Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২০, ২০ আষাঢ় ১৪২৭, ১২ যিলক্বদ ১৪৪১ হিজরী

নজরুলের গান ও কবিতা মুক্তিযুদ্ধের স্পৃহাকে করেছে শাণিত -প্রেসিডেন্ট

মো: শামসুল আলম খান/এস.এম.হুমায়ুন কবির | প্রকাশের সময় : ২৬ মে, ২০১৮, ১২:০০ এএম

প্রেসিডেন্ট মো: আব্দুল হামিদ বলেছেন, ভাষা সংগ্রামসহ স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গান, কবিতা ও নাটক আমাদের বার বার অনুপ্রাণিত করেছে। বিশেষত মুক্তিযুদ্ধকালে তার দেশপ্রেম ও উদ্দীপনামূলক গান ও কবিতা আমাদের লড়াই সংগ্রামের স্পৃহাকে করেছে শানিত। শুক্রবার বিকেল পৌনে ৫ টার দিকে ময়মনসিংহের ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতি বিজড়িত নজরুল একাডেমী মাঠে জাতীয় পর্যায়ে তিনদিন ব্যাপী নজরুল জন্ম বার্ষিকী’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, আমাদের জাতীয় সংগ্রাম এবং মহান মুক্তিযুদ্ধসহ সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নজরুলের লেখনী আমাদের উজ্জীবিত করেছে বলেও মন্তব্য করেন প্রেসিডেন্ট মো: আব্দুল হামিদ।
তিনি বলেন, কবি নজরুলের জাতীয়তাবোধ বাঙালির অনন্ত প্রেরণার উৎস। পরাধীন ব্রিটিশ আমলে সকল ভয়ভীতি উপেক্ষা করে তিনি বাংলা ও বাঙালির জয়গান গেয়েছেন। কাজী নজরুল সমাজ পরিবর্তনের যে অনির্বান শিখা জালিয়েছে তার আলোকচ্ছটা আমাদেরকে সোনার বাংলা গড়তে অনুপ্রাণিত করবে।
প্রেসিডেন্ট বলেন, আমার বিশ্বাস নতুন প্রজন্ম নজরুল চর্চার মাধ্যমে নিজেদের সমৃদ্ধ করবে এবং বৈষম্যহীন, সমতাভিত্তিক, একটি অসম্প্রদায়িত সমাজ বিনির্মানের প্রত্যয়ে দেশপ্রেমের মহান ব্রতে উজ্জীবিত হয়ে জাতি গঠনে অর্থবহ অবদান রাখবে।
প্রেসিডেন্ট মো: আব্দুল হামিদ আরো বলেন, বাংলা সাহিত্য-সঙ্গীতের অন্যতম পথিকৃত যুগস্রষ্টা জাতীয় জাগরণের কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তার কালজয়ী প্রতিভা ও জীবন দর্শন, মানবিক মূল্যবোধের স্ফূরণ, সমৃদ্ধশালী লেখনী বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ।
নজরুল শুধু বাংলার জাতীয় কবিই নন, তিনি জাগরণের কবি, সাম্যের কবি। তিনি শোষণ, বঞ্চনা, অত্যাচার, কুসংস্কার ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে তাঁর লেখনীতে তুলে ধরেছেন।
প্রেসিডেন্ট আরো বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল পশ্চিমবঙ্গের চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করলেও জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কাটিয়েছেন ময়মনসিংহের এই ত্রিশালে। কবির প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে আসানসোলের দারোগা রফিজউল্লাহ সাহেব তাকে তার বাড়িতে নিয়ে আসেন এবং বালক নজরুলের লেখাপড়ায় যাতে বিঘ্ন না ঘটে সে প্রত্যয়ে তিনি তাকে নিজ গ্রামে প্রেরণ করেন। এভাবেই ১৯১৪ সালে নজরুলের দরিরামপুর জীবনের সূচনা ঘটে। সেখানে তিনি দরিরামপুর স্কুলের সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন। কবি তার ময়মনসিংহ জীবনের স্মৃতিচারণ করেছেন জীবন সায়াহ্নে।
ময়মনসিংহের সাহিত্য সম্মেলনে কবিকে আমন্ত্রণ জানানো হলে শারীরিক অসুস্থতার কারণে উপস্থিত হতে পারেননি। তাই লিখিত ভাষণে তিনি বলেন, ‘এই ময়মনসিংহ আমার কাছে নতুন নহে। এই ময়মনসিংহ জেলার কাছে আমি অশেষ ঋণে ঋণী। আমার বাল্যকালের অনেকগুলি দিন ইহার বুকে কাটিয়া গিয়াছে।
এইখানে থাকিয়া আমি কিছুদিন লেখাপড়া করিয়া গিয়াছি। আজও আমার মনে সেই সব প্রিয় স্মৃতি উজ্জ্বল ভাস্বর হইয়া জ্বলিতেছে।’
প্রেসিডেন্ট বলেন, আসানসোলের রুক্ষ এলাকা হতে আগত নজরুলের মনে সুজলা, সুফলা শস্য-শ্যামলা ত্রিশালের প্রকৃতি প্রবলভাবে রেখাপাত করেছিল। প্রকৃতি প্রেম এবং সৃষ্টিশীলতার এই পরিবেশে কবিকে দারুণভাবে উদ্বেলিত করেছিল। বাঁধনহারা কবি নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবহে।
শ্রেণিকক্ষে গতানুগতিক পড়াশুনার প্রতি ততটা মনোযোগী না হলেও বরাবরই তিনি ভাল ফলাফল করতেন এবং প্রতিভাগুণে তিনি শিক্ষক ও সহপাঠীদের প্রবলভাবে আকৃষ্ট করতেন।
তিনি বলেন, কবিতার প্রতি কবির ছিল অনবদ্য আগ্রহ। বিশেষত সে বালক বয়সেই তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতার প্রতি প্রবলভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। এ সময় দরিরামপুর স্কুলে মহিম বাবুর পরিচালনায় স্কুলে একটি বিচিত্রা অনুষ্ঠান আয়োজিত হলে নজরুল সেই অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’ এবং ‘পুরাতন ভৃত্য’ আবৃত্তি করে শিক্ষক-ছাত্রসমেত উপস্থিত সকলকে তাক লাগিয়ে দেন।
প্রেসিডেন্ট আরো বলেন, সৃষ্টিশীল এই মহান কবির প্রতি সম্মান জানাতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবি ও তার পরিবারের সদস্যদের ১৯৭২ সালে কলকাতা থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। কবিকে আবাসন ও চিকিৎসা সুবিধাসহ নাগরিকত্ব প্রদান করেন। ১৯৭৬ সালে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত কবি এখানেই ছিলেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন তথ্য মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি বেগম সিমিন হোসেন রিমির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোঃ মসিউর রহমান।
নজরুল স্বারক বক্তা ছিলেন বেগম আকতার কামাল। অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক ড. সুভাস চন্দ্র বিশ্বাস। পরে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট জহিরুল হক খোকা, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল, জেলা পরিষদ প্রশাসক অ্যাডভোকেট ইউসুফ খান পাঠান, জেলা জাসদ সভাপতি অ্যাডভোকেট গিয়াস উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদক ও মহানগর জাসদ সভাপতি সৈয়দ শফিকুল ইসলাম মিন্টু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের স্বাধীন স্বত্ত¡াকে জাগ্রত করেছেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার চেতনার বসবাস আমাদের হৃদয় ও মনের গহীনে। মানুষের পরিচয় তার পোশাকে নয় ভাষা, সংস্কৃতি ও চিন্তায়। রবীন্দ্র ও নজরুল এটাতে কাজ করেছেন।
নজরুল শুধু কবি নন সঙ্গীতঙ্গ এমনটি বলেন তথ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, কবি নজরুল দার্শনিক, বাংলা ভাষার প্রধান সাহিত্যিক, জাতীয় কবি, দুই বাংলায় তার গান সমানভাবে সমাদৃত। সত্যের সংগ্রামে, সাম্যের জয়গানে, উদ্দ্যম তারুণ্যে, ইসলামী গান ও গজলে নজরুলকে আমরা পাই। শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী কলমযোদ্ধা, ধুমকেতুর মত আকস্মিক।
মন্ত্রী বলেন, নজরুল এক বিস্ময়কর প্রতিভা। তার কবিতায় আগুন ও মুক্ত একসঙ্গে ঝরতে শুরু করে। রবীন্দ্র যুগেও তিনি আলো ছড়িয়েছেন। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক, মানবতাবাদী ও সাম্যবাদী। ইসলামী রক্ষণশীলতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। নজরুলের ভাষা ও ভাবেও রয়েছে বিদ্রোহের বহি:প্রকাশ। জঙ্গিবাদী হায়েনারা পেছন থেকে ছোবল মারার চেষ্টা চালাচ্ছে অভিযোগ করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, জঙ্গিবাদ হায়েনাদের মোকাবেলায় কবি নজরুল আমাদের প্রাণশক্তি। আমাদের সন্তান যেন জঙ্গি, আগুন সন্ত্রাসী ও রাজাকারের রাহমুক্ত থাকতে পারে সেই প্রত্যাশাই করছি।
ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক (ডিসি) ড.সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ত্রিশালের মানুষের প্রাণের দাবি ছিল নজরুল জন্ম বার্ষিকী যেন জাতীয়ভাবে পালিত হয়। তাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। এজন্য সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়কে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।
তিনি বলেন, ময়মনসিংহ শিল্প ও সাহিত্যের জেলা। মহামান্য রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের আগমনে এ শিল্প ও সাহিত্য চর্চা আরো সমৃদ্ধ হবে।
এছাড়া শনিবার (২৬ মে) ও রোববার (২৭ মে) নজরুল মঞ্চে নজরুলের জীবনী নিয়ে আলোচনা, গান, নৃত্য ও নাট্যানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া তিনদিন ব্যাপী জাকঁজমকভাবে চলবে নজরুল মেলা।
প্রতিবারের মত এবারো নজরুল একাডেমী ও নজরুল কলেজ মাঠে বিশাল আয়োজনে থাকছে নজরুল গ্রামীন ও বইমেলা। ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রামীনমেলার দোকানপাট বসেছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: নজরুল


আরও
আরও পড়ুন