Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ০৬ কার্তিক ১৪২৬, ২২ সফর ১৪৪১ হিজরী

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বেনজির যানজট

| প্রকাশের সময় : ১৫ মে, ২০১৮, ১২:০০ এএম

অর্থনীতির লাইফলাইন বলে পরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক যানজটে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। এই মহাসড়কে যানজট নতুন না হলেও গত কয়েকদিনে তা তীব্র আকার ধারণ করছে এবং অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। চট্টগ্রামের সীতাকুÐ থেকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের দূরত্ব ১২০ কিলোমিটার। এই ১২০ কিলোমিটারে যানজট এতই প্রকট যে, ঘণ্টার পর ঘণ্টায় গাড়ী এক ইঞ্চিও নড়ে না। ঢাকা-চট্টগ্রাম চার-পাঁচ ঘণ্টার রাস্তা। অথচ যাতায়াতে পার হয়ে যাচ্ছে ১৭-১৮ ঘণ্টা, কখনো ২৪ ঘণ্টা। ফেনীর মহিপাল থেকে ফতেপুর তিন কিলোমিটার। এই তিন কিলোমিটার রাস্তা পার হতেই লাগছে ১০-১২ ঘণ্টা। স্বাভাবিক ও নজিরবিহীন এই যানজটের কারণে যাত্রী সাধারণের কষ্ট ও দুর্ভোগের সীমা-পরিসীমা থাকছে না। শিশু, নারী ও বৃদ্ধাযাত্রীদের যাতনা-বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে সবচেয়ে বেশী। খাদ্য ও পানির সংকট এবং প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার ন্যূনতম কোনো সুযোগ না থাকায় যাত্রী সাধারণের অবস্থা কী দাঁড়াতে পারে, সহজেই অনুমেয়। মহাসড়কজুড়েই এক অমানবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ওদিকে, কেনা জানে, এই মহাসড়কটি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক। সওজের হিসাবে এ মহাসড়কে প্রতিদিন ২৫ হাজার গাড়ি চলাচল করে। টোলপ্লাজার হিসাবে, এ সংখ্যা ৩০ হাজার। এই ২৫-৩০ হাজার গাড়ীর ৬০ শতাংশেই পণ্যবাহী। দেশের আমদানি-রফতানিপণ্যের প্রায় তিন চতুর্থাংশই পরিবাহিত হয় এ মহাসড়ক দিয়ে। সামনে রমজান মাস। স্বভাবতই আমদানি করা পণ্যের পরিবহন আগের যে কোনো সময়ের এখন বেশী। পণ্যপরিবহন বিলম্বিত হওয়ার কারণে পণ্যমূল্যে তার ব্যাপক বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। অপরপক্ষে রফতানির পণ্য যদি ঠিক সময়ে বন্দরে পৌঁছুতে না পারে তবে জাহাজীকরণে বিলম্ব ও বিড়ম্বনা সৃষ্টি অসম্ভব নয়। তাতে ব্যবসায়ীদের অবধারিত ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে। বহু আগের এক হিসাব থেকে জানা যায়, যানজটের কারণে এই মহাসড়কে টাকার অংকে প্রতিদিন সাকুল্যক্ষতি হয় ২৭৪ কোটি টাকা। বলা বাহুল্য, সে ক্ষতি ইতোমধ্যে ৩০০ কোটি টাকা ছড়িয়ে গেছে।
ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে যাতায়াত সহজ, মসৃণ ও গতিশীল করার লক্ষ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চারলেনে উন্নীত করার প্রকল্প নেয়া হয়েছিল। অনেক বিলম্বে হলেও সে প্রকল্পের বাস্তবায়ন হয়েছে। কিন্তু জনদুর্ভোগ, যানজট, আর্থিক ক্ষতি কমেনি। বরং বলতে গেলে, সবকিছুই বেড়েছে। দু:খ এই যে, আমরা আকাশে চলে যাচ্ছি এবং এ নিয়ে উৎসব করছি অথচ ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে যেতে কিংবা চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসতে পারছিনা সহজে; এজন্য ২৪ ঘণ্টা রাস্তায় থাকতে হচ্ছে। এটা আমাদের সড়ক বিভাগ, সড়ক বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সড়ক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের চরম ব্যর্থতা বললেও কম বলা হয়। শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক নয়, দেশের সব সড়ক-মহাসড়কের ব্যাপারেই এই ব্যর্থতা দৃশ্যমান। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজটের প্রধান কারণ ফেনীর ফতেপুরে নির্মাধীন রেলওয়ে ওভারপাস। টোলপ্লাজায় সময়ক্ষেপন এবং রাস্তায় চাঁদাবাজি এর দ্বিতীয় কারণ। বিগত পাঁচ বছর ধরে ফতেপুরে রেলওয়ে ওভারপ্লাস নির্মিত হচ্ছে। ২০১২ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের কাজ দু’বছরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই ২০১৮ সালে এসেও তা শেষ হয়নি। চারলেনের মহাসড়ক এই এলাকায় এসে আধা কিলোমিটার সিঙ্গেল লেনে পরিণত হয়েছে। বিপুল সংখ্যক গাড়ি সিঙ্গেল লেন দিয়ে যাতায়ত করতে গিয়ে যানজটের শিকার হচ্ছে। কিছুদিন আগেও মহাসড়কে চলাচলকারী গাড়িগুলো ফতেপুর এলাকার এসে ফেনী শহরের ভেতর দিয়ে যাওয়া সড়কটি ব্যবহার করতে পারতো। এখন সড়কটির ভেঙ্গেচুরে এমন অবস্থা হয়েছে যে, তা ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। সড়ক-মহাসড়কে কোনো অন্ডারপাস, ওভারপাস কিংবা ফ্লাইওভার নির্মাণ করতে হলে আগে বিকল্প যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে নিতে হয়। ফতেপুর রেলওয়ে ওভারপাস নির্মাণের ক্ষেত্রে এ ধরনের বিকল্প যাতায়াতের বন্দোবস্ত করা হয়নি। যে সড়কটি বিকল্প হিসাবে কাজে লাগতে পারতো তার প্রতিও নজর দেয়া হয়নি। ফেনী শহরের ভেতর দিয়ে যাওয়া রাস্তাটি উন্নয়ন, সংস্কার ও সম্প্রসারণ করে ব্যবহার উপযোগী রাখা সম্ভব হলে যানজটের এই তীব্রতা ও ব্যাপকতা কখনোই দেখা দিতে পারতো না। ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেয়ায় এই মহাবিভ্রাট ও বিপত্তি দেখা দিয়েছে। উল্লেখ আবশ্যক যে, টোলপ্লাজায় অহেতুক সময়ক্ষেপণ এবং সড়কজুড়ে পুলিশের চাঁদাবাজি যানজট পরিস্থিতিকে অবনত করতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
চলমান যানজট পরিস্থিতির অবসানে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল। পরে অবশ্য সে ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। ধর্মঘট সংকটের কোনো সমাধান করতে পারবে না। সমাধান করতে হলে সংকটটি কোথায় তা নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। যেহেতু ফতেপুর রেলওয়ে ওভারপাসই মূল কারণ সুতরাং যতদ্রæত সম্ভব এই ওভারপাস নির্মাণ শেষ করতে হবে। জানা গেছে, ওভারপাসের আংশিক খুলে দেয়া হবে শিগগিরই। এটা ভাল খবর অবশ্য। যতদিন ওভারপাস প্রকল্পের কাজ শেষ না হচ্ছে, ততদিন ফেনী শহরের ভেতরকার সড়কটি বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করতে হবে। এ জন্য সড়কটি দ্রæত মেরামত, সংস্কার ও সম্প্রসারণ করতে হবে। রমজানের আগে সেটি সম্ভব নয়। ঈদ ও বর্ষার আগেই যাতে হয়, সেদিকে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি দিতে হবে, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে এই মহাসড়কটির ব্যবস্থাপনাগত উন্নয়ন সাধন করতে হবে। টোলপ্লাজা, চাঁদাবাজি বা দুর্ঘটনা যাতে যানজটের কারণ না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। অত্যন্ত পরিতাপজনক হলেও বলতে হচ্ছে, মহাসড়কটির বিভিন্ন অংশে ভাংচূর ও খানাখন্দের কারণে এমন অবস্থা হয়েছে যে, গাড়ী অতি সাধারণ গতিবেগেও চলতে পারেনা। অবিলম্বে মহাসড়কটির সার্বিক সংস্কারের পদক্ষেপ নিতে হবে। আশা করা যায়, এসব ব্যবস্থা ও পদক্ষেপ নেয়া হলে বিদ্যমান প্রায় অচলাবস্থা অনেকটাই কেটে যাবে। মহাসড়কে গাড়ি চলাচলে সম্ভবযোগ্য গতিশীলতা আসবে।

 

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: যানজট

৯ আগস্ট, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন