Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ মে ২০১৮, ০৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ৫ রমজান ১৪৩৯ হিজরী

হল থেকে মধ্যরাতে বের করে দেয়ার প্রতিবাদে উত্তপ্ত ঢাবি: ছাত্রীরা আতঙ্কে

বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ২১ এপ্রিল, ২০১৮, ১২:০০ এএম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি সুফিয়া কামাল হল থেকে মধ্যরাতে ছাত্রী বের করে দেয়া ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। গতকাল বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের সামনে একত্র হয়ে বিক্ষোভ করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান ও নুরুল হক নূর আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। অন্যদিকে রাজু ভাস্কর্যের উত্তর দিকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি আবিদ আল হাসান ও সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন প্রিন্সের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ নেতারা অবস্থান নেয়। ফলে আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামন থেকে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার কথা থাকলে ছাত্রলীগের অবস্থানের কারণে তা পরিবর্তন করে রাজু ভাস্কর্য থেকে আন্দোলন করার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। তবে কোটা আন্দোলন ইস্যুতে সুফিয়া কামাল হলের ঘটনা কেন্দ্র করে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আতঙ্কের সৃস্টি হয়েছে। কখন কাকে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেয়া হয় এবং হয়রানী করা হয় সে ভয়ে শিক্ষার্থীরা উৎকণ্ঠিত।
ঘটনার সুত্রপাত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ছাত্রীদের হল থেকে বের করে দেয়া। কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে ওই রাতে হল থেকে কয়েকজন ছাত্রীকে বের করে দেয়া হয়। গতকাল ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের কবি সুফিয়া কামাল হল থেকে প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সাবিতা রেজওয়ানা রহমান ছাত্রীদের বের করে দেন। ভুক্তোভোগী ছাত্রীরা জানায়, কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে ফেসবুকে নানা তথ্য শেয়ার করা ও হলের ছাত্রলীগ সভাপতি ইফফাত জাহান এশার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার কারনে হল প্রশাসন সাধারণ ছাত্রীদের এমন হয়রানি করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিক্ষুব্ধ এবং আতঙ্কিত এক ছাত্রী বলেন, মধ্যরাতে হলের হাউজ টিউটররা প্রত্যেক ফ্লোরে পাহারা বসান এবং ছাত্রীদের মুঠোফোন চেক করেন। তারপর তাদেরকে হল থেকে বের হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এতে সাধারণ ছাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে পরে। সেই সাথে সবাইকে হলের নিচে ডেকে এনে প্রাধ্যক্ষ বলেন, কারা কারা বিভ্রান্তিমূলক পোস্ট দিচ্ছে তা ইন্টিলিজেন্স সেল দেখবে। এবং পরবর্তীতে এইসব নিয়ে কোন প্রকার পোস্ট দিতেও নিষেধ করেন তিনি। কতৃপক্ষের এধরণের আচরণে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীসহ সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা আতঙ্কে আছেন।
প্রশাসনের রোষানলে পড়ে হল থেকে বিতাড়িত কয়েকজন ছাত্রী হলেন পদার্থ বিজ্ঞানের অন্তি ও রিমি, গণিত বিভাগের শারমিন। এছাড়াও ছাত্রীদের দেয়া তথ্যমতে আরো অন্তত বিশজন ছাত্রীকে জোর করে হল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। ছাত্রীরা আরো অভিযোগ করে বলেন, যারা হলে আছে তাদের কে এই নিয়ে কোন কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে এবং ফেসবুকে কোন তথ্য শেয়ার দিতেও নিষেধ করা হয়েছে। এছাড়াও বের করে দেয়া ছাত্রীদের সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতেও বাধা দেয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ঘটনাকে স্বাভাবিক এবং ক্যাম্পাসের শান্তি শৃংখলা রক্ষার স্বার্থে তিন ছাত্রীকে অভিভাবকদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে দাবি করছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজ শিক্ষক এ ধরণের ঘটনাকে নজীরবিহীন ও ন্যাক্কারজনক হিসেবে অবিহিত করেছেন।
গতকাল মধ্যরাতে সরেজমিনে দেখা যায় অনেক অভিভাবকই হলের গেটে এসে তার সন্তানকে নিয়ে যাচ্ছেন এবং এইসময় তারা কোন প্রকার কথা বলতেও চাননি। এক জন অভিভাবককে সাংবাদিকরা তথ্য জানান জন্য প্রশ্ন করলে তিনি রিক্সা নিয়ে চলে যান এবং কোন কিছু জিজ্ঞাসা না করতে অনুরোধ করেন।
হল ত্যাগে কয়েকজন ছাত্রীকে হল ত্যাগে বাধ্য করার প্রতিবাদে রাত দেড়টার দিকে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এস এম ইয়াসিন আরাফাত একাই প্রভোস্টের পদত্যাগের দাবিতে হলের ফটকে অবস্থান নেন। পরে রাত দুইটার দিকে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতারা ইয়াসিনের সঙ্গে যোগ দেন। তাঁরা সেখানে বিক্ষোভ করেন। অনেকে শ্লোগান দেন, ‘ভয় দেখিয়ে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না, আমার বোন পথে কেন প্রশাসন জবাব চাই।’ বৃহস্পতিবার রাত আড়াইটা পর্যন্ত তাঁরা সেখানে অবস্থান নেন। গতকাল শুক্রবার দেশের প্রতিটি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করে অবস্থান শেষ করেন সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতারা। বিক্ষোভ চলাকালীন হলের ভেতর থেকে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেত্রী ফটকের কাছে এসে বলেন, হলে কোনো সমস্যা নেই আপনারা চলে যান। সে সময় বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা প্রাধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে ছাত্রলীগের নেত্রীরা কিছু না বলে চলে যান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হলের ফ্লোরে ফ্লোরে রাতে হাউস টিউটররা পাহারা বসান। ছাত্রীরা আতঙ্কে আছেন। তাঁরা বলছেন, মূলত যে ২৬ ছাত্রী ছাত্রলীগের নেত্রী ইফফাত জাহান এশার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন প্রথম দফায় তাঁদের বিচার করছে হল প্রশাসন। হলের প্রাধ্যক্ষ বাংলাদেশ আওয়ামী যুব মহিলা লীগের সদস্য সাবিতা রেজওয়ানা রহমান নিজেই এই তথ্যের সত্যতা স্বীকার করেছেন। হলের সাধারণ ছাত্রীরা কর্তৃপক্ষের এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করছেন। তাঁরা আতঙ্কের মধ্যে আছেন বলে জানিয়েছেন। তাঁরা অভিযোগ করেছেন, হলের প্রাধ্যক্ষ ছাত্রীদের ছাত্রত্ব বাতিল, গোয়েন্দা নজরদারি ও মামলার ভয় দেখাচ্ছেন। অভিযোগ প্রসঙ্গে সাবিতা রেজওয়ানা সাংবাদিকদের বলেন, আমরা অনেক ছাত্রীকে ডেকেছি। তাঁদের মোবাইল চেক করা হচ্ছে। তাঁরা বিভিন্ন ফেক অ্যাকাউন্ট খুলে গুজব ছড়াচ্ছে। মুচলেকা দিয়ে তাঁদের স্থানীয় অভিভাবকদের সঙ্গে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ ছাত্রীরা বলছেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনে যে ছাত্রীরা হলের ছাত্রলীগের সভাপতি ইফফাত জাহানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন, তাঁদের শায়েস্তা করছে হল প্রশাসন।
এদিকে এ ঘটনা নিয়ে বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসি সাংবাদিকদের বলেন, সুফিয়া কামাল হলে কোন ছাত্রীকে হয়রানি করা হচ্ছেনা। বরং তাদেরকে অভিভাবকের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে। যারা এসব অভিযোগ করছেন তারা অপতথ্য প্রচার করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি সুফিয়া কামাল হল থেকে রাতের অন্ধকারে ছাত্রীদের বের করে দেওয়ার ঘটনার মধ্য দিয়ে কর্তৃপক্ষ ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি করতে চাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের মঞ্চ বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক। তিনি বলেন, আমরা খবর পেয়েছি, রাত ১১টার পরেও অনেক ছাত্রী হল থেকে বের হয়ে গেছেন। ছাত্রীদের মোবাইল কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। প্রাধ্যক্ষের কক্ষে অনেককে আটকে রাখা হয়েছিল। অভিভাবক ডেকে রাতের অন্ধকারে হল ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। কোনো অপরাধ করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনানুযায়ী ছাত্রীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে; কিন্তু ছাত্রীদের এভাবে বের করে কর্তৃপক্ষ ভয়ংকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাচ্ছে। সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন বলেন, এটি হল প্রশাসনের ধৃষ্টতা। আমরা প্রশাসনকে সব সহযোগিতা করছি। এর মধ্যে কোনো আলোচনা ছাড়াই কেন তারা এমন সিদ্ধান্ত নিল, আমরা তার জবাব চাই।

 


Show all comments
  • গনতন্ত্র ২১ এপ্রিল, ২০১৮, ৬:৫১ এএম says : 0
    জনগন বলছেন, “ অবহেলা – ২০১৮ “ গভীর রাতে হল ছাড়া ছাত্রীরা চুপ থাকবে বাংগালী কত আর, দলীয় বক্তব্য দিলেন ভি,সি তিনি অভিবাবক শুধু আওয়ামীলীগার ৷ অন্যায় যদিও করে থাকে গভীর রাতে কেন হবে হল ছাড়তে, ভি,সি সাহেবের মেয়ে হলে তিনি কি পারতেন সত্য লুকাতে ? হামলার সময়ও দিলেন বক্তব্য সরকারের পক্ষ অবলম্বন করে, উনার উপর ভরসা করলে ছাত্রছাত্রীদের ক্ষতি হতে পারে ৷ ভিসি নয় অভিবাবক চাই সব ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তার তরে, তাহারাই আগামী দিনের দেশের ভবিষৎ অবহেলা মানবো কেমন করে ??
    Total Reply(0) Reply
  • কামাল ২১ এপ্রিল, ২০১৮, ৩:৩৯ এএম says : 0
    দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠে কী হচ্ছে এসব ?????????
    Total Reply(0) Reply
  • নেসার উদ্দিন ২১ এপ্রিল, ২০১৮, ৩:৪০ এএম says : 0
    শিক্ষক মহোদয়দের কাছে জানতে ইচ্ছে করছে আপনারা আমাদেরকে কি শিক্ষা দিচ্ছেন?
    Total Reply(0) Reply
  • নাহিদ ২১ এপ্রিল, ২০১৮, ৩:৪১ এএম says : 0
    এটা ভুলে গেলে চলবে না যে এরা আমাদেরই বোন।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।