Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫, ৯ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

মাহে রমজানের পয়গাম

মাওলানা আবদুল হামিদ | প্রকাশের সময় : ২১ মে, ২০১৮, ১২:০০ এএম

সিয়াম সাধনা ও আত্মশুদ্ধির পয়গাম নিয়ে হাজির হয়েছে মাহে রমজান। এ মাসে মানুষের দিশারী এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। রমজান মাসের প্রথমাংশে রহমত, দ্বিতীয়াংশে মাগফিরাত আর তৃতীয়াংশে নাজাত তথা দোজখ থেকে মুক্তি। এ মাসে সিয়াম পালন করা প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক মুসলমান নর-নারীর উপর ফরজ করা হয়েছে।। ধর্মপ্রাণ মুসলানদের কাছে এ মাসের গুরুত্ব অপরিসীম।
‘সাওম’ বা রোজা ইসলামের মূল ভিত্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিধান। ‘সাওম’ আরবি শব্দ এর অর্থ বিরত থাকা। সাওম শব্দের বহুবচন হচ্ছে সিয়াম। শরিয়তের পরিভাষায় সুবহে সাদিক উদয় হওয়ার পূর্ব থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজার নিয়তে পানাহার ও যৌনাচার থেকে বিরত থাকার নাম ‘সাওম’। রমজান মাসে সিয়াম পালন করা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমান নর-নারীর জন্য ফরজ বা অবশ্যকর্তব্য। আল্লাহ তা’লা আল কুরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেজগারি অর্জন করতে পার’ (সূরা বাকারা- ১৮৩)। সূরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তা’লা বলেন, ‘রমজান মাসই হল সে মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়ত এবং সৎপথের ¯পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এই মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোজা রাখবে।’ (সূরা বাকারা ১৮৫)
মাহে রমজানে সিয়াম পালনকারী একজন মুসলমান সত্যিকারের খাঁটি ইবাদতকারী হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। রহমত ও বরকতের দিক দিয়ে রমজান মাস অন্য ১১ মাস থেকে শ্রেষ্ঠ। দীর্ঘ এগারটি মাসের পাপ পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত হওয়ার অপূর্ব সুযোগ এনে দেয় রমজান মাস। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ মাসে রহমতের বারিধারা বর্ষণ করেন। মুত্তাকি পরহেজগার বান্দাদের ক্ষমা করার জন্য সব আয়োজন করে রাখেন। এ মাসের শেষ দশকে রয়েছে হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ লাইলাতুল কদর। আল্লাহ তা’লা উম্মতে মুহাম্মাদির একরাত্রির ইবাদতই পূর্ববর্তী উম্মতগণের এক হাজার মাসের ইবাদাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। যে রাত সম্পর্কে আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘শবে কদর হল এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ’ (সূরা কদর- ৩)। ফযিলতের দিক থেকে রমজান মাসকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এ সমপর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রমজান মাসের প্রথমাংশে রহমত, দ্বিতীয়াংশে মাগফিরাত আর তৃতীয়াংশে নাজাত তথা দোজখ থেকে মুক্তি। (বুখারি)
রাসূল (সা.) এরশাদ করেন, রমজান মাসে যে ব্যক্তি একটি নফল আদায় করল, সে যেন অন্য মাসের একটি ফরজ আদায় করল। আর যে এ মাসে একটি ফরজ আদায় করল, সে যেন অন্য মাসের সত্তরটি ফরজ আদায় করল (বায়হাকি)। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন বলেন, ‘নিশ্চয়ই রোজা আমার জন্য, এর প্রতিদান আমিই দান করি’। রমজান মাসের আগমন হলে রাসূল (সা.) অতিশয় আনন্দিত হতেন, সাহাবায়ে কেরামদের বলতেন, বরকতময় মাস রমজান এসেছে। এরপর তিনি এ মাসের কিছু ফযীলত বর্ণনা করে বলতেন, আল্লহ তা’লা তোমাদের জন্য সিয়াম পালন ফরজ করেছেন। এ মাসে আকাশের দ্বারসমূহ খুলে দেয়া হয়। বন্ধ করে দেয়া হয় জাহান্নামের দরজাগুলো। অভিশপ্ত শয়তানকে বন্দি করা হয়। এ মাসে রয়েছে একটি রাত যা হাজার রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যে ব্যক্তি এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো সে মূলত সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল। (নাসায়ি)
রাসুল (সা.) বলেছেন, রমজান মাসে আমার উম্মত কে পাঁচটি নিয়ামত দান করা হয়েছে যা আগের উম্মতকে দেওয়া হয়নি, (১) রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের চেয়ে বেশী ঘ্রানযুক্ত (২) ইফতার পর্যন্ত রোজাদারের জন্য ফেরেশতারা দোয়া করেন (৩) রোজাদারের জন্য প্রতিদিন জান্নাতকে সজ্জিত করা হয় (৪) শয়তানকে বন্দি করা হয় (৫) রমজানের শেষ রাতে সকল উম্মতকে ক্ষমা করা হয়।
রোজার নিয়ত: মনের ইচ্ছা পোষণকেই নিয়ত বলে। রোজার জন্য নিয়ত করা ফরজ। নিয়ত না করে সারা জীবন না খেয়ে থাকলেও একটি রোজাও হবে না। মাহে রমজানের রোজার নিয়ত রাতেই করে নেওয়া উচিত। তবে রাতে নিয়ত না করলে দিনের অগ্রভাগে নিয়ত করে নিতে হবে। শর্ত হলো, কোনো কিছু খেতে বা পান করতে পারবে না। আরবি ভাষায় নিয়ত জানা থাকলে ভালো, নতুবা বাংলায় নিয়ত করা চলে। মুখে নিয়তের শব্দ উচ্চারণ করা জরুরি নয়। কাজেই মাহে রমজানে রোজা রাখার জন্য নিয়ত করে রাতে মনে মনে শুধু বলতে হবে, ‘নাওয়াইতু আন আছুমমা গাদান মিন শাহরি রামাদানাল মুবারাকি’ - অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমি আগামীকাল মাহে রমজানের রোজা রাখার নিয়ত করছি’।
তারাবির নামাজ: রমজান মাসে রাতে তারাবিহের ২০ রাকাত নামাজ আদায় করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। এশার নামাজের পরে বিতির তিন রাকাত নামাজের আগে ১০ সালামে ২০ রাকাত নামাজ আদায় করা সুন্নত। তারাবির নামাজ একাকীও পড়া যেতে পারে। মসজিদে জামাতের সঙ্গে পবিত্র কোরআনের খতম তারাবিহ পড়ায় অশেষ সওয়াব রয়েছে। একাকী বা জামাতের সঙ্গে সূরা তারাবিও পড়া যেতে পারে।
সেহরি: সেহরি মাহে রমজানের বরকতময় একটি পর্ব। সেহিরর দ্বারা রোজাদারের রোজা রাখার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং মন প্রফুল্ল থাকে। সেহিরর সময়ে আল্লাহর বিশেষ রহমত বর্ষিত হয় এবং বান্দার দোয়া কবুল করা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা সেহির খাও, এতে বরকত আছে (মুসলিম)। রাতের একটু শেষ ভাগেই সেহির খাওয়া উত্তম। এতে অশেষ বরকত রয়েছে। হযরত ইবনে ওমর (রা.) এর থেকে বর্ণিত হয়েছে, “যিনি সেহরি খান তার উপর স্বয়ং আল্লাহ পাক ও ফেরেস্তারা রহমত নাযিল করেন।” (তাবরানি)
ইফতার: সূর্য অস্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করতে হবে। ইফতারের জন্য খেজুর ও পানির কথা হাদিস দ্বারা সমর্থিত। ইফতার নিজে করা এবং অন্যকে করানো সওয়াবের কাজ। যে ব্যক্তি অন্যকে ইফতার করাবে, তার সওয়াবের কোনো কমতি হবে না। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, “যদি কেউ রমজান মাসে তার সার্মথ্য অনুযায়ী একটি খেজুর বা এক গøাস পানি দ্বারা হলেও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অপর ভাইকে ইফতার করায় তাহলে আল্লাহ তা’লা তাকে মাফ করে দিবেন। একই সাথে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিবেন ও উক্ত রোজাদারের সমপরিমান সওয়াব দিবেন আর এ কারণে ঐ রোজাদারের সওয়াব একটুও কমানো হবে না।”
ইফতার করার সময় এ দোয়াটি পড়া উত্তম, ‘আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু, ওয়াআলা রিজকিকা আফতারতু।’ অর্থ- ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার সন্তুষ্টির জন্য রোজা রেখেছি এবং আপনার রিযিক দ্বারাই ইফতার করছি।’ ইফতারের ক্ষণটি দোয়া কবুলের সময়। রোজাদারের জন্য আনন্দময় মুহূর্ত এটি। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, রোজাদার যখন ইফতার করে, তার দোয়া প্রত্যাখ্যান করা হয় না।’
যেসব কারণে রোজা ভঙ্গ হয়:
১. রোজা রেখে শরিয়ত সম্মত কারণ ছাড়া জ্ঞাতসারে পানাহার ও যৌনাচার করা। এতে রোজা ভঙ্গ হয় এবং কাযা ও কাফ্ফারা ওয়াজিব হয়।
২. কেউ জোরপূর্বক কিছু খাইয়ে দিলে।
৩. নাকে কানে বা মস্তকের ভেতরে ওষুধ দিলে।
৪. অসুখের কারণে কোনো ওষুধ বা খাদ্যবস্তু পেটের ভেতরে দিলে।
৫. লোহা, কাঠ, মাটিসহ এমন অখাদ্য বস্তু গিলে ফেলা, যা সাধারণত খাওয়া হয় না।
৬. ইচ্ছাকৃতভাবে মুখ ভরে বমি করলে।
৭. রাত্র আছে মনে করে সকালে সেহরি খেয়ে ফেললে।
৮. সূর্যাস্ত হয়ে গেছে মনে করে সূর্যাস্তের আগে ইফতার করলে।
৯. ভুলে কিছু খাওয়ার পর রোজা ভেঙে গেছে মনে করে ইচ্ছা করে পুনরায় কোনো কিছু খাওয়া।
১০. দিনের বেলা কুলি করতে গিয়ে পানি গলার ভেতরে গেলে।
১১. বিনা নিয়তে রোজা রাখার পর ইচ্ছাপূর্বক রোজা ভঙ্গ করলে।
১২. ধূমপান করলে এবং ধূপ ও আগরবাতি জ্বালিয়ে পরিকল্পিতভাবে তার ধোঁয়া গ্রহণ করলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যায়। প্রথম কারণটি ছাড়া বাকি সকল কারণে শুধুমাত্র কাযা ওয়াজিব হবে।
যেসব কারণে রোজা মাকরুহ হয়:
১. অযথা কোনো বস্তু মুখের মধ্যে রেখে চিবানো।
২. লবণ বা অন্য কোনো বস্তুর স্বাদ নিয়ে থুতু করে তা আবার ফেলে দেওয়া।
৩. মাজন, কয়লা বা পেস্ট দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করা।
৪. ফরজ গোসলের প্রয়োজন থাকা সত্তে¡ও সারা দিন গোসল না করে কাটানো।
৫. শিঙা লাগানো।
৬. রক্তদান করা।
৭. গিবতে লিপ্ত হওয়া।
৮. মারামারি করা, ঝগড়া করা, গালি দেওয়া, মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা ইত্যাদি।
বসন্তকালে যেমন প্রকৃতি নবরূপে হেসে ওঠে, তেমনি রমজান মাস এলে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের হৃদয় আনন্দে প্রফুল্য হয়ে ওঠে। তাই রমজান মাসকে ইবাদতের বসন্তকাল বলা চলে। মাহে রমজানের আবশ্যকীয় বিধিবিধানগুলোর জ্ঞান রোজাদারের থাকা দরকার। সে ক্ষেত্রে রোজার ফাযায়েল ও মাসায়েল সংক্রান্ত ভলো কোন বই পড়া যেতে পারে। সিয়াম পালন ও অন্যান্য ফরজ ইবাদাতের পাশাপাশি সুন্নাত, নফল ইবাদাত, কোরআন তিলাওয়াত বেশী বেশী করা দরকার। এ মাসের পবিত্রতা রক্ষা করা জরুরী। দিনের বেলা পানাহার বন্ধ করতে হবে। অশ্লিলতা বেহায়াপনা বন্ধ করতে হবে। তবেই রমজান মাস আমাদের জন্য উভয় জাহানে সাফল্যের বার্তা বয়ে আনবে ইনশা আল্লাহ...!
শিক্ষক : জামেয়া ইসলামিয়া আনওয়ারে মদিনা মাদরাসা, ইসলামপুর সিলেট।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ