Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৯ আশ্বিন ১৪২৫, ১৩ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌
শিরোনাম

ই’তিকাফের মাহাত্ম্য, তাৎপর্য ও সদকায়ে ফিতর-এর মাসায়েল

মুফতি ইবরাহীম আনোয়ারী | প্রকাশের সময় : ৩১ মে, ২০১৮, ১২:০০ এএম

“নবী করিম সা. ইরশাদ করেন- ই’তিকাফকারী যাবতীয় গুনাহ হতে মুক্ত থাকে এবং তার জন্য ঐ পরিমাণ নেকী লিখা হয়, যে পরিমাণ আমলকারীর জন্য লেখা হয়ে থাকে। (সুনানে ইবনে মাজাহ, মেশকাত শরীফ, মাআরেফ, খ-১, পৃ. ১৮৩)
ই’তিকাফের অর্থ ও প্রকারভেদ: ‘ই’তিকাফ’ শব্দের অর্থ হলো- কোনো এক স্থানে অবস্থান করা। কুরআন সুন্নাহের পরিভাষায় বিশেষ শর্ত সাপেক্ষে একটা নির্ধারিত সময় সীমার মধ্যে ই’তিকাফের নিয়তে নির্দিষ্ট মসজিদে অবস্থান করাকে ই’তিকাফ বলে। আমাদের হানাফী মাযহাবের নিকট ই’তিকাফ তিন প্রকার:
ওয়াজিব ই’তিকাফ: যা কোন কাজের উপর মান্নত করার কারণে ওয়াজিব হয়। যেমন: কোনো ব্যক্তি বলল যে, যদি আমার অমুক কাজটি পূরণ হয়, তাহলে আমি এতদিন ই’তিকাফ করবো তাহলে ই’তিকাফ ওয়াজিব হয়ে যায়। অতএব, যত দিনের নিয়ত করবে ততদিন ই’তিকাফ করা ওয়াজিব হবে।
সুন্নত ই’তিকাফ: যা রমযান মাসের শেষ দশ দিনে করা হয়। নবী কারীম এই দিন গুলোতে ই’তিকাফ করতেন।
নফল ই’তিকাফ: এর জন্য কোন সময় বা দিনকাল নির্দিষ্ট নেই। যতক্ষণ বা যতদিন ইচ্ছা করা যাবে, এমনকি কেউ সারা জীবন ই’তিকাফের নিয়ত করলেও জায়েয হবে।
ই’তিকাফের শর্তসমূহ: ১. যেই মসজিদে ই’তিকাফ করা হবে ঐ মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে পড়তে হবে। ২. মসজিদে অবস্থান করলেই ই’তিকাফের নিয়ত করতে হবে। ৩. মহিলাদের মাসিক তথা ঋতুস্রাব থেকে পাক হওয়া এবং ফরজ গোসল থেকে পবিত্র হওয়া শর্ত। উল্লেখ্য যে, ই’তিকাফের জন্য প্রাপ্তবয়স্ক এবং পুরুষই হওয়া শর্ত নয়, বরং অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেও যদি বুদ্ধিসম্পন্ন হয়, তাহলে তার ই’তিকাফ সহীহ হবে। (রদ্দুল মুখতার, খ-১, পৃ. ১৫৫)
ই’তিকাফ সংক্রান্ত্র জরুরী মাসআলা
রমযান ব্যতীত অন্য সময় ই’তিকাফ: ই’তিকাফকারী রমযান মাস ব্যতীত অন্য সময়ে নফল ই’তিকাফের নিয়তে মসজিদে অবস্থান করতে পারবে।
মসজিদে প্রবেশের সময় ই’তিকাফ: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য মসজিদে প্রবেশ করার সময় ই’তিকাফের নিয়ত করে নেওয়া মুস্তাহাব। এতে মুসল্লির আমল নামায় অধিক হারে সওয়াব লেখা হয়। এমনিভাবে দ্বীনি তালিম, ওয়াজ-নসিহত, দ্বীনি আলোচনা ও কিতাবাদী পড়ার জন্য যখন মসজিদে প্রবেশ করবে তখন ই’তিকাফের নিয়ত করে নেওয়া মুস্তাহাব। (বাহরুর রায়েক, খ-২, পৃ. ৩০০)
ঘরে নফল ই’তিকাফ: পুরুষের নফল ই’তিকাফের স্থান একমাত্র মসজিদ। আর মহিলাদের ই’তিকাফের স্থান হল- বাসা বা ঘর।
এক ঘন্টা বা আধা ঘন্টার জন্য নফল ই’তিকাফ: এক ঘন্টা বা আধা ঘন্টা বা এর থেকে কম সময়ের নিয়ত করলেও ই’তিকাফ সহিহ হবে। যতক্ষণ মসজিদে অবস্থান করবে ততক্ষণ ই’তিকাফের সাওয়াব প্রাপ্ত হবে। নিয়ত এভাবে করবে যে, আমি যতক্ষণ পর্যন্ত মসজিদে অবস্থান করবো ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহকে সন্তুষ্টি করার উদ্দেশ্যে ই’তিকাফের নিয়ত করলাম। (ফাতওয়ায়ে মাহমুদিয়্যাহ)
দাওয়াতে তাবলিগের মেহনতের উদ্দেশ্যে মসজিদে ই’তিকাফ: দাওয়াতে তাবলিগের উসূল অনুসারে ই’তিকাফের নিয়তে মসজিদে অবস্থান করা, রাত্রি যাপন, আহার বা পানাহার করা জায়েয ও বৈধ। বলতে অবাক লাগে যে, কিছু নতুন ফিৎনা সৃষ্টিকারী দাওয়াতে তাবলিগের বিভিন্ন দ্বীনি আলোচনা ও কাজের উপর অহেতুক প্রশ্ন করে থাকে। আসলে তা তাদের অজ্ঞতা ও কুরআন-হাদিছ থেকে দূরত্বতার কারণে। কেননা, দাওয়াতে তাবলিগের সমস্ত উসূলসমূহ কুরআন-হাদিছ দ্বারা প্রমাণিত। তাই না জেনে অযথা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা ঠিক নয়।
নাবালেগ সন্তানের ই’তিকাফের হুকুম: অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে যদি ই’তিকাফ থাকে, সেও সাওয়াবের অধিকারী হবে। কেননা, ই’তিকাফের জন্য প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া শর্ত নয়।
টাকার বিনিময়ে ই’তিকাফ: সুন্নত ই’তিকাফকে ব্যবসার পণ্যের ন্যায় ক্রয়-বিক্রয় করা জায়েয হবে না এবং ই’তিকাফ বিক্রেতা ব্যক্তি ই’তিকাফের কোনো সওয়াব পাবে না। শুধু শুধু সে কষ্টই করবে। রমযানের শেষ ১০ দিন সুন্নত ই’তিকাফ না থাকলে পুরো মহল্লাবাসী গুনাহগার হবে। (আল হেদায়াতু শরহুল বেদায়াহ)
ই’তিকাফকারীদের জন্য আলাদা পার্টিশন দেওয়া: ই’তিকাফকারীর জন্য মসজিদের কোণে চাদর ইত্যাদি দিয়ে পার্টিশন দেওয়া বা কামরার মত বানিয়ে নেওয়া মুস্তাহাব। ই’তিকাফকারীকে অবশ্য লক্ষ রাখতে হবে, যেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত জায়গা দখল করে রাখা না হয় এবং তা নামাজীদের কষ্টের কারণ না হয়। বিশেষত কাতার ঠিক করতে যেন কোনো অসুবিধা না হয়। (আবু দাঊদ শরীফ)
ই’তিকাফকারী ঘরে গিয়ে প্রশ্রাব-পায়খানা গোসল ইত্যাদি করা: ছোট ও বড় জরুরত এবং ফরজ গোসলের জন্য যদি মসজিদের আশে পার্শ্বে পানির ব্যবস্থা না থাকে, তখন বাসায় গিয়ে জরুরত পূরণ করার অনুমতি আছে। তবে সাহ্রী ও ইফতার মসজিদে করতে হবে। এর জন্য দোকানে বা বাসায় যাওয়া যাবেনা। আর যদি ‘সাহ্রী ও ইফতার’ নিয়ে আসার জন্য কেউ না থাকে তখন বাড়িতে বা হোটেলে গিয়ে তা মসজিদে নিয়ে আসবেন এবং মসজিদেই সাহ্রী ও ইফতার করবেন।
ই’তিকাফকারী অসুস্থ হয়ে গেলে বাহির হওয়া: মুতাকিফ ব্যক্তি নিজের চিকিৎসার জন্য মসজিদ থেকে বাহির হলে তার সুন্নত ই’তিকাফ ভেঙ্গে যাবে। (বাহরুর রায়েক)
ই’তিকাফ অবস্থায় ভুলে মসজিদ থেকে বাহির হওয়া: অনিচ্ছায় বা ভুলবশত মসজিদ থেকে বাহির হওয়ার কারণেও সুন্নত ই’তিকাফ ভেঙ্গে যাবে।
ই’তিকাফকারী জানাযার নামাজে যোগদান করা: ই’তিকাফ অবস্থায় জানাযার নামাজের জন্য বাহির হওয়া জায়েয হবে না। যদি বাহির হয়, চাই জানাযার নামাজ তিনি ব্যতীত অন্য ব্যক্তি পড়াতে সক্ষম হোক বা না হোক, তার ই’তিকাফ ভেঙ্গে যাবে। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া)
ই’তিকাফ অবস্থায় মোবাইলে আলাপ করা: বিশেষ জরুরতের জন্য মোবাইলে আলাপ করার দ্বারা উক্ত ব্যক্তির ই’তিকাফ ভাঙ্গবে না। হ্যাঁ, যদি মোবাইল করতে করতে মসজিদের বাহিরে চলে যায়, তাহলে মুতাকিফ ব্যক্তির ই’তিকাফ ভেঙ্গে যাবে।
ই’তিকাফকারী যদি ধুমপানে অভ্যস্থ হয়: ই’তিকাফকারীর জন্য কুরআন-হাদিছে অনেক সওয়াব ও ফজিলতের কথা বিদ্যমান রয়েছে। তাই ই’তিকাফকারীকে ঐদিকে বিশেষভাবে দৃষ্টিপাত করতে হবে। যদি সম্ভব হয়, তাহলে দশ দিনের জন্য ধুমপান ছেড়ে দিবে।
ই’তিকাফকারী জরুরতে যাওয়ার সময় সালাম-কালাম করা: মুতাকেফ ব্যক্তি চলা-ফেরা অবস্থায় সালাম দেওয়া বা উত্তর নেওয়া অথবা কারো অবস্থা জিজ্ঞাসা করা জায়েয হবে। কিন্তু এতে দাঁড়িয়ে সালাম দেওয়া বা নেওয়া নিষেধ।
মহিলাদের ই’তিকাফের হুকুম: মহিলা যদি ঘরে ই’তিকাফ করার মান্নত করে, তখন ঘরে ই’তিকাফ করা ওয়াজিব। আর যদি রমযানের শেষ দশকে নিয়ত করে, তাহলে তা সুন্নত হবে। আর যদি এমনিতেই ঘরে ই’তিকাফের নিয়ত করে, তাহলে তা নফল ই’তিকাফ হবে। (বাহরুর রায়েক: ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া)
মহিলা ই’তিকাফকারীর মাসিক হয়ে গেলে: মহিলাদের ই’তিকাফ অবস্থায় যদি মাসিক ঋতুস্রাব শুরু হয় বা স্বামীর সাথে সহবাস হয়ে যায়, তাহলে তার সুন্নত ই’তিকাফ নষ্ট হয়ে যাবে।
মহিলা মুতাকিফ অবস্থায় খানা পাকানো: যদি মুতাকিফা মহিলার খানা ইত্যাদি পাকানোর মত কেউ না থাকে। তাহলে সে ঘরে ই’তিকাফের স্থানে খানা ইত্যাদি পাকানো জায়েয হবে, নচেৎ জায়েয হবে না।
ই’তিকাফকারী মসজিদের বাহিরে আযান দেওয়া: ই’তিকাফকারী মসজিদের বাহিরে গিয়ে আযান দেওয়া জায়েয। আর যদি ই’তিকাফকারী মসজিদের মুয়াজ্জিন হয়, তখন মসজিদের বাহিরে গিয়ে নির্দিষ্ট স্থানেও আযান দেওয়া জায়েয হবে।
জুমার দিন গোসল করার জন্য বাহির হওয়া: ফরজ গোসল ব্যতীত শুধু জুমার দিনের সুন্নত গোসলের জন্য মসজিদ থেকে বাহির হওয়া জায়েয হবে না।
ই’তিকাফ অবস্থায় মসজিদের ভিতরে ছাত্র পড়ানো: ই’তিকাফ থাকাবস্থায় মসজিদের ভিতরে ছাত্র পড়াতে কোনো সমস্যা হবে না।
মসজিদে গোসল ফরজ অবস্থায় তায়াম্মুম করা: ই’তিকাফকারী মসজিদ থেকে বাহির হওয়ার সময় তায়াম্মুম করবেন এবং বাহির হয়ে গোসল করে নিবেন। এমনকি মসজিদ নাপাক না হওয়ার জন্য সমস্ত হেকমত অবলম্বন করবেন। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া)
ই’তিকাফ অবস্থায় দুনিয়াবী কথা-বার্তা বলা: উক্ত ব্যক্তির ই’তিকাফ হয়ে যাবে। তবে সে ই’তিকাফের পরিপূর্ণ সাওয়াব পবে না। তাই বিনা প্রয়োজনে মসজিদে দুনিয়াবী আলাপ না করা উচিত। কেননা, মসজিদ দুনিয়াবী কথা বলার জায়গা নয়। এই সম্পর্কে বিভিন্ন হাদিছে হুশিয়ারী উল্লেখ আছে।
ক্বাযা ই’তিকাফ: সতর্কতা হলো উক্ত ব্যক্তি রমযানের পরে দশ দিন রোজাসহ কাযা আদায় করবে। আর তা যদি সম্ভব না হয়, তাহলে যেদিন সে ই’তিকাফ ভেঙ্গে দিয়েছে শুধু ঐ দিনের রোজা সহকারে ই’তিকাফ ক্বাযা আদায় করবে। উল্লেখ্য যে, অতীতের ক্বাযা ই’তিকাফ এই বৎসরের সুন্নত ই’তিকাফের সাথে আদায় করলে তা আদায় হবে না।
ওয়াজিব ই’তিকাফের জন্য অসিয়্যত করা উচিত: যদি কোনো ব্যক্তি সময় সুযোগ থাকা সত্তে¡ও ওয়াজিব ই’তিকাফ (তথা মান্নতের ই’তিকাফ বা ঐ সুন্নত ইতিকাফ যা শুরু করার পর নষ্ট করা হয়েছে) আদায় না করে অবশেষে মৃত্যু রোগে ঢলে পড়ে কিংবা এমন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে, যদ্দরূন উক্ত মান্নত পূরণ করা অসম্ভব, তাহলে উক্ত ই’তিকাফকারী ঐ মান্নত ই’তিকাফের কাফ্ফারা ও ফিদিয়া আদায়ের জন্য তার ওয়ারিশগণকে অসিয়ত করে যাবে।

সদকাতুল ফিতর যাকে আমরা সাধারণত রমযানের ফিতরা হিসেবে জানি তা দ্বিতীয় হিজরীর শা’বান মাসে ফরজ হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহ সা. এর মাধ্যমে সাদাকাতুল ফিতরকে ওয়াজিব করার মহান লক্ষ ও উদ্দেশ্য হল অভাবীদের অভাব দূর করা। অসহায় নিঃস্ব ব্যক্তিদের জরুরত পূরণ করা। বিশেষত রোজা রাখতে গিয়ে মানুষের ভুল-ত্রæটি মুক্ত করা। যেমন: হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
অর্থ: “রাসূলুল্লাহ সা. ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব করেছেন রোজাদারকে বে-ফায়দা ও অশ্লীল কর্মকান্ড, অপবিত্রতা হতে পবিত্র করার জন্য এবং ফকির-মিসকিনদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনের জন্য।” (আবু দাঊদ শরীফ)
সদকায়ে ফিতর কার উপর ওয়াজিব: যে ব্যক্তির উপর কুরবানি ওয়াজিব, অর্থাৎ সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা বা তার সমপরিমাণ টাকা থাকে, তাহলে তার উপর ঈদুল ফিতরের দিন সদকায়ে ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। চাই তা ব্যবসার সম্পদ হোক বা না হোক, বৎসর অতিবাহিত হোক বা না হোক, পুরুষ হোক বা মহিলা হোক কোন পার্থক্য নেই। (হেদায়া, খ-১, পৃ. ১৯০)
ছেলে-মেয়েদের পক্ষ থেকে সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব: যে ব্যক্তির উপর সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব হবে। তার উপর তার অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়েদের পক্ষ থেকেও সদকায়ে ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। (হেদায়া, রহমানিয়া খ:১ পৃ:১৯০)
মহিলাদের শুধু নিজের উপর সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব: যেই মহিলার নিকট প্রয়োজনাতিরিক্ত সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা বা তার সমপরিমাণ টাকার সম্পদ থাকবে, তার উপর শুধু নিজের সদকায়ে ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। তার উপর নিজ ছেলে-মেয়ে, মাতা-পিতা, ভাই-বোন এমনকি গরীব স্বামীর পক্ষ থেকে সদকায়ে ফিতর আদায় করা ওয়াজিব নয়। (আহকামে রমযান পৃ .১৭৫)
সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব কখন: সদকায়ে ফিতর ঈদুল ফিতরের দিন সূর্য উদয়ের সময় আদায় করা ওয়াজিব হয়, তবে এর পূর্বেও সদকায়ে ফিতর আদায় করা জায়েয আছে। সুতরাং যে ব্যক্তি উক্ত সময়ের পূর্বে ইন্তেকাল করবে বা ফকির হয়ে যাবে, তার উপর সদকায়ে ফিতর আদায় করা ওয়াজিব নয়।
নবজাতক সন্তানের সদকায়ে ফিতর: যদি সুবহে সাদিকের পূর্বে বা সুবহে সাদিকের সময় নবজাতক সন্তান জন্ম গ্রহণ করে, তাহলে সম্পদশালী পিতা তার নবজাতক সন্তানের পক্ষ থেকে ‘ফিতরা’ আদায় করা তার উপর ওয়াজিব। আর যদি সুবহে সাদিকের পর জন্ম গ্রহণ করে, তাহলে তার পক্ষ থেকে ‘ফিতরা’আদায় করা ওয়াজিব নয়। (হিন্দিয়া)
নতুন মুসলমানের ফিতরা: যদি কোন কাফির বা ফকির ঈদুল ফিতরের দিন সূর্য উদয়ের পূর্বে বা সূর্য উদয়ের সময় মুসলমান এবং সম্পদশালী হয়ে যায়, তাহলে তার উপর সদকায়ে ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। আর যদি সূর্য উদিত হওয়ার পর মুসলমান হয় সম্পদশালী হয়, তাহলে তার উপর সদকায়ে ফিতর আদায় করা ওয়াজিব নয়। (হিন্দিয়া রশিদিয়া, খ-১, পৃ. ১৯২)
দেরীতে ফিতরা আদায় করা মাকরূহ: ঈদুল ফিতরের দিন ঈদের নামাজের পূর্বে সদকায়ে ফিতর আদায় করতে হবে। ঈদের নামাজের পূর্বে সদকায়ে ফিতর আদায় না করে পরে আদায় করা সুন্নত পরিপন্থী ও মাকরূহ হবে। তা সত্তে¡ও দেরীতে আদায় করলেও আদায় হয়ে যাবে। (দুররে মুখতার, খ-২, পৃ. ৩৬৭)
বিবাহিত মেয়ের সদকায়ে ফিতর কার উপর ওয়াজিব: যদি বিবাহিতা মেয়ে পিতার বাড়িতে অবস্থান করে থাকে, তখন দেখার বিষয় হচ্ছে সে সম্পদশালী কিনা? যদি সে সম্পদশালী হয়, তাহলে সে প্রাপ্ত বয়স্কা হোক বা না হোক, তার সম্পদ থেকে নিজ ‘সদকায়ে ফিতর’ আদায় করা ওয়াজিব। কিন্তু মেয়ে যদি প্রাপ্ত বয়স্কা বটে, কিন্তু সম্পদশালী নয়, তাহলে তার সদকায়ে ফিতর আদায় করা ওয়াজিব নয়। আর যদি মেয়ে অপ্রাপ্ত বয়স্ক হয় এবং স্বামীর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া না হয় অথবা সম্পদশালীও না হয়, তাহলে পিতার উপর তার ‘সদকায়ে ফিতর’ আদায় করা ওয়াজিব। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া)
রোজা না রাখলেও সদকায়ে ফিতর আদায় করা ওয়াজিব: যদি সম্পদশালী ব্যক্তি কোনো কারণবশত রমযানের রোজা রাখতে না পারে, এরপরেও তার ‘সদকায়ে ফিতর’ আদায় করা ওয়াজিব। নচেৎ, সে গুনাহগার হবে। (ফতোয়ায়ে শামি, খ-১, পৃ. ১৬৩)
সদকায়ে ফিতর এর পরিমাণ: সদকায়ে ফিতর হচ্ছে খেজুর, যব, গম, আটা বা এগুলোর নগদ মূল্য টাকা পয়সা দ্বারা ‘সদকায়ে ফিতর’ আদায় করা যাবে। (হিন্দিয়া, খ-১, পৃ. ১৯৩)
মাসআলা: যদি সদকায়ে ফিতর গম বা আটা দ্বারা আদায় করতে চায়, তাহলে এক ছা’ অর্থাৎ আনুমানিক সাড়ে তিন সের ভালো মানের খেজুর বা তার মূল্য আদায় করতে হবে। (রশিদিয়া খ-১, পৃ. ১৯১)
মাসআলা: যদি সদকায়ে ফিতর খেজুর দ্বারা আদায় করতে চায়, তাহলে পৌনে দুই সের (তথা- ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম) ভালো মানের গম বা আটা সদকা করতে হবে। আর যদি মূল্য আদায় করতে চায়, তাহলে উক্ত গম বা আটা পরিমাণ মূল্য সদকা করে দিবে। (দুররে মুখতার, খ-১, পৃ. ৩৪৬)
সদকায়ে ফিতর কাকে দিবে: যে সমস্ত লোকদেরকে জাকাত দেওয়া যায়, তাদেরকে সদকায়ে ফিতরও দেওয়া যায়। আর যে সমস্ত লোকদেরকে জাকাত দেওয়া জায়েয নাই, তাদেরকে সদকায়ে ফিতর দেওয়াও জায়েয নাই। (ফতোয়ায়ে শামি, খ-২, পৃ. ৩৪৪)
সদকায়ে ফিতরের টাকা দিয়ে মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ: সদকায়ে ফিতরের টাকা দিয়ে মসজিদ, মাদ্রাসা, রাস্তা, হাসপাতাল নির্মাণসহ জনকল্যাণমূলক কাজ করা জায়েয হবে না; বরং উক্ত টাকা গরিব-মিসকিন তথা যাকাতের উপযোগীদেরকে বন্টন করে দিতে হবে।
মাদ্রাসার গরিব ছাত্রদেরকে ফিতরা দেওয়া উত্তম: মাদ্রাসার গরিব ছাত্রদেরকে সদকায়ে ফিতর দেওয়া অধিক উত্তম। কেননা, এতে ‘সদকায়ে ফিতর’ আদায়ের সাথে সাথে ‘সদকায়ে জারিয়াহ’ এর সওয়াবও অর্জন হয়।
একজনকে একাধিক সদকায়ে ফিতর দেওয়া: একটি সদকায়ে ফিতর একজন ফকির মিসকিন বা একাধিক ফকির মিসকিনকেও প্রদান করা জায়েয। এমনিভাবে একজনকে একাধিক সদকায়ে ফিতর দেওয়াও জায়েয ও বৈধ হবে। (ফতোয়ায়ে শামি, খ-২, পৃ. ৩৬৪)
ঋণের পরিবর্তে ফিতরার টাকা কর্তন করা: কোনো ধনী ব্যক্তি কোনো অসহায় ব্যক্তির নিকট ঋণ পাওনা থাকে, এমতাবস্থায় যদি ধনী ব্যক্তি ঋণের পরিবর্তে গরীব থেকে সদকায়ে ফিতরের টাকা কর্তন করে, তাহলে তার সদকায়ে ফিতর আদায় হবে না।
কারাবদ্ধ ব্যক্তিকে ফিতরা দেওয়া: যদি কোনো কারাবদ্ধ গরীব এবং জাকাতের উপযোগী হয়, তাহলে তাকে বা তার পরিবারকে জাকাত ও সদকায়ে ফিতরের টাকা দিতে পারবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।