Inqilab Logo

সোমবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২২, ১০ মাঘ ১৪২৮, ২০ জামাদিউস সানি ১৪৪৩ হিজরী

পরমাণু-ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা স্থগিত উত্তর কোরিয়ার

| প্রকাশের সময় : ২২ এপ্রিল, ২০১৮, ১২:০০ এএম

ইনকিলাব ডেস্ক : সব ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ স্থগিত ও পারমাণবিক পরীক্ষা কেন্দ্রের কাজ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং উন। অর্থনৈতিক অগ্রগতি ধরে রাখা এবং কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কিম এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছে কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি (কেসিএনএ)। ২১ এপ্রিল থেকে উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক পরীক্ষা ও আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ বন্ধ রাখবে, কিমের বরাত দিয়ে জানায় দেশটির এ রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা। বিবিসি বলছে, সামনের সপ্তাহে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইনের সঙ্গে শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনার আগে উত্তরের শীর্ষ নেতা ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা স্থগিতের এই সিদ্ধান্ত নিলেন। এদিকে, জুনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও কিমের শীর্ষ বৈঠক আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ ও পারমাণবিক পরীক্ষা নিয়ে পিয়ংইয়ংয়ের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। টুইটারে তিনি বলেন, উত্তর কোরিয়া ও পৃথিবীর জন্য এটি খুবই ভালো সংবাদ, বিরাট অগ্রগতি। এর আগে বৃহস্পতিবারও তিনি বলেছিলেন, উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক পথ থেকে সরে এলে তাদের জন্য ‘উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ’ অপেক্ষা করছে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের এক মুখপাত্রও পিয়ংইয়ংয়ের এ পদক্ষেপকে ‘অর্থবহ অগ্রগতি’ হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়েছেন। এ ঘোষণা দুই দেশের আসন্ন শীর্ষ সম্মেলনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মন্তব্য করেছে মুন জায়ে ইনের দপ্তর। ১৯৫০-৫৩ পর্যন্ত দুই কোরিয়ার যুদ্ধ হয়েছিল। যুদ্ধ সমাপ্তিতে কোনো শান্তিচুক্তি না হওয়ায় উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া এখনও ‘কার্যত যুদ্ধবিরতির’ মধ্যে আছে। মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ ও পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির কারণে দশককাল ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় থাকা উত্তর কোরিয়ার আলোচনার প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে গত মাসে বিশ্বকে বিস্ময় উপহার দিয়েছিলেন ট্রাম্প। ফেব্রæয়ারিতে পিয়ংচ্যাংয়ে হওয়া শীতকালীন অলিম্পিককে কেন্দ্র করে উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যে সম্পর্কের বরফ কমে আসার ধারাবাহিকতাতেই ওয়াশিংটনকে ট্রাম্প-কিম বৈঠকের প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রস্তাব গ্রহণ করে ট্রাম্প জুনের প্রথম দিকে কিংবা তারও আগে উত্তরের শীর্ষ নেতার সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তুতি নিতে প্রশাসনকে নির্দেশ দেন। বৈঠকস্থল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বেশ কয়েকটি স্থানকে বিবেচনা করা হচ্ছে বলেও পরে জানিয়েছেন তিনি। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, দুই কোরিয়ার ডিমিলিটারাইজ জোন কিংবা বেইজিংয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতৃত্বের এ সরাসরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে; সম্ভাবনা আছে অন্য কোনো এশীয় দেশ, ইউরোপ এমনকী আন্তর্জাতিক পানিসীমায় কোনো নৌযানের মধ্যে হওয়ারও।
এ সিদ্ধান্ত কেন নিলেন কিম জং আন
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কেসিএনএ বলছে, ‘২১শে এপ্রিল থেকে উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা এবং আন্ত-মহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা বন্ধ করে দেবে’। নেতা কিম জং-উনের যে বিবৃতি কেসিএনএ প্রচার করেছে, সেখানে তিনি বলছেন - ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার আর প্রয়োজন নেই, কারণ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে পারমাণবিক বোমা বহনের সক্ষমতা উত্তর কোরিয়া অর্জন করে ফেলেছে।
প্রেসিডেন্ট কিম আরো বলেন, ‘নর্দার্ন পারমাণবিক পরীক্ষা কেন্দ্রটি তার উদ্দেশ্য হাসিল করতে সক্ষম হয়েছে, সেটির আর প্রয়োজন নেই’।
তিনি বলেন, এখন তার মূল লক্ষ্য উত্তর কোরিয়ার সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির বিকাশ এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন। এই ঘোষণা কিম জং উন এমন সময় দিলেন যখন খুব শিগগিরই তিনি দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ বৈঠকের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। তার প্রথম বৈঠকটি হবে এ মাসের ২৭ তারিখ দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের সাথে। অন্যটি মে মাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এই সিদ্ধান্তের জন্য মি. কিমকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার এই সিদ্ধান্তে উল্লসিত হওয়ার কারণ কতটা?
ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্ট এর সদস্য এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অঙ্কিত পাÐা বিবিসিকে বলেছেন - উত্তর কোরিয়ার ইতিহাস এবং তার ক্ষেপণাস্ত্র এবং পারমাণবিক কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করলে আশাবাদে রাশ টানতে হবে। কারণ হিসাবে মি. পাÐা বলছেন, প্রথমত - বন্ধের যুক্তি হিসাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের যে কথা কথা প্রেসিডেন্ট কিম দাবি করেছেন, সেটা একবারে অবিশ্বাস করার মত কথা নয়। ভারত ও পাকিস্তানের উদাহরণ টেনে মি. পাÐা বলেন, ১৯৯৮ পর্যন্ত এই দুই দেশের প্রত্যেকে ছয়টি করে পারমাণবিক পরীক্ষার পর তারা আর কোনো পরীক্ষা করেনি এবং সারা বিশ্ব মেনে নিয়েছে এরা পারমাণবিক শক্তিধর।
‘ছয়টি পারমাণবিক পরীক্ষার পর উত্তর কোরিয়া একইভাবে নিশ্চিত হয়েছে তারা অস্ত্র বানিয়ে ফেলেছে’।
মি. পাÐার মতে, ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে উত্তর কোরিয়ার পঞ্চম এবং ষষ্ট পারমাণবিক পরীক্ষা দুটো ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৬ তে উত্তর কোরিয়া দাবি করে, তারা যে কোনো পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ছোড়া যায় এমন আকারের এবং ওজনের পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে পেরেছে। ধারণা করা হয়, ঐ বোমার ক্ষমতা নাগাসাকিতে আমেরিকার ফেলা বোমার চেয়ে তিনগুণ শক্তিধর।
২০১৭ তে পরীক্ষা করা বোমার শক্তি আরো অনেক বেশি। ২০১৭ সালের তেসরা সেপ্টেম্বর পরীক্ষার পর ভূকম্পন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীদের ধারণা হয়েছে উত্তর কোরিয়া এখন যে কোনো শহর ধ্বংস করে দেয়ার ক্ষমতা অর্জন করেছে।
‘তার পারমাণবিক পরীক্ষা বন্ধের ঘোষণায় বোঝা যাচ্ছে মি. কিম এখন নতুন আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছেন’।
উত্তর কোরিয়ার এই অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা স্বতঃপ্রণোদিত, তাই যে কোনো সময় এটা থেকে তারা বেরিয়ে আসতে পারে। ১৯৯৯ সালে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার ওপর একটি অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা থেকে ২০০৬ সালে বেরিয়ে এসেছিল। প্রেসিডেন্ট কিম বলেছেন, পারমাণবিক কর্মসূচিতে সাফল্যের পর তিনি এখন দেশের অর্থনীতির দিকে মনোনিবেশ করবেন। অঙ্কিত পাÐা মনে করেন, মি. কিমের এই বক্তব্য ফেলে দেওয়া যায় না। তিনি হয়তো খুব শিগগিরই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তোলার দাবি শুরু করবেন। এ ঘোষণা কিম জং উন এমন সময় দিলেন যখন তিনি দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ বৈঠকের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন।
বৈঠকে দরকষাকষি না করে কেন আগেভাগে নিজ থেকে এসব নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিয়ে দিলেন কিম জং উন?
মি. পাÐার মতে, উত্তরটি সহজ- মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাথে শীর্ষ বৈঠকটি মি. কিমের জন্য একটি বড় পুরষ্কার। তার বাবা বা দাদা যা পারেননি, তিনি তা করে দেখাতে চলেছেন। পারমাণবিক পরীক্ষার একটি স্থান ধ্বংস করে উত্তর কোরিয়ার যে ক্ষতি হবে, তার চেয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সামনে বসে মুখোমুখি দেন-দরবার করার সুযোগের মূল্য অনেক বড়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দক্ষিণ কোরিয়া বা আমেরিকা চায় উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্র-মুক্ত হতে হবে। কিন্তু মি. কিমের শনিবারের ঘোষণায় তার কোনো ইঙ্গিতই নেই। এখন পর্যন্ত তিনি যে পারমাণবিক অস্ত্র বানিয়েছেন তা ধ্বংসের বা পরিত্যাগের কোনো প্রতিশ্রæতি তিনি দেননি। সূত্র : বিবিসি, রয়টার্স ও এএফপি।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: উত্তর কোরিয়ার


আরও
আরও পড়ুন