Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ০৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে শবে বরাত

মুফতি মুহা :আবু বকর বিন ফারুক | প্রকাশের সময় : ৪ মে, ২০১৮, ১২:০০ এএম


 শেষ \

দলীল নং : ৪ : সিহাহ্ সিত্তার অন্যতম হাদীসগ্রন্থ জামে তিরমিজি শরীফ ১ম খÐ, ৯২ পৃষ্ঠায় একটি অধ্যায় রয়েছে, যার নাম “বাবু মাযা ফি লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান” সেখানে হযরত উম্মুল মোমেনীন হযরত আয়েশা ছিদ্দিকা (রাঃ) হতে বর্ণিত: তিনি বলেন- এক রজনীতে আমি দয়াল নবী রাসূলে পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে বিছানায় পেলাম না। এই জন্য তাঁর সন্ধানে বেরিয়ে পড়লাম। তারপর আমি জান্নাতুল বাকীতে গিয়ে নবীজিকে আকাশের দিকে মাথা উঠানো অবস্থায় দেখতে পেলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, হে আয়েশা! তুমি কি এ ধারণা করছ যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তোমার উপর অবিচার করেছেন? হযরত আয়েশা ছিদ্দিকা রাদ্বিয়াল্লাহ আনহা বললেন; আমি এমন ধারণা করিনি, ভেবেছিলাম আপনি আপনার অন্য কোন বিবির নিকট গমন করেছেন। তখন নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফরমালেন নিশ্চয় আল্লাহ পাক শাবান মাসের ১৫ তারিখের রাত্রে প্রথম আকাশে তাজাল্লী ফরমান- অত:পর তিনি (আল্লাহ) বনী কালব গোত্রের:মেষের পশম সমূহের চেয়েও বেশী লোকের গুনাহ ক্ষমা করেন।” উল্লেখ্য যে, এই বনী কালব এর মেষের সংখ্যা ছিল ৩০,০০০। {তথ্য সূত্র: (১).মুসনাদে আহমদ, খÐ-১৮, পৃষ্ঠা-১১৪, হাদীস নং-২৫৯৬, মোট ২১ টি হাদীস রয়েছে।(২).মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা, খÐ-১০, পৃষ্ঠা-৪৩৮, হাদীস নং-৯৯০৭।
দলীল নং : ৫ : শেরে খোদা হযরত আলী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে মারফু মুত্তাছিল সনদে রেওয়ায়েত করা হয় যে, আল্লাহ হাবীব নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ ফরমান- যখন শাবানের ১৫ তারিখের রাত্র আগমন করে তখন তোমরা রাত্র জাগরণ করতঃ মহান আল্লাহ তায়ালার এবাদত বন্দেগী কর এবং এর পূর্ববর্তী দিনে (১৫ তারিখে) রোজা পালন কর। কেননা চৌদ্দ তারিখের সূর্য অস্থ যাওয়া তথা ১৫ তারিখের রাত্র আরম্ভ হওয়ায় সাথে সাথে মহান আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার আসমানে স্বীয় তাজাল্লী প্রকাশ ফরমান। অর্থাৎ দুনিয়া বাসীর প্রতি বিশেষ রহমতের দৃষ্টি দান করতঃ দয়াপূর্ণ কুদরতী আওয়াজে আহ্বান করে থাকেন। আমার বান্দাদের মধ্যে কেউ আজকের এ পবিত্র রাত্রে আমি আল্লাহ দরবারে নিজের কৃত পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছ কি? আমি তোমাদের ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছি। রুজি-রিজিক চাওয়ার আছ কি? আমি তোমাদের চাহিদা অনুপাতে রিজিক দানের ফয়সালা করে দিব। কোন বিপদগ্রস্থ লোক বিপদ মুক্তির জন্য প্রার্থনাকারী আছ কি? আমি তোমাদের বিপদ দূরীভূত করে দিব। এমন আরো বিষয়ে কেউ প্রার্থনাকারী আছ কি? আমি তা সবই তোমাদেরকে দান করব। মহান আল্লাহ তায়ালার এরূপ করুনাপূর্ণ ঘোষনা সুবহে সাদিক পর্যন্ত চলতে থাকে। {তথ্য সূত্র: (১). ইবনে মাজাহ শরীফ, পৃষ্ঠা-১০০। (২),মিশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা-১১৫।
দলীল নং : ৬ : হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, শাবানের মধ্যবর্তী রাত তথা শবে বরাত যখন আগমন করে তখন মহান আল্লাহ তায়ালা রহমতের তাজাল্লী ফরমান এবং তিনি তার সমস্ত বান্দাদেরকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু মুশরিক বা মুসলমান ভাইয়ের প্রতি বিদ্বেষপোষণকারীকে ক্ষমা করেন না। {তথ্য সূত্র: (১).বাজ্জার, খÐ-১, পৃষ্ঠা-৯৩।(২).বায়হাকী শরীফ, খÐ-৩, পৃষ্ঠা-৩৭৮।
দলীল নং : ৭ : হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)থেকে বণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন, শাবান মাসের মধ্যবর্তী রাতে মহান আল্লাহ রহমতের ভান্ডার নিয়ে তার সকল সৃষ্টির প্রতি এক বিশেষ ভূমিকায় অবতীর্ণ হন এবং এ রাতে হিংসুক ও হত্যাকারী ব্যাক্তি ছাড়া সকলকে ক্ষমা করে দেয়া হয়। {তথ্য সূত্র: (১). মুসনাদে আহমদ, খÐ-৬, পৃষ্ঠা-২৩৮, হাদীস নং-১৬৪২।}
ইসলামী মণীষাতের বক্তব্য : বড়পীর হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বলেন- আল্লাহ পাক এরশাদ করেন- হা-মী-ম প্রকাশ্য মহাগ্রন্থ আল কোরআনের শপথ- যে কোরআনকে আমি মুবারক (বরকতময়) রাতে নাযিল করেছি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)এর তাফসীর প্রসংগে বলেন- কিয়ামত পর্যন্ত যা হওয়ার আছে- তা আল্লাহ পাক ফয়সালা করে দিয়েছেন। শপথ উজ্জল প্রকাশ্য গ্রন্থ তথা কোরআনের যাকে আমি বরকতময় রাতে অর্থাৎ শাবান মাসের মধ্যবর্তী রজনীতে নাযিল করেছি- ঐ ১৫ শাবানের রাতটি হচ্ছে লাইলাতুল বরাআত- এবং অধিকাংশ মোফাসসিরীনে কেরাম এ মত পোষণ করেছেন। (গুনিয়াতুত্ত্বালেবীন, খÐ-১, পৃষ্ঠা-৬৮৪। আরো আলোচনা ১৮৭ পৃষ্টায় রয়েছে।)
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী, ইমাম সবুকীর (রঃ) থেকে নকল করে বলেন, উক্ত শবে বরাতের রাত্রে বান্দার সারা বৎসরের গুনাহ মাফের বদলা হয়ে যায়। শুক্রবার রাত্রের ইবাদত সাপ্তাহিক গুনাহ মাফের বদলা এবং শবে ক্বদরের রাত্রের ইবাদত সারা জিন্দেগীর গুনাহ মাফের বদলা হয়ে যায়। এই জন্যই এ রাত্রসমূহে আল্লাহ নৈকট্য লাভের আশায় জাগ্রত থেকে ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে গুনাহ মাফের উছিলা হয়ে যায়। তাই এ রাত্র সমূহকে গুনাহ মাফের উছিলা বলা হয়। (মুকাশাফাতুল কুলুব, পৃষ্ঠা-৬৪০)
ফিকহে হানাফীঃ আল্লামা শামী, ইবনে নুজাইম, আল্লামা শরমবুলালী, শাইখ আব্দুল হক দেহলভী, মাওলানা আব্দুল হক লাখনভী, মুফতী মুহাম্মদ শফী, মুফতী তাকী উসমানীসহ উলামায়ে হানাফীয়া মতামত হল, শবে বরাতে শক্তি সামর্থ্য অনুযায়ী জাগ্রত থেকে একাকীভাবে ইবাদত করা মুস্তাহাব। তবে এর জন্য জামাআত বদ্ধ হওয়া যাবে না। ( আদ-দুররুল মুখাতার, খÐ-২ খন্ড, পৃষ্ঠা-২৫।
ফিকহে শাফেয়ীঃ ইমাম শাফেয়ী ( রহমতুল্লাহি আলাইহি )-এর মতে, শাবানের ১৫তম রাতে অধিক অধিক দুআ কবুল হয়ে থাকে। ( কিতাবুল উম্ম, খÐ-১ম, পৃষ্ঠা-২৩১)
ফিকহে হাম্বলীঃ শাইখ ইবনে মুফলী হাম্বলী ( রহমতুল্লাহি আলাইহি ), আল্লামা মনসুর আল বাহুতী, ইবনে রজর হাম্বলী প্রমুখ হাম্বলী উলামায়ে কেরামের মতে শবে বরাতে ইবাদত করা মুস্তাহাব। ( আল মাবদা, খÐ-২, পৃষ্ঠা-২৭, কাশফুল কিনা, খÐ-১, পৃষ্ঠা-৪৪৫)
ফিকহে মালেকীঃ ইবনে হাজ্ব মালেকী ( রহমতুল্লাহি আলাইহি) বলেন, সালফে সালেহীনগণ এ রাতকে যথেষ্ট সম্মান করতেন এবং এর জন্য পূর্ব থেকে প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। ( আল মাদখাল, খÐ-১ম, পৃষ্ঠা-২৯২)
ইবনে তাইমিয়ার অভিমতঃ লা-মাজহাবী ও খালাফী সম্প্রদায়ের অন্যতম ইমাম, আব্দুল আব্বাস আহমেদ ইবনে তাইমিয়া বলে, পনেরো শাবানের রাতের ফজীলত সম্পর্কে একাধিক মারফু হাদীস ও আসারে সাহাবা বর্ণিত রয়েছে। এগুলো দ্বারা এ রাতের ফজীলত ও মর্যাদা প্রমাণিত হয়। সালফে সালেহীনদের কেউ কেউ এ রাতে নফল নামাজের ব্যাপারে যতœবান হতেন। আর শাবানের রোযার ব্যাপারে তো সহীহ হাদীসসমূহই রয়েছে। (ইকতিযাউস সিরাতুল মুস্তাকিম, খÐ-২য়, পৃষ্ঠা-৬৩১)
আশরাফ আলী থানবীঃ কাওমী ও তাবলীগ সম্প্রদায়ের অন্যতম মুরুব্বী আশরাফ আলী থানবী বলে, ‘লাইলাতুল মুবারাকাহ’ বলতে গিয়ে বলেন, কেউ কেউ লাইলাতুল মুবারাকাহ এর ব্যাখ্যা লাইলাতুল বরাত করেছেন। এর কারণ এই যে, বিভিন্ন বর্ণনায় এ সম্পর্কেও বার্ষিক ঘটনাবলীর সিদ্ধান্তের বিষয় এসেছে। (তাফসীর বয়ানুল কুরআনে, খÐ-২, পৃষ্ঠা-৯৯।)
কবর যিয়ারত : এ রাত্রে আপনজন যারা কবরে তাদের কবর যিয়ারত করবেন। স্ব স্ব এলাকার আওলিয়ায়ে কেরাম, বুজুর্গানে দ্বীনদের মাজার যিয়ারত করা অতি উত্তম। এতে ফয়েজ ও বরকত হাসেল হয়। তবে হ্যাঁ কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সারা রাত্র ব্যয় করে দেওয়াটা বোকামী। যেহেতু সুন্নত আদায়ের লক্ষ্যে আয়ত্বের ভিতরে নিকটতম মাজার শরীফ ও কবর জিয়ারত করলে আদায় হয়ে যায়। কেনান, প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে মা আয়েশা সিদ্দিকা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)শা’বানের ১৫ তারিখের রাতে জান্নাতুল বাকীতে মোনাজাতরত অবস্থায় পেয়েছেন। (“জামে তিরমিজি” ১ম খন্ড ৯২ পৃষ্ঠা, “মুসনাদে আহমদ” ১৮তম খন্ড, পৃ.-১১৪, হাদীস নং-২৫৯৬। “মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা” ১০ম খন্ড, পৃ.-৪৩৮, হাদীস নং-৯৯০৭।)
তাহলে আমাদেরকে শবে বরাত পালন করতে হবে হবে। আল্লাহ তা’আলা সকলকে সঠিক বিষয়টি বুঝার তাওফিক দান করুক। আমীন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর