Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

রোজার গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্য

ড. মু হা ম্ম দ সি দ্দি ক | প্রকাশের সময় : ১৭ মে, ২০১৮, ১২:০০ এএম

ইন্ডিয়ার অভিনেতা ইরফান খান মন্তব্য করেছিলেন যে, জনগণের কুরবানি ও রোজা না করে আত্ম-পরীক্ষা, অন্তর্দশন করা উচিত। তিনি বলেন যে, ভেড়া-ছাগল কুরবানি না করে নিজের নিকটবর্তী কিছুকে কুরবানি করা উচিত। এ ধরনের মন্তব্যের পর অলইন্ডিয়া মুসলিম পারসনাল ল’ বোর্ডের সদস্য জাফর গিলাবী একে সমালোচনা করলেন। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ সংগঠনের সচিব মাওলানা খাত্রি বললেন, অভিনেতার উচিত নিজের ‘ক্যারিয়ার’- কাজের দিকে নজর দেয়া এবং উল্টাপাল্টা বক্তব্য না রাখা। 

মুসলিম হয়ে ইরফান খান কুরবানি ও রোজাকে নিরুৎসাহিত করেছেন। কুরআন-হাদিস, ইসলামী জীবন দর্শন না জানার ফলে এটা হয়েছে। রোজা তো কুরআন-হাদিসের নির্দেশে রাখা হয়। কুরআন বলে, ‘তোমরা যদি সঠিক বিষয় অনুধাবন করতে তাহলে তোমরা বুঝতে তোমাদের জন্য রোজা রাখাই অধিকতর মঙ্গলজনক। রমযানের মাস এ মাসেই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, যা মানব জাতির জন্য পুরোপুরি হিদায়াত এবং এমন দ্ব্যর্থহীন শিক্ষা সঙ্কলিত, যা সত্য-সঠিক পথ দেখায় এবং হক ও বাতিলের পার্থক্য সুস্পষ্ট করে দেয়। কাজেই এখন থেকে যে ব্যক্তি এ মাসেই সাক্ষাৎ পাবে তার জন্য এই সম্পূর্ণ মাসটিতে রোজা রাখা অপরিহার্য।’ (সূরা বাকারা : ১৮৪-১৮৫ আয়াত)।
এই যে নির্দেশ বিশ্বনবীর মাধ্যমে এসেছে তাকে অমান্য করবে একজন অভিনেতার কথা মান্য করে? তবে নবী (সা:)-এর সময় বদরযুদ্ধ ও মক্কা অভিযানের সময় রমজান মাস এলে, রোজা রাখতে হয়নি। কুরআন বলে, ‘আল্লাহ তোমাদের সাথে নরম নীতি অবলম্বন করতে চান, কঠোর নীতি অবলম্বন করতে চান না। (সূরা বাকারা : ১৮৫ আয়াত)
কিছু মুসলিম নেতা উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে বলে রোজা করতে নিষেধ করেন। তিউনিসিয়ার মরহুম প্রেসিডেন্ট হাবিব বারগুইবা অন্যতম। তার ফরাসি স্ত্রী তাকে এ ব্যাপারে উৎপাহিত করে থাকবেন। তাই বিবাহ শাদীর ব্যাপারে সাবধান হওয়া উচিত।
এদিকে চীন ও আরো কিছু দেম মুসলমানদের রোজা রাখতে দিচ্ছে না। অজানা ধর্মকর্মেও বাধা দিচ্ছে। চীনের সঙ্গে বিশ্বের মুসলমানরা সম্পর্ক বৃদ্ধিতে আগ্রহী। তবে এই আধা-কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ইসলামবিরোধী অবস্থান মুসলমানদের হতাশ করেছে। চীনের দেখাদেখি মিয়ানমারও মুসলিম নির্যাতন শুরু করেছে।
রোজার ধর্মীয়-আধ্যাত্মিক মঙ্গল ছাড়াও অন্যান্য মঙ্গল রয়েছে, বিশেষ করে দৈহিক। মার্ক ম্যাটিসন নামক এক ¯œায়ুতন্ত্র বিশেষজ্ঞ গবেষণা করে দেখেছেন যে, রোজা রাখলে রক্তের সুগার (চিনি) লেভেল (স্তর)-–এর উন্নতি হয়, হৃদরোগের আশঙ্কা কমে যায়, মস্তিষ্কের ¯œায়ু রোগগুলো অপসারিত হয়, যেমন আলজেইমার ও পারকিনসনস রোগ আর ব্যক্তির মন-মানসিকতা ও স্মৃতি বাড়ে।
বলা হয় যে, পেটের ভূড়ি কমাতে রোজা কার্যকরী উপায়। রোজা বয়স-বৃদ্ধি রোধ করে সুস্বাস্থ্য প্রদান করে।
যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘টি এইচ চান স্কুল অব পাবলিক হেলথ’ একটা গবেষণা করে রোজার ওপর যা ২০১৭ সালে ২৬ অক্টোবর ‘সেল মেটাবলিজম’ নামে প্রকাশিত হয়। মানবদেহের সেলে খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করে কিভাবে পরিবর্তন হয় তা এই গবেষণায় পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে দেখা যায় যে, এই উপবাসে জীবন-প্রবাহ বৃদ্ধি পায়, স্বাস্থ্য উন্নত হয়। হার্ভার্ডের চান স্কুলের জেনেটিকস অ্যান্ড কমপ্লেক্স ডিজিজেজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক উইলিয়াম নেয়ার বলেন, ‘যদিও পূর্ববর্তী গবেষণা প্রতিপন্ন করেছে কিভাবে সবিরাম রোজা (ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং) বৃদ্ধত্বকে ¯øথ করে, আমরণ এখন সবেমাত্র বুঝতে পারছি এবং আন্তর্নিহিত জীববিজ্ঞানের বিষয়টি।.... যখন আপনি আপনার খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করেন কিছু সময়ের জন্য, এতে শরীরের বিশাল মঙ্গল হয়। যেমনÑ ওজন হ্রাস, ক্রনিক ব্যাধি থেকে রক্ষা, দেহের সেলের মেরামত সংস্কার স্মৃতিশক্তির উন্নতি এবং মস্তিষ্কের ক্ষমতা বৃদ্ধি।’ মোট কথা রোজাতে শরীরের সেলসমূহের মেরামত হয় এবং শরীর ত্রæটিপূর্ণ টিসুকে শোষিত করে।
সবিরাম উপবাস পাশ্চাত্যে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে। এর নাম ‘ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং’ যেমন সারাদিনে একবার আহার, অথবা একদিন পরপর খাদ্য গ্রহণ। ওয়েব পেজ, বøগ ও বইপুস্তকে ব্যায়াম ও খাদ্য বিশারদগণ এই ব্যবস্থা প্রচার করে চলেছেন অন্যান্য ধর্মের রোজার বিকল্প উপবাস দেখা যায়। হিন্দু ধর্মের রয়েছে উপবাস যেমন একাদশীর উপবাস। বিধবারা আবার বেশি উপবাস করে। সর্বজনীন উপবাস নেই। আর তাদের উপবাসে পানি ও অন্য কিছু আহার কই অনুমোদিত রোজার কথা আছে হযরত মুসা (আ:), হযরত ঈসা (আ:) অর্থাৎ যিশুখ্রিষ্ট যে চল্লিশ দিন ধরে রোজা করেছিলেন, তার উল্লেখ রয়েছে বাইবেলে। গাইবেল লেখে তিনি (নবী এলিজা বা এলিয়) উঠে ভোজন পান করলেন এবং সেই খাদ্যের প্রভাবে চল্লিশ দিবা-রাত্র গমন করে
ঈশ্বরের পর্বত হোরেরে উপস্থিত হলেন (১ রাজাবলি ১৯:৮)। নবীন এলিজা চল্লিশ দিন না খেয়ে রোজা রাখেন।
সেই সময়ে মুসা চল্লিশ দিবা-রাত্র সেখানে ঈশ্বরের সহিত অবস্থিতি করলেন, অন্নভোজন ও পানি পান করলেন না। আর তিনি সেই দুই পাথরে নিয়মের বাক্যগুলো অর্থাৎ দশ আজ্ঞা (টেন কমান্ড সেন্টস) লিখলেন। (এক সোডাস, ৩৪:২৮)।
আর ঐ মাসের চতুর্বিংশ দিনে ইসরায়েল-সন্তানরা উপবাস, চটপরিধান ও মস্তকে মাটি লাগিয়ে একত্র হলো। (নহিমিয় ৯:১)।
ইহুদিদের জন্য রোজার বিধান ছিল। তাই হযরত ঈসা (আ:) চল্লিশ দিন রোজা পালন করেছিলেন। এ যুগে খ্রিষ্টানরা বড় লম্বা ধরনের রোজা না করলে ‘লেন্ট’ নামক পর্বে রোজা রাখে, তবে প্রধানত খ্রিষ্টান পুরোহিতরা। ‘লেন্ট’ রোজা মূলত ক্যাথলিক খ্রিষ্টানরা পালন করে। ১৮ থেকে ৫৯ বছরের ক্যাথলিকরা এটা পালন করে এস ওয়েনেসডে ও গুড ফ্রাইডের দিনে। এটা করা হয় যিশুখ্রিষ্টের অত্মবিসর্জনের স্মরণে। এই উপবাসে কোনো কোনো স্থানে পশু থেকে প্রাপ্ত খাদ্যাবলি গ্রহণ নিষিদ্ধ, কেউ কেউ উপবাসে মাছ অথবা মাছ ও মুরগি আহার মান্যতা দেয় কেউ আবার ফল ও ডিম নিষিদ্ধ করে, আবার কেউ উপবাসে শুধু রুটি খাওয়ার অনুমোদন দেয়। তবে একজনকে উপবাস সময়ে একটা পূর্ণ আহার গ্রহণ অনুমোদন করা হয়। সামান্য কিছু প্রটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টান লেন্ট উপবাস পালন করে।
যিশুখ্রিষ্ট জন দি ব্যাপ্টিস্টের নিকট জর্ডান নদীতে দীক্ষা নিয়ে মরুভূমিতে চলে যান। সেখানে তিনি চল্লিশ দিন-রাত রোজা পালন করেছিলেন।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু মুসলিম দেশে রোজাকে রোজা না বলে অন্য শব্দ ব্যবহার করা হয়, যেমন মালয়েশিয়া, ব্রæনেই ও সিঙ্গাপুরে রোজাকে বলা হয় ‘পউসা’ যা সম্ভবত সংস্কৃত ‘উপবাস’ শব্দ থেকে এসেছে। ‘পউসা’ শব্দ ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডেও ব্যবহৃত হয়।
মউরুন ফিডলার নামক এক পর্যটক কাশ্মিরে মুসলমানদের সূর্যোদায় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা দেখে বিস্মিত হন। তিনি চমৎকার হন এই জেনে যে, রোজাদার পানি পর্যন্ত পান করেন না। রোজার ত্রিশ দিনে। তিনি মন্তব্য করেন ‘মুসলিম রোজা লেন্ট উপবাসকে ঈষদুষ্ণ (টেপিড) করেছে। তিনি আশ্চর্য হন জেনে যে, রোজাদার রোজার সময় যৌনকর্ম থেকে বিরত থাকে, পাপের কাজ করে না যেমন পরনিন্দা করা, গালি দেয়া, মিথ্যা বলা, মারামারি করা ইত্যাদি করে না রোজা থেকে। তিনি বলেন, ক্যাথলিকরা দিন দুপুরের সময় প্রথমবার আহার করে উপবাস থেকে, আর সপ্তাহে এক দিন উপবাস। কখনও কখন উপবাস থেকে দিনে দু’বার হালকা খাবার খায় তারা। আর পানি পান কোনো সমস্যাই নয়। আজকাল লেন্ট উপবাস সপ্তাহব্যাপী করা হয় না। ফিডলার মন্তব্য করেন, ‘আমাদের মুসলিম ভাই-বোন স্বর্গ-সুখে সুখী হোক রমজান মাসে এই কামনা আমি করি।’
লেখক : ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।

 



 

Show all comments
  • গনতন্ত্র ১৭ মে, ২০১৮, ৩:১৮ এএম says : 0
    জনগন বলছেন, “ সান – ২০১৮ “ ওহে মাহে রমজান আমার হৃদয়ে দাও সান, কালিমাচ্ছন্ন হৃদয়ে আমার ঘর বেঁধেছে শয়তান ৷ হারাম জিনিষ হালাল করতে সদায় করছে পেরেশান, নামাজ / রোজায় রোগের অজুহাত হৃদয়কে করতে চায় পাষান ৷ সম্পদের প্রতিযোগিতায় নামিয়ে র্দুনীতি / ঘুষ খাইতে বাধ্য করে আমায়, অধিক লাভের কুমন্ত্রনায় খাদ্যে ভেজাল বিবেক / মানবতা আজ গিয়েছে নর্দমায় ৷
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর