Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৯ আশ্বিন ১৪২৫, ১৩ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

নজরুলচর্চা এবং সমাজহীন মুসলমান সমাজ

শেখ দরবার আলম | প্রকাশের সময় : ৪ জুন, ২০১৮, ১২:০০ এএম

“এক”
আজ ৯ মে ২০১৮ তারিখ বুধবার। মাস দুই আগে ২০১৮-এর মার্চে এক অল্পবয়স্ক মুসলমান ভদ্রলোকের কথা শুনে মনে হলো যে, “নজরুল ইসলাম ত্যাগ করে ‘হিন্দু’ হয়ে যাওয়া মানুষ”। আমি তার এই ভ্রান্ত ধারণা দূর করার লক্ষ্যে কিছু কথা বললাম। ি শেষে নজরুল সম্পর্কে আমার ধারণা একবাক্যে ব্যক্ত করতে বললেন।
আমি বললাম, নজরুল সাম্য ও সহাবস্থানের কবি। আরো স্পষ্ট করে বললে বলতে হয় যে, অর্থনৈতিক সাম্য ও সামাজিক সাম্য ও বিভিন্ন ধর্মীয় সমাজের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত, আইনগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের কবি কাজী নজরুল ইসলাম। আরো অনেক ক্ষেত্রে তাঁর অনেক বড় অবদান থাকলেও এই আঙিনায় এটাই সবার জন্য সবচেয়ে বড় অবদান। এই অবদান সবার জন্য। মুসলমাদের জাগরণের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশাল ও ব্যাপক হলেও সেটা তো কেবল মুসলমানদের জন্যই। তাই এটা সেভাবে উল্লেখ করলাম না।
আমরা যদি এই ভারতীয় উপমহাদেশের এবং বিশ্বের বাস্তব অবস্থা যদি একটু গভীরভাবে উপলব্ধি করার চেষ্টা করি তা হলে বুঝতে পারব যে, কবির এই সাম্য ও সহাবস্থানকামী পরিচয়টা কত বড় পরিচয়, কত মহৎ পরিচয়, কত বিশাল পরিচয়, বিশ্বের সব মানুষের জন্য এটা তাঁর কত প্রয়োজনীয় পরিচয়। এই পরিচয় দাবি করার মতো কোনো অবদান ‘বিশ্বকবি’ বলে অভিহিত নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরে নেই। তাঁর শ্রেণিগত অবস্থান এবং হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ এবং হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক একজাতিতত্ত¡ এই পরিচয় অনুমোদন করে না। তিনি যে সমাজের জাতীয়তাবাদী মহলের সমাজপতি ছিলেন সেই সমাজের জতীয়তাবাদী মহলে কেউও তা কখনো অনুমোদন করেননি। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক কঠিন বাস্তবতার কথা বলেই এটা উল্লেখ করলাম।
আমার নজরুল বিষয়ক সাতটা বই আছে। সংস্কৃতি বিষয়ে আছে দু’টো। কথাসাহিত্যের বই আছে একটা। নজরুল বিষয়ক বইয়ে এবং সংস্কৃতি বিষয়ক বইয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ এবং ব্যাখ্যা আছে।
সাধারণভাবে আমাদের এই সমাজহীন সমাজের লোকেদের যে মানসিক অবস্থা তাতে বুঝি একজন চাল চুলোহীন গরিব মুসলমানের লেখাপড়ার গরজ অনেকেই বোধ করেন না। আমার বইয়ের কথা তাই পত্রিকায় লেখায় উল্লেখ করতে হয়। তাই কেবল এটুকু উল্লেখ করছি যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চৌদ্দ বছর বয়সে লেখা প্রথম গানটিতেই তাঁর হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের স্পষ্ট পরিচয় পাবেন। আর তিনি যে হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক একজাতিতত্ত¡ আরোপকামী ছিলেন সে পরিচয় তাঁর লেখা ছোটগল্প দুরাশায় স্পষ্টভাবেই পাবেন।
তার সময়ে জমিদাররা এবং রাজন্যবর্গ শাসিত রাজ্যগুলোর রাজারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের এক একটা স্তম্ভ ছিলেন। তিনি নিজেও তাঁর জমিদারি চালিয়েছেন। এই অবস্থায় তাঁর মধ্যে সাম্যবাদ খুঁজতে গিয়ে কী আর এই পাওয়ার আশা করা যায় যদি মাত্রাতিরিক্ত কল্পনা না থাকে? সব থেকে বড় কথা এই যে, নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত এই কবি মুসলমানদের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক অধিকার স্বীকার করতেন না। ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানদের আর্থ-সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক অস্তিত্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বীকার করতেন না।
“দুই”
বেশ কয়েক বছর যাবৎ দেখছি, কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ‘অসাম্প্রদায়িক’ কবি বলার একটা চল হয়েছে। ‘অসাম্প্রদায়িক’ তো তিনি অবশ্যই। তবে এরা যাঁরা কবি নজরুল ইসলামকে “অসাম্প্রদায়িক” বলেন, এঁদের কাছে অসাম্প্রদায়িকতার অন্যরকম অর্থ আছে। এঁরা মনে করেন, নজরুল ইসলামপন্থী ছিলেন না, ইসলামের প্রতি নজরুলের আকর্ষণ বা টান ছিল না। এঁরা কেউ কেউ এটাও মনে করেন যে, কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘ইসলাম’ ত্যাগ করে হিন্দুধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি কালীপূজাও করতেন। মুসলমান ঘরের এক বাঙালি অধ্যাপক ভদ্রলোক কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ‘রণক্লান্ত’ প্রমাণ করার জন্য একটা বই লিখেছেন। এই ২০১৮-এর ফেব্রæয়ারিতে প্রকাশিত তাঁর বইয়ে নজরুলের যুদ্ধটা তিনি দেখাতে চাননি। কেননা, তার বক্তব্য এই যে তাতে নাকি ‘বীরপূজা’ হয়ে যাবে। তাই নজরুলকে খাটো করে দেখানোটা গুরুত্বহীন করে দেখনোটা তিনি তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন। মুসলমানরাও যাতে নজরুলচর্চা না করেন সেই লক্ষ্যে তাঁদের মনে ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। তিনি তাঁর বইয়ে কালী ঠাকুরের দুটো ছবি ছেপে দেখিয়েছেন যে, নজরুল ‘নিজের বাড়িতে কালীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করে তাঁরও উপাসনা’ যেমন করতেন, তেমনি ‘শ্যামবাজার স্ট্রিটের’ ‘কালীমন্দিরে নিয়মিত পূজো করতে যেতেন’। এমন কালীভক্ত কিন্তু ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবও ছিলেন না।
কেবল ঘরের ‘চিলেকোঠার’ এর ‘কালীমূর্তি’ ‘সকাল-সন্ধ্যা’ ‘জপ’ করে তাঁর সাধ মিটত না। রাস্তার ‘কালীমন্দিরে’ ও ‘নিয়মিত পূজো করতে যেতেন নজরুল’? এত বড় কালীসাধক ছিলেন নজরুল? তার আর কোনো কাজকর্ম ছিল না? তাঁর সংসার চালাতেন কে? ‘বাড়ির চিলেকোঠায় কালীপ্রতিমা স্থাপন করে সকাল-সন্ধ্যা মন্ত্রজপ করতে শুরু করলেন’ এ কথা মেদিনীপুরের এক সরকারি লাইব্রেরির গ্রন্থাগারিক আজহার উদ্দিন খান মুসলমান ঘরের সন্তান বলেই লিখেছেন। কবি কাজী নজরুল ইসলামের কনিষ্ঠপুত্র কাজী অনিরুদ্ধ ইসলামের স্ত্রী ‘কল্যাণী কাজীও এ কথা উল্লেখ করেছেন’। সংসারের প্রতি তাঁর ‘বৈরাগ্য’ আসার পর ‘এই সময় থেকে তিনি শ্যামবাজারের এক কালীমন্দিরে নিয়মিত পূজো করতে যেতেন’। অতএব এই নজরুলকে ‘অসাম্প্রদায়িক’ বলে অভিহিত করা যায়!
“তিন”
কবির কনিষ্ঠপুত্র কাজী অনিরুদ্ধ ইসলামের স্ত্রী কল্যাণী কাজী কবির সুস্থাবস্থায় কবি পরিবারে আসেননি। আলজেইমার ডিজিজে কবি নির্বাক, নিশ্চুপ ও গৃহবন্দী হয়ে যাওয়ার অনেক পরে তিনি যখন কবি পরিবারে আসেন, তখন কবির শাশুড়ি গিরিবালা দেবীও কবি পরিবারে ছিলেন না। কবির বাসাও তখন আর শ্যামবাজার এলাকায় ছিল না। ইতোমধ্যে কবি পরিবারকে একাধিকবার বাসা বদল করতে হয়েছে।
আজহার উদ্দীন খান এবং কল্যাণী কাজী কবির হিন্দু ধর্ম গ্রহণের কথা বা কালীসাধনার কথা কার কাছে শুনেছেন? কবি পতœী প্রমীলা নজরুল ইসলামের কাছে? তাহলে এত বড় কালীসাধকের স্ত্রী হয়ে প্রমীলা নজরুল ইসলাম তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁকে যেন কবর দেয়া হয় সে নসিহত তাঁর ইন্তেকালের আগে করে গিয়েছিলেন কেন?
তবে ১৯৮০-এর দিকে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ অডিটোরিয়ামে নজরুল সৃষ্টি সংরক্ষণ সংস্থার তরফে নজরুল জন্মজয়ন্তীতে সঙ্গীত পরিবেশনের দাওয়াত দিতে আমি যখন কল্যাণী কাজীদের বাসায় গিয়েছিলাম, সে সময় বাসায় তাঁর মেয়ে অনিন্দিতা কাজী ছিলেন। সেখানে আমার যাওয়ার পর তখন তাঁর ভাই সম্পর্কের এক আত্মীয়ও এসেছিলেন। আমি মুসলমান ঘরের সন্তান, এটা জানার পর তাঁর সেই ভাই সম্পর্কের আত্মীয় বললেন, ‘আমরা হিন্দু’ বোঝাতে চাইলেন কল্যাণী কাজী হিন্দু সমাজের মেয়ে।
আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করার বা বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে করিনি। কল্যাণী কাজী বা তাঁর মেয়ে অনিন্দিতাও কিছু বলেননি। তবে পরে খুব খুশি হয়েছিলাম এ কারণে যে, অনুষ্ঠানের দিন কল্যাণী কাজী প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রেক্ষাগৃহে এসে অনুগ্রহ করে নজরুল সঙ্গীত পরিবেশন করে গিয়েছিলেন বলে। এ জন্য কোনো টাকা চাননি অবশ্য স্ত্রীমতী বিজন বালা ঘোষ দস্তিদার, শ্রীমতী যূথিকা রায়, শ্রীমতী রেনু বসু ভৌমিক প্রমুখ নজরুল সঙ্গীত শিল্পীরাও কোনো টাকা চাননি। কবির প্রতি গভীর শ্রদ্ধার কারণে কবির বংশধরদের প্রতিও আমি শ্রদ্ধা পোষণ করি। কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সৃষ্টিকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে অনুভব ও উপলব্ধি করার চেষ্টা করি। তাই কাজী নজরুল ইসলামের সমস্ত দিকের অনন্য সাধারণ সংগ্রাম এবং সাফল্যকে উল্লেখ করার চেষ্টা করি। তাঁকে যথার্থই অনন্য সাধারণ ‘বীর’ হিসেবেও দেখি। অপরিসীম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তাঁর পাওনা হয় বলেই মনে করি। আমি যথার্থই তাঁর ভক্ত। এর মধ্যে লেনদেনের কোনো হিসাব নেই। লেনদেনের হিসাবে কাউকে খুশি করে কিছু পাওয়ার প্রত্যাশাও আমার নেই। এটাও উপলদ্ধি করি যে, ভারতীয় উপমহাদেশের এবং যে সমাজে আমি জন্মেছি, সেই ভারতীয় উপমহাদেশ এবং আমাদের অনেক বিষয়ে সমাজ তাঁর কাছে অনেক ধনী। অবশ্য তাঁর অবদান কোনো বিশেষ দেশের বা উপমহাদেশের জন্য নয়, সমস্ত বিশ্বের জন্যই। কেবলমাত্র কোনো বিশেষ সমাজের জন্য নয়। সব সমাজের জন্যই। অত্যন্ত অকৃত্রিম এবং আন্তরিকভাবেই তিনি ছিলেন সাম্য ও সহাবস্থানের কবি। আমাদের মনে তাঁর সম্পর্কে যাতে কোনো ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি না হয়, সে জন্য বিভিন্ন জায়গায় তিনি যেমন বারবার বলে গেছেন যে, তিনি ‘আল্লাহ্র বান্দা’ এবং ‘নবীর উম্মত’; কিন্তু তিনি কবি সবার, তেমনি তিনি যে সাম্য ও সহাবস্থানের কবি সে পরিচয়টা বড় করে দিয়ে গেছেন। তিনি কোনো জনগোষ্ঠীকে প্রতিপক্ষ ও শত্রæ হিসেবে শনাক্ত করে জাতীয়তাবাদী হননি কখনো।
“চার”
তিনি কৃত্রিম মানুষ ছিলেন না। মেকি মানুষ ছিলেন না। অসৎ ও অনুদার মানুষ ছিলেন না। ক‚টবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন না। অনুভ‚তিহীন মনের মানুষ ছিলেন না। ছিলেন অত্যন্ত স্পর্শকাতর মনের মানুষ। তিনি ছিলেন মনুষ্যত্ববোধে উত্তীর্ণ যথার্থ মহৎ মানুষ। ভারতীয় উপমহাদেশে আমাদের প্রবিবেশী বড় সমাজের যাঁরা তাঁর নিকট সান্নিধ্যে এসেছেন তাঁদের অনেকেই মনে করতেন যে, তিনি মানুষ নন দেবতা। এত ভক্তি, এত শ্রদ্ধা ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের প্রতিবেশী বড় সমাজের মানুষের কাছ থেকে সেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে আর কোনো মুসলমান কখনো পাননি। আগেও নয়, পরেও নয়। তাঁকে দেখার জন্য মানুষ ভোর থেকে তাঁর বাড়ির সামনে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন।
হিন্দু সমাজে যদি জাতীয়তাবাদী মহল না থাকতেন, যদি হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ এবং হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক একজাতিতত্ত¡ না থাকত, যদি তাঁদের জাতীয়তাবাদের প্রতিপক্ষ এ শত্রু হিসেবে মুসলমানরা এবং তাদের একজাতিতত্তে¡র প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসেবে মুসলমান সমাজের ইতিহাস ঐতিহ্য ও ইসলামি সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা শনাক্ত না করা যেত, তাহলে (১৯৪২-এর ৯ অক্টোবর) তাঁর অসুস্থতার পর, (১৯৪৭-এর মধ্য-আগস্টের) স্বাধীনতার পর উপযুক্ত মর্যাদার নজরুলচর্চা হিন্দু সমাজেই করতেন। একশ’ নব্বই বছর যাবৎ সম্মানজনক জীবিকার এবং সম্মানজনক জীবিকার্জনের সহায়ক শিক্ষার ক্ষেত্রে অধিকারবঞ্চিত হয়ে হতদরিদ্র, অশিক্ষিত, অসচেতন ও অসংগঠিত সমাজহীন সমাজে পরিণত হওয়ার পর উপযুক্ত মর্যাদায় নজরুলকে ধারণ করার এবং স্বাধীনতা ধারণ করার মানসিকতা বাঙলাভাষী মুসলমানরা এখনো অর্জন করেননি। উপযুক্ত মর্যাদায় নজরুলচর্চার মানসিকতাও এখন অর্জন করেননি। এই আত্মসমালোচনাটুকু আমাদের নিজেদের স্বার্থেই আমাদের করতে হবে। আমি নিজে উপলব্ধি করি, দীর্ঘক্ষণ না খাওয়ার পর কোনো কোনো দুপুরে বা দুপুরের পর খেতে বসি তখন ক্ষুধার টানে সামনে খাবার যা কিছু থাকে সবই খেয়ে ফেলি।
১৭৫৭-এর ২৩ জুন থেকে ১৯৪৭-এর ১৪ আগস্ট পর্যন্ত, অন্তত এই ১৯০ বছরের ক্ষুধা এখনো আমাদের মেটেনি। আমরা হাউমাউ করে সবকিছুই খেয়ে ফেলছি। নজরুলচর্চার সমস্ত সুযোগ এবং সংস্থানকেও খেয়ে ফেলছি। ১৯৪২-এর অক্টোবরে নজরুলের বই নিজের নামে গ্রাস করে আমাদেরই এক কবি নজরুল পরিবারকে ঢাকায় আসতে দেয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিলেন ১৯৫০-এর গোড়াতেই। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর সম্পাদনায় প্রকাশিত নওবাহার পত্রিকায় তিনি একটার পর একটা দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখিছেন কবি কাজী নজরুল ইসলামকে হিন্দু প্রমাণ করার জন্য। লিখেছিলেন নজরুল নাকি ইসলামের মধ্যে ‘বিষ’ মিশিয়ে দিয়েছিলেন! তিনি বরং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যেই ইসলামের আদর্শ খুঁজে পেয়েছিলেন। অনেক বই-ই তিনি লিখেছিলেন। জনপ্রিয় হয়েছিল কেবল গ্রাস করা নজরুলের বইটি। এটা বাস্তবতা। কঠিন বাস্তবতা।
আমাদের সমাজ ছিল না বলে এসব দেখায় কেউ কোথাও ছিলেন না। দেখার এখনো কোথাও কেউ নেই। নজরুলচর্চা প্রসঙ্গেই এটা স্মরণ রাখা দরকার।
“পাঁচ”
বিংশ শতাব্দীর সেই বিশের দশকের গোড়ার দিকে সাহিত্য-সংস্কৃতির অভিনয় নজরুল যখন তখন তাঁকে উপযুক্ত মর্যাদার ঠাঁই দেয়ার সামর্থ্য দারিদ্র্যপীড়িত সমাজহীন মুসলমান সমাজের ছিল না। সেটাও আমাদেরকে জানতে এবং বুঝতে হবে।
যুদ্ধে ইংরেজ উৎখাত করার সোয়াশ’ বছরের একক ব্যর্থ প্রয়াস ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে সর্বসম্মতভাবে ত্যাগ করে হিন্দুদের মতোই ইংরেজদের আনুগত্য স্বীকার করে ইংরেজদের প্রবর্তিত শিক্ষা গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত সব মুসলমান একমত হয়ে নিয়েছেন। এরপর ইংরেজরা এ বিষয়ে মুসলমানদেরকে কিছু কিছু সুযোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত মূলত ১৮৮৫ থেকে নিয়েছেন। ইতোমধ্যে হিন্দুরা মুসলমানদেরকে কোনো আঙিনায় কোনো সুযোগ না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। এই অবস্থায় মুসলমানরা আর কতটুকু এগোতে পারবেন? নাট্যাঙ্গন, বেতার, গ্রামোফোন রেকর্ড কোম্পানি, চলচ্চিত্র সব আঙিনা তখন কেবল হিন্দুদের এখতিয়ারে।
এদিকে চালচুলোহীন নজরুলকে কোনো নিম্নমধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবার ও মেয়ে দিতে অত্যন্ত স্বাভাবিতভাবেই নারাজ। এই হিসাব এখনো তো কাজ করে। এক বিংশ শতাব্দীতেও তো কাজ করে।
লেখক : গবেষক



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।