Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫, ১০ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

কালবৈশাখি ঝড়বৃষ্টি দুর্ভোগে নগরবাসী

সায়ীদ আবদুল মালিক | প্রকাশের সময় : ৩০ এপ্রিল, ২০১৮, ১২:০০ এএম

রাজধানীতে বৃষ্টি মানেই পানিবদ্ধতা-যানজট। স্যুয়ারেজ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ায় সামান্য বৃষ্টিপাত হলেই রাজপথ ও অলি-গলিতে পানি জমে যায়। এ পানিতে ছড়িয়ে পড়ে বিপুল পরিমান বর্জ্য। এতে নাগরিকরা পড়েন চরম দুর্ভোগ-বিড়ম্বনায়। পানি জমতে যে সময় লাগে, তার থেকে বেশি সময় লাগে সরতে। নগরবাসীর অভিযোগ, ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ ব্যবস্থাপনার দূর্বলতাই এর মূল কারণ। তারা বলছেন, বহু বছর ধরে এ সমস্যা চলতে থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যাপারটি আমলে নিচ্ছে না। দুই সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন সড়কে চলছে উন্নয়ন খোঁড়াখুঁড়ির কাজ। খানাখন্দক ও খোঁড়াখুঁড়ির গর্তে বৃষ্টির পানি জমে একাকার হয়ে আছে। কোথয় সমতল আর কোথায় খানাখন্দক তা বুজার উপায় নেই। এ সব সড়কে প্রতিদিন অহরহ ছোট বড় দুর্ঘটনা ঘটেই চলছে। গতকালের টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে জনগণ অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, স্যুয়ারেজ লাইনের এ দুর্বস্থা থেকে উদ্ধার পেতে ও সড়কে মাসের পর মাস উন্নয়ন কাজ দ্রæত শেষ করার জন্য বারবার জানানোর পরও ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এবং ঢাকা ওয়াসা আশ্বাস ছাড়া আর কিছুই দিতে পারছে না। দুই সিটি কর্পোরেশন ও ওয়াসা অফিসে বহু অভিযোগপত্র জমা পড়েলেও এর কোন প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি রাজধানী ঢাকাকে শতভাগ পয়ঃনিষ্কাশনের আওতায় আনার জন্য ২০১২ সালে ঢাকা ওয়াসা যে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল, তাও মুখ থুবড়ে বড়েছে বলে জানা গেছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলাল ইনকিলাববে বলেন, ঢাকা শহরের পয়ঃনিষ্কাষণের প্রধান দায়িত্ব ওয়াসার। কারণ ঢাকা শহর থেকে বড় অংকে পানি নিষ্কাশনের মাধ্যম স্যুয়ারেজের দায়িত্ব তাদের কাছে। আমাদের কাছে শুধু মাত্র কিছু ছোট খাট ড্রেনের দায়িত্ব।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, যেখানে সেখানে খোঁড়াখুঁড়ি আর অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকান্ডের কারণে নগরবাসীর দুর্ভোগ যেন বেড়েই চলছে। তবে এ দুর্ভোগ লাঘবে সংশিষ্টদের কোনো তৎপরতাও চোখে পড়ে না। দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কার কাজ হচ্ছে না। আবার কোন কোন এলাকায় পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থাও নেই। যে কারণে সামান্য বৃষ্টি হলেই রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি সর্বত্রই পানিতে ডুবে যায়। রাজধানীর ডিএনডি বাঁধসহ বহু এলাকায় একটু বৃষ্টি হলেই হাঁটু পানি জমে যায়। এতে বৃষ্টির পানি জমে থাকে দিনের পর দিন। হাঁটু পানিতেই চলাচল করতে হয় ওইসব এলাকার মানুষকে। পুরান ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা সবচেয়ে অপ্রতুল। হালকা বৃষ্টি হলেই ড্রেন ভরে রাস্তায় জমে যায় পানি। দুর্গন্ধযুক্ত ও পচা পানিতেই চলতে হয়ে পুরান ঢাকাবাসীকে। একই অবস্থা রাজধানীর অন্যান্য এলাকারও।
গতকাল রোববার সকাল ৮টার দিকে আকাশ আঁধার কালো করে রাজধানীতে ধেয়ে আসে কাল বৈশাখী ঝড়। আবহাওয়া অফিস থেকে জানা গেছে, ঝড়ের সময় বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৭৩ কিলোমিটার। সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ঢাকায়। আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেন, ঝড়-বৃষ্টির এই প্রবণতা চলবে আরও কয়েক দিন।
সকালের ভারি বর্ষণের পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ও সড়কে পানি জমে সৃষ্টি হয় চরম দুর্ভোগের। মিরপুরে মেট্রোরেলের কাজ চলছে গত প্রায় এক বছরেরও বেশি সময়। এ কারণে সড়কে গাড়ি চলার জায়গা কমে গেছে। তার মধ্যে পানিবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় ১০ নম্বর থেকে ফার্মগেটমুখী সড়কে দেখা যায় ব্যাপক যানজট। অনেক গাড়িকে মিরপুর ১ নম্বর ঘুরে ফার্মগেইটের দিকে যেতে দেখা যায়। পশ্চিম রাজারবাজার, ইন্দিরা রোডের বিভিন্ন সড়কে দেখা যায় নালা থেকে উপচে ময়লা পানিতে রাস্তা সয়লাব হয়ে আছে। জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার পূর্বপাশের রাস্তা, চন্দ্রিমা উদ্যানের মুখে এবং জাহাঙ্গীর গেট এলাকার সড়কের এক প্রান্তেও পানিবদ্ধতা দেখা যায়।
পশ্চিম রাজাবাজার এলাকার বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম বলেন, গত কয়েক মাস ধরে রাস্তায় কাজ চলতে দেখেছি। নতুন নতুন পাইপ বসাচ্ছে। রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িতে ভোগান্তি হলেও ভাবছিলাম এবার বুঝি পানিবদ্ধতা থেকে মুক্তি মিলবে। কিন্তু অবস্থা তো আগের মতই। বৃষ্টি হলেই পানি জমছে।
দুপুরের দিকে ফার্মগেইট থেকে কারওয়ান বাজারে যাওয়ার সড়কেও বিভিন্ন অংশে পানি জমে থাকতে দেখা যায়। ওই সময় শুক্রবাদ এলাকাতেও রাস্তায় পানি ছিল বলে জানান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী ফাতেমা ইসলাম। আজিমপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে পলাশীমুখী সড়ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়ামের সামনের সড়ক, তেজগাঁও সাতরাস্তা থেকে মহাখালীগামী সড়কের বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে ছিল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত। নাবিস্কো এলাকায় পানির কারণে যান চলাচলের জায়গা কমে আসায় সৃষ্টি হয় যানজট।
এদিকে বিমানবন্দর সড়কের এমইএস বাসস্ট্যান্ড ফ্লাইওভারের মুখে, বনানী কবরস্থান, আর্মি স্টেডিয়ামের সামনের সড়কে একাংশে পানি জমে থাকতে দেখা যায় দুপুর পর্যন্ত। বুদ্ধ পূর্ণিমার সরকারি ছুটি থাকায় গতকাল রোববার সকালে এমনিতে রাস্তা ছিল মোটামুটি ফাঁকা, লোকজন বের হয়েছে কম। তবে যারা বের হয়েছেন তারা পড়েছেন যানবাহন স্বল্পতায়। ইব্রাহিমপুরের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মতিউর রহমান বলেন, সারা বছরই রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চলে। কিন্তু পানিবদ্ধতার কোন সমাধান হয় না, বৃষ্টি হলেই আমরা সমস্যায় পড়ি। এর কি কোনো প্রতিকার নাই। যোগাযোগ করা হলে ঢাকা ওয়াসার ড্রেনেজ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, বৃষ্টির পর কিছু এলাকায় সড়কে পানি জমার খবর তারা পেয়েছেন। তবে সেটা ‘খুব বেশি’ নয়।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম বলেন, সকালে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে নিচু এলাকায় পানি জমেছিল। বৃষ্টি থামার পরপরই আমাদের ইমার্জেন্সি রেন্সপন্স টিম মাঠে নেমেছে। তারা ম্যানহোলগুলোর ঢাকনা খুলে দিয়ে পানি নিষ্কাশনে সহযোগিতা করেছেন। এ কর্মকর্তার ভাষ্য মতে, অনেক এলাকায় ময়লা আবর্জনা ও পলিথিন জমে ম্যানহোলের ফাঁকা স্থানগুলো জ্যাম হয়ে পড়েছে। এ কারণে পানি সরতে সমস্যা হয়। আমরা সেগুলো অপসারণ করে দিয়েছি।
তবে ডিএসসিসি’র এই কর্মকর্তার এমন বক্তব্যের প্রতিফলন গতকাল দুপুর পর্যন্ত চোখে পড়েনি। দুপুরের দিকেও ঢাকার বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকতে দেখা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর পানিবদ্ধতা নিরসনে প্রতি বছর শত কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। এ বছর সড়ক, ফুটপাত ও সারফেস ড্র্রেন নির্মাণে ১৯৩ কোটি টাকা ব্যয় ধরেছে ডিএসসিসি। ইতোমধ্যে প্রায় সব টাকা খরচ করেছে এই সংস্থা। কিন্তু আসন্ন বর্ষা মৌসুমে পানিবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনও সম্ভাবনা দেখছেন না নগরবাসী। সিটি কর্পোরেশনের পাশাপাশি ঢাকা ওয়াসাও নিজস্ব ড্রেন পরিষ্কারের পেছনে ব্যয় করা হয় বড় অংকের টাকা। কিন্তু পরিস্থিতির কোনও উন্নতি হয় না।
জানা গেছে, গত প্রায় ৫০ বছরেরও বেশি সময় আগে রাজধানীর মাত্র ৩০ শতাংশ এলাকায় স্যুয়ারেজ লাইন স্থাপন করা হয়েছে। এ সব লাইনের বেশিরভাগই এখন অকেজো। কর্তৃপক্ষ যেখানে লিকেজ পাচ্ছে, সেখানে সংস্কারের চেষ্টা করছে। স্যুয়ারেজ লাইন স্থাপনের একটি মহাপরিকল্পনা ২০১২ সালে ওয়াসা নেয়। কিন্তু অত্যন্ত ধীরগতি ও পরিকল্পনা মাফিক কাজ না হওয়ায় এ প্রকল্পও অনেকটা মুখ থুবড়ে পড়াছে।
তৎকালীন সময় প্রায় ১৩ হাজার ১২০ কোটি টাকা (১৬০ কোটি ডলার) ব্যয়ে ডেনমার্কের গ্রন্টমিজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ঢাকা ওয়াসার অধীনে প্রায় ৪০০ বর্গকিলোমিটার রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ও ঢাকা মহানগর উন্নয়ন পরিকল্পনা (ডিএমডিপি) অঞ্চলের মোট ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার আওতায় আনার এ মহাপরিকল্পনা তৈরি করে।
রাজধানী পুরান ঢাকার ইসলামবাগ এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ রাজন খান বলেন, এ এলাকার ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ লাইনের ত্রæটির জন্য প্রতিনিয়তই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে আমাদের। বেশি বৃষ্টি লাগে না, হালকা বৃষ্টিই যথেষ্ট হাঁটু পানি হওয়ার জন্য। ড্রেন দিয়ে তো পানি যায়-ই না, বরং ড্রেনের ময়লা ওই পানির সঙ্গে মিশে যায়। স্যুয়ারেজ লাইনের ঢাকনা খুলে রাখলেও পানি যায় না, বরং মল-মূত্র ভেসে ওঠে।
তিনি আরও বলেন, একবার পানি জমলে পানি নামতে কয়েকদিন লেগে যায়। দুর্গন্ধে এলাকা দিয়ে চলাচল তো দূরের কথা, বাড়িতেও নাক চেপে থাকতে হয়। বিশেষ করে গলির ভেতরের বাসিন্দাদের খুবই সমস্যা হয়। রাস্তার চাপ কলের পানিতেও ড্রেন-স্যুয়ারেজের ময়লা চলে আসে। এ ব্যাপারটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সমাধান চাইলেও এখন পর্যন্ত দুর্ভোগ কমেনি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনকে জানালেও তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
কুড়িলের বাসিন্দা মোহাম্মদ আব্দুর রহিম বলেন, এই এলাকায় বৃষ্টি হলে বন্যার মতো আবস্থা হয়ে যাওয়া সাধারণ ঘটনায় দাঁড়িয়েছে। চল্লিশ বছরের ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ লাইন পুরোপুরি অকেজো। একবার পানি উঠলে সপ্তাহখানেকের আগে নামে না। অপবিত্র পানির জন্য বাসা থেকে বের হতে পারি না। আজান দিলে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তে পারি না। শুধু আমি কেন, এলাকার কেউই মসজিদে যেতে পারেন না। তার ওপর এ ময়লা পানি যদি মসজিদের সীমানা পর্যন্ত চলে যায় তাহলে পবিত্রতা কীভাবে রক্ষা হয়।
এ ছাড়াও ভারি বর্ষণের দিনগুলোতে দেখা যায়, বৃষ্টির ফলে রাস্তায় পানি উঠে যাওয়ায় যাত্রাবাড়ী, শনিরআখড়া, রায়েরবাগ, জুরাইনসহ বেশকিছু এলাকার শিক্ষার্থীরা জুতা হাতে নিয়ে হাঁটু সমান পানি পার হয়ে বিদ্যালয়ে হয়। কুড়িলে তো ছোট ছোট পথশিশুরা এই ময়লা পানিতেই সাঁতার কাটে। ###



 

Show all comments
  • বিপ্লব ৩০ এপ্রিল, ২০১৮, ২:৩৯ এএম says : 0
    পানিবদ্ধতা নিরাসনে সিটি কর্পোরেশনগুলো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
    Total Reply(0) Reply
  • কাসেম ৩০ এপ্রিল, ২০১৮, ২:৩৯ এএম says : 0
    প্রতি বছর একই ভোগান্তি আর কত সইতে হবে ?
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ