Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫, ০৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

সরকারী পদের দায়িত্ব অর্পণের শর্তাবলী

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান | প্রকাশের সময় : ৩১ মে, ২০১৮, ১২:০০ এএম

সরকারি পদমর্যাদার আরবি প্রতিশব্দ মানসিব, এর বহুবচন মানাসিব, আভিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে শব্দটির অর্থ- পদ, পদমর্যাদা, অবস্থান, দায়িত্ব ও স্তর ইত্যাদি। এর ইংরেজি প্রতিশব্দ উবংরমহধঃরড়হ অত্র প্রবন্ধে মানসিব ও উবংরমহধঃরড়হ দ্বারা সরকারি পদ ও দায়িত্ব উদ্দেশ্য। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন দায়িত্ব, পদ ও চাকুরি সম্মান ও মর্যাদার উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। তাছাড়া রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব লাভ নাগরিকের অন্যতম অধিকার হিসেবেও গণ্য করা হয়। এ কারণে পদ অর্জনে লবিং, সুপারিশ, ঘুষ ও গিফট প্রদান ইত্যাদি বিষয়কে বৈধ মনে করা হয়। কিন্তু ইমলামে পদের চাহিদা প্রকাশ করাকে নেতিবাচক হিসেবে দেখা হয়েছে। আব্দুর রহমান ইবন সামুরা বলেন, মহানবী (সাঃ) আমাকে বললেন: হে আব্দুর রহমান, দায়িত্ব চেয়ো না। কেননা যদি তোমাকে তোমার চাওয়ার কারণে দায়িত্ব দেয়া হয়, তাহলে তোমাকে নিসঃঙ্গ ছেড়ে দেয়া হবে( দায়িত্ব পালনে তুমি আল্লাহর সাহায্য হতে বঞ্চিত হবে।)পক্ষান্তরে যদি তা না চাইতেই তোমাকে দেয়া হয় তুমি সে বিষয়ে ( আল্লাহর পক্ষ হতে) সাহায্যপ্রাপ্ত হবে। আবু মুসা আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, দু‘ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কাছে এসে দায়িত্ব চাইলে তিনি তাদেরকে বললেন: আল্লাহর কসম, আমরা এমন কাউকে কর্মকর্তা নিযুক্ত করব না, যে দায়িত্ব চায় এবং এমন ব্যক্তিকেও নয়, যে দায়িত্ব লাভের আকাক্সক্ষা করে। এ কারণেই অধিকাংশ উলামায়ে কিরাম ও সালাফ রাণ্ট্রীয় দায়িত্বকে এড়িয়ে চলতেন। ইসলাম কোন পদ চেয়ে নেয়াকে নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি কেউ কোন পদ বা দায়িত্ব পেলে তা যথাযথভাবে পালনের নির্দেশ দিয়েছে।
সরকারি পদ ও জাতীয় সম্পদ আল্লাহ প্রদত্ত আমানত হওয়ার ব্যাপারে অসংখ্য হাদীস রয়েছে। আবু যার গিফারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী করীম (সাঃ) এর কাছে আবেদন করলাম, আমাকে রাষ্ট্রীয় কোন দায়িত্ব নিযুক্ত করুন। তিনি আমার কাঁধে তার পবিত্র হাত রেখে বললেন: হে আবু যার! তুমি (এ ব্যাপারে) দুর্বল। কেননা এ আমানত এবং কেয়ামতের দিন তা অপমান ও অনুতাপের কারণ হবে। তবে যে তা ন্যায়ের সাথে গ্রহণ করবে এবং তার হক আদায় করবে তার বিষয়টি ভিন্ন।
হাদীসে সরকারি পদ ও দায়িত্বের অধিকারীদের জন্যে ‘রায়িন’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। অভিধানে এর অর্থ হলো, তদারককারী, তত্ত¡াবধায়ক, রাখাল, রক্ষক। সরকারি দায়িত্ব ও পদের দায়িত্বশীল ব্যক্তিগণও দায়িত্বের বিচারে রক্ষক ও রাখাল। তদারককারী বা রাখালের দায়িত্ব হলো রক্ষা করা এবং মালিকের নির্দেমনা অনুসারে চলা। ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: শুনো, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তার দায়িত্বাধীন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। এজন্যেই নববী নির্দেশনার আলোকে সে সময় পর্যন্ত কেউ নিজ কর্তব্য পালনে সফল হবে না, যতক্ষণ না সংরক্ষক ও দায়িত্বশীলের ভুমিকায় সে পদ ও সম্পদের ব্যবহার না করে।
কুরআন মাজিদে পদ ও সম্পদের দায়িত্ব অর্পণের মৌলিক নীতি বর্ণনা করা হয়েছে: নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে আমানতকে তার উপযুক্ত ব্যক্তিদের কাছে পৌছে দিতে হুকুম করছেন। কুরআনে মাজীদের আয়াতের আলোকে পদ ও দায়িত্ব গ্রহণের জন্য বুনিয়াদি শর্ত হলো যোগ্যতা। এই যোগ্যতার বিষয়টি হাদিসে শরীফে আলোচিত হয়েছে এই শব্দে: লোকদের জন্যে বিজ্ঞ প্রতিনিধি আবশ্যক। ‘ উরাফা’ শব্দটি ‘ আরীফ’এর বহুবচন।‘আরীফ’ শব্দের ব্যাখ্যায় ইবনে মানযূর আফ্রিকী লিখেছেন:আরীফ ঐ ব্যক্তি গুপ্রশাসন সংক্রান্ত বিষয়াদি সম্পর্কে অবগতির কারণে প্রতিষ্ঠিত ও বরণীয়। সরকারি পদ ও সম্পদের দায়িত্বপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা তখনই সম্ভব হবে, যখন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে যোগ্যতা নিশ্চিত হবে।
যাকে দায়িত্ব প্রদান করা হবে তার মধ্যে সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা পদ সম্পর্কে অবগতি ও পরিপূর্ণ জ্ঞান থাকা আবশ্যক। তবেই সে এ পদ বা সম্পদেও দায়িত্ব যথাযথ সংরক্ষণও করতে পারবে। ইফসুফ আ. মিসরের বাদশাহর কাছে ঐ দেশের রাষ্ট্রীয় কোষাগারের দায়িত্ব প্রত্যাশা করেন; তিনি বলেছিলেন: আমাকে এ দেশের ধনভান্ডার সমূহের দায়িত্বে নিযুক্ত করুন। নিশ্চয় আমি সংরক্ষক ও জ্ঞাত। তবে এ আয়াতের ইলম বা জ্ঞান দ্বারা সকল বিষয়ের উদ্দেশ্য নয়। বরং উদ্দেশ্য হলো ঐ পদ বা দায়িত্বের ইলম। ‘আস-সিয়াসাতুশ শারঈয়্যাহ’ নামক গ্রন্থে ইলম- এর পরিচয় এভাবে প্রদান করা হয়েছে-“ইলম শব্দের মর্ম ও অর্থ অনেক ব্যাপ্ত ও প্রশস্ত, প্রায়োগিক ও তাত্তি¡ক সকল বিষয় এই শব্দের অর্থের আওতাধীন। কিন্তু এখানে ইলম দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, এ পরিমাণ ইলম, যা সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা কাজের যাবতীয় তত্ত¡কে অন্তর্ভুক্ত করে”। ইলম বা যোগ্যতা যাচাইয়ের পরিমাপদন্ডও হলো, ইলম। যে কমিশন বা পরিষদ কোন ব্যক্তিকে কোন পদের জন্যে নির্ধারণ করে সে নির্বাচন কমিটির ইলমের বিষয়টি বিবেচনা করাও আবশ্যক।আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: যে ব্যক্তি কোন মুসলিমকে সম্প্রদায়ের কোন কাজের দায়িত্বে নিযুক্ত করলো এ অবস্থায় যে, সে জানে, মুসলিমদের মধ্যে এ ব্যক্তির চেয়ে অধিক ভালো কেউ আছে, যে কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাহ সম্পর্কে আরো বেশি জানে, তাহলে এই নির্বাচক ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসূল এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর সাথে খেয়ানত করলো।
উপরিউক্ত হাদিস থেকে দুটি বিষয় জানা গেলো, প্রথমত সরকারি পদ ও সম্পদের দায়িত্বের জন্যে ইলম থাকা আবশ্যক। দ্বিতীয়ত যে ব্যক্তিবর্গ বা পরিষদের কাউকে নিয়োগের ক্ষমতা অর্পণ করা হয় তাদের জন্যে অবশ্য কর্তব্য হলো, তারা যোগ্যতাকে মানদন্ড বানাবে। এ কারণে সার্ভিস কমিশনের জন্যে আবশ্যক হলো, ঘুষ, স্বজনপ্রীতি এবং সুপারিশ থেকে ঊর্ধ্বে উঠে ইলম সম্পন্ন ও পদের জন্যে উপযুক্ত ব্যক্তিকে নির্ধারণ করা।
সরকারি পদ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ সোপর্দ করার জন্যে জ্ঞানগত যোগ্যতার পাশাপাশি মানসিক ও শারীরিক যোগ্যতার পূর্ণমাত্রায় থাকা জরুরি। মানসিক ও শারীরিক যোগ্যতা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো,আকেল (পরিণত জ্ঞানবুদ্ধিও অধিকারী), প্রাপ্তবয়স্ক এবং তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী হওয়া। কেননা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পূর্বে মানুষের বোধ অসম্পূর্ণ থাকে। আকল বা মানসিক যোগ্যতা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো অনুভূতিসম্পন্ন হওয়া, পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগতি, পর্যালোচনা শক্তি, দুর্যোগপূর্ণ সময়ের মোকাবেলা করার যোগ্যতা পদের অধিকারী হবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ সম্পর্কে কুরআনে এসেছে: আল্লাহ তোমাদের জন্য তাকে (তালূত) মনোনীত করেছেন আর তাকে জ্ঞানে ও দেহে প্রাচুর্যতা দান করেছেন।শারীরিত যোগ্যতার মধ্যে রয়েছে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সঠিকভাবে কর্মক্ষম হওয়া, দৃষ্টিশক্তি অর্থাৎ দেখার যোগ্যতা থাকা, পঙ্গু না হওয়া এবং সুস্থ হওয়া। যাতে দায়িত্বশীল ব্যক্তি নিজ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোন প্রকার জটিলতার মুখোমুখি না হন।
ইসলামী শিক্ষার আলোকে সরকারি যোগ্য কর্মীর জন্যে বিশ্বস্ত হওয়া আবশ্যক। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, শুআইব আ. এর মেয়ে যখন তার পিতার কাছে মূসা আ. কে মজদুর হিসেবে রাখার আবদার করেন, তখন কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন, তার ( মূসা আ.) মাঝে মৌলিক দুই বৈশিষ্ট্য- শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত হওয়ার গুণ রয়েছে। আল্লাহ বলেন: সে দুই মেয়ের একজন তার পিতাকে বললেন, আব্বাজান! তাকে আপনি মজুর হিসেবে রেখে দিন, কারণ আপনার মজুর হিসেবে উত্তম হবে সেই ব্যক্তি যে শক্তিশালী, আমানতদার।
এ আয়াত থেকে স্পষ্ট হলো, কারো কাছে কোন পদ বা দায়িত্ব অর্পণ করতে হলে তার যোগ্যতার দিকে খেয়াল করা জরুরি। যোগ্যতার জন্যে শর্ত হলো, প্রথমত দেখতে হবে, সে শক্তিশালী কি না। অর্থাৎ তার বোধ ও দৈহিক অবস্থা এতটা মজবুত কিনা যে, সে নিজ কর্তব্য পালন এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও দাপ্তরিক কার্যক্রমকে বিগত অভিজ্ঞতার আলোকে বিন্যস্তভাবে পরিচালনার দক্ষতা রাখে। দ্বিতীয়ত হলো, বিশ্বস্ত হওয়া। কুরআন মাজীদ অন্যত্র দায়িত্বের জন্যে বিশ্বস্ত হওয়াকে যোগ্যতার অংশ সাব্যস্ত করেছে।সুরা নিসায় বর্ণিত রয়েছে, আমানতকে তার যোগ্য ব্যক্তির কাছে সোর্পদ করো। এখানে আমানত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো শাসনসংক্রান্ত দায়িত্ব তথা পদমর্যাদা। এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, মজলিস আমানতদারীর সাথে হওয়া উচিত। উদ্দেশ্য হলো, মজলিসে যে কথা আলোচনা হয় সেটা মজলিসের আমানত। ঠিক এভাবেই সরকারি বিষয়ে যে কোন গোপন কথা, তথ্য বা আইন রয়েছে সেগুলো সব রাষ্ট্রীয় পদের আমানত। আর যে আমানতের খেয়ানত করে তাকে হাদিসে মুনাফিক বলা হয়েছে।এ কারণে খেয়ানতকারী ব্যক্তি দায়িত্বের যোগ্য হতে পারে না।
রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও সম্পদ হলো, আমানত। এই আমানত সোর্পদ করার মূলনীতি ইসলামী শরীয়া স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে। ইসলামী শিক্ষামতে পদ সোর্পদ করার মানদন্ড হলো যোগ্যতা। যার মাঝে যোগ্যতা রয়েছে সে ব্যক্তিই ঐ কাজের জন্যে উপযুক্ত। এজন্যে বিভিন্ন বিভাগে কর্মী নিয়োগ করার সময় অঞ্চলভিত্তিক, সংখ্যালঘু হিসেবে, নারী অথবা মৃত চাকুরীজীবির সন্তানদের জন্যে যে কোটাপ্রথা রয়েছে, তা সুন্নাহর আলোকে তখনই বৈধ হবে, যখন এই গুরুদায়িত্ব আঞ্জাম দেয়ার জন্যে উপযুক্ত যোগ্যতা তাদের মাঝে থাকবে। যোগ্যতাশূন্য অবস্থায় কোটাপ্রথার ব্যবহার জায়েয নেই। হাদিস শরীফে রয়েছে: যখন কাজের দায়িত্ব অনুপযুক্ত ব্যক্তিকে সোর্পদ করা হয় তখন কেয়ামতের অপেক্ষা করো।
ইসলাম সরকারি পদ ও সম্পদের যথাযথ ও দায়িত্বপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্যে নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও সম্পদের দায়িত্বশীলদের জন্য আবশ্যক হলো- সর্বাবস্থায় তারা রাষ্ট্রের উপকার ও স্বার্থের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখবেন। সর্বক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি ও ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে দায়িত্ব পালন করবেন, এমনকি যে বিষয়গুলো আংশিক বা পরিপূর্ণভাবে রাষ্ট্রের উপকার সাধন করে সেসব ক্ষেত্রেও। এ প্রসঙ্গে আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদিসটি প্রণিধানযোগ্য।তিনি বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: শ্রেষ্ঠতম উপার্জন হলো শ্রমিকের নিজ হাতের উপার্জন, যখন সে কল্যাণকামী হয়। এ হাদিস অনুসারে, নিজ হাতে উপার্জনকারীর উপার্জনকে শ্রেষ্ঠ সাব্যস্ত করা হয়েছে কল্যাণকামী হওয়ার শর্তে। সরকারি কর্মকর্তার জন্য রাষ্ট্রের প্রতি কল্যাণকামী হওয়ার অর্থ হলেঅ, সে সর্ববিষয়ে উপকারের দিককে প্রাধান্য দেবে। প্রত্যেক দায়িত্ব বা পদে কর্মরত ব্যক্তির সাথে প্রথমে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের ও কর্মকর্তার মাঝে একটি চুক্তি সম্পন্ন হয়। এটিকে কর্মের চুক্তিপত্র বলা হয়ে থাকে । যে শর্তগুলোর ভিত্তিতে এই দায়িত্ব পালনের প্রতিশ্রুতি সম্পন্ন হয় সে শর্তগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খরুপে আদায় করা সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর কর্তব্য। এই চুক্তিপত্র রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তার মাঝে একপ্রকার প্রতিশ্রুতি। আর প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কুরআন শরীফে এসেছে- আর তোমরা প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করো।নিঃসন্দেহে প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে।
আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) যখন খলীফা নিযুক্ত হলেন, তখন তিনি নিজ দায়িত্বের প্রতিশ্রুতিনামা জনসম্মুখে এ ভাষায় প্রকাশ করেছেন এবং এর মাধ্যমেই তিনি নিজ দায়িত্বের সীমানা নির্ধারণ করে নিয়েছেন, তিনি বলেন: যদি আমি সঠিক কাজ করি তাহলে তোমরা আমাকে সহযোগিতা করবে, আর ভুল কাজ করলে তোমরা আমাকে সংশোধন করবে। সত্য বলা আমানত ও মিথ্যা বলা প্রতারণা। তোমাদের দৃষ্টিতে দুর্বল ব্যক্তি আমার কাছে সবল, যতক্ষণ না আমি তার প্রাপ্য দিতে পারি। তোমাদের মধ্যকার শক্তিশালী ব্যক্তি আমার দরবারে অতি দৃর্বল, যতক্ষণ না আমি তার কাছ থেকে মজলুমের হক আদায় করতে পারি।
একজন সরকারি কর্মকর্তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য, তিনি সরকারি সম্পদকে আমানত গণ্য করবেন এবং ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের মধ্যে পার্থক্য করবেণ। এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খেয়াল করা উচিত যে, দায়িত্ব বা পদচ্যুত হওয়ার সাথে সাথে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও উপকরণও তার কর্তৃত্বশূন্য হয়ে যাবে। এ জন্যে এই সম্পদকে সে সংরক্ষণকারী ও বন্টনকারী হিসেবে নিজের কাছে রাখবে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও উপকরণে অন্যায়ভাবে হস্তক্ষেপ করা বা ব্যবহার করা কখনো বৈধ হবে না।
ইসলামী রাষ্ট্র ও অন্যান্য শাসনব্যবস্থার মৌলিক পার্থক্য এটাই যে, ইসলামী রাষ্ট্রে পদস্ত ব্যক্তিবর্গ বিশ্বস্ত,সংরক্ষণকারী ও বন্টনকারী হিসেবে পালন করেন, পক্ষান্তরে সাধারণত অন্যান্য রাষ্ট্রব্যবস্থায় কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণ সরকারী উপকরণ ও সম্পদকে ব্যক্তিগত বস্তুর ন্যায় নিজ স্বর্থে ব্যবহারের ক্ষেত্রে খুব একটা কুণ্ঠাবোধ করেন না। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও উপকরণের ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিজ কর্মপদ্ধতি এভাবে বর্ণনা করেছেন: আমি না তোমাদেরকে কোন কিছু দেয়ার ক্ষমতা রাখি, আর না তোমাদেরকে কোন কিছু থেকে বঞ্চিত করতে পারি। আমি তো স্রেফ খাযানার দায়িত্বশীল। যেখানে সম্পদ খরচের হুকুম হয় আমি সেখানে সম্পদ খরচ করি।
ইসলামী শিক্ষার আলোকে কারো পক্ষে একজন সৎ ও আদর্শ সরকারি কর্মকর্তা বা দায়িত্বশীল হওয়া তখনই সম্ভব, যখন সে নিজ কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করার মাধ্যমে নিজ মাসহারা ও পারিশ্রমিককে হালাল মনে করবেন। অনেকে সময় এমন দেখা যায় যে, সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীগণ নানা বাহানায় কর্তব্য পালনে অবহেলা করে বা কাজটি অস্পূর্ণ করে ফেলে রাখে। এদেরকে যে বেতন বা বিনিময় দেয়া হয় তা গ্রহণে এরা অপরাধী। ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় শ্রমদান ও পারিশ্রমিককে হালাল মনে করে গ্রহণ করার বিষয়ে অনেক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) প্রত্যেককে শ্রমদান ও পরিশ্রমের মাধ্যমে উপার্জন করার শিক্ষা দিতেন। ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় কর্মক্ষম লোকদের কাজকর্ম না করে অলস বসে থাকা বা অন্যায়ভাবে রিযিকের অন্বেষণ করতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। উমর (রাঃ) বলেন: তোমাদের কেই যেন রিযিক অন্বেষণ থেকে বসে পড়ে এ দুআ না করে যে, আয় আল্লাহ! আমাকে রিযিক দান করুন। তোমাদের তো জানা আছে, আসমান স্বর্ণ- রুপা বর্ষণ করে না, বরং আল্লাহ মানুষদেরকে পরস্পরের মাধ্যমে রিযিক প্রদান করেন। মাসহারা এবং কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান প্রসঙ্গে কুরআনে কারীমের নির্দেশনা হচ্ছে; মানুষ তাই পায়, যা সে করে। উপার্জনকে হালাল মনে করে গ্রহণ করাও সরকারি কর্মকর্তাদের কর্তব্য। ইসলাম সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদেরকে ঘুষ ও উপঢৌকন গ্রহণ, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও অপকর্ম থেকে নিষেধ করেছে। ইসলাম এ শিক্ষাও দিয়েছে যে, সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের সবসময় দেশের ও রাষ্ট্রের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করতে হবে এবং সরকারি সম্পদকে নিজ মালিকানাধীন সম্পদের ন্যায় মনে করা ও নিজ প্রয়োজনে ব্যবহারের কোন সুযোগ নেই।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।