Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৫, ১৪ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

রেসকোর্সে পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণ ও জেনারেল ওসমানীর বিমানে গুলিবর্ষণ

মো বা য়ে দু র র হ মা ন | প্রকাশের সময় : ৪ জুন, ২০১৮, ১২:০০ এএম

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এবং তদানিন্তন রেসকোর্স ময়দানে পাক বাহিনী ভারতীয় বাহিনী এবং মুক্তি বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করে। এধরনের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে তিন বাহিনী প্রধানদের উপস্থিত থাকার
কথা। পাক বাহিনীর প্রধান ছিলেন লে: জে: এ এ কে নিয়াজি, ভারতীয় বাহিনী প্রধান লে: জে: জগজিৎ শিং অরোরা এবং বাংলাদেশ বাহিনীর প্রধান জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গণি (এম এ জি) ওসমানী । ঐ অনুষ্ঠানে জেনারেল অরোরা এবং জেনারেল নিয়াজি আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেন। সাধারণ নিয়ম হলো এই যে, আত্মসমর্পণ দলিলে মিত্র বাহিনীর দুই প্রধানেরই অর্থাৎ অরোরা এবং ওসমানীর স্বাক্ষর থাকার কথা ছিল। কিন্তু সেখানে শুধুমাত্র অরোরার স্বাক্ষর রয়েছে, ওসমানীর স্বাক্ষর নাই। এমনকি জেনারেল ওসমানী সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিতও ছিলেন না। মুক্তি বাহিনীর তরফ থেকে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন বিমান বাহিনী প্রধান এবং মুক্তি বাহিনীর উপপ্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল একে খন্দকার। তাই প্রশ্ন ওঠে, এত বড় একটি মহা গুরুত্বপূর্ণ আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মুক্তি বাহিনীর প্রধান জেনারেল এম এ জি ওসমানী কেন উপস্থিত ছিলেন না? এই নিয়ে বছরের পর বছর শত শত প্রশ্ন আকাশে বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সঠিক কোনো উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়নি। সম্ভাব্য যে সব উত্তর পাওয়া যাচ্ছে সেই সব উত্তরের সপক্ষে কোনো ডকুমেন্টারি এভিডেন্স বা দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। বহুদিন বহু ঘাঁটা ঘাঁটি এবং বহু অনুসন্ধানের পর অবশেষে আসল কারণটি জানা গেছে। ইংরেজিতে যেটি বলা হয়, From the horse’s mouth, তেমনি এমন এক ব্যক্তির মুখ থেকে এই কারণটি বর্ণিত হয়েছে যিনি ঐ ক্রিটিক্যাল মুহূর্তে জেনারেল ওসমানীর সাথেই ছিলেন। তিনি হলেন ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। বর্তমানে গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল, গণস্বাস্থ্য মেডিক্যাল কলেজ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার এবং প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা। ‘সাপ্তাহিক’ নামক একটি ম্যাগাজিনে প্রদত্ত সাক্ষাৎকারে ড. জাফরুল্লাহ এই চাঞ্চল্যকর তথ্য বর্ণনা করেছেন। এটি প্রকাশিত হয়েছে ২০১৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর। যখন ঢাকায় আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের সময় ঘনিয়ে আসছিল তখন ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে একটি বিমানে ভারত থেকে সিলেট পাঠানে হয়। বিমানটির টাইপ ছিল এম-৮। বিমানটি যখন সিলেটের আকাশে উড্ডীয়মান তখন সেই বিমানে আর একটি বিমান থেকে গুলি করা হয়। গুলি করেই হানাদার বিমানটি পালিয়ে যায়। এই চাঞ্চল্যকর রুদ্ধশ্বাস কাহিনীটি আপনারা বরং ড. জাফরুল্লাহর মুখেই শুনুন :
দুই
ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলছেন, ১৬ ডিসেম্বর সকালে ব্রিগেডিয়ার গুপ্ত জানালেন, আজ ঢাকায় পাকিস্তান সেনারা আত্মসমর্পণ করবে। ভাবলাম নিশ্চয়ই মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়কের কাছে এ সম্পর্কে কিছু খবর আছে। আশ্চর্য, ওসমানী সাহেব একবারে চুপ, কোনো কথা বলছেন না, বিষয়টাতে খটকা লাগল। জেনারেল ওসমানীর এডিসি আমাদের প্রিয় নেতা শেখ মুজিবুরের বড় ছেলে শেখ কামাল আমাকে বলল, ‘স্যার কখন রওনা হবে, তা তো বলছেন না। জাফর ভাই, আপনি যান, জিজ্ঞেস করে সময় জেনে নিন। অধীর আগ্রহে আমরা সবাই অপেক্ষা করছি’। আমি গিয়ে জিজ্ঞেস করায় ওসমানী সাহেব বললেন, ‘I have not yet received PM›s order to move to Dhaka.’ ‘ঢাকার পথে রওনা হবার জন্য কলকাতা থেকে প্রধান মন্ত্রী তাজউদ্দীন সাহেবের কোনো নির্দেশ পাইনি’।
আমি বললাম, ‘আপনাকে অর্ডার দেবে কে? আপনি তো মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক’। ওসমানী বললেন, ‘I decide tactics, my order is final for firing, but I receive orders from the cabinet through PM, Mr. Tajuddin Ahmed.’
ঘণ্টাখানেক সময় পরে, পুনরায় ওসমানী সাহেবের সামনে দাঁড়ানোর পর পরই জেনারেল ওসমানী অত্যন্ত বেদনাতাড়িত কণ্ঠে যা বললেন তার মর্মার্থ হলো, ‘আমার ঢাকার পথে অগ্রসর হবার নির্দেশ নেই। আমাকে বলা হয়েছে, পরে প্রবাসী সরকারের সঙ্গে একযোগে ঢাকা যেতে, দিনক্ষণ তাজউদ্দীন সাহেব জানাবেন। গণতন্ত্রের আচরণে যুদ্ধের সেনাপতি প্রধানমন্ত্রীর অধীন, এটাই সঠিক বিধান। মনে হলো, উনি জেনে শুনে বিষপান করছেন। পরে ব্রিগেডিয়ার গুপ্তকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সিলেটের কী অবস্থা’? ব্রিগেডিয়ার গুপ্ত জানালেন ‘সিলেট ইজ ক্লিয়ার’। ওসমানী বললেন, ‘তাহলে চলুন আমরা সিলেট যাই, সেখানে গিয়ে আমার পিতা-মাতার কবর জিয়ারত করব, শাহজালালের পুণ্য মাজারে আমার পূর্ব পুরুষরা আছেন’। ওসমানী সাহেব শেখ কামালকে ডেকে সবাইকে তৈরি হতে বললেন। আধা ঘণ্টার মধ্যে আমরা আকাশে। নিরুপদ্রব যাত্রা। ভারতীয় এম-৮ বিমানে সিলেটের পথে চলেছি। পরিষ্কার আকাশ। প্লেনের যাত্রী জেনারেল ওসমানী ও তার এডিসি শেখ কামাল, মুক্তিবাহিনীর চিফ অফ স্টাফ জেনারেল এম রব, এম এন এ, রিপোর্টার আল্লামা, ব্রিগেডিয়ার গুপ্ত, ভারতীয় দুই পাইলট এবং আমি। কেউ কথা বলছে না, সবাই নীরব।
অতর্কিতে একটি প্লেন এসে চক্কর দিয়ে চলে গেল। হঠাৎ গোলা বিস্ফোরণের আওয়াজ, ভিতরে জেনারেল রবের আর্তনাদ, পাইলট চিৎকার করে বলল, ‘উই হ্যাভ বিন অ্যাটাকড্’। রবের উরুতে আঘাতের পরপরই তার কার্ডিয়াক এ্যারেস্ট হলো। আমি এক্সটার্নাল কার্ডিয়াক ম্যাসাজ দিতে শুরু করি। পাইলট চিৎকার করল, অয়েল ট্যাংক হিট হয়েছে, তেল বেরিয়ে যাচ্ছে, আমি বড় জোর ১০ মিনিট উড়তে পারবো। অতপর তিনি শুনতে শুরু করল ওয়ান, টু, থ্রি...টেন.. থার্টি... ফোর্টি... ফিফটি...নাইন সিক্সটি...। ওয়ান মিনিট গান (এড়হব)। এভাবে মিনিট গুনছে উদ্বিগ্ন চিন্তিতসহ পাইলট। ধীর স্থিরভাবে পাইলটের আসনে বসা অন্য পাইলট। ওসমানী সাহেব লাফ দিয়ে উঠে, অয়েল ট্যাংকের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করলেন, ‘জাফরুল্লাহ্, গিভ মি ইয়োর জ্যাকেট’। আমি আমার দামি জ্যাকেটটা ছুড়ে দিলে, ওসমানী সাহেব ওটা নিয়ে তৈলাধারের ছিদ্র বন্ধের চেষ্টা করতে থাকেন। বলেন, উড় হড়ঃ ড়িৎৎু সু নড়ুং, ও শহড়ি ঝযুষবঃ ষরশব ঃযব ঢ়ধষস ড়ভ সু যধহফং.’
ভয় পেয়ো না, আমি সিলেটকে আমার হাতের তালুর মতো চিনি। কার্ডিয়াক ম্যাসাজ দেবার ফাঁকে ফাঁকে আমি ভাবছিলাম, আজ ১৬ ডিসেম্বর, দেশ স্বাধীন হবে। কিন্তু আজ আমরা সবাই কিছুক্ষণের মধ্যে মারা যাব। আগামীকাল পত্রিকায় শোক সংবাদ (ঙনরঃঁধৎু) কলামে কি লেখা হবে? বীরের মৃত্যু। অপঘাতে মৃত্যু?
কার গোলাতে এই দুর্ঘটনা? পাকিস্তানের সব বিমান তো কয়েকদিন পূর্বে ধ্বংস হয়েছে কিংবা গ্রাউন্ডেড করা হয়েছে। তাহলে আক্রমণকারী বিমানটি কাদের? গোলা ছুড়ে কোথায় গেল? গৌহাটির পথে? চিন্তা বিঘ্নিত হলো ওসমানী সাহেবের চিৎকারে। নিচে একটা জায়গার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললেন, ‘Land Here’ এখানে নামো। আর বললেন, ‘Let me land first to taste the enemy attack if there is one’। শত্রুর গুলির স্বাদ নেবার জন্য আমাকে প্রথম নামতে দাও, যদি কোনো শত্রু এখনও থেকে থাকে। উনি লাফ দিয়ে নামলেন। ধরুন, বলে আমি জেনারেল রবকে ছুড়ে দিলাম, সঙ্গে নামলাম আমি। আমার পিছনে পিছনে অন্যরা লাফিয়ে নামলেন। প্লেনটা আমাদের চোখের সামনে দাউ দাউ করে আগুনে পুড়ছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কখনো এই ঘটনার তদন্ত প্রকাশ করেননি। ভারত সরকার সব সময় এই ঘটনায় নীরব, মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছেন।
স্বাধীনতার বিজয় উল্লাসে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এই দুর্ঘটনার তদন্তের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব উপলব্ধি বোধ করেননি। সবাই উদ্বিগ্ন, প্রাণপ্রিয় নেতা জীবিত শেখ মুজিবের দেশে প্রত্যাবর্তনের কামনায়।
তিন
ওপরের এই ভয়াবহ ঘটনার পর পাঠকদের আর বুঝতে বাকি থাকে না যে, জেনারেল ওসমানী ছিলেন ভারতীয়দের চোখের বালি। তাই তারা তাকে একেবারে শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কথায় বলে, রাখে আল্লাহ মারে কে? ওসমানীর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। আল্লাহ তাকে রাখতে চেয়েছেন। তাই অন্যেরা তাকে মারতে চাইলেও সফল হয়নি। এমনকি ঐ অজ্ঞাত রহস্যময় বিমানটির গুলিতে জেনারেল রব শেখ কামাল এরাও বেঁচে গেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো- কেন জেনারেল ওসমানী ভারতীয়দের চোখের বালি হলেন? এই বিষয়টিও অনেকের কাছে এতদিন ধরে ধোঁয়াশা ছিল। কিন্তু ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সেটিও ক্লিয়ার করে দিয়েছেন। তিনি চিকিৎসা বিদ্যায় উচ্চ শিক্ষা নেওয়ার জন্য ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন। সেখানে যখন তিনি লেখাপড়া শেষ করেন তখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। এই অবস্থায় লন্ডনের প্রবাসী বাঙালিরা অবস্থা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণের জন্য জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে ভারতে পাঠান। ভারতে অবস্থানের সপ্তম দিনে জেনারেল ওসমানী বিমান যোগে কলকাতা থেকে আগরতলা আসেন। তারপর কি ঘটেছে, সেটি তার মুখ থেকেই শুনুন:
সপ্তম দিনে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সে কলকাতা থেকে আগরতলা। পূর্ব পাকিস্তানের মহকুমা শহরের চেয়ে ছোট। হোটেলের সন্ধানে শহরে প্রবেশ পথে প্রথম দেখা হলো ছাত্রলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মনির সঙ্গে। মনি বললেন, ‘ডাক্তার, আমি জানতাম আপনি আসবেন, কমিউনিস্টরা লন্ডনে বসে থাকবেন না’। হাসিমুখে ভালো ব্যবহার করলেন। জিজ্ঞেস করলেন, কলকাতায় কার কার সঙ্গে দেখা হয়েছে।
‘প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ’, বলার সঙ্গে সঙ্গে ফজলুল হক মনি হঠাৎ রেগে গেলেন, বললেন কোথাকার প্রধানমন্ত্রী? কে তাকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছেন? তাজউদ্দীন, নিজে নিজেকে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেছেন। আওয়ামী লীগের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কমিউনিস্ট’। হতভম্ব হয়ে গেলাম। ভাবলাম যুদ্ধের সময় যদি এরূপ বিভেদ থাকে ভবিষ্যতে কী হবে? নিশ্চয়ই তাজউদ্দীন সাহেবের জীবনটা সুখের হবে না। স্বাধীনতা উত্তরকালে তাই প্রমাণিত হয়েছিল। ‘কৃতঘ্ন’ শব্দটা অন্য ভাষায় নেই। ষড়যন্ত্র থেমে ছিল না। যুদ্ধকালীন সময়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ শেখ ফজলুল হক মনির সহায়তায় মুক্তি বাহিনীর সমান্তরাল অপর একটি বাহিনী সৃষ্টি করেছিল। নাম বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স বা মুজিব বাহিনী।
যাই হোক, ড. জাফরুল্লাহ বলছেন, কলকাতা থেকে সরাসরি লক্ষৌ ফ্লাইট না পাওয়ায় দিল্লি হয়ে লক্ষৌ যাত্রা করি। দিল্লিতে বিশিষ্ট বাঙালি ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তারা সাক্ষাতে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘সব ঠিক হয়ে গেছে, আপনারা ডিসেম্বরে ঢাকা ফিরতে পারবেন। প্রবাসী সরকারের সঙ্গে ভারতের চুক্তি হয়েছে।’ আশ্চর্য হলাম, ওসমানী সাহেব আমাকে কিছুই বলেননি।
লক্ষৌ সেন্ট্রাল কমান্ড হাসপাতালে খালেদ মোশারফ আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘আমাকে লন্ডনে নিয়ে চলুন, ভারতীয়রা আমাদের ভুটান সিকিম বানাবে। তারা আমাদের চাইনজি অস্ত্র নিয়ে ভারতীয় নিম্নমানের অস্ত্র দিচ্ছে, আমাদেরকে তাদের পদানত করে রাখার জন্য’। আপনার জন্য টিকেটের ব্যবস্থা তো আমিই করতে পারি কিন্তু ভারতীয়রা আপনাকে ভারত ছাড়ার অনুমতি দেবে তো? বিষয়টি আমি সর্বাধিনায়ককে জানাব।
ফেরার পথে আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। দিল্লি-কলকাতার একটা ফ্লাইট লক্ষৌ হয়ে যায়। প্লেনে ওঠার পর দেখি আমার পাশে আবদুস সামাদ আজাদ এম এন এ।
সামাদ ভাই বললেন, ‘তুমি আমাকে দেখনি। কাউকে বলবে না। এয়ারপোর্টে আমার গাড়ি থাকবে, সেটা নিয়ে তুমি চলে যেও। আমার জন্য অন্য আর একটি গাড়ি থাকবে’। তুমি আমার কথা কাউকে বলো না। আমার অনুসন্ধিৎসা বাড়ল, জিজ্ঞেস করলাম, ‘দিল্লিতে কী করলেন? কোনো চুক্তি হয়েছে কি’? উনি উত্তর দিলেন না। আমার মনে সন্দেহ দৃঢ় হলো। কলকাতা পৌঁছে সোজা থিয়েটার রোডে ওসমানী সাহেবের রুমে। রেগে বললাম, দেশ বেঁচে দিয়েছেন। উনি আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন কিছুই বুঝতে পারছেন না। আমি খালেদ মোশারফ ও আব্দুস সামাদ আজাদের সঙ্গে আমার কথোপকথনের কথা বললাম। আবদুস সামাদ আজাদের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে তাদের সঙ্গে আলাপের বিস্তারিত তথ্য জানলাম। আরও জানালাম দিল্লির বিশিষ্ট জনেরা আমাকে কী বলেছেন। ওসমানী সাহেব সোজা প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন সাহেবের ঘরে ঢুকে উচ্চস্বরে বললেন, ‘You sold the country, I wil not be a party to it.’ তাজউদ্দীন সাহেব কর্নেল ওসমানীকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন, নিচু স্বরে কী বললেন আমি শুনতে পেলাম না। আমি দরজার বাইরে ছিলাম।
কয়েকদিন পরে উভয়ের মধ্যে পুনরায় বাগ্বিতন্ডা ভারতীয় একটি প্রস্তাবনা নিয়ে। ডিসেম্বরে দেশ স্বাধীন হলে আইনশৃঙ্খলা স্থাপনের জন্য বেশ কয়েকজন ভারতীয় বাঙালি ওঅঝ ও ওচঝ বাংলাদেশের সব বড় শহরে একটা মেয়াদে অবস্থান নেবেন। ওসমানী সাহেব বললেন, ‘এটা হতে পারে না, আমাদের বহু বাঙালি, ঈঝচ,চঝচ আছে। কেউ কেউ পাকিস্তানে আটকা পড়েছেন। এরা তো নিশ্চয়ই ফিরে আসবেন।
ওসমানী সাহেবের সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশের সরকারের মন্ত্রীদের মত পার্থক্যের কথা জেনে ভারতীয়রা আরও সতর্ক হলেন। ওসমানী সাহেবকে কড়া নজরে রাখলেন। কাগজে কলমে যৌথ কমান্ডের কথা থাকলেও বস্তুত তারা ওসমানী সাহেবকে একাকী করে দিলেন। ভারতীয়রা সব কমান্ড নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করলেন। ওসমানী সাহেবের সঙ্গে ভারত কর্তৃপক্ষের সম্পর্কের দ্রুত অবনতি হলো।
জেনারেল (অব.) ওসমানী ছাত্র নেতা কে এম ওবায়দুর রহমান ও আমাকে ৫ ডিসেম্বর ৭১ যশোরের অবস্থা দেখে আসার জন্য নির্দেশ দেন। ঐ দিনই আমরা যশোর ক্যান্টনমেন্টে পৌঁছে হতভম্ব হয়ে যাই। ভারতীয় সেনারা একের পর এক অফিসারদের বাসস্থানের এসিসহ বিভিন্ন সামগ্রী, অস্ত্রাগার, এমনকি যশোর সিএমএইচের যন্ত্রপাতি লুট করেছে। বলছে, ‘বেঙ্গল রেজিমেন্ট এত বৈভব ও আরাম আয়েশে ছিল, কেন বিদ্রোহ করেছ? বিষয়টা ফোনে ওসমানী সাহেবকে জানানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে ৭ ডিসেম্বর আমি কলকাতা ফিরে আসি। ওবায়দুর রহমান তার জেলা ফরিদপুরের পথে অগ্রসর হবার সিদ্ধান্ত নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। কলকাতায় পৌঁছে সঙ্গে সঙ্গে আমি পুরো বিষয়টি ওসমানী সাহেবকে জানানোর পর, তিনি আমাকে সঙ্গে নিয়ে তাজউদ্দীন আহমেদকে অবহিত করেন। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘তাহলে পাকিস্তানি বর্বর বাহিনীর সঙ্গে ভারতীয় সেনাবাহিনীর তফাৎ কোথায়’? ওসমানী সাহেব বললেন, ‘বুঝতে পারছেন, ভারতীয়রা আমাকে কেন সরাসরি সমরাঙ্গনে যেতে দেয়নি। তাদের উদ্দেশ্য ভালো না’।
চার
ওপরের এই বিস্তারিত বর্ণনার পর পাঠক পাঠিকা ভাই বোনদের কাছে এই বিষয়টি নিশ্চয়ই পরিষ্কার হয়ে গেছে যে প্রবাসে যেসব আওয়ামী লীগ নেতা গিয়েছিলেন তাদের মধ্যেও ছিল আদর্শিক বিভাজন এবং নেতৃত্বের রেষারেষি। শেখ মুজিবের আপন ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনি এবং আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারি তাজউদ্দীন আহমেদের মধ্যে ছিল প্রচননড কোন্দল। তাই তাজউদ্দীনকে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী বানালেও শেখ ফজলুল হক মনি সেটা মেনে নিতে পারেননি। সেজন্যই তিনি যখন জাফরুল্লাহর মুখে তাজউদ্দীনের নামের আগে প্রধানমন্ত্রী শব্দটি শোনেন তখন তিনি তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন। এই বিরোধের সূত্র ধরেই মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যেও তীব্র বিরোধ দেখা দেয়। প্রবাসী সরকারের উদ্যোগে জেনারেল ওসমানীর নেতৃত্বে গঠিত হয় মুক্তি বাহিনী। কিন্তু ঐ দিকে শেখ মনির উদ্যোগে ভারতীয় জেনারেল উবানের সরাসরি তত্তাবধান ও পরিচালনায় গঠিত হয় মুজিব বাহিনী বা বেঙ্গল লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ)। সেটি একটি ভিন্ন কাহিনী। আজ আমরা সেদিকে যাচ্ছি না।
ড. জাফরুল্লাহর বিবরণীতে জানা যায় যে, কলকাতায় ভারত সরকার এবং প্রবাসী সরকারের মধ্যে অনেক কিছুই ঘটে যায় এবং অতীব গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যার আগা মাথা, মুক্তি বাহিনীর প্রধান সেনাপতি হওয়া সত্তেও জেনারেল ওসমানী কিছুই জানতেন না। জুলাই মাসেই ঠিক হয় যে, ভারতীয় সেনাবাহিনী ডিসেম্বরেই পাকিস্তান আক্রমণ করবে এবং ডিসেম্বরের মধ্যেই পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে বাংলাদেশ নাম দিয়ে স্বাধীন করবে। এই মর্মেও একটি চুক্তি হয়েছিল। সেটিও ওসমানী জানতেন না।
স্বাধীন হওয়ার আগেই যে স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ভারতের কাছে বন্ধক দেওয়া হয়েছে সেটি বুঝেছিলেন জেনারেল ওসমানী এবং সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশারফ। তাই লক্ষৌ সেন্ট্রাল কমান্ড হাসপাতালে খালেদ মোশারফ জাফরুল্লাহকে দেখে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘আমাকে লন্ডনে নিয়ে চলুন, ভারতীয়রা আমাদের ভুটান সিকিম বানাবে। তারা আমাদের চাইনজি অস্ত্র নিয়ে ভারতীয় নিম্নমানের অস্ত্র দিচ্ছে, আমাদেরকে তাদের পদানত করে রাখার জন্য’। তাই দেখা যায়, জাফরুল্লাহর বর্ণনা মতে ওসমানী সাহেব সোজা প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন সাহেবের ঘরে ঢুকে উচ্চস্বরে বললেন, ‘You sold the country, I wil not be a party to it.’ এসব বর্ণনা থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, কেন জেনারেল ওসমানীকে তদানিন্তন রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিত আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আসতে দেওয়া হয়নি এবং কেন তাকে বহনকারী এম-৮ বিমানে গুলি চালানো হয়েছিল।
পাঁচ
শেখ মুজিবকে পাকিস্তানিরা
কেন হত্যা করেনি?
পাকিস্তানিদের হাত ছাড়া হয়ে গেল সাবেক পূর্ব পাকিস্তান। তার পরেও ওরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে কেন হত্যা করেনি? এব্যাপারে নানান কথা শোনা যায়, নানা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। আমরা সেগুলোর মধ্যে যাচ্ছি না। কিন্তু ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ঐ সুদীর্ঘ সাক্ষাৎকারের শুরুতেই এসম্পর্কে যা বলেছেন সেটি হুবহু এখানে তুলে দিচ্ছি। জাফরুল্লাহর বর্ণনা মতে ব্রিটিশ সাংবাদিক শেখ মুজিবকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘Mr. Rahman, are you not afraid that Pakistanis may kill you?
‘মিস্টার রহমান, আপনার কি পাকিস্তানিদের হাতে মারা যাবার ভয় নেই’?
তাৎক্ষণিক উত্তর দিলেন বঙ্গবন্ধু,- ‘No, if they kill me, they have to face their worst enemy-the Communists’.
‘না, আমাকে মারলে তাদেরকে তাদের বড় সবচেয়ে বড় শত্রু কমিউনিস্টদের মুখোমুখি হতে হবে’? এ সম্পর্কে আমার কিছু জানা নাই। ড. জাফরুল্লাহ নিজেও কিছু বলেননি।
journalist15@gmail.com



 

Show all comments
  • ২৬ জুলাই, ২০১৮, ১:০৩ এএম says : 0
    এখানে আপনি আপনার মন্তব্য করতে পারেন এমন অনেক কথাই আমরা এখনো জানিনা থানক্স ধন্নবাদ
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।