছিল। এমন কিছু ভাবনা তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল যেগুলোকে কোনো শ্রেণিতে ফেলা যায় না।
: আচ্ছা, আমি কেন তাকে পছন্দ করি? নিজের কাছে এ প্রশ্নের জবাব খোঁজে সে। পায় না। এটি তার কাছে একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। এ কি তার নিয়তি? এ কারণেই কি এ অফিসে তার সাথে তার দেখা হয়েছে? অথচ তার সাথে তার দেখা হওয়াটা ছিল খুবই সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু তাতে কী গোলমালটাই না হয়ে গেল? হ্যাঁ, তার দৃষ্টিতে ব্যাপারটি তাই। এ অফিসে তো আরো অনেকে ছিল। তারাও অবিবাহিত, আকর্ষণীয়। কই, তাদের কারো সাথে তো হলো না!
তার একাকী জীবনে সে সুখী হয়তো ছিল না, কিন্তু তার কোনো অসন্তোষও ছিল না। তার কোনো সময় মনে হতো না যে সে একা। অফিস এবং বাড়ি। কাজ এবং নিঃসঙ্গতা। একটু কোনোরকম রান্না, বই পড়া, ঘুম, কখনো সখনো পার্কে গিয়ে একটু বসা। জীবনটা তার এক রকম করে কেটে যাচ্ছিল। এ রকম সময়েই তার সাথে দেখা হয় তার। তারপর কিছু ব্যাপার ঘটল।
প্রথমবার তার দিকে তাকানোর পর সে আবার তার দিকে ফিরে তাকায়। কোনো মেয়ে কি প্রথম দেখার পর অপরিচিত পুরুষের দিকে আবার তাকিয়ে দেখে? কিন্তু সে তাই করল। দেখল, সে তার চোখের চশমা খুলে টেবিলের ওপর রেখে নিজের চোখ রগড়ে নিচ্ছে। তারপর আবার চশমা পরল। এটা তার অভ্যাস নাকি সে যে ক্লান্ত, তারই প্রকাশ?
তার ভয় হলো যে সে মানুষটিকে চিনতে পারেনি। সে তাকে বুঝতে পারেনি এটা ঠিক। কিন্তু কিভাবে যেন তার মনে হয়েছে সে একজন ভালো মানুষ। তার ভেতরে দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু কখন হলো সেটা সে জানে না। মানুষ যখন কারো ভালোবাসায় পড়ে তখন তো আগে চোখই প্রধান ভূমিকা পালন করে, তারপর মন, হৃদয় ও চূড়ান্ত পর্যায়ে শরীর। সে কিভাবে চোখ থেকে শরীর পর্যন্ত পৌঁছবে? সে তাকে জানে না, অথবা হয়তো তাকে জানতে চায়ও না এ ভয়ে যে তার সম্পর্কে যা ভেবেছে তা সে রকম না হয়ে অন্য রকম হতে পারে। সে মনে-প্রাণে এটা বিশ্বাস করতে চায় যে, ঐ পুরুষটি তারই জন্য, তারই উপযুক্ত, অন্তত কিছুকালের জন্য হলেও। তারপর সে প্রয়োজন হলে নিজের জন্য আলাদা পথ খুঁজে নেবে, কিন্তু তার পছন্দ নয় এমন কিছুর মধ্যে নিজেকে সমর্পণ করবে না।
সমর্পণ? সে অবাক হয় যে, যদি সে ঐ মানুষটির প্রতি আকৃষ্টই না হবে তাহলে তার কাছে নিজেকে সমর্পণের ভাবনা মাথায় এলো কি করে? ব্যাপারটা তার কাছে একাধারে বিস্ময়কর ও রহস্যময় মনে হয়। তবে কি নিজের অজান্তেই তাকে সে তার ভালোবাসা উপহার দিয়ে ফেলেছে, যা মোটেই ঠিক কাজ হয়নি। অচেনা একজন মানুষকে ভালোবাসা! কিভাবে তা হলো, কিছুতেই ভেবে পায় না সে।
মানুষটি তার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। পিয়নকে কিছু বলে। একটু পরই পিয়ন দু’টি কোকের বোতল ও দু’টি স্ট্র নিয়ে ফিরে আসে। ধীরে ধীরে কোকে চুমুক দেয় সে। যেন প্রস্তুতি নেয় বা সাহস সঞ্চয় করে। তার দিকে তাকায়। পরমুহূর্তে নিজের বোতলটি টেবিলে রেখে অন্য বোতলটি তার দিকে এগিয়ে দেয়। নারীর সলজ্জ হাসি হেসে বোতলটি হাতে নেয় সে।
আচ্ছা, সে কোকের বোতলটি নিলো কেন? সে কেন তার দিকে তাকাল? সে কি নারী বলে তার পৌরুষের প্রতি আকৃষ্ট? সে কি চাইছিল সে তার জন্য এটা করুক! নারীরা তাদের চেয়ে দীর্ঘকায় ও বলিষ্ঠ পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এটাই স্বাভাবিক। নারীরা কি পুরুষদের তুলনায় দেহে ও শক্তিতে দুর্বল বলেই এ রকম হয়? নাকি নারীদের এটাই মনের গোপন ইচ্ছা? নারীরা কি এটা ধরেই নেয় যে, পুরুষরা নিশ্চিতই তাদের সকল অসুবিধা, বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করবে? এটা তো ঠিক এ বিশ্বে চলার পথে নানা ঝামেলা দেখা দেয়। আর নারীরা সব ঝামেলা সব সময় একা সামাল দিয়ে উঠতে পারে না। পুরুষের সহায়তা প্রয়োজন হয় তাদের।
সে তার দিকে তাকায়। মানুষটি দীর্ঘদেহী ও বলিষ্ঠ। তবে তার প্রতি তার আকৃষ্ট হওয়ার কারণ কিন্তু এটা নয়।
হয়তো সে অবচেতন মনে এমন কাউকে চায় যে তাকে এমন ভাবে রাখবে যাতে সে কখনো ভুলে যাবে না যে একজন নারী।
সে এ ভাবনার মধ্যে ডুবে থেকেই জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। মানুষটি তার এত কাছে অথচ তার নিকট থেকে যেন অনেক দূরে। হ্যাঁ, যা পাওয়া যায় না তা নিয়ে স্বপ্ন দেখা মানুষের স্বভাব। কারণ, মানুষ জীবন্ত, মৃত নয়।
এ বিষয়টি তার মধ্যে হতাশার সৃষ্টি করে। তার মনে প্রশ্ন চিৎকার করে- কেন... কেন... কেন? ভালো লাগার কোনো অনুভূতি তার মধ্যে কাজ করে না, বরং বিষয়টি তার কাছে ভীষণ বিরক্তিকর হয়ে ওঠে।
সব কিছুই কি রাসায়নিক নয়? রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া আমাদের হাতের তালু ঘামে ভিজিয়ে ফেলে। বুকের ভেতর ধড়াস ধড়াস শব্দ তোলে। কোনো প্রতিক্রিয়াই যেহেতু সচেতনভাবে হয় না তাই তার ব্যাখ্যা করা সহজ। সে তাই তার দেহ ও মনের বিশ্বাসঘাতকতা জনিত প্রতিক্রিয়া থেকে নিজেকে পৃথক করে ফেলতে পারে। কিন্তু কোনো কিছুই সহজ নয়। কেউই একে ক্লিনিক্যাল রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে বাতিল করতে পারে না। কোথাও যেন কোনো জাদুর ব্যাপার ঘটে, যেখান থেকে একটু আগে চোখের পানি ঝরেছে সেখানে ফুটে ওঠে হাসির রেখা।
কোনো জাদু কান্ড ঘটেছে। সে কোনোভাবেই এটা বিশ্বাস করতে পারছে না। সে কেন তার প্রতি ইন্দ্রিয়গতভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে? যদি কোনো কারণ না থাকে তাহলে এটা হচ্ছে কেন? সে কি ঐ মানুষটির প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েনি, তার কাছে নিজেকে সমর্পণের বাসনা লালন করছে না? সে কি এটা মেনে নেয়নি যে, সে তাকে আকৃষ্ট করতে সফল হয়েছে?
তাকে বিষয়টি বলা উচিত। কিন্তু সে তো নারী, কি করে তা বলবে? তার কি বলা উচিত? প্রশ্নটি তাকে উত্তেজিত করে তোলে। আচ্ছা, কারো লিঙ্গ কি কারো অনুভূতির নিবিড়তা ও বৈধতা নিরূপণ করতে পারে? সে তাকে অবশ্যই বলবে।
কিন্তু কিভাবে? একজন মানুষ কি করে আরেকজন মানুষের সামনে তার সকল ছলাকলা, প্রত্যাশা, ভয় ও অবস্থান পরিত্যাগ করতে পারে? সেখানে কি নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়? তার কি তা করার সাহস আছে? এটা কি তার কাছে অনেক কিছু?
সে তার দিকে তাকায়। হাসে। তবে তার চোখে কোনো ভাষা ছিল না। তবু তার গন্ডদেশ লাল হয়ে ওঠে। সেও জবাবে সলজ্জ হাসে।
তাকে কথাটি বলতে হবে, নইলে বাকি জীবনে হয়তো আর বলাই হবে না। কিন্তু কথাটি বলার পর কী হবে, সে ভাবতে থাকে।
সে উঠে দাঁড়ায়, মানুষটির দিকে হেঁটে যায়। তার সাথে কথা বলতে থাকে। কতক্ষণ কথা বলেছে সে জানে না। সে থেমে যায়, কেননা তার কথা ফুরিয়ে গেছে। তার বলার মতো আর কিছু ছিল না। এরপর যেন চরাচর জুড়ে অসীম নীরবতা নেমে আসে।
তারপর কী ঘটল তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো সে তা পেল যা সে নিজের জন্য খুঁজে ফিরছিল। সেটা ছিল তার সাথে তার বিবাহ। তা কি তার জন্য যথেষ্ট ছিল না?
মরিয়ম নাজরাথ মালদ্বীপের বিশিষ্ট গল্প লেখিকা। ‘এ থট’ নামের তার এ গল্পটি ২০০২ সালে মালদ্বীপের একমাত্র ইংরেজি সাপ্তাহিক ‘মানডে টাইমস’-এ প্রকাশিত হয়।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ