Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ মে ২০১৮, ০৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ৫ রমজান ১৪৩৯ হিজরী

ঝুঁকিতে তিন পার্বত্য জেলা

ম্যালেরিয়া নির্মূলে বাধা, অরক্ষিত সীমান্ত, দুর্গম এলাকা, সুযোগ-সুবিধার অভাব

| প্রকাশের সময় : ২৩ এপ্রিল, ২০১৮, ১২:০০ এএম

হাসান সোহেল, বান্দরবান থেকে ফিরে : দেশে ম্যালেরিয়া রোগের প্রকোপ পূর্বের তুলনায় কমেছে। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যাও কমেছে। তারপরও ম্যালেরিয়া নির্মূল করাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ হিসেবে অরক্ষিত সীমান্ত, দুর্গম এলাকা এবং সার্বিক সুযোগ-সুবিধার অভাবকে অন্যতম বাধা হিসেবে দেখছেন তারা। স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির তথ্যমতে, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি এই তিন পার্বত্যজেলায় ম্যালেরিয়া নির্মূলের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে ম্যালেরিয়ার প্রবণতার দিক থেকেও এই তিন জেলায় শতকরা হার ৯৩ শতাংশ। এরমধ্যে শুধুমাত্র বান্দরবানে এ রোগের প্রবণতার হার ৬০ শতাংশ। বিশেষ করে বান্দরবান জেলার আলীকদম, লামা, রুমা এবং থানছি উপজেলায় ম্যালেরিয়ায় প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। এই জেলায় আক্রান্তের হার এবং আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার দুটোই বেশি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের একমাত্র জেলা বান্দরবান, যে জেলার সঙ্গে ভারত ও মিয়ানমার উভয় দেশের সীমান্ত রয়েছে। এই দুটি দেশের সীমান্ত অঞ্চল তীব্র ম্যালেরিয়াপ্রবণ। তারা জানান, প্রতি বছর মার্চ-এপ্রিল মাসে জুমচাষিরা পাহাড় চাষের উপযোগী করতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় ম্যালেরিয়ার বাহক এ্যনোফিলিস জাতীয় স্ত্রী মশা এসব এলাকা থেকে চলে যায়। কিন্তু বর্ষা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ম্যালেরিয়ার বাহক মশা পুনরায় পাহাড়ি জঙ্গলে ফিরে আসে। এ সময় পাহাড়ী জনগোষ্টী দুর্গম পাহাড়ী বনে চাষাবাদ এবং কাঠ কাটতে যায়। তখন মশার কামড়ে তারা ম্যালেরিয়ার আক্রান্ত হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থাকে তারা এতোটাই দূরে থাকে যে পথিধ্যেই অনেকের মৃত্যু ঘটে। তবে আক্রান্ত হওয়ার পরে যারা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বা হাসপাতালে আসতে পারে তাদের কোন সমস্যা হয় না।
বান্দরবান সিভিল সার্জন অফিসের সিনিয়র মেডিক্যাল অফিসার ডা. বিশ্বজ্যোতি চাকমা জানান, ম্যালেরিয়া আক্রান্তের ৬০ শতাংশই বান্দরবান জেলায় বাস করে। ম্যালেরিয়া এ জেলার প্রধান সমস্যা। কারণ গভীর জঙ্গলে জুম চাষিরা ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন। তারা এতটাই গভীর জঙ্গলে থাকেন যে আক্রান্ত হয়ে সেবাকেন্দ্র পর্যন্ত আসতে পারেন না। আর দুর্গম হওয়ার কারণে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরাও চিকিৎসা দিতে সেখানে যেতে পারেন না।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি থেকে প্রাপ্ত তথ্যে অনুযায়ী, ২০১৫ সালে দেশে ৩৯ হাজার ৭১৯ জন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়, যার মধ্যে ৯ জনের মৃত্যু ঘটে। ২০১৬ সালে মোট ২৭ হাজার ৭৩৭ জন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয় এবং ১৭ জনের মৃত্যু ঘটে। ২০১৭ সালে ২৯ হাজার ২৩৭ জন আক্রান্ত হয় এবং ১৩ জনের মৃত্যু ঘটে। তথ্যমতে, দেশে ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে প্রায় দেড় কোটি মানুষ। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ১৩টি জেলার ৭১টি উপজেলায় ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব রয়েছে। সাসটেনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল-এসডিজি শর্ত অনুসারে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশ থেকে ম্যালেরিয়া নির্মূল করতে হলে আমাদের ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ ম্যালেরিয়া প্রকোপ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে পরপর তিন বছর এ অবস্থা ধরে রাখতে হবে।
ম্যালেরিয়া নির্মূল প্রসঙ্গে বান্দরবানের সিভিল সার্জন ডা. অং শৈ প্রæ বলেন, পার্বত্য এলাকা বান্দরবানের মানুষ এখন আগের চেয়ে কম ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়। এই এলাকায় শতভাগ কীটনাষকযুক্ত মশারি দেয়া হয়েছে। ২০১৭ সালে বান্দরবানে ম্যালেরিয়া রোগে একজনের মৃত্যু হয়েছিল। চলতি এ বছর এখনো কারও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।
সামগ্রিক বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) প্রফেসর ডা. সানিয়া তাহমিনা বলেন, ম্যালেরিয়া মশা বাহিত রোগ। বাহকবাহিত যে কোন রোগ সম্পূর্ণ নির্মূল করা কঠিন। এক্ষেত্রে ধৈর্য্য ধরতে হবে। ব্যবস্থাপনা যত কার্যকর হবে পরিস্থিতি ততোই উন্নত হবে। ম্যালেরিয়া নির্মূলের লক্ষ্যে কাজ করছি। আমরা এই দৌড়ে শেষ পর্যায়ে আছি। সফল হতে এক্ষেত্রে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়া নির্মূলে আমরা বদ্ধপরিকর। গত ছয় বছরে মৃত্যুর হার উঠা-নামা করলেও আক্রান্তের হার প্রায় ৫৪ শতাংশ কমেছে। এটা আমাদের জন্য খুবই আশাব্যাঞ্জক।

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর