Inqilab Logo

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২০, ১৩ কার্তিক ১৪২৭, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪২ হিজরী

সড়কে হতাহতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে: সড়ক যেন মৃত্যুফাঁদ

সাখাওয়াত হোসেন | প্রকাশের সময় : ২৬ মে, ২০১৮, ১২:০০ এএম

রাজধানীসহ সারাদেশেই সড়ক যেন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। চালকদের অব্যাহত বেপরোয়া গাড়ি চালানো আর সাধারণ মানুষের অসচেতনতার কারণে প্রতিদিনই নিঃস্ব হচ্ছে একাধিক পরিবার। সড়কে হতাহতের সংখ্যা কেবল বেড়েই চলেছে। কেউই বিচার পাচ্ছেন না। উচ্চ আদালতের রায়ও কার্যকর হতে বিলম্বিত হচ্ছে। গত দেড় মাসে সারাদেশে চালকদের বেপরোয়া আচরণের শিকার অন্তত ১৫টি ঘটনা মানুষের মনে নাড়া দিয়েছে। এগুলো দুর্ঘটনা না হত্যা বা হত্যাচেষ্টা, তা নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। সড়কে ঘটে যাওয়া এমন ১৫টি ঘটনায় ভুক্তভোগীদের মধ্যে অন্তত পাঁচজন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে মারা গেছেন। আর ঘটনার পর হাসপাতালে নিলে একজনকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। যারা বেঁচে গেছেন, তারা হাসপাতালে শুয়ে কাতরাচ্ছেন। চিকিৎসা খরচ বহন করতে কিংবা পরিবারের প্রধান ব্যক্তিটির এ অবস্থায় বাকি সবাই শঙ্কিত বোধ করছে। পুরো পরিবারই এখন অন্ধকারে। নিরপরাধ এ মানুষগুলোর বেশির ভাগই কিছু কিছু গাড়িচালকের অতিরিক্ত আয়ের লোভ কিংবা খামখেয়ালিপনার শিকার। আর কিছু ঘটনা ঘটছে সাধারণ মানুষের অসচেতনতার কারণে। দ্রæতগামী যানবাহনের সামনে দিয়ে রাস্তা পার হওয়া বা চলন্ত গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে জীবনে ঘটছে বিপর্যয়। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় টঙ্গী থেকে উত্তরার বাসায় বিআরটিসির বাসে করে স্বামীর সাথেই ফিরছিলেন আতিকুন নেছা স্বস্তি (৫০)। আব্দুল্লাহপুর মোড়ে নামার সময় এক পা ফেলার পর অন্য পা ফেলার আগেই বাস টান দেয়। ফলে তিনি বাস থেকে রাস্তায় পড়ে যান। এ সময় বাসটি তার বাম পায়ের ওপর দিয়ে চলে যায় এবং বাম পায়ের হাঁটুর নিচ থেকে গোড়ালি পর্যন্ত থেঁতলে যায়। আহত আতিকুন ময়মনসিংহে স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে কাজ করেন। তিনি উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টরের ৩৩ নম্বর সড়কের ২০ নম্বর বাসায় থাকেন। স্বামীর নাম রফিকুল ইসলাম। তিন মেয়ে ও এক ছেলের জননী তিনি। আহতের মেয়ে জামাই তারেক হোসেন প্লাবন জানান, তাকে উদ্ধার করে প্রথমে আধুনিক হাসপাতাল এবং পরে পঙ্গু হাসপাতাল নেয়া হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে শ্যামলীর ট্রমা হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। এখানে রাত ১০টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত অস্ত্রোপচার করে তার পা কেটে ফেলেন চিকিৎসকেরা। এরপর তাকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। স্থানীয় জনতা ঘটনার সময় চালক ও হেলপারকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
উত্তরা পূর্ব থানার ওসি নূরে আলম সিদ্দিকি দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, এ ঘটনায় ঢাকা মেট্রো ব ১৪-৪৬৪৩ নাম্বার বাসটি থানায় আটক রয়েছে। এখনো কোনো মামলা হয়নি। সম্ভবত তারা রোগী নিয়ে ব্যস্ত। মামলা হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কে দুর্ঘটনায় অঙ্গহানি বা মৃত্যুর তালিকা বড় হচ্ছে। অনেক ঘটনাতেই বাস বা ট্রাক আটক হয় এবং চালকও গ্রেফতার হয়। কেউ কেউ জামিনে বেরিয়ে এসে আবারো বেপরোয়া হয়ে গাড়ি চালায়। আইনের সঠিক প্রয়োগ ও জনসচেতনতাই সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুন দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, প্রশিক্ষিত চালকের অভাব রয়েছে। একই সাথে চালকও পথচারি কেউ আইন মানছেন না। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করতে হলে সকলকেই সচেতন হয়ে রাস্তার আইন মানতে হবে। একই সাথে প্রশিক্ষিত চালকের হাতে গাড়ির দায়িত্ব দিতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
স্বজনদের অভিযোগ, সড়ক দুর্ঘটনায় কঠিন কোনো শান্তি না হওয়ার কারণেই চালকেরা মানুষ মেরেও সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ এখন বিচারের আশাও করেন না।
নিরাপদ সড়ক চাই-এর চেয়ারম্যান ও চলচ্চিত্রাভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন বলেছেন, সড়ক দুর্ঘটনার দায় একক কোনো সংগঠনের নয়। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সাধারণ মানুষ, সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, সংগঠন সবারই দায়িত্ব রয়েছে।
গত ১৭ মে রাজধানীর হানিফ ফ্লাইওভারে দুই বাসের রেষারেষিতে ঢাকা ট্রিবিউন পত্রিকার বিজ্ঞাপন বিভাগের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ মো. নাজিম উদ্দীন (৩৮) নিহত হন। পুলিশ কনস্টেবল আলাউদ্দিন ১২ মে হানিফ ফ্লাইওভারে দায়িত্ব পালন করছিলেন। যাত্রাবাড়ী থেকে ছেড়ে আসা তারাবো পরিবহনের একটি বাস তাকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। বাসের চাকা তার বা পায়ের ওপর দিয়ে চলে যায়। একটি রেন্ট-এ-কার কোম্পানির গাড়িচালক রাসেল সরকার এখনো যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন অ্যাপোলো হাসপাতালে। হানিফ ফ্লাইওভারের যাত্রাবাড়ীতে গ্রিন লাইন পরিবহনের একটি বাস তার গাড়িকে ধাক্কা দেয়। এ নিয়ে বাসের চালক ও রাসেলের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এ সময় গ্রিন লাইন পরিবহনের চালক বাস চালানো শুরু করেন। তখন রাসেল সরতে গেলে ফ্লাইওভারের রেলিংয়ে আটকে পড়েন। তার পায়ের ওপর দিয়েই বাস চলে যায়। এতে তার বা পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
গত ৩ এপ্রিল বিআরটিসির একটি দোতলা বাসের পেছনের ফটকে দাঁড়িয়ে গন্তব্যে যাচ্ছিলেন তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী রাজীব হোসেন। স্বজন পরিবহনের একটি বাস বিআরটিসির বাসটিকে ওভারটেক করার জন্য বা দিক গা ঘেঁষে পড়ে। দুই বাসের প্রবল চাপে রাজীবের হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৬ এপ্রিল রাজীব মারা যান। এ ঘটনায় হাইকোর্ট রাজীবের পরিবারকে এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশ দেন। পরে আবার হাইকোর্টের আদেশে তা স্থগিত হয়ে যায়। রাজীবের মৃত্যুর এক দিন পরই খালিদ হাসান হৃদয়ও (২০) হাত হারান। কাজ শেষে হৃদয় টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেসের বাসে করে গোপালগঞ্জ যাচ্ছিলেন। বাসের পেছনে জানালার পাশের একটি সিটে বসেছিলেন তিনি। ডান হাত দিয়ে জানালার মাঝখানের রড ধরে ছিলেন। গোপালগঞ্জের বেতগ্রাম বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বাসের পেছন দিক থেকে আসা একটি ট্রাক ওভারটেক করতে যায়। কিন্তু হঠাৎ করে ট্রাকটি বাসের পেছন অংশ ঘেঁষে চলে যায়। এতে হৃদয়ের ডান হাতটি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। হৃদয় এখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার বাবা রবিউল ইসলাম জানান, ট্রাকচালককে গ্রেফতারের পরদিনই প্রভাবশালীরা জামিনে বের করে নিয়ে যায়। তিনি বিচার পাওয়ার আশা করেন না। গত ২০ এপ্রিল রাতে বিআরটিসির দোতলা বাসের চাপায় ডান পা হারানো গৃহকর্মী রোজিনা আক্তার মারা যান ২৯ এপ্রিল। ওই মাসের ৫ তারিখ সকালে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় বিকাশ পরিবহনের দুটি বাস পাল্লা দিয়ে চলছিল। আয়েশা খাতুন তার ছয় বছর বয়সী মেয়েসহ ওই দুই বাসের মধ্যে চাপা পড়েন। রিকশাচালক ও আয়েশা খাতুনের মেয়ে অক্ষত থাকলেও আয়েশা খাতুনের মেরুদন্ড ভেঙে যায়। তিনি সাভারের সিআরপিতে চিকিৎসাধীন। দায়িত্ব পালনকালে ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শক দেলোয়ার হোসেনের পা চাপা পড়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি বাসের নিচে।
গবেষণায় দুর্ঘটনার ৯ কারণ
সমপ্রতি পিপিআরসি ও ব্র্যাকের গবেষণায় সড়ক দুর্ঘটনার ৯টি কারণ চিহ্নিত হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালনা, চালকের প্রশিক্ষণের অভাব, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বিভিন্ন গতির যানের একই সড়কে চলাচল, সড়কের ধারে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকান্ড, সড়কের নকশায় ত্রুটি, ট্রাফিক আইনের দুর্বল প্রয়োগ, সড়ক নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতনতার অভাব ও পথচারীর ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ, দুর্ঘটনা ঘটিয়ে চালকদের পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি ও অপ্রতুল শাস্তির বিধান।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন