Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ০৬ কার্তিক ১৪২৬, ২২ সফর ১৪৪১ হিজরী

পতন আতঙ্কে বিনিয়োগকারীরা

| প্রকাশের সময় : ২৮ মে, ২০১৮, ১২:০০ এএম

সুখবরেও প্রাণ ফিরছে না বাজারে : উদ্বেগে অর্থমন্ত্রী : বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বাজেটের পর বসবেন
অর্থনৈতিক রিপোর্টার
টানা পতনে একেবারে তলানীতে ঠেকেছে পুঁজিবাজার। ধারাবাহিক দরপতন আর লেনদেনের খরায় অনেকটাই নিষ্প্রাণ দেশের শেয়ারবাজার। সরকারের পক্ষ থেকে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য দেয়া বিশেষ সুবিধা এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে চীনের দুই প্রতিষ্ঠান শেনঝেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জেকে পাওয়ার মতো সুখবরেও বাজারে প্রাণ ফিরছে না।
যদিও টানা পতনে উদ্বেগ প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বাজেটের পর পূঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বসবেন বলে উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের উৎস হিসেবে তৈরি করতে আগামী বাজেটে নীতি সহায়তা থাকবে বলে উল্লেখ করেছেন। এদিকে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের প্রভাব বেশি থাকায় এবং ২০১৭ সালে ব্যাংকগুলো ভালো মুনাফা করতে না পারার বড় প্রভাব পড়েছে বলে মত দিয়েছেন অনেকেই। সূত্র মতে, টানা পতনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মূলধন, সূচক লেনদেনের পরিমান দুটোই কমেছে। এমনকি পতনে এক বছর আগে ফিরে গেছে পুঁজিবাজার। অব্যাহত পতনের আতঙ্কে পড়েছে বিনিয়োগকারীরা। প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করতেও দেখা গেছে শতশত বিনিয়োগকারীদের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজারে প্রতিদিনই পতন হচ্ছে। দিশাহারা হয়ে পড়েছে বিনিয়োগকারীরা। এতে অস্বস্তিকর সময় কাটছে। কেনা দামের চেয়ে অনেক নিচে নামায় ক্ষতির মুখে পড়েছে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। তবু পুঁজিবাজারের ‘অস্বাভাবিক’ চিত্রে কারো টনক নড়ছে না। ক্রমগত শেয়ারের দরপতনে একটু একটু করে বিনিয়োগকারীদের পুঁজি কমে আসছে। পুঁজি হারানোর শঙ্কার পাশাপাশি আস্থার সংকট জেঁকে বসেছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। ফলে হ-য-ব-র-ল অবস্থা বিরাজ করছে দেশের শেয়ারবাজারে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তাক আহমেদ সাদেক বলেন, বাজারে যে টানা দরপতন দেখা দিয়েছে তার মূল কারণ কোম্পানিগুলো বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশিত লভ্যাংশ দিতে পারেনি। বিশেষ করে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের কোম্পানিগুলো ভালো লভ্যাংশ দেয়নি। ফলে বাজারে এক ধরনের তারল্য সঙ্কটও দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশও ভালো না হওয়ায় বাজারে শেয়ার বিক্রির চাপ বেশি। সে জন্যই বাজারে নেতিবাচক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নানা ইতিবাচক ইস্যু থাকার পরও কেন বাজার উঠে দাঁড়াতে পারছে না সে দুশ্চিন্তা বিনিয়োগকারীসহ নানা মহলে বিরাজ করছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বাজারের পতন ঠেকাতে দৃশ্যত কোনো কাজ করছে না। আর লেনদেন কম হওয়া কিংবা বাজার পতনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হিসেবে প্রথমেই ইনভেষ্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (আইসিবি) দায়ী করা হয়। আসলে বর্তমান বাজার পতন আইসিবিকেই ঘিরে হচ্ছে।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, আইসিবি সোনালী কিংবা জনতা ব্যাংকের কাছ থেকে লোন নিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে থাকে। শেয়ার দর বৃদ্ধি পেলে সেগুলো বিক্রি করে লোন পরিশোধ করার পাশাপাশি মুনাফাও করে আইসিবি। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক স¤প্রতি ব্যাংকগুলোকে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে যে, সিঙ্গেল পার্টি এক্সপোজার লিমিট ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের ১৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। আর আইসিবিকেও এ আইনের আওতায় বেঁধে রাখা হয়েছে। আগে এ আইনটি বলবৎ থাকলেও আইসিবি এর থেকে বাইরে ছিলো। কিন্তু এক শ্রেণীর বিনিয়োগকারীদের যোগসাজশে আইসিবিকে ফের এই আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এখন আইসিবি আগে যেখানে সোনালী ব্যাংকের কাছ থেকে হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত লোন নিতে পারতো। এখন সেখানে তার চেয়ে অনেক কম পরিমাণ লোন নিতে পারে। যার ফলে আইসিবি আগের মতো মার্কেটে বিনিয়োগ করতে পারছে না।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান এ বি মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, আমাদের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে এক ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। অযৌক্তিকভাবে সরকারের নির্দেশনায় ব্যাংকের সিআরআর কমানো হয়েছে। এটি আর্থিক খাতের জন্য খুব একটা ভালো লক্ষণ নয়। তবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সাতটি ব্যাংকের কিছু শেয়ার বিদেশিরা ছেড়ে দিয়েছেন। সুতরাং বিদেশিরা ব্যাংকের খুব বড় অংকের শেয়ার ছাড়েননি। এ নিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের খুব বেশি আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
এদিকে পুঁজিবাজারের বর্তমান মন্দাবস্থায়ও আইসিবি শেয়ার ক্রয়ের ক্ষেত্রে নিস্ক্রিয় রয়েছে বলে বিক্ষোভে বিনিয়োগকারীরা দাবি করে। একই সঙ্গে বিষযটি তদন্তের আহবান জানান। বাজার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পুঁজিবাজারে বেসরকারি ব্যাংকের মূলধন অনেক বেশি। এই ব্যাংকগুলো ২০১৭ সালে ভালো মুনাফা করতে না পারায় লভ্যাংশ কমেছে। কোনো কোনো ব্যাংক নগদ অর্থ জমা রেখে শুধু বোনাস শেয়ার ইস্যু করেছে। এতে ব্যাংক খাতের শেয়ারে বিক্রির চাপ বেশি। যার দরুন পুঁজিবাজারে বড় প্রভাব পড়েছে।
ব্যাংকের ঋণ আমানত (এডিআর) কমানো হলে ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট দেখা দেয়। এ জন্যই বেসরকারি ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত সুদে আমানত সংগ্রহে মাঠে নেমে পড়ে। তবে এই সংকট কাটাতে ব্যাংক মালিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত ১ এপ্রিল ব্যাংকে সিআরআর কমানো ও সরকারি আমানতের অর্ধেক বেসরকারি ব্যাংকে রাখার ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী।
ঘোষণা অনুযায়ী, সিআরআর সাড়ে ৬ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ কমিয়ে সাড়ে ৫ শতাংশ করা হয়। পাশাপাশি সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকেও নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। সিআরআর কমানোয় ব্যাংকের ১০-১২ হাজার কোটি টাকা বাজারে এলেও সরকারি আমানত এখনো পায়নি বেসরকারি ব্যাংক।
ডিএসইর এক শীর্ষ ব্রোকারেজ হাউসের এমডি নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, সুখবরেও পুঁজিবাজার উন্নতির কোনো লক্ষণ নেই। সবাই শেয়ার বিক্রিই করছে। আর বিক্রির চাপে পতনও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। কোনো একটি গোষ্ঠী দাবি আদায়ে পরিকল্পনামাফিক পুঁজিবাজারকে ফেলে দিচ্ছে। বাজারের উন্নয়নে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।
সংকটের সময় শেয়ারবাজারে সাপোর্ট দেয়া ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) অন্যতম দায়ীত্ব হলেও সা¤প্রতিক সময়ে সরকারি এ প্রতিষ্ঠান অনেকটা নিস্ক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে বাজারের টানা দরপতন দীর্ঘ হয়েছে বলে মনে করছেন শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা। তাদের অভিযোগ আইসিবি বর্তমানে শেয়ারবাজারে কোনো সাপোর্ট দিচ্ছে না।
শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অনেক বছর ধরে আইসিবির কাছে সোনালী ও অগ্রণী ব্যাংকের আড়াই হাজার কোটি টাকার আমানত রয়েছে। গত বছরের দ্বিতীয়ার্ধে এসে হঠাৎ করে বাংলাদেশ ব্যাংক এটিকে অতিরিক্ত আমানত হিসেবে উলে­খ করে ডিসেম্বরের মধ্যে ফেরত দিতে আইসিবিকে নির্দেশ দেয়। এ নির্দেশ পালন করতে হলে শেয়ার বিক্রি করতে হবে বলে জানায় আইসিবি।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, এতে শেয়ারবাজারে বিরূপ প্রভাব পড়বে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিষয়টি আমলে নেয়নি। শেষে আইসিবি বাধ্য হয়ে শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করলে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে ব্যাপক দরপতন শুরু হয়।
এ সময় গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, আইসিবি ডিসেম্বরের মধ্যে দুই থেকে তিন হাজার কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করবে। এ গুজবে পুরো ডিসেম্বরজুড়ে বাজারে দরপতন হয়। পরে এ নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ইউনূসুর রহমানের হস্তক্ষেপে অতিরিক্ত আমানত ফেরত দেয়ার সময় বাড়িয়ে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে আইসিবির শেয়ার বিক্রির চাপ কিছুটা কমে। তবে, বাজার থেকে শেয়ার কিনে সাপোর্ট দেওয়ার কাজ আর করেনি আইসিবি। ফলে আইসিবির শেয়ার বিক্রির যে নেতিবাচক প্রভাব বাজারে পড়ে তার রেশ এখনও রয়েছে- এমনটাই মনে করছেন শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএসইর এক পরিচালক বলেন, ‘আজ শেয়ারবাজারের যে অবস্থা তার জন্য আইসিবি অন্যতম দায়ী। আইসিবির শেয়ার বিক্রির চাপের কারণেই বাজারের এ অবস্থা। এর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসিও দায়ী। বাংলাদেশ ব্যাংকের কারণেই আইসিবি শেয়ার বিক্রির চাপ বাড়িয়েছিল। আইসিবি যদি গত নভেম্বরে শেয়ার বিক্রির চাপ না বাড়াত তা হলে হয়ত আজ বাজারের এ অবস্থা হতো না।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক রকিবুর রহমান বলেন, ‘এখন যে দরপতন হচ্ছে তা অস্বাভাবিক। এর জন্য দায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক। শেয়ারবাজারকে ভাল করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বরং তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ শেয়ারবাজারের বিপক্ষে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে শেয়ারবাজার স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যতগুলো পদক্ষেপ নিচ্ছে সবই শেয়ারবাজারের উন্নয়নের পরিপন্থী।’###

 

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: বিনিয়োগকারী


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ