Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৯ আশ্বিন ১৪২৫, ১৩ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

শূন্য

কা ম রু ল হা সা ন দ র্প ণ | প্রকাশের সময় : ৪ জুন, ২০১৮, ১২:০০ এএম

১.
রায়নার ওপর থেকে মহব্বত নেমে যায়। যেন সূর্য থেকে এক টুকরো কালো মেঘ সরে গেল। ঘামে শরীর চুপচুপ। হাঁপাতে থাকে। মেঘে ঢাকা অবস্থায় বেশ সুখে ছিল রায়না। মনে হচ্ছিল আরও চাই, আ-র-ও। দশ মিনিটের চাওয়ার পর তার ইচ্ছার পরিসমাপ্তি ঘটে। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে মানুষের চাওয়ার সীমাবদ্ধতা আছে, বুঝতে পারে। ক্ষণিক পরে সেই চাওয়াই অক্টোপাসের মতো হিল হিল করে জেগে ওঠে। পেঁচিয়ে ধরে। হাহাকার করে ওঠে মন। দু’চোখের কোল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে রায়নার। প্রতিবারই এমন হয়।
২.
নিম্ন ও মধ্যবিত্তের মাঝামাঝি এক পরিবারে রায়নার জন্ম। যেখানে চাওয়ার শেষ নেই। যোগ্যতার চেয়ে আশার পরিধি বড়। চাওয়া-পাওয়ার ব্যবধানে যে শূন্যস্থান, সেখানে তাদের হাহাকার বসবাস করে। রায়না সুন্দরী। চলতে ফিরতে যে সৌন্দর্য চোখে পড়ে, তার ব্যতিক্রম। কোকাকোলার বোতলের মতো ঢেউ খেলানো শরীর। বাঁকে বাঁকে ভাদ্র মাসের ভরা নদীর যৌবন টল টল ঢল ঢল করে। দেহপাত্র উপচে পড়া নবীন যৌবন। ঝকঝকে। হেঁটে আসলে মনে হয় তলোয়ার আসছে। বখাটেরা ছোঁক ছোঁক করে। হাতের আঙ্গুল চিরুণী বানিয়ে আউলা চুল টেনে পিছে নিয়ে যায়। নিচের ঠোঁট কামড়ে মন্তব্য করে- ইস্ মালডা কি! যদি একবার...। রোমিওরা তৃষিত নয়নে বুকভরা ভালবাসা নিয়ে চলার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। উপেক্ষা করে চলে রায়না। সবাই চায়। ওকে চায়। ও চায় একজনকে। নিউটন। বড়লোকের ছেলে। ক্লাস সেভেন থেকে সম্পর্ক। এইটে উঠেই আমেরিকা চলে যায়। ওখানেই পড়াশোনা করে। ওদের ভালবাসা ঠাঁই নেয় চিঠিতে। কত মায়া, মমতা আর লিপস্টিকমিশ্রিত দু’ঠোটের কত রক্তিম ছাপ চিঠির শেষ ভাগে এঁকে, তার উপর ‘কিস্ মি’ লিখে লাল-নীল-হলুদ খামে ভরে পাঠিয়েছে রায়না। তার সাক্ষী এ আকাশ, বাতাস, ডাকপিয়ন আর অন্তর্যামী। আশা, স্বপ্ন, কল্পনা, আবেশ, আবেগ, মমতা, ক্ষমতার বুননে মনকে বহুবর্ণে রাঙ্গিয়েছে। নিউটন ফিরবে। বিয়ে হবে। অভাব অনটন মাড়িয়ে পর্বতসম চাওয়া-পাওয়ার শিখরে উঠবে। যা চাইবে তা-ই পাবে। অপ্রাপ্তি, অপূর্ণতা দু’পায়ে লুটাবে। ওহ্ স্বপ্ন! কী স্বপ্ন!
৩.
বিএ পাস করে রায়না। নিউটন ফেরে। দেখা হয়। কতদিন পর! আবেগ নিমেষে গলে অশ্রুহয়ে দু’চোখে ঝর্ণাধারার সৃষ্টি হয়। নিউটন আর আগের মতো নেই। কী সুন্দর! হ্যান্ডসাম। হাঁসের বাচ্চার মতো। জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে। বাসায় আগেই বলে রেখেছিল- এই হাঁসের বাচ্চা ছাড়া কাউকে বিয়ে করবে না। বাবা-মা রাজি। উপায় নেই। সামান্য সরকারি চাকরি। পাঁচজনের সংসার। রায়না বড়। ছোট দু’বোন। একজন অনার্স প্রথম বর্ষে। পরেরটা সিক্সে। তিন মেয়েকে পাড় করতে হবে। আমেরিকা ফেরত চেলে। বিয়ে করে বউ নিয়ে চলে যাবে। এর চেয়ে ভাল পাত্র, স্বপ্নের মতো। ঠিক হয়। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিউটনের বাবা-মা প্রস্তাব নিয়ে আসবেন। রায়নাকে আংটি পরিয়ে যাবেন।
৪.
ড্রেসিং টেবিলের সামনে রায়না। টেবিলের উপর আই লাইনার, আইল্যাশ, লিপস্টিক, ফেস পাউডার, ব্লাশঅন আরও কত কি! আজ পৃথিবীর সেরা সাজে সাজবে ও। দুপুরের দিকে ঘষে ঘষে গোসল করে। ঘষাঘষির কারণে বাঁ বুকের বাঁ দিক ছিলে গেছে। বেশ জ্বলছে। বার বার হাত চলে যায় ওখানে। কী বিশ্রী ব্যাপার! এমন দিনে এমন ঘটনা। তার ওপর গরম। ওহ্ কী গরমরে বাবা! বেছে বেছে এ দিনেই! থাক্ গরম পড়–ক। বৃষ্টি না এলেই হলো। নিজকে সান্ত¡না দেয়। কিন্তু সমস্যা, ঘামে সব ভিজে যাচ্ছে। মেকাপের প্রলেপ ভেদ করে মুখে স্বেদবিন্দু জমে। বার বার পাফ করে। কী প্রাণান্তকর চেষ্টা! আই লাইনার দিয়ে চোখের রেখা আঁকে। এক টানে পটলচেরা। ভেজা ভেজা টলমল। মনের আনন্দে গেয়ে ওঠে, ‘আমার প্রিয়া লজ্জা পেতে পারে... আহা কাছে এসেও ফিরে যেতে পারে।’ কখন যে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে, জানে না। আয়নার সামনে বাতাসে হাত উড়িয়ে ঘুরে ঘুরে নেচে নেচে গেয়ে ওঠে। পরনে পেঁয়াচের খোসার রংয়ের মতো শাড়ি। রান্নাঘর থেকে সুবাস আসছে। একসঙ্গে ঝাল-মিষ্টির ঘ্রাণ। একটার পর আরেকটা নাকে লাগছে। ডাক এলো, কইরে রায়না! তরকারীর লবণটা দেখে যা! আনন্দ আর টেনশনের মিশ্রণে গতির সৃষ্টি হয়। ছুটে আসে। পাশে বসে। রায়নার দিকে তাকিয়ে রাহেলা বেগম চমকে ওঠে। এ কাকে দেখছেন তিনি। ও কে... ও কে....। আমার জঠরজাত কন্যা? এতো বড়... এতো বড় ও! অশ্রুতে ভরে ওঠে দু’চোখ।
-কই মা, দাও! রায়নার কথায় কান্না থেকে রান্নায় ফেরে রাহেলা বেগম।
চামচে এক টুকরো গোশত এগিয়ে দিয়ে বলল,
- এই নে। তাড়াতাড়ি কর, ওদের আসার সময় হয়ে এলো।
গোশতের টুকরো রায়নাকে বাড়িয়ে দিতে গিয়েই টপ করে এক ফোঁটা অশ্রু রাহেলার চোখ থেকে পড়ে যায়। রায়না দেখে। দেখতে চায় না। বোঝে। বোঝাতে চায় না। পরাণের ওপর পাষাণের হালকা চাদর বিছিয়ে দেয়।
-খুব স্বাদ হয়েছে মা। এবার হাঁড়ি উঠিয়ে ফেলতে পার। বলেই দ্রুত রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। বিছানায় লুটিয়ে পড়ে।
এদিকে ভালবাসা। অন্যদিকে মা-বাবা- বোন। মাঝে আমি। রায়নার কান্না থামে না।
৫.
রায়না যে কথা বলে নিজকে সান্ত¦না দিয়েছিল, বৃষ্টি না আসুক; বৃষ্টি আসেনি। ঝড় এসেছিল। স্বপ্ন ভাঙ্গা ঝড়! প্রকৃতি বিরূপ। বাইরে ঝঞ্ঝা। মনের ভেতর টর্নেডো। মনকে উপড়ে কোথায় যে নিয়ে ফেলেছে, হদিস পাওয়া যায়নি। রায়না আর খোঁজেওনি।
৬.
একটি বেসরকারি কোম্পানিতে রিসেপশনিস্টের চাকরি নেয় রায়না। এসব কোম্পানিতে সুন্দরীদের ‘ডেকোরেশন পিস’ হিসেবে রিসেপশনে বসিয়ে রাখা হয়। আদি ব্যবসার উন্নত সংস্করণ। চার্ব্য ও চোষ্যের বদলে দৃষ্টি ও মনের লেহন ক্রিয়া বেশ আয়েশ করে করা যায়। ওর চাকরি নেয়া প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। দুই পরিবারের ভরণ-পোষণ একা সামলাতে পারছিলেন না বাবা। দুই বিয়ে করলে যা হয়। ফলে রায়নাকেও তার আপন দুই বোন ও মায়ের অর্ধেক দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়। ছেলে হয়ে যায় সে।
৭.
বাসা বদল করে রায়নারা কাফরুলে ছয়তলা বাড়ির তিন তলায় ওঠে। মাসখানেকের মধ্যে রায়নাকে বাড়িওয়ালার ছোট ছেলে মাসুমের মনে ধরে। কেমন কেমন করে। রায়না বেশ বুঝতে পারে। প্রেমের গভীলতার কারণে সকরুণ ও প্রণয় দৃষ্টি নিয়ে তাকাতে গিয়ে মাসুমের ডান চোখ অজান্তে বুঁজে আসে। ভাবখানা এমন, তাকে ছাড়া বাঁচবে না। কিছুতেই না। প্রাণ বিসর্জন দেব- এমন ভাব নিয়ে দাঁড়য়ে থাকে। বাড়িওয়ালাদের অকর্মন্য ছেলেরা যা চায়, প্রাণ দিয়ে চায়। বসে বসে খেতে পারার খেসারত। মাসুম খুব ইনিয়ে-বিনিয়ে রায়নাকে ভালবাসার কথা বলতে চায়। অকারণে দরজায় টোকা দিয়ে বলে, পানি ঠিকমত পাচ্ছেন তো! কোনো সমস্যা হলে বলবেন কিন্তু। রায়না বোঝে-এ সবই ছুঁতো। মনে মনে হাসে। তার এ সরল ভঙ্গি ভাল লাগে রায়নার। অতীত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় ও অনেক ভেবেচিন্তে সে ঝুঁকে। তার লোভ আছে। চাহিদা পূরণ করে একটা নিশ্চিন্ত জীবনের লোভ। টানাপড়েন আর কত!
৮.
সুন্দরীদের কপাল ভাল। যাকে চায় তাকে পায়। বৃদ্ধ থেকে বালক পর্যন্ত কদর। চলতি পথে সবাই ঘাড় ঘুরিয়ে হলেও একবার দেখে নেয়। কেউ ট্যাঁরা চোখে, কেউ ঢুলু ঢুলু চোখে। মুচকি হাসিতে উল্টে পড়ে। ‘আ’ করলে জ্ঞান হারায়। সব হাটেই বিকোয়। এক্ষেত্রে তাদের ইচ্ছাই যথেষ্ট। মাসুমের প্রতি রায়না ইচ্ছা পোষণ করে। ইচ্ছার রেশ ধরে বেশ ভাল সময় কাটে তাদের। অফিস থেকে বাসা। বাসা থেকে ছাদে। একেকটি বিকেল রূপকথার হাঁসের সোনার ডিম হয়ে আসে। স্মৃতি গহবরে থরে থরে ডিমগুলো সযত্নে সংরক্ষণ করে। প্রশস্ত ছাদের দক্ষিণে দোলনা। বিশাল ছাতা। তার নীচে গোলটেবিল। চারপাশে চেয়ার। দোলনা রায়নার প্রিয়। প্রতি বিকেলে সে দোলনায় বসে, দোলে। তার স্বপ্ন দোলে। একেকটি স্বপ্ন সোনার আলোয় মোড়ানো পিগু হয়ে মনের অন্তঃপুরে সূর্য হয়ে কিরণ দেয়। আলোকিত হয় অন্তর। এই দোলনায়ই হয়তো বাকি জীবন দোল খাবে। বিমুগ্ধ হয়ে রায়নার তন্ময়তা দেখে মাসুম। মাঝে মাঝে টব থেকে গোলাপ ছিঁড়ে চুলে গেঁথে দেয়। কী সুন্দর সময়! রায়নার মনপুকুরে ছোঁড়া আশার ছোট্ট ঢিলের বৃত্ত প্রসারিত হয়ে ধীরে ধীরে পাড়ের দিকে ধাবিত হতে থাকে। তীরে মিলবে। পূর্ণতা পাবে। একদিন বিকেলে রায়না যখন কালো পাড়ের সাদা শাড়ি পরে, চুল ছড়িয়ে দোলনায় দোল খেতে খেতে গুনগুন করে গাইতে গাইতে আকাশ দেখছিল, এমন সময় মাসুম পেছনে দাঁড়িয়ে এ অপরূপ দৃশ্য দেখে থমকে যায়। তার মন দুমড়ে-মুচড়ে কাগজের মতো কুঁচকে ওঠে। ‘ওকে পাব না! ওকে পাব না! অন্যের হয়ে যাবে’- এমন হৃদয় বিদীর্ণ করা ভাবনা উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে তরঙ্গায়িত হয়ে তার অন্তরের এক‚ল থেকে ওক‚লে শূন্যতার ভেতরে দিয়ে হায় হায় করে ছুটে যায়।
-কখন এসেছ? দোলনা থেকে ছোট্ট একটি লাফ দিয়ে ঘুরেই মাসুমের সামনে দাঁড়ায় রায়না। থামে না। মনের আবেগ আর উচ্ছাস নিয়ে বলে যায়-
- কী সুন্দর বিকেল, তাই না! কাঁচা হলুদের রঙের মতো রোদ গাছের পাতায় কেমন লেপটে আছে দেখ!
মাসুম ছোট্ট করে বলল,
- হু।
- কী হয়েছে তোমার? মন খারাপ?
- তোমাকে একটা কথা বলা দরকার রায়না। বিরতি না দিয়েই বলল,
- তোমার সাথে মনে হয় বিয়েটা হচ্ছে না। আব্বা-আম্মা কিছুতেই রাজি হচ্ছেন না। বলেছেন ওই মেয়েকে বিয়ে করলে ঘাড় ধরে বাসা থেকে বের করে দেব, হারামজাদা।
রায়না কিছু বলে না। ওর পরণের শাড়ির কালো পাড় মুহূর্তে গ্রাস করে নেয় সাদা জমিন। মনপুকুরে ছোঁড়া ঢিলটি ক্যামেরার মতো রিউইন্ড করে হাতে নিয়ে পিষ্ট করে ফেরে। শূন্য হয়ে যায় মান। অসীম শূন্যতায় শুধু ভেসে বেড়ায় আমার কী দোষ... আমার কী দোষ!
৯.
অফিস নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে রায়না। তার একটাই চিন্তা-মা আর বোন। কিন্তু এক জায়গায় চিন্তা স্থির করলেও কিংবা আর কাউকে নিয়ে না ভাবলেও, অন্যরা তাকে নিয়ে ভাবে, ভাবতে শেখায়। তলোয়ার নিজেকে না কাটলেও অন্যকে কাটে। এই অন্যদের একজন সোহেল রহমান। হ্যান্ডসাম। স্মার্ট। ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন। এসবের আড়ালে তার বয়স ঢাকা পড়ে গেছে। ধরে নেয়া যায় ৪০ আর ৫০-এর মাঝামাঝি একটি অনির্দিষ্ট বয়স। ব্যবসায়িক কাজে রায়নার অফিসে প্রায়ই আসেন। শিল্পপতি। সতেরটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী। শিপিং ব্যবসা। স্পষ্টবাদী। যা বলেন সরাসরি বলেন। কথায় দৃঢ়তা। রুক্ষতা নেই। ব্যবসায়িক কাজে সোহেল রায়নাদের অফিসে প্রায়ই আসে। রিসিপশনে রায়নার সঙ্গে শুধু অফিসিয়াল ষ ৩৬ পৃষ্ঠার পর
কথাবার্তা হয়। এমডি সাহেব রুমে আছেন কিনা এ জাতীয় কথাবার্তা। এসব কথাও তার জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন নেই। শুধু কথার সম্পর্কটা বজায় রাখা। এর বেশ কিছু নয়। রায়না লক্ষ্য করে ইদানীং সোহেল রহমানের আসা-যাওয়া বেড়ে গেছে। তার চরিত্র বিরুদ্ধ অপ্রয়োজনীয় কথাও জিজ্ঞেস করে।
১০.
মায়ের জন্য রায়নার খুব টান। যতটা বাবার প্রতি তার অনেক গুণ। বাবার দ্বিতীয় বিয়ে, মায়ের সতীনের সংসার, তার সৎ মা- বিষয়গুলো যন্ত্রণা দেয়। ও কি করবে! জন্ম তো বদলে ফেলা যায় না। কী এক অসহায় অবস্থা! এসব যন্ত্রণা কাউকে বলা যায় না। প্রকাশ করা যায় না। শুধু বিয়ের সময় প্রকাশ হয়ে পড়ে। বিয়ে ভেঙ্গে যায়। মায়ের প্রতি তার অসীম টানের কারণ-পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মানুষ তার মা। তাকেও সৎ মায়ের সংসার করতে হয়েছে। বিয়ের পর সতীনের সংসার। এর চেয়ে অসহায় কে? আর কে? দু’চোখের কোল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে রায়নার। সন্ধ্যায় ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছে। এসব কথা তার মনে কালো কুচকুচে দাঁড় কাক হয়ে তারস্বরে চিৎকার করে উঠে বেড়ায়। ওর ছোট বোন দীপা এসে বলল, আপু সুমন ভাই এসেছে। মনটা কেমন করে ওঠে। এসব কথা একমাত্র সুমনের সঙ্গে শেয়ার করে। সুমন মন দিয়ে শোনে। বন্ধুর মতো। দু’হাতে চোখের জল মুছে ড্রইং রুমের দিকে যায়।
- এতো দিন পর মনে হলো আমার কথা? সেই যে গেলেন.....
- এতো কাজ থাকে... এতো কাজ.... বুঝেছ.... সময় করে উঠতে পারি না। আজও আসা হতো না। এদিকে একটা কাজ থাকায়.... ভাবলাম তোমাদের বাসা হয়ে যাই। সুমন মিথ্যা বলে। ও রায়নাকে দেখতেই এসেছে। সুমন ওর দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাই। রায়না ভাল করেই জানে সুমন ওকে পছন্দ করে। তার হাবভাবে বোঝা যায়। দ্বিধা-দ্ব›েদ্ব ভোগে রায়না। সুমন ভাল ছেলে। একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে এক্সিকিউটিভ পদে আছে। ডিপেন্ডেবল নয়। বাবার সংসারে যে কষ্ট করছে, স্বামীর ঘরে তা চায় না। ওর দরকার নিশ্চিত ছায়া। সুশীতল জীবন। তারপরও সুমনের ব্যাপারে সে মাঝামাঝি অবস্থানে। বিষয়টা এমন, বেশি বিপদ হলে টুক করে সুমনের নৌকায় উঠে পড়বে। লাস্ট স্টপেজ!
- সুমন ভাই, কাল কি আপনার সময় হবে?
- কেন বলতো?
- আপনার সঙ্গে একটু বের হবো।
সুমন চিন্তা করে।
- হবে, কখন?
- পাঁচটায় আমার অফিসে চলে আসেন।
১১.
রায়নাকে সুমনের কাছে উড়ন্ত-দূরন্ত মনে হয়। এক ধরনের বুনো সৌন্দর্য ঘিরে রয়েছে। সুমন ভয় পায়। কিন্তু নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও পোকা আগুনের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য ঝাঁপ দেয়, জীবন উৎসর্গ করে সুখ পায়, সুমন অতটা না পারলেও কাছাকাছি যেতে চায়। এটা তার মনের চাওয়া, সাহসের নয়। ঘাপটিমারা নীতি নিয়ে বসে থাকে। সুযোগ বুঝে কোনো একদিন সাহসকে সাথে নিয়ে বলে ফেলবে ‘আমি তোমাকে ভালবাসি’। কথাটা প্রাচীন এবং হ্যাংলামি হলেও এর বিকল্প কোনো বাক্য আজও আবিষ্কার হয়নি। একথা মনে মনে রাখলে প্রেমিক এবং প্রেমিকা উভয়ের জন্য লস। কোনো এক সময় এক পক্ষ সরে গিয়ে বিস্ময়ের সঙ্গে বলতে পারে, কই, আমি তো বলিনি তোমাকে ভালবাসি! বলো বলেছি! বলেই টা টা বাই বাই বলে সটকে পড়বে। কাজেই কোনো ভাববাচ্যে নয়, ভালবাসাকে টেটা বানিয়ে সরাসরি ছুঁড়ে মারতে হবে। গেঁথে ফেলতে হবে। তা না হলে প্রেমিক বা প্রেমিকা বাইম মাছের মতো স্লিপ কেটে বেরিয়ে যেতে পারে। কেউ পছন্দ করুক আর নাই করুক। রাগ হোক আর আনন্দ হোক-উভয় ক্ষেত্রেই ভালবাসার প্রস্তাবে তার হৃৎপিন্ড তিরতির করে কেঁপে উঠবে। কাজেই ভালবাসা প্রকাশ করতে হবে। মনে মনে ভালবাসার কোনো দাম নেই। আমি তোমাকে ভালবাসি, তুমি জানলে না- এ ভালবাসার অর্থ হয় না।’ মরে গেলে তোমার প্রতি আমার গভীর ভালবাসা, আমার সঙ্গে সমাধিস্থ হয়ে যাবে। তাতে তোমার কোনো লাভ নেই। তুমি তো জানলেই না। অতএব নো ভাবাভাবি, বলো বীর আমি তোমাকে ভালবাসি! ভালবাসার চিরন্তন এই বাক্যতীরে বিদ্ধ করে ফেল রায়নাকে। সাহসী হয়ে ওঠ সুমন।
১২.
রায়নার সঙ্গে সুমনের বের হওয়া এবারই প্রথম নয়। এর আগেও বেশ কয়েকবার বের হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছে। বেইলী রোডের নাটক পাড়ায় নাটক দেখেছে। বাসায় পৌঁছে দিয়েছে। সন্ধ্যায় পৌঁছে দেয়ার সময় যখন সিএনজি দিয়ে যেত, সুমন লক্ষ্য করত রায়না খুব কৌশলে তার পার্সটি দু’জনের মাঝামাঝি রেখে বসত। যেন ম্যাচের কাঠি আর ম্যাচবঙ্গের পাশ। ঘষা না লেগে যায়। লাগলেই সর্বনাশ! জ্বলে উঠবে। পার্সটিকে তখন সুমনের কাছে পাহাড় মনে হতো। পাহাড়ের দু’পাশে দু’জন। তারপরও একদিন সাহস করে সুমন বলে ফেলে, তোমার হাতটা একটু দেবে? রায়না দ্বিধা করলেও পাহাড়ের উপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে দেয়। পাহাড়টিকে তখন কত ক্ষুদ্র মনে হয়েছে। যেন এক লাফে সুমন হিমালয় চূড়ায় উঠে গেছে। রায়নার হাত ধরে চোখ বন্ধকরে বসে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর ছেড়ে দিয়ে বলে, থ্যাঙ্ক ইউ! রায়না মিটিমিটি হাসে। মনে মনে বলল, বালক! এটা ছয় মাসন আগের ঘটনা। ছয় মাস পর ওদের বাসায় আজ এলো সুমন। মনে পুলক নিয়ে বেরিয়ে আসে। রায়না যেভাবে আহলাদ আর অভিমান নিয়ে বলল, আমার কথা মনে পড়লো! তার মানে কি... মানে কি! অনেক কিছু। সুমনের মনে আনন্দ আর স্বস্তির স্রোত। সাহস বেড়ে তিনগুণ। স্বস্তি, রায়না এখন অন্য কারো সঙ্গে বাঁধা নেই। ও খারি। অবশেষে রায়না আমার কাছেই এলো, আমারই হলো- এমন ভাবনায় উতলা হয়ে ওঠে। ধৈর্য্যরে ফল আছে। সেই ফল এখন আমার হাতের মুঠোয়। আবেগে উচ্ছাসে কান্না এসে পড়ে সুমনের। মনে মনে পরিকল্পনা করে। রায়না আর আমার দু’জনের চাকরিতে- সংসার বেশ কেটে যাবে। অনেক উঁচুতে দু’রুমের ছোট্ট একটা বাসা নেবো। ষোল-সতের তলায়। আকাশের কাছাকাছি। শূন্যে। সেখানে বসে জোছনা আর নিচের দৃশ্য উপভোগ করা যাবে। বিকেলে বারান্দায় বসে দু’জনে চা খাবো। গল্প করবো। খোঁচাখুঁচি করবো। ছোট্ট সিমসাম সংসার! প্রাণ খুলে হাসব হা হা হা...। হা হা করতে করতেই ঘুম ভেঙ্গে যায় সুমনের। বিছানা থেকে লাফিয়ে ওঠে। শরীরে কেমন একটা আবেশ জড়িয়ে আছে। মুখে স্বপ্নের হাসি। আজই তার সেই স্বপ্নের দিন। অনেক অপেক্ষা আর আক্ষেপ শেষ হবে আজই। বাসা থেকে দ্রুত বেরিয়ে পড়ে। টেনশন আর উত্তেজনায় কোনো কাজেই মন বসছে না। দিনটাকে দীর্ঘ মনে হচ্ছে। এতো বড় দিন কেন! কখন পাঁচটা বাজবে! আধাবেলা অফিস করেই বেরিয়ে পড়ে। মতিঝিল থেকে গুলশান যাবে। রায়নার অফিসে। মাত্র বাজে দু’টো। ট্যাক্সি ক্যাবে উঠে পড়ে। পথে পথে জ্যাম পেরিয়ে সাড়ে তিনটায় রায়নার অফিসে পৌঁছে। এখন দেড় ঘণ্টা বাকি। গেস্ট রুমে সুমনকে নিয়ে যায় রায়না।
- আপনি এতো আগে এসে পড়েছেন! বসুন, হাতের কাজগুলো সেরে নিই।
উত্তেজনা আর টেনশনের সঙ্গে লজ্জা যুক্ত হয়ে সুমনের একেবারে ব্যাড়াথ্যাড়া অবস্থা। সাহসের লেশমাত্র নেই। কোনো রকমে বলল,
- না, না কোনো সমস্যা নেই। আমি অপেক্ষা করি। তুমি কাজ সেরে নাও। তাড়াহুড়োর কিছু নেই।
- কফি দিতে বলি। কফি খান। বলেই রায়না বেরিয়ে যায়।
লজ্জায় রায়নার দিকে তাকাতে পারছে না সুমন। ওর দৃষ্টি কখনই মুখের দিকে যায় না। সরাসরি কারো দিকে তাকাতে পারে না। আর এখন তো ত্রাহি অবস্থা। রায়নার উপর দিয়ে ঢেউ খেলে দৃষ্টি শুধু পিছলে গেছে। এতেই বুঝে গেছে রায়না ভয়ংকর-সুন্দর সেজেছে। পরনের শাড়ি। গাঢ় নীল রংয়ের উপর লাল-লাল ফুল। হায় হায় কী সুন্দর! রায়না চলে যাওয়ার সময় ওর মসৃণ হলদেটে পিঠ নজরে আসে। পিঠের উল্টো পাশও। কী উন্নত! মেদহীন পেট। তার মাঝ দিয়ে সূ²-সরু রোম রেখা কোথায় চলে গেছে কে জানে!
পিয়ন কখন কফি দিয়ে গেছে বুঝতে পারেনি। ঠান্ডা হয়ে গেছে।
- একি! কফি খাননি? রায়নার কথায় চমক ভাঙ্গ সুমনের।
- ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কয়টা বাজে?
- সাড়ে চারটা।
- এখনই বের হবে?
- আপনার জন্যই তো তাড়াতাড়ি বের হচ্ছি। চলুন।
মেইন রাস্তা থেকে রায়নার অফিস খানিকটা ভেতরে। হেঁটে যেতে তিন-চার মিনিট লাগে। সুমন ও রায়না পাশাপাশি হাঁটছে। সুমনের হাঁটা কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। এলোমেলো। নিজের পায়েল সঙ্গে পা জড়িয়ে প্যাঁচ লেগে যাচ্ছে। ওর মনে হচ্ছে লোহা আর চুম্বক পাশাপাশি চলেছে। লোহা নিজেকে দূরে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। পারছে না। কি অদ্ভুত ব্যাপার! ওর ডান কাঁধ বরাবর রায়নার বাঁ কাঁদের সঙ্গে লেগে যাচ্ছে। অথচ ও তা চাচ্ছে না। অনেক সময় বিপরীত দিক থেকে সুন্দরী হেঁটে আসতে দেখলে এমন হয়। কোন এক অদৃশ্য টানে ছেলেদের সরল দিক বাঁকা হয়ে তার দিকে ছোটে। শরীর কেমন টাল খেয়ে যায়। ভদ্রলোক হলে অনেক কষ্টে টাল সামলান। ভাবটা এমন- কানের পাশ দিয়ে গুলী গেল। আর দুষ্টু প্রকৃতির হলে ধাক্কাটা খেয়েই যায়। একটা ফিলিংস নিয়ে হাঁটতে থাকে। যেন নিজকে রিচার্জ করে নিল। প্রকৃতির কী খেয়াল! পৃথিবীতে নারী ও পুরুষ নামক দুইটি প্রাণী এমনভাবে ছাড়া হয়েছে যে একজন আরেকজনকে প্রতিনিয়ত টেনে যাচ্ছে। মেয়ে ছাড়া কবি-সাহিত্যিকরা লিখতেই পারেন না। কিন্তু সুমন কোনোভাবেই চাচ্ছে না রায়নার সঙ্গে এখন লাগালাগি হোক।
- চলুন কোথাও যাওয়া যাক। নিরিবিলি আপনাকে কিছু কথা বলা দরকার।
সুমনের অবস্থা আরও কাহিল। গলা শুকিয়ে ছিদ্র বন্ধ হওয়ার উপক্রম। কোনো রকমে বলল-
- চলো। বলতে গিয়ে গলার স্বর বাঁশির সুরের মতো প্যাঁ করে ওঠে। এ সময় কণ্ঠের এমন বিটলামি পছন্দ হচ্ছে না সুমনের। কণ্ঠ যেন ইচ্ছা করেই এমন করছে।
- কোথায় যাওয়া যায়।
- অ্যামেরিকান ফ্রাইড চিকেনে।
- ওখানে যাওয়া কি ঠিক হবে?
- তা হলে আর কোথায়?
- এয়ারপোর্টের রাস্তায়। পশ্চিম পাশে সবুজ গাছের ছায়ার মাঝে দীর্ঘ পথ চলে গেছে সুদূরে...। যেভাবে বলা শুরু করেছিল আবেগের তোড়ে সাহিত্য চলে আসছিল। বুঝতে পেরে কোন রকমে নিজকে থামিয়ে বলে-
- ওখানে হাঁটা যায়।
১৩.
গোধূলি। মেঘের আড়ালে সূর্য। তাল তাল স্বর্ণখন্ড হয়ে অলসভাবে ভেসে বেড়াচ্ছে মেঘ। সুমন ও রায়না পাশাপাশি হাঁটছে। কথা নেই। দুজনের মনেই প্রকৃতির এই অপরূপ শোভা ছাপ ফেলেছে। আকাশে স্বর্ণমেঘ। সুমনের মনে টেনশনের কালো মেঘ।
আবসন্নতায় পেয়ে বসে। মুখ খোলে রায়না।
- সুমন ভাই!
কাঁচা ঘুম থেকে জেগে ওঠার মতো চমকে ওঠে সুমন।
- বলো।
আমাদের অফিসে এক ভদ্রলোক আসেন। সোহেল রহমান। শিল্পপতি। সতেরটি গার্মেন্টস ও শিপিং ব্যবসা। বিরাট বড়লোক। বয়স একটু বেশি। বোঝা যায় না। অমায়িক ভদ্রলোক। আমাকে পছন্দ করেন। কোনো ভনিতা করেননি। সরাসরি বিয়ের কথা বলেছেন....রায়না যখন কথা বলছিল, সুমনের মনে হচ্ছিল বহুদূর থেকে কথাগুলো ভেসে আসছে। যেন সীমানার ওপার থেকে কথা বলছে। কথা দীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে আসছে। মাথা ঝিমঝিম করছে। স্থির থাকতে চেষ্টা করছে। এ সময় দুর্বল চিত্তের মানুষদের স্থির থাকা অসম্ভব। সুমন দুর্বল। ইলাস্টিকের মতো। টানতে থাকলে চিকন হয়। ছিঁড়ে না। কোনো রকমে বলল-
-এই গাছ তলায় একটু বসি। রায়নার অপেক্ষা না করে বসে পড়ে। এমনভাবে বসল যেন ট্রাক থেঁতলে দিয়েছে। ওর কাছে মনে হচ্ছে ঘুম থেকে জাগিয়ে আসামীকে ফাঁসি দেয়া হলো। পাশে বসে রায়না। সুমনের ভালো লাগছে না। চলে যেতে ইচ্ছে করছে। নিজেকে সামলাচ্ছে। হৃৎপিন্ডটা জ্বলছে। কে যেন কামরাঙ্গা মরিচ ডলে দিয়েছে। প্রচন্ড জ্বলছে। চর্ম হাসি দিয়ে বলল-
- তুমি কি ভাবছ?
- ভাবছি বিয়ে করব। মায়া লেগে গেছে।
লোকটি খুব অসহায়। এতো ঐশ্বর্যের মধ্যেও কেমন হেল্পলেস। বার-তের বছরের একটি মেয়ে আছে। মা হারা। আগের বউ ডিভোর্স দিয়ে চলে গেছে। যে কারণে গেছে, তা কোনো কারণই না। এসব চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বিয়ে করব।
- আমি কি করতে পারি?
- ভেবেছিলাম আপনার সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেব। দুপুরে মনে হলো পরামর্শের দরকার নেই। বিয়ে তাকেই করব। ডিসিশান ফাইনাল।
- তাহলে আমাকে ডাকলে কেন? মোবাইলে জানিয়ে দিতে পারতে। সুমনের মাথা ঠিক নেই। ও এখন যা খুশি বলতে পারে। শিশুদের মতো অভিযোগ করে বসল।
- ভাবলাম, অনেক দিন আপনার সঙ্গে বের হওয়া হয় না....
- অ।
১৪.
বেদনাদায়ক এ ঘটনার পর সুমন পাথর হয়ে যায়। মস্তিষ্কের মায়া-মমতার সংবেদনশীল নিউরণগুলোকে তামার তারে পরিণত করে। সব কিছু শূন্য মনে হয়। সোহেল রহমানকে বিয়ে করে রায়না। যেন উড়ে এসে রূপকথার দেশে পড়ল। ঐশ্বর্য আর ঐশ্বর্য। অভাব বলে কিছু নেই। হানিমুন করতে ইউরোপ-আমেরিকা ঘুরে একাকার। কী সুখ! সমৃদ্ধি! যা চায়, পায়। যা আসে কেবলই আসে। সাধ আর সাধ্য নয়, সাধ্য আরসাধ্য। প্রাসাদসম বাড়ি। ব্যক্তিগত গাড়ি। অফুরন্ত হাত খরচ। যখন যা করতে মন চাইছে, করছে। কোন সমস্যা নেই। ফিলিপাইনের এক সময়ে স্বৈরশাসক মার্কোসের স্ত্রী ইমেলদার মতো জীবন। জাগতিক সব কিছুতেই পূর্ণ। পৃথিবীতে তার চাওয়ার কিছু নেই। ওর মনে হয়, মানুষ সব হারিয়ে শূন্য হয়, সব ‘আছে’র মধ্যে ‘আমি’ শূন্য। সোহেল চাওয়া অপূর্ণ রাখেনি। রায়না যে জীবন চেয়েছিল তার চেয়ে বেশি পেয়েছে। বছরখানেক পর তার একটা সমস্যা দেখা দেয়। বিচিত্র সমস্যা। ও কিছু চাইতে পারছে না। চাইতে ইচ্ছা করে না। চাওয়ার ক্ষমতা শেষ হয়ে গেছে। অর্থনীতির সূত্রে মানুষের চাওয়ার শেষ নেই। সবক্ষেত্রে এ সূত্র খাটে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চাওয়ার সীমাবদ্ধতা আছে। রায়না ওর জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝতে পারে। মনে মনে ভাবে, দেহের প্রচন্ডটানে যখন সোহেলের সঙ্গে মিলিত হই, উপভোগ করি, তৃপ্তি মেটে। তরপরই বিতৃষ্ণা। আরেকবার চাইতে ইচ্ছা করে না। কারোরই ইচ্ছা করে না। আধা, ঘণ্টা, এক ঘণ্টা- তারপর হয়তো ইচ্ছাটা আবার জেগে ওঠে। কিন্তু এই সময়টাতে তো আমার ইচ্ছার মৃত্যু হয়। চাওয়ার পরিসমাপ্তি ঘটে। আবার এই যে আমি ঐশ্বর্যের মধ্যে আছি, অভাব নেই। যা চাচ্ছি, পাচ্ছি। মনের যতটুকু ক্ষমতা আছে, সবটুকু ব্যবহার করে চেয়ে যাচ্ছি আর পেয়ে যাচ্ছি। চাওয়ার কিছু নেই। সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। সব স্বপ্ন পূরণ হয়ে শূন্য হয়ে পড়েছি। স্বপ্ন হারা আমি স্বপ্ন দেখতে পাচ্ছি না এমন কেন হলো- ভেবে পায় না রায়না। এক গ্লাস পানিতে ক্রমাগত চিনি ঢালতে থাকলে এক সময় আর দ্রবীভূত হয় না, পানির দ্রাবক শক্তি হারিয়ে যায়। রায়নার চাওয়াগুলোও এখন আর নতুন চাওয়ায় দ্রবীভূত হয় না। সব আছের মধ্যে শূন্য হয়ে পড়েছে। শূন্যতার ভেতর কেবল ভেসে বেড়ায় আর কী চাই! কী চাই! শূন্যের পরিধিতে প্রতিধ্বনিতে হয়ে তার চিৎকার ঘুরে বেড়ায়। এই আর্তনাদ, হাহাকার সোহেলকে স্পর্শ করে না। সে তার শিল্প সাম্রাজ্য নিয়ে দিন-রাত ব্যস্ত। গভীর রাতে ফেরে। ঘুমিয়ে পড়ে। দু’চারটা সুখ-দুঃখের কথা বলার সুযোগ হয় না। সুযোগ আদায় করতে পারছে না। রূপকথার কাঠুরিয়ার মতো হয়ে পড়ে। যা চায় সবই সোনা হয়ে আসে। সুখের সাগরে ভাসতে ভাসতে সে কেঁদে বেড়ায়। চোখের জলও স্বর্ণ বিন্দু হয়ে ঝরে। এমন এক হাহাকার জাহাজের যাত্রী রায়না। যেখানে চাওয়া নেই, পাওয়া নেই। অনন্ত শূন্যতা। এই অথৈ অসীম বিভীষিকাময় সমুদ্রে ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে হাজির হয় মহব্বত। তার ড্রাইভার। ছড়ে বসে রায়না। বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়। জাহাজ থেকে দূরে, বহুদূরে ভেসে চলে তারা।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর