Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর ২০১৮, ০৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

সৈনিক নজরুলের সাহিত্য চর্চা

শা হ রি য়া র সো হে ল | প্রকাশের সময় : ২৫ মে, ২০১৮, ১২:০০ এএম

কাজী নজরুল ইসলাম ১৯১৭ খৃ. সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। তখন তিনি রানীগঞ্জ সিয়ারসোল স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। সৈনিক হিসাবে নির্বাচিত হবার পর প্রথমে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় কলকাতা ফোর্ট উইলিয়ামে, তারপর প্রশিক্ষণের জন্য লাহোর হয়ে নওশেরা। সৈনিক জীবনের শুরু এভাবেই। সৈনিক হবার পরও কিন্তু তার কাব্য চিন্তা একে বারে ম্লান হয়ে যায়নি। পরবর্তীতে বিভিন্ন কাব্যে তার এ চিন্তার ফসল আমরা দেখতে পাই। ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, আর হাতে রণতূর্য’, যুদ্ধের ভেতরেও তিনি মানবতার গান গেয়েছেন, সত্যের জয়ধ্বনি করেছেন। রিক্তের বেদন (১৯২৪) গ্রন্থে আমরা তার সৈনিক জীবনের ট্রেনিং এর কিছু প্রতিচ্ছবি লক্ষ্য করি। নজরুল সৈনিক এবং কবি। নওশেরায় তিন মাস প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর নজরুল কোম্পানির সঙ্গে করাচী যান। নজরুল সেনাবাহিনীতে কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন বলেই অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাটেলিয়ন কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পদে উন্নতি লাভ করেন। নজরুলের সৈনিক জীবনের অধিকাংশ সময় কাটে করাচীতে। অনেকে মনে করেন, পরবর্তীতে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে গিয়েছিলেন। কিন্তু এ বিষয়টি সঠিক কিনা জানা যায়নি। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, তিনি আরবী-ফার্সী ভাষায় মুগ্ধ হয়েছিলেন সৈনিক জীবনে। তাদের ক্যাম্পে এক হুজুর ছিলেন। তার মুখ থকে আরবী-ফার্সী সাহিত্য জেনে তিনি এর ওপর আকৃষ্ট হন এবং মৌলভীর কাছ থেকে আরবী-ফার্সী জেনে এ ভাষার নাম করা কবি-সাহিত্যিকদের বিভিন্ন লেখা পড়েন। পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যে তিনি এ সকল আরবী-ফার্সী-উর্দু প্রভৃতি ভাষার সংযোগ ঘটান। করাচী সেনা নিবাসে নজরুলের সাহিত্য চর্চা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্য আশ্রিতই ছিলনা; বরং বাংলাদেশের সাহিত্য জগতের সঙ্গেও তার বিলক্ষণ যোগাযোগ ছিল। যুদ্ধের প্রতি তার আকর্ষণ ছিল ব্যাপক। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়তে সব সময় তিনি প্রস্তুত ছিলেন। কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্ব তাকে মুগ্ধ করত। তিনি সশরীরে যুদ্ধ না করলেও স্বাধীনতার জন্য, সত্যের জন্য তার প্রাণ সর্বদা উন্মুখ হয়ে থাকত। সৈনিক অবস্থার মাঝেও তিনি প্রচুর লিখেছেন, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে আমরা তার প্রমাণ পাই।

উপরিউক্ত তালিকার ‘বাউলের আত্মকাহিনী’ গল্পটি নজরুলের প্রথম প্রকাশিত রচনা এবং প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘মুক্তি’। যুদ্ধের বিভিন্ন প্রেক্ষাপট বন্ধুদের বাস্তব ঘটনা ইত্যাদি নিয়ে তিনি এ সকল রচনাকে সমৃদ্ধ করেছেন। নজরুলের সৈনিক জীবনের সাহিত্য চর্চার ফল, ফারসি কাব্যের সঙ্গে পরিচয়, মধ্য প্রাচ্যের সংস্কৃতিতে উৎসাহ এবং সে ঐতিহ্যের সঙ্গে একাত্মতা। শুধু তুর্কি রমনীর সৌন্দর্যকে ডাঁসা আঙুর আর পাকা ডালিমের মতো রসাল বোধ নয় সঙ্গে সঙ্গে পারস্যের বুলবুল হাফিজের বাণীতে বাংলার কাব্যে ছড়িয়ে দেয়ার প্রয়াস চালিয়েছেন।

‘নাই বা পেল নাগাল, শুধু সৌরভেরি আশে
অবুঝ, সবুজ দুর্বা যেমন যুঁই কুঁড়িটির পাশে
বসেই আছে, তেমনি বিভোর থাকবে প্রিয়ার আশায়
তায় অলকের একটু সুবাস পশবে তোর এ নাশায়
রেশ শেষে একটি করেও প্রিয়ার হিয়ার পর
জাগাবেরে তোর ও প্রাণে অমনি অবুঝ হরষ।’

নজরুলের সামরিক জীবনে যুদ্ধের নৃশংসতা, হতাশা বা ক্ষোভ নেই বটে; তবু সৈনিক জীবনের শিক্ষা যে তার অভিজ্ঞতাকে সমপ্রসারিত, দৃষ্টিকে উদার সর্বোপরি কবি হওয়ার প্রস্তুতিকে পূর্ণতা দান করতে যথেষ্ট সাহায্য করেছিল, তাতে কোন সন্দেহ নেই। সৈনিক জীবন নজরুলকে বাংলাদেশের প্রাদেশিক গণ্ডী ছাড়িয়ে সর্বভারতীয় এমন কি মধ্যপ্রাচ্যের পটভূমিকায় স্থাপন করে। ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে নজরুল শুধু বাংলাদেশকে অতিক্রম করেননি, ঐতিহ্য চেতনায় তিনি ভারতবর্ষকেও ছাড়িয়ে গেছেন, সম্পর্কিত হয়েছেন মধ্য প্রাচ্যের সঙ্গে, একাত্ম হয়েছেন আন্তর্জাতিক চেতনার সঙ্গে। সৈনিক জীবনের শৃংখলা ও সংঘবদ্ধ সমবায়ী জীবন, বাল্য ও কৈশোরের বাঁধন হারা নজরুলকে এক পূর্ণ দায়িত্বশীল যুবকে পরিণত করেছিল।

প্রথম মহাযুদ্ধ অবসানের পর ১৯২০খৃ. মার্চ মাসে ৪৯নং বেঙ্গলী রেজিমেন্ট ভেঙে দেয়া হলে নজরুল করাচী থেকে কলকাতায় চলে আসেন। কলকাতায় নজরুল ওঠেন বাল্য বন্ধু শৈলজানন্দের রমাকান্তবোস স্ট্রিট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট বোর্ডিং-এ। সেখানে কিছু সমস্যার কারনে শৈলজানন্দের মেস ছেড়ে নজরুল ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র অফিসে এসে ওঠেন এবং সেখানে মুজাফফর আহমদের সঙ্গে বসবাস শুরু করেন। নজরুল যখন ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে থাকতে শুরু করেন, তখন তার সম্পত্তির মধ্যে ছিল, সৈনিকের পোষাক, শেরওয়ানি, ট্রাউজার্স, কালো উঁচু টুপি, বাইনা কুলার, কবিতা ও গানের খাতা, পুঁথি-পুস্তক, মাসিক পত্রিকা, ঊর্দু অনুবাদসহ দিওয়ানে হাফিজ ইত্যাদি। এছাড়া ছিল ‘ব্যথার দান’ এর উৎসর্গের সেই কাঁটাটি, সেটি নিয়ে নজরুল লিখেছেন,

‘মানসী আমার
মাথার কাঁটা নিয়েছিলুম বলে
ক্ষমা করোনি
তাই বুকের কাঁটা দিয়ে
প্রায়শ্চিত্ত করলুম।’

আর এভাবেই সৈনিক জীবনের শেষে শুরু হয় নজরুল জীবনের অন্য এক নতুন অধ্যায়। সৈনিক জীবন তার সাহিত্যকে পরিপূর্ণতা ও মহিমান্বিত করেছিল। নজরুল হয়ে উঠেছিলেন মহাবিদ্রোহী। সত্যকে আপন করবার জন্য বহুবার লাঞ্চিত হয়েছেন-কারাগার যাপন করতে হয়েছে। তবু তার জীবন বিশেষত সৈনিক জীবন ছিল এক দুঃসাহসী সত্য অভিযান।

তথ্যসূত্র :
যুগ স্রষ্টা নজরুলমখান মুহাম্মদ মঈনুদ্দিন
বাংলা সাহিত্যে নজরুলমআজহার উদ্দীন খান
নজরুল চরিত মানসমড. সুশীল কুমার গুপ্ত
নজরুল প্রতিভামমোবাশ্বের আলী



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ