Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ০৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

আত্মশুদ্ধির রোজা ও মুসলমান

হো সে ন মা হ মু দ | প্রকাশের সময় : ১৭ মে, ২০১৮, ১২:০০ এএম

পবিত্র রমজান মুসলমানদের কাছে একটি মহিমান্বিত মাস। রোজা পালনের মাস রমজান। পবিত্র কোরআন নাযিল ও রোজার কারণে রমজান এ মহিমা অর্জন করেছে। প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানই অধীর আগ্রহে এ মাসটির জন্য অপেক্ষা করেন। সম্মানিত মাসের মর্যাদামÐিত রমজানকে বলা হয় আত্মশুদ্ধির মাস। এক মাসব্যাপী রোজা পালনের মধ্য দিয়ে মুসলমানরা আত্মশুদ্ধির এ সাধনায় নিয়োজিত হন। রোজাদাররা বিশ^জগতের প্রভু আল্লাহর অতি প্রিয়।
অল্প দু-একটি দেশ ছাড়া বিশ্বের সর্বত্রই আজ কম-বেশি সংখ্যায় ইসলাম অনুসারীদের বসবাস রয়েছে। বলা দরকার, আধুনিক পৃথিবী ক্রমেই সংযোগ ও সম্পর্কের পথ হেঁটে বিশ্বগ্রামের রূপ নিচ্ছে। এ বিশ্বগ্রামের প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে ইসলাম, মুসলমান, কোরআন ও ইসলামী সংস্কৃতি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি বিশ্বমানুষের জীবন ও কর্মে যেমন অনিবার্য প্রভাব ফেলছে; ইসলাম ও কোরআনও তেমনি ক্রমশ ব্যাপক সংখ্যক মানুষের চিন্তা-চেতনা ও ধর্মবোধকে প্রভাবিত করছে। এ প্রভাব এতটাই প্রবল যে, অত্যন্ত প্রতিক‚ল পরিস্থিতিও মুসলমানদের নামাজ আদায় ও রোজা পালন থেকে নিবৃত্ত রাখতে পারে না। বিশ্বের এমনও স্থান রয়েছে যেখানে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা কোনো দ্বিধা না করেই ২২ ঘণ্টা পর্যন্তও রোজা পালন করেন।
রমজান মাসে মুসলমানদের জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। এ সময় ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের দিকে যে কোনো সময়ের চেয়ে অধিক মনোযোগী হন। আমাদের দেশে রমযানে প্রতি ওয়াক্তের নামাজেই মসজিদে মুসল্লিদের উপস্থিতি বেড়ে যায়। রাতে তারাবির নামাজ পড়ার সময় মসজিদগুলো পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। অনেক জায়গায় প্রতি জুমার নামাজে মসজিদে স্থান সংকুলান না হওয়ায় মুসল্লিদের জামাত পার্শ্ববর্তী রাস্তা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এ থেকে রমযানের প্রতি মুসলমানদের সম্মান আর গুরুত্বারোপের প্রমাণ মেলে। রমজান মাসে বিশেষ করে মুমিন মুসলমানরা আল্লাহর ইবাদতে সর্বোচ্চ সাধ্য অনুযায়ী নিজেদের নিয়োজিত করেন। প্রকৃতপক্ষে রমজান মাসের আবহটি পুরোপুরিই প্রভুর কাছে বান্দার আত্মসমর্পণের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের। এ সময় আত্মশুদ্ধির আকাক্সক্ষায় নিবেদিত মুমিন বান্দার অস্তিত্বে জাগতিক স্বার্থ ও বিষয় চিন্তা একেবারেই গৌণ হয়ে যায়। বান্দার অন্তরের নিভৃতে তখন একটি ইচ্ছাই শুধু সার্বক্ষণিক নিবেদন হয়ে ধ্বনিত হয়Ñ তা হচ্ছে ইবাদত ও ইবাদত, মহান প্রভুর সন্তুষ্টি। তার হৃদয়ে শুধু গুঞ্জরিত হয়ে চলেÑ ‘ধায় যেন মোর সকল ভালোবাসা, প্রভু তোমার পানে, তোমার পানে, তোমার পানে।’
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মুমিন বান্দার নিবেদনের এই যে ব্যাপক প্রাবল্য, এটাই রমজান মাসে মুসলমানদের বৈশিষ্ট্য। একজন মুসলমানের ইবাদত একটি দিন বা মাসের বা বছরের জন্য নয়, তা সারা জীবনের। বিশেষ কোনো কারণ, যেমন রোগ, দুর্ঘটনায় অপারগ হয়ে পড়া ছাড়া এক মাসের রোজা পালনে কোনো রেয়াত নেই। বছরের অন্য এগারো মাসে ইবাদতের ক্ষেত্রে যদি কোনো শৈথিল্য ঘটেও থাকে, তা পূূরণের জন্য রমজান সর্বোৎকৃষ্ট সময়। ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম হিসেবে রোজা মুসলমানের জীবন ও জীবনাচারের অপরিহার্য দিকনির্দেশক। পরিশুদ্ধির পবিত্রতা ও স¦চ্ছতায় তা সকল পাপ ও কালিমা থেকে মুক্ত করে মুমিনের জীবন, তাকে দেয় আল্লাহর ইবাদতে নিজেকে অধিক সমর্পিত করাসহ দ্বীনের পথে আরো একধাপ এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা।
দ্বিতীয় হিজরির শাবান মাসে আল্লাহ পাক মুসলমানদের রোজা উপহার দেন। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন : ‘হে মানুষ, তোমরা যারা ঈমান এনেছ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করে দেয়া হয়েছে যেমনি করে ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর যেন তোমরা (এর মাধ্যমে আল্লাহকে) ভয় করতে পার।’ (সূরা বাকারা, ১৮৩ আয়াত) তার পরপরই আল্লাহ পুনরায় বলেন : ‘রোজার মাস (এমন একটি মাস) যাতে কোরআন নাযিল করা হয়েছে, আর এই কোরআন হচ্ছে মানবজাতির জন্য পথের দিশা, সৎপথের সুস্পষ্ট নিদর্শন, (মানুষের জন্য হক বাতিলের), পার্থক্যকারী। অতএব তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাসটি পাবে, সে এতে রোজা রাখবে...’ (সূরা বাকারা, ১৮৫ আয়াত)। আল্লাহ এ দু’টি আয়াতের মধ্য দিয়ে রোজার অলংঘনীয়, অতুলনীয় ও সুউচ্চ মর্যাদা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সেই সাথে রোজার মাসকে কোরআন নাযিলের মাস বলে মহিমান্বিত করে রোজা ও মুসলমানদের মধ্যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের সেতুবন্ধন রচনা করেছেন। এদিকে রোজা কায়েম হওয়ার পর রাসূল সা: যথাযথ মর্যাদা ও গুরুত্বসহ মুসলমানদের কাছে রোজাকে তুলে ধরেন। তিনি রোজা সম্পর্কে বলেছেন, ‘রোজা একটি ঢালের মতো।’ এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, ঢাল যেমন যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রæর আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে রোজাও তেমনি ঈমানদার মুসলমানদের সব পাপাচার, অন্যায়, অশ্লীলতা, ফিতনা-ফ্যাসাদ থেকে রক্ষা করতে পারে। রাসূল সা: রোজার পবিত্রতা ও রোজাদারের মর্যাদা সম্পর্কেও বলেছেন। বুখারি শরিফে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সা: বলেছেন, ‘‘তোমাদের কেউ রোজা রাখলে তার সঙ্গে শোরগোল করবে না কিংবা অশ্লীল কথাবার্তা বলবে না। কেউ যখন রোজাদারের সঙ্গে ঝগড়া করতে আসে তখন রোজাদার যেন বলে ‘আমি রোজাদার’।’’
এক মাস রোজা পালন ও সর্বোচ্চ ইবাদতের পরিণতিতে রমজান মাসে একজন মুসলমানের জীবনে অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে অধিক স্বস্তি ও শান্তি বিরাজ করে। দিনের দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, সেই অবস্থায় সকল স্বাভাবিক কাজকর্মসহ অন্যান্য দায়িত্ব পালন, ওয়াক্তিয়া নামাজের বাইরেও অতিরিক্ত নামাজ-জিকির-ইতেকাফের মাধ্যমে অধিক ইবাদত মুসলমানের জীবনে ভিন্নমাত্রা আনে। ইসলাম শান্তির ধর্ম, রোজা সেই শান্তির পথে মুসলমানকে এগিয়ে নেয়। রোজা মুসলমানকে ন¤্র, বিনয়ী করে; ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, সহনশীলতা, সংযম শিক্ষা দেয়; দরিদ্র, অসহায়দের প্রতি মমত্ববান ও সহানুভ‚তিশীল হতে সাহায্য করে। সহিংসতা ও অশান্তি সৃষ্টি, লোভ ও হিংসা পরিত্যাগ এবং প্রতিহিংসা, প্রতিশোধ গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে উৎসাহ জোগায়।
উল্লেখ্য, রাসূল সা: তাঁর জীবনে নয়বার রোজা পেয়েছিলেন। মহান আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু তাঁর জীবনে রোজা পালনসহ সেহরি-ইফতারের ক্ষেত্রে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তাঁর জীবনযাত্রা ছিল সহজ, সরল, অনাড়ম্বর। বিলাসিতার ন্যূনতম উপস্থিতিও তার জীবনে ছিল না। ইফতার বা সেহরির ক্ষেত্রে অন্য কিছুই নয়, খেজুর আর পানিই ছিল তাঁর প্রধান খাবার। হযরত আনাস রা: হতে বর্ণিত : তিনি বলেন, রাসূল সা: কয়েকটি ভেজা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। যদি ভেজা খেজুর না থাকত তবে সাধারণ শুকনো খেজুরই গ্রহণ করতেন। যদি তাও না থাকত, তবে কয়েক ঢোক পানিই হতো তার ইফতার। (তিরমিজি : ৬৯৬) হজরত আবদুল্লাহ বিন আবি আউফা রা: সূত্রে বর্ণিত : তিনি বলেন, রোজায় আমরা রাসূল সা:-এর সফরসঙ্গী ছিলাম। স‚র্যাস্তের সময় তিনি একজনকে ডেকে বললেন, ছাতু ও পানি মিশিয়ে ইফতার পরিবেশন করো। (মুসলিম শরীফ, ১০৯৯)। অন্যদিকে সেহরিতেও একই অবস্থা ছিল। ভেজা বা শুকনো খেজুর আর পানি দিয়ে সেহরি সেরে নিতেন তিনি। হযরত আনাস রা: বলেন, সেহরির সময় রাসূল সা: বললেনÑ আমি রোজা রাখব, খাবার দাও। আমি রাসূল সা:-এর সামনে খেজুর ও পানি পরিবেশন করলাম। বস্তুত, রাসূল সা:-এর ইফতার ও সেহরির ক্ষেত্রে তেমন কোনো ব্যতিক্রম ঘটার কথা জানা যায় না। ইসলামের মুকুটহীন স¤্রাটের খেজুর ও পানি বা শুধু পানি দিয়ে ইফতার সম্পন্ন করার কথা একালে আমাদের দেশের ছোলা ভুনা, মুড়ি- পেঁয়াজু, বেগুনি, চপ, খেজুর, জিলাপি, শরবত, হালিম সমন্বয়ে ইফতার সম্পন্নকারীরা স্মরণ করে দেখতে পারি। মনে হয়, আমাদের দেশসহ বিশ্বের অন্যান্য স্থানের অগণিত হতদরিদ্র মুসলমানদের ইফতার ও সেহরির প্রতিনিধিত্ব তিনি করে গেছেন দেড় হাজার বছর আগে। সে প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের বিত্তশালী নাগরিক সমাজে বা বিশে^র যেখানেই হোক, মুসলমানদের মধ্যে ইফতারের নামে বিলাসিতা একবারেই বেমানান, অপ্রয়োজনীয়, লজ্জাকর বলে প্রতিভাত হয়।
মুসলমানদের রোজা পালন করা অপরিহার্য। পবিত্র রমজান মাসে মুসলমানদের সচেতন হতে হবে যে রোজা মহান আল্লাহর তরফ থেকে এক বিশেষ উপহার। রোজা যতটাই সাধনার, ততটাই আনন্দের। রোজা রাখার মধ্য দিয়ে আত্মশুদ্ধি লাভের প্রচেষ্টা কার ক্ষেত্রে সফল হয় আর কার ক্ষেত্রে হয় না, তা শুধু আল্লাহ জানেন। সৎ নিয়ত থাকলে রোজা শিক্ষা ও আদর্শ পাপবিদ্ধ-কলুষিত মনকেও পরিচ্ছন্ন করে দেয়। আর অসৎ নিয়ত থাকলে সারা মাস রোজা রাখা ও কষ্ট করে তারাবি নামাজ আদায় করা পরিণত হয় শুধুু আত্মপ্রদর্শনী মাত্রে। কোনো রোজাদার রোজাও করবেন আবার তার অজু করা, মোনাজাত করা হাত দিয়ে ঘুষও নেবেন, মিথা কথা বলবেন, অন্যায় করবেন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করে বিপুল অর্থ আয় করবেন, ভুয়া মামলায় মানুষকে জেলে পাঠাবেন, অন্যের ক্ষতি করবেনÑ তা কি হতে পারে?
একজন মুসলমানের আত্মশুদ্ধি মানে এক বিরাট বিষয়। তাতে আল্লাহ যেমন খুশি হন, তার আখেরাতের পথ যেমন পরিষ্কার হয়, তেমনি তাতে অন্য মুসলমানেরও শান্তি ও কল্যাণ সাধিত হয়। প্রতিটি রোজাদার যদি আত্মশুদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হন সেটাই হবে তার রোজা পালনের সার্থকতা।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর