Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৭ আশ্বিন ১৪২৫, ১১ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

ইসলাম শব্দের ব্যবহারিক অর্থ

এ. কে. এম. ফজলুর রহমান মুন্শী | প্রকাশের সময় : ২৩ মে, ২০১৮, ১২:০০ এএম

ইসলাম শব্দের ব্যবহারিক দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে শান্তি স্থাপন তথা বিরোধ পরিহার করা। এ প্রসঙ্গে আল কোরআনে ইরশাদ হয়েছে: (ক) ‘স্মরণ কর, আল্লাহ তোমাকে স্বপ্নে দেখিয়ে দিলেন যে, তারা সংখ্যায় স্বল্প, যদি তোমাকে দেখাতেন যে তারা সংখ্যায় অধিক তবে তোমরা সাহস হারাতে এবং যুদ্ধ বিষয়ে নিজেদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করতে, কিন্তু আল্লাহ তোমাদের মধ্যে শান্তি স্থাপন করেছেন, এবং অন্তরে যা আছে যে সম্বন্ধে তিনি বিশেষভাবে অবহিত। (সূরা আনফাল: আয়অত ৪৩)।
(খ) ইরশাদ হয়েছে: ‘যে স্তন্যপান কার পূর্ণ করতে চায় তার জন্য জননীগণ তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দুই বছর স্তন্যপান করাবে; জনকের কর্তব্য যথা বিধি তাদের ভরণ-পোষন করা। কাওকে তার সাধ্যাতীত কার্যভার দেওয়া হয় না। কোন জননীকে তার সন্তানের জন্য এবং কোনো জনককে তার সন্তানের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে না। এবং উত্তরাধিকারীগণেরও অনুরূপ কর্তব্য। কিন্তু তারা যদি পরস্পরের সম্মতি ও পরামর্শক্রমে স্তন্যপান বন্ধ করতে চায়, তবে তাদের কারও কোনো অপরাধ হবে না। তোমর যা বিধিমত দিতে চেয়েছিলে তা যদি আর্পণ কর তবে ধাত্রী দ্বারা তোমাদের সন্তানকে স্তন্যপান করাতে চাইলে তোমাদের কোনো পাপ হবে না। আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ যে, তোমরা যা কর আল্লাহ পাক উহার সম্যক দ্রষ্টা। (সূরা বাকারাহ: আয়াত ২৩৩)।
বস্তুত: শান্তি স্থাপান ও বিরোধ পরিহার করার বিষয়টিকে বিশ্লেষন করতে গিয়ে আয়েম্মায়ে মুজতাহেদীন দুইটি দিকনির্দেশনার কথা উল্লেখ করেছেন, যা খুবই প্রনিধানযোগ্য। এর প্রথমটি হলো এই যে, আত্মসমর্পনের মাধ্যমে আল্লাহ পাকের সাথে নিবিঢ় শান্তি স্থাপিত হয় এবং তার বিরুদ্ধতা পরিত্যাক্ত হয়। এ প্রসঙ্গে আল কোরআনে ইরশাদ হয়েছে: ‘বল, আমি কি আল্লাহকে ছেড়ে অন্য প্রতিপালককে খুঁজব? অথচ তিনিই সব কিছুর প্রতিপালক। প্রত্যেকে স্বীয় কৃতকর্মের জন্য দায়ী, এবং কেউ অন্য কারও ভার বহন করবে না। অতঃপর তোমাদের প্রত্যবর্তন তোমাদের প্রতিপালকের নিকটেই, তৎপর যে বিষয়ে তোমরা মতান্তর ঘটিয়ে ছিলে তা তিনি তোমাদেরকে অবহিত করবেন। (সূরা আনয়াম: আয়াত ১৬৪)।
আর দ্বিতীয়টি হলো এই যে, আল্লাহর সৃষ্ট মানুষের সাথে একাত্মতার ভিত্তিতে ও এর অনুভ‚তিতে এবং সাম্য নীতির স্বীকৃতিতে সমাজে শান্তি-নিরাপত্তার অনুকুল অবস্থার সৃষ্টি হয়। এ প্রসঙ্গে আল কোরআনে ইরশাদ হয়েছে: ‘এবং তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধর, এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ কর। তোমারা ছিলে পরস্পর শত্রæ এবং তিনি তোমাদের অন্তরে প্রতি বন্ধন সৃষ্টি করেন। ফলে তার অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই হয়ে গেলে। তোমরা অগ্নিকুণ্ডের প্রান্তে ছিলে, আল্লাহর উহা হতে তোমাদের রক্ষা করেছেন। এরূপে আল্লাহ তোমাদের জন্য তার নিদর্শন স্পষ্টভাবে বিবৃত করেন যাতে তোমরা সৎপথ পেতে পার। (সূরা আল ইমরান: আয়াত ১০৩) হাদীস শরিফে উক্ত হয়েছে, রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন: প্রকৃত মুমিন ওই ব্যক্তি যার হাত ও রসনার আঘাত হতে অন্য মুসলমানগণ নিরাপদ থাকেন। (সহীহ বুখারী: ২:৩)।
ইসলাম একটি দীন। আরবী দীন শব্দটি আল কোরআনে হরকতের তারতম্যসহ সর্বমোট ৬৮ বার এসেছে। একুনে ৬৮+২৫= ৯৩ বার দীন শব্দটি আল কোরআনে ব্যবহৃত হয়েছে। আল কোরআনে বিবৃত দীন ইসলাম এমন একটি জীবন ব্যবস্তা যা ঈমান ও বিশ্বাস, আনুষ্ঠানিক ইবাদত, দার্শনিক তত্ত¡রাজি এবং মানুষের কর্ম-জীবন আধ্যাত্মিক ও পারত্রিক জীবন দর্শন ও ক্রিয়া কর্মের সম্পাহারকে বুঝায়।
[আরবী দীন শব্দটি তিনি অর্থে ব্যবহৃত হয়।
(১) আরমীয় হিব্রæ হতে গৃহীত দীন শব্দের অর্থ প্রতিফল, বিচার। আল কোরআনে ইরশাদ হয়েছে: ‘তিনি বিচার দিবসের অধিকর্তা।’ (সূরা ফাতিহা: আয়াত ৩)। (২) দীন শব্দটি বিশুদ্ধ আরবী শব্দ। উহার অর্থ প্রথা, রীতি-নীতি। আল কোরআনে ইরশাদ হয়েছে: এভাবে আমি ইউসুফের জন্য কৌশল করেছিলাম, রাজার আইনে তার সহোদরকে সে আটক করতে পারত না, আল্লাহ ইচ্ছা না করলে। আমি যাকে ইচ্ছা মর্যাদায় উন্নীত করি। (সূরা ইউসুফ: আয়াত ৭৬) (৩) উহার অর্থ ধর্ম বা ধর্মীয় জীবন ব্যবস্থা। আল কোরআনে ইরশাদ হয়েছে: আল্লাহর নিকট একমাত্র মনোনীত দীন ইসলাম। যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল তার পরস্পর বিদ্বেষ বসত: তাদের নিকট জ্ঞান আসবার পর মতানৈক্য ঘটিয়ে ছিল। আর কেউ আল্লাহর নিদর্শনকে প্রত্যাখ্যান করলে আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত তৎপর।’ (সূরা আল ইমরান: আয়াত ১৯)। জাহেলী যুগ হতে আরবী ভাষায় দীন শব্দটি এই তিনটি অর্থে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। উল্লিখিত তিনটি অর্থের কোন না কোন একটি দ্বারা কোরআনুল কারীমের আয়াতগুলো ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। ধর্ম শাস্ত্র মতে দীন একটি স্বগীয় বিধান। বিবেক, বুদ্ধি ও জ্ঞান সম্পন্ন মানুষ স্বকীয় বিবেক-বিবেচনা বলে উহা গ্রহণ করলে ওই বিধান মানুষকে শান্তি ও মুক্তির পথ প্রদর্শন করবে। বস্তুত: সেই বিধানে বিশ্বাস ও কর্ম পদ্ধতির যাবতীয় রীতি-নীতি সন্নিবিষ্ট রয়েছে। মিল্লাত বা ধর্মীয় জাতি, মাযহাব বা ধর্মীয় আইন কানুন পদ্ধতি, শরীয়া বা আল্লাহর আইন কানুন দীনের মধ্যেই শামিল রয়েছে। দীনের ব্যাপ্তি ও প্রসস্তি বুঝানোর জন্য এগুলোর পৃথক পৃথক সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশ্বের যে কোন ধর্ম বুঝানোর জন্য দীন শব্দের ব্যবহার করা চলে। কিন্তু ইসলামের বিধান মতে, আল্লাহ পাকের মনোনীত ধর্ম ইসলাম ছাড়া দীন শব্দের ব্যবহার অন্যান্য ধর্মের জন্য ব্যবহার করলে, সে দীন মেনে চলার আবশ্যকতা থাকবেনা। কেননা, কোরআন নাযিলের পর পূর্ববর্তী ধর্মগুলোর অনুশাসন ও নীতিমালা রহিত হয়ে গেছে কিংবা বাতিল বলে ঘোষিত হয়েছে। আল কোরআনে সুস্পষ্টভাবে ঘোষনা করা হয়েছে: (ক) ‘আল্লাহ পাক তোমাদের জন্য এই দীনকে (ইসলাম) মনোনীত করেছেন। সুতরাং আত্মসর্মণকারী না হয়ে তোমরা কখনোও মৃত্যুবরণ করো না।’ (সূরা বাকারাহ: আয়াত ১৩২। (খ) ইরশাদ হয়েছে: ‘তিনি (আল্লাহ) আদেশ দিয়েছেন, কেবল তাকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত না করতে, এটাই সরল দীন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ ইহা অবগত নয়।’ (সূরা ইউসুফ: আয়াত ৪০) (গ) ইরশাদ হয়েছে: ‘তার অপেক্ষা দীনে বা ধর্মীয় জীবন ব্যবস্থায় কে উত্তম সে সৎকর্ম পরায়ন হয়ে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে এবং একনিষ্ঠভাবে ইবরাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ করে? এবং আল্লাহ ইবরাহীমকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন।’ (সূরা নিসা: আয়াত ১২৫) (ঘ) ইরশাদ হয়েছে: ‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দীন মনোনীত করলাম।’ (সূরা মায়েদাহ: আয়াত ৩)। সুতরাং দীন ইসলামই হচ্ছে একমাত্র জীবন ব্যবস্থা যা অনুসরণ করলে দুনিয়ায় জীবনের সকল অঙ্গনে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে এবং পারলৌকিক জীবনে মুক্তি ও নিস্কৃতি লাভে ধন্য হওয়া যাবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর