Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৪ আশ্বিন ১৪২৫, ৮ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

বাংলা ছোট গল্পের ধারা

শা হ রি য়া র সো হে ল | প্রকাশের সময় : ২০ এপ্রিল, ২০১৮, ১২:০০ এএম

পৃথিবীর সাহিত্যের ইতিহাসে ছোট গল্প নতুন কিছু নয়। বোকাচ্চিওর ডেকামেরন, চসার এর গল্প, ঈশপের গল্প, সংস্কৃতে বিষ্ণুশর্মার হিতোপদেশ ও পঞ্চতন্ত্র, সোমদেবের কথা সরিৎসাগর, বৌদ্ধ সাহিত্যে জাতকের গল্প প্রভৃতি ছোট গল্পের চিরন্তন আবেদনেরই নিদর্শন। ই এ পো এর মতে, ‘যে গল্প অর্ধ হতে এক বা দু’ঘন্টার মধ্যে এক নিঃশ্বাসে পড়ে শেষ করা যায়, তাকে ছোট গল্প বলে।’ এইচ জি ওয়েলস বলেন, ‘ছোট গল্প ১০ হতে ৫০ মিনিটের মধ্যে শেষ হওয়া বাঞ্চনীয়।’ তবে রবীন্দ্রনাথ এর উক্তিই অধিক গ্রহণযোগ্য। তিনি মনে করেন যে, ছোট গল্পের শুরু ও শেষে চমৎকারিত্ব থাকবে। হঠাৎ ঘটবার প্রয়াস থাকবে এবং ‘শেষ হয়েও হইলো না শেষ’ এমন একটি অবস্থা সৃষ্টি হবে, সেটি ছোট গল্প।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ছোট গল্প খুব পুরাতন নয়। ১৯০০ সালের দিকেই এর প্রচলন ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যায়। বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রথমে ছোট গল্প লেখার প্রয়াস চালান। পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সার্থক ও সুন্দর ছোট গল্প উপহার দেন। তার গল্পস্বল্প, গল্পগুচ্ছ, তিন সঙ্গী প্রভৃতি গল্পগ্রন্থ রয়েছে। প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্পে জীবনের ছোট-খাট ঘটনা হাস্যোজ্জ্বল কৌতুক রসিকতা অথচ সংযম ও লঘু কোমল স্পর্শে বিচিত্ররূপ লাভ করেছে। তার লেখা ষোড়শী, গল্পবীথি, নূতন বউ প্রভৃতি চমৎকার ছোট গল্প। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ছোট গল্পে মনুষ্যত্বের স্তুতিরূপ ঊর্ধ্বায়িত হয়ে উঠেছে। মহেশ, বিলাসী, মন্দির তার বিখ্যাত ছোট গল্প। তারাশঙ্কর, সরোজকুমার, শৈলজানন্দ আধুনিক বাস্তবতামূলক সমস্যাকে গ্রহণ করেছেন। তারাশঙ্কর মূলত বিলীয়মান জমিদারী প্রথার ওপর লিখেছেন। মানব জীবনের বিন্দু বিসর্গ বিষয় নিয়ে নাতি-দীর্ঘ ব্যঞ্জনা দীপ্ত গল্প রচনা করে বাংলা সাহিত্যে অভিনবত্ব যোগ করেছেন বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়। তার অদৃশলোকে, তন্বী, অনুগামিনী, বনফুলের গল্প প্রভৃতি উলে­খযোগ্য। রোমান্টিক ধারায় লিখেছেন মনীন্দ্রলাল বসু, মনোজ বসু প্রভৃতি লেখকগণ। বাংলার প্রকৃতিকে যিনি নিজের মত করে আপন করতে পেরেছিলেন, তিনি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তার গল্পগুলিতে প্রকৃতির বাস্তবঘন স্বাদ পাওয়া যায়। মৌরি ফুল, সুলোচনা, কিন্নর দল প্রভৃতি তার উলে­খযোগ্য গল্পগ্রন্থ। পরবর্তীতে যারা জীবনের সমস্যাকে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তাদের মধ্যে প্রেমেন্দ্র মিত্র, বুদ্ধদেব বসু, অচিন্ত্য সেন, সুবোধ ঘোষ উলে­খযোগ্য। বাংলা ছোট গল্পে বাস্তব নিষ্ঠতা, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও নির্মম সততার পরিচয় দিয়েছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। তার সমুদ্রের স্বাদ, ফেরিওয়ালা, ভেজাল, সরীসৃপ, বৌ, পাশ-ফেল প্রভৃতি উলে­খযোগ্য।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের ফলে সাহিত্য চর্চা কিছুটা ঝিমিয়ে পড়ে। তবে কিছু দিনের ভেতরই ঢাকাকে কেন্দ্র করে পুরা উদ্যমে সাহিত্য চর্চা চলতে থাকে। পত্র-পত্রিকার প্রয়োজন মেটাবার জন্য প্রচুর ছোট গল্প লিখিত হয়। এ সকল ছোট গল্পের ভেতর যথেষ্ট পরিমাণ সার্থক ছোট গল্পও রচিত হয়। প্রথম দিকে যারা ছোট গল্প লিখেছিলেন, তারা ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠা অর্জন করে। পরবর্তীতে আরও নতুন কিছু মুখ সংযুক্ত হন। গল্পের বিষয়েরও নানা ধরণের বৈচিত্র্য পাওয়া যায়। মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখ, নগর জীবনের আনন্দ-বেদনা মুখরিত হয়ে ওঠে ছোট গল্পে। জীবনের বৈচিত্র্যবোধ, মনস্তাত্বিক বিশ্লেষণ ছোট গল্পে উপজীব্য হয়ে ওঠে। যারা অত্যন্ত সফলতার সাথে ছোট গল্প লিখেছেন, তাদের ভেতর আবুল মনসুর আহমদের আয়না, ফুড কনফারেন্স, আসমানী পর্দা, গ্যালিভারের সফর নামা ইত্যাদি বিখ্যাত। শওকত ওসমানের জুনু আপা ও অন্যান্য, প্রস্তর ফলক; আবু রুশদের প্রথম যৌবন, শাড়ি-বাড়ি-গাড়ি; আলাউদ্দিন আল আজাদের অন্ধকার সিঁড়ি, জেগে আছি, ধানকন্যা; আব্দুর গাফফার চৌধুরীর কৃষ্ণপক্ষ, সম্রাটের ছবি, সুন্দর হে সুন্দর; হাসান আজিজুল হকের সমুদ্রের স্বপ্ন, আত্মজা ও একটি করবীগাছ, শীতের অরণ্য, জীবন ঘষে আগুন, নামহীন-গোত্রহীন; খালেদা এদিব চেীধুরীর পোড়া মাটির গন্ধ; আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের অন্য ঘরে অন্য স্বর, দুধে-ভাতে উৎপাত, দোযখের ওম ইত্যাদি বিখ্যাত। এ ছোট গল্পগুলি বাংলা সাহিত্যে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এছাড়াও যারা ভাল লিখেছেন, তাদের ভেতর রয়েছেন; শাহেদ আলী, শওকত আলী, জ্যোতি প্রকাশ দত্ত, শহীদ সাবের, রাহাত খান, হাসনাত আব্দুল হাই, শহীদ আখন্দ, আব্দুস শাকুর, সুব্রত বড়–য়া, হাসান হাফিজুর রহমান প্রমুখ।
১৯৭১ পরবর্তী বাংলাদেশের ছোট গল্পে নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে, যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। নানা সুরে বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠেছে ছোট গল্পের প্রাঙ্গন। জীবনের কলগুঞ্জন যেমন প্রতিধ্বনিত হয়েছে সেখানে, তেমনি প্রতিফলিত হয়েছে মানুষের হৃদয়বৃত্তির রূপায়ন। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তি মানুষের নিদারুন জীবন সংকট ফুটে উঠেছে। পল্লী জীবন ও নগর জীবনের চিত্র পাশাপাশি চিত্রিত হয়েছে বাংলা ছোট গল্পে। তবে জীবনের সূক্ষাতি-সূক্ষ বিষয়গুলো আরও ব্যাপকভাবে পরবর্তীতে ছোট গল্পে ফুটে উঠবে এবং বিশ্বের অন্যতম ছোট গল্পের পাশে যেয়ে দাঁড়াবে, একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

তথ্যসূত্র: সাহিত্য সন্দর্শন-শ্রীশ চন্দ্র দাশ
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-মাহবুবুল আলম
বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত-অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত-মুহম্মদ আব্দুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান সম্পাদিত



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ