Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ০৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

জন্ম শতবার্ষিকীর শ্রদ্ধাঞ্জলী: ফররুখের জীবন ও সাহিত্যকর্ম

মু সা ফি র ন জ রু ল | প্রকাশের সময় : ৮ জুন, ২০১৮, ১২:০০ এএম

কবি সৈয়দ ফররুখ আহমদ মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার মাঝাইল গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯১৮ সালের ১০ জুন জন্মগ্রহণ করেন। পিতা পুলিশ ইন্সপেক্টর সৈয়দ হাতেম আলী। ফররুখ আহমদ খুলনা জিলা স্কুল থেকে ১৯৩৭ সালে মেট্রিক এবং কলিকাতা রিপন কলেজ থেকে ১৯৩৯ সালে আই.এ পাশ করেন। এরপরে প্রথমে স্কটিশ কলেজে দর্শনে অনার্স এবং পরে সেন্টপল কলেজে ইংরেজিতে অনার্সে অধ্যয়ন করেন। কলেজ জীবন থেকে বামপন্থী রাজনীতিতে সক্রিয় হন। এ সময় তিনি র‌্যাডিকেল হিউম্যানিজম আন্দোলনের নেতা এম.এন রায়ের অনুসারী ছিলেন। ১৯৪৩ সালে আই.জি (প্রিজন) অফিসে, ১৯৪৪ সালে সিভিল সাপ্লাই অফিসে, ১৯৪৫-১৯৪৭ সালে পর্যন্ত জলপাইগুড়িতে একটি ফার্মে ও মোহাম্মদী পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে এবং ১৯৪৭-১৯৭২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ বেতারে স্টাফ রাইটার পদে কর্মরত ছিলেন।
কবি ফররুখ আহমদ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সমর্থন দান করেন। দেশবিভাগের পরপরই তিনি মাসিক সংগাত পত্রিকার (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর, ১৯৪৭) সংখ্যায় ‘পাকিস্তান : রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্য’ নিবন্ধে তিনি লেখেন “গণতান্ত্রিক বিচারে যেখানে সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়া উচিৎ সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষ কে পর্যন্ত যাঁরা অন্য একটি প্রাদেশিক ভাষায় রূপান্তরিত করতে চান তাঁদের উদ্দেশ্য অসৎ। পূর্ব পাকিস্তানের সকল অধিবাসীর সাথে আমিও এই প্রকার অসাধু প্রতারকদের বিরুদ্ধে আমার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।”
তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’ (১৯৪৪), ‘সিরাজাম মুনীরা’ (১৯৫২), ‘নৌফেল ও হাতেম’ (১৯৬১), ‘মুহুর্তের কবিতা’ (১৯৬৩), ‘পাখির বাসা’ (১৯৬৫), ‘হাতেম তায়ী’ (১৯৬৯) ‘হরফের ছড়া’ (১৯৭০) ‘ছড়ার আসর’ (১৯৭০) ‘হে বন্য স্বপ্নরা’ প্রভৃতি।
ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪) মুসলিম রেনেসাঁসের কবি। চল্লিশের দশকের শক্তিশালী কবি প্রতিভা ফররুখ আহমদ আধুনিক বাংলা কাব্য ধারার পথ বিনির্মাণের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তিনি মুসলিম ঐতিহ্যবোধে উজ্জীবিত হয়ে আরব্য উপন্যাস, ইরান ও আরবীয় সংস্কৃতিতে উল্লেখিত কাহিনীর ঐতিহ্য একদিকে যেমন ধারণ করেছেন অন্যদিকে মুসলিম অভ্যুত্থান যুগের ঐতিহ্য ও ভাবধারাও তাঁর কাব্যে ধারণ করেছেন। তিনি জীবনের শূণ্যতাবোধকে যেমন কবিতার প্রধান উপজীব্য বিষয় হিসেবে নির্বাচন করেছেন, তেমনি মানুষের কুটিলতা, সংকীর্ণতা ও স্বার্থান্ধতাকে কাব্যে স্থান দিয়েছেন। ‘মানুষের সততায় হারায়েছি আমি যে বিশ্বাস’-এ উক্তি শুধু ‘হাতেমতায়ী’র নায়িকা হুসনা বানুরই নয়, আধুনিক বিক্ষুব্ধ পৃথিবীর যে কোন মানুষের। তাই তাঁর কবিতা এক বিশেষ ধর্মীয় কাল পরিক্রমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর কবিতা লাভ করেছে বিশ্বজনীনতা।
ফররুখ আহমদ মুসলিম আদর্শে বিশ্বাসী। তাঁর কাব্যে ঐতিহ্য ও আদর্শের পারস্পর্য কি তা সহজেই বোধগম্য এবং কোন প্রেক্ষিতে এই সমন্বিত উদ্বোধন তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু তাতে ঐতিহ্যের স্বপ্ন যতখানি লাবণ্যে উদ্ভাসিত, জীবনের দ্বািদ্বক অবশ্যম্ভাবিতা উজ্জ্বল। জীবনধারণের সাথে আদর্শের যোগ স্থাপিত করা হয়েছে প্রতীক ও রূপক দ্যোতনার মাধ্যমে। তাই ফররুখ আহমদের প্রতীক ব্যবহার জীবন রসে নয় প্রতীকী রসে সিঞ্চিত। এ প্রসঙ্গে উদাহরণ দিলে কথাটি পরিস্কার হবে:
“নতুন পানিতে সফর এবার, হে মাঝি সিন্দাবাদ
পাকে পাকে ঘুরে-তীর বেগে ছুটে আবর্তে দিশেহারা,
ক্ষুধার ধমকে ঘাস ছিঁড়ে খেয়ে আকাশ জাগায়ে সাড়া,জালিমের চোখ আগুনে পোড়ায়ে গুড়ায়ে পাপের মাথা,
দেখেছি সবুজ দরিয়া জাজিমে স্বপ্ন রয়েছে পাতা।” (সিন্দাবাদ)
অথবা
“জাগো বন্দরে কৈফিয়তের তীব্র ভ্রুকুটি হেরি
জাগো, অগণন ক্ষুধিত মুখের নীরব ভ্রুকুটি হেরি
দেখ চেয়ে দেখ সূর্য ওঠার কত দেরি কত দেরি।” পাঞ্জেরী)
উদ্ধৃতগুলো এতই প্রাঞ্জল যে, কি আদর্শে উজ্জীবিত এবং ব্যবহৃত প্রতীকের আড়ালে মূল বক্তক্যটাই বা কি তা সহজেই অনুমেয়। মূলত প্রতীকের আড়ালে যে ঐতিহ্য ও আদর্শ অবিমিশ্র হয়েছে তা একটি বিশেষ কালের সীমায় আবদ্ধ থাকেনি তা হয়ে উঠেছে গতিময়।
ইসলামি ভাবধারা ও উপজীব্য বিষয় নিয়ে কবিতা লেখায় যে দৃষ্টান্ত কবি কাজী নজরুল ইসলাম উপস্থাপন করেন কবি ফররুখ আহমদ সে ধারারই যোগ্য উত্তরসাধক। কবিতার আঙ্গিক রচনাশৈলী এবং প্রকাশ ভঙ্গিতে উভয়ের মধ্যে মূলগত কিছু পার্থক্য থাকলেও কতকগুলো ক্ষেত্রে কবি ফররুখ আহমদ সার্থক স্রষ্টা। বিদেশী শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ করে আরবী-ফারসী শব্দের ব্যবহারে তিনি অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাবলীল ও সার্থক।
আরবের মরু প্রান্তরে খেজুর গাছের আড়ালে মায়াবী চাঁদের হাতছানি, ইরান ও আরবের সংস্কৃতি ও পুরাকথা কুরআনের সত্য কাহিনী এবং আরব্য উপন্যাসের বিভিন্ন ঘটনাবলীকে তিনি শৈল্পিক কুশলতায় কাব্যিক দক্ষতায় যথার্থ রূপদান করেছেন। আরবী-ফারসী শব্দ ব্যবহার সর্বপরি উপমা উৎপ্রেক্ষার সার্থক প্রয়োগের মধ্য দিয়ে বাংলা কাব্যে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন। কবির প্রেম, সৌন্দর্য চেতনা এবং আবেগ উল্লেখিত পরিমন্ডলের আবির্ভ‚ত নয় বরং এ সবের মধ্যে একাকার হয়ে মিশে আছে। তাঁর কাব্য বৈশিষ্ট্য আলোচনা করতে গিয়ে আবু জাফর সামসুদ্দীন পূর্বদেশ পত্রিকায় ১৩৮১ সালের ৪ঠা কার্তিক প্রকাশিত অপরাজেয় কবি ফররুখ আহমদকে ‘জীবন শিল্পী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার মতে ‘অন্ধকার অমানিশার মধ্যেও আলোর গান শোনার নামই যদি জীবন বন্দনা হয়, তাহলে ফররুখ আহমদ অবশ্যই ছিলেন জীবন শিল্পী।
ফররুখ আহমদ ছিলেন মানব দরদী কবি। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ তিনি পছন্দ করতেন না। তাঁর বিশ্বাস ছিলো সকল মানুষই সমান। তিনি নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের দুঃখ সমব্যথী। এবং এদের গভীর মমতায় অনুভব করতেন। তাঁর এই জীবনাদর্শের প্র্রকাশের ভঙ্গিও ছিলো ভিন্নতর। তিনি নির্যাতিত মানুষের দুঃখ বেদনায় মুসলিম ঐতিহ্যকে স্মরণ করেছেন এবং সেই আদর্শকে বুকে বাধার পরামর্শ দিয়েছেন :
“নিশান আমার কি স্বপন তুমি দেখছো আজ।
নিশান আমার শীর্ণ মুঠিতে
পেতে চাও তুমি মহা নিখিল?
ক্ষুধিত মাটিতে সে নয় তাজমহল
মানুষের মাঠে বিরাণ মাটিতে
এবার ফলবে তাজা ফসল।” (নিশান)
ফররুখ আহমদের কাব্য সাধনার প্রথম পর্বে ছিলো রোমান্টিকতা, স্বপ্ন ও সৌন্দর্যবোধের প্রাধান্য, যদিও কবিতায় স্বপ্ন ও বাস্তবের দ্ব›দ্ব একবারেই অপ্রতক্ষ ছিলো না। কবিতার ভাষা, উপমা, উৎপ্রেক্ষা চিত্রকল্প ও রূপরীতিতে অনেকটা এই কবির রচনাতে ছিলো আবেগ অনুভূতির স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ এবং স্বতন্ত্র কণ্ঠের উচ্চারণ। স্বপ্ন ও সৌন্দর্যবোধের পাশাপাশি মানবিকতাবোধের প্রকাশ ঘটেছে তাঁর প্রথম জীবনের কবিতায়। কিন্তু সীমিত সাফল্যে সন্তুষ্ট না থেকে সৃজনী প্রতিভাধর ফররুখ আহমদ কাব্যের নতুন রূপ নির্মাণের দিকে অগ্রসর হন। এ ক্ষেত্রে কাজী নজরুল ইসলাম ও মহাকবি ইকবালের কবিতাই তাঁর প্রেরণার মূল উৎস হয়। ইসলামী আদর্শে গভীরভাবে বিশ্বাসী এবং মুসলিম রেনেসাঁয় প্রত্যয়ী হওয়ার পর ফররুখ কাব্যের উপজীব্য আহরণ ও রূপরীতি নির্মাণের ক্ষেত্রে ভিন্নরীতির অন্নেষী হন। পাকিস্তান আন্দোলনের পটভ‚মিতে রেনেসাঁ আন্দোলনের সময়েই তিনি সচেতন প্রয়াসে কাব্যে মুসলিম ঐতিহ্যের ব্যবহার, বিশেষ করে চলতি ভাষার পুঁথি কাব্যের নবরূপায়ণের দিকে দৃষ্টি দেন। আরব্য উপন্যাসের কাহিনীকে প্রতীকী উপস্থাপনের মাধ্যমে ফররুখ আহমদ নতুন ব্যঞ্জনায় ও গভীর তাৎপর্য মহিমায় মূর্ত করে তোলেন। (অসমাপ্ত)



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।