Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫, ০৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

মাটি ও মানুষের সঙ্গে রাজনীতি যাঁর

মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক | প্রকাশের সময় : ৯ জুন, ২০১৮, ১২:০০ এএম

আজকের রচনা অবতারণা করার জন্য আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি একজন মানুষের রাজনৈতিক জীবন ও রাজনৈতিক কর্ম দ্বারা এবং গত ২৮-২৯ মে তার সেই কর্মের প্রতিফলন দেখে। আমি নিজে একজন নবীন রাজনৈতিক কর্মী। আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি আরেকজন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ সফল রাজনৈতিক নেতার রাজনৈতিক জীবন ও কর্মের দ্বারা। তিনি তৃণমূল পর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মী ও জাতীয় পর্যায়ের নেতা। আমি যাঁর কথা বলছি, তাঁর নাম সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম। ওয়াহিদুল আলমের পিতা হচ্ছেন মরহুম আলহাজ সৈয়দ আব্দুস সাত্তার। তাঁর জন্মস্থানের প্রসিদ্ধ নাম লালিয়ার হাট; চট্টগ্রাম থেকে হাটহাজারী যাওয়ার প্রধান সড়কের উপরেই এটি অবস্থিত। মরহুম সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম পারিবারিক সূত্রে আমার মামা; তথা আমার একমাত্র আপন চাচীর সানোয়ারা বেগমের কনিষ্ঠ ভাই। ওয়াহিদুল আলম বয়সে আমার থেকে দুই-তিন বছরের বড়। তিনি আমার মরহুম পিতার অতি ঘনিষ্ঠ, অসম বয়সের বন্ধু এবং আস্থাভাজন ব্যক্তি ছিলেন; তিনি আমার পিতাকে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ পরামর্শক ও গুরুজন হিসেবে বিবেচনায় রাখতেন। সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের প্রথম সন্তান হলেন ব্যারিস্টার সৈয়দা শাকিলা ফারজানা, যিনি জাতীয়তাবাদী আইনজীবী সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে নেতৃত্বস্থানীয় পর্যায়ে সংযুক্ত। শাকিলা ফারজানা হাটহাজারী এলাকাতেও জনগণের নিকট একজন শ্রদ্ধাভাজন রাজনৈতিক নেতা। দ্বিতীয় সন্তান হচ্ছেন সৈয়দা আকলিমা ফারজানা। তিনি একজন ব্যস্ত সমাজসেবক। মরহুম ওয়াহিদুল আলমের সম্মানিতা স্ত্রী ফরিদা ওয়াহিদ, বৃহত্তর চট্টগ্রামের চকরিয়া উপজেলার একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের বিদূষী সন্তান। ওয়াহিদুল আলমের জনমুখী পরিশ্রমী কর্মকান্ডের প্রেরণা ও উৎসাহের ভান্ডার ছিলেন তিনি। আমার মরহুম পিতার জ্যেষ্ঠতম ফুফুর শ্বশুরবাড়িও ছিল ওই একই লালিয়ারহাট সংলগ্ন গ্রামে।
মানুষকে ভালোবাসতে হয়, মানুষকে ভালোবাসা যায় এবং মানুষকে ভালোবাসলে ভালোবাসার মাধ্যমেই মানুষ সেটার সম্মান রক্ষা করে, এর জ্বলন্ত উদাহরণ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের রাজনৈতিক জীবন। মূলত এই কথাটি তুলে ধরার জন্যই আজকের এই কলামের অবতারণা। উদ্দেশ্য, তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক কর্মীগণ দিক নির্দেশনা পেতে পারেন। মৃত্যু এবং তদপরবর্তী ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানমালার কথা দিয়েই শুরু করি। রবিবার ২৭ মে ২০১৮ আনুমানিক সন্ধ্যা ৭:৪০ এর দিকে খবর পেলাম সাবেক সংসদ সদস্য তথা আমার মামা সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম ইন্তেকাল করেছেন। এখন থেকে কম-বেশি দুই বছর আগে তিনি দ্বিতীয়বার ব্রেইন স্ট্রোক-এ আক্রান্ত হয়েছিলেন। দেশ-বিদেশে চিকিৎসা নেওয়া সত্তে¡ও, সেটা থেকে তিনি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। মৃত্যু সংবাদ কানে আসা মাত্রই হাটহাজারী ও চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ হাসপাতালে ছুটে গেলেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও ছুটে গেলেন। বর্তমান সংসদের চট্টগ্রাম-৫ আসনের বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত এমপি ও বর্তমান মন্ত্রী সভার সদস্য, হাটহাজারীর সন্তান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, সাবেক মন্ত্রী ও বর্তমান স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রী এবং বিএনপির অন্যতম ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান, সাবেক প্রতিমন্ত্রী-সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বর্তমানে বিএনপির অন্যতম ভাইস চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল ইবরাহিম বীর প্রতীক, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মীর হেলাল, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি ডাক্তার শাহাদত হোসেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডাক্তার ফোয়াজ হোসেন শুভ, প্রখ্যাত সাংবাদিক নেতা ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য কাদের গণি চৌধুরী এবং আরও অনেকেই হাসপাতালে সমবেত হন। দলমত নির্বিশেষে একজন পরলোকগত জননেতার প্রতি শ্রদ্ধাপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ বিদায় জানানোর জন্য সমন্বিতভাবে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। অবশ্যই, ওয়াহিদুল আলমের সদ্য বিধবা স্ত্রী এবং জ্যেষ্ঠ কন্যা স্বনামখ্যাত ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা সহায়তা করেন। বলে রাখতেই হবে যে, রাজনৈতিক নেতা হিসেবেও ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা তাঁর পিতার নির্বাচনী আসনের জনগণের নিকট সুপরিচিত ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি।
ওয়াহিদুল আলম সর্বশেষ পার্লামেন্ট সদস্য ছিলেন ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত; প্রায় সাড়ে এগারো বছর পর তিনি ইন্তেকাল করলেন। তার প্রথম জানাযা অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা মহানগরের মোহাম্মদপুর এলাকায় অবস্থিত কাদেরিয়া তৈয়বিয়া আলীয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গনে ২৭ মে রাতে। দ্বিতীয় জানাযা অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ২৮ মে সকাল ১১টায়। তৃতীয় জানাযা অনুষ্ঠিত হয় ২৮ মে দুপুর সাড়ে বারোটায়, ঢাকা মহানগরের নয়া পল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে। অতঃপর মৃতদেহ হেলিকপ্টারে করে চট্টগ্রাম নিয়ে আসা হয়। ২৮ মে বাদ আসর চট্টগ্রাম মহানগরের অতি বিখ্যাত জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদ প্রাঙ্গনে চতুর্থ জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রামের এই জানাযায়, বিজ্ঞজনদের অনুমানে, দশ হাজারের অধিক মানুষ শরীক হয়েছিলেন। চট্টগ্রাম মহানগরের সকল রাজনৈতিক দলের নেতা ও কর্মীবৃন্দ এবং সামাজিক নেত্রীবৃন্দ, আলেম-ওলামাগণ জানাযায় অংশগ্রহণ করেন। পরেরদিন তথা ২৯ মে সকাল ১১টায় হাটহাজারী উপজেলার সদরে, হাটহাজারী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের মাঠে পঞ্চম জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। ওই মাঠে অনুষ্ঠিত মিটিং বা জানাযার সঙ্গে পরিচিত অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলেন, স্মরণকালের মধ্যে কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক নেতার জন্য এতবড় জানাযা এই মাঠে অনুষ্ঠিত হয়নি। যদিও মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ (জেনারেল এরশাদ সাহেবের) জাতীয় দলের সদস্য এবং ওয়াহিদুল আলমের ঘোরতর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তথাপি, ব্যারিস্টার আনিসই হাটহাজারী উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেন যেন জানাযার সকল প্রশাসনিক বন্দোবস্ত করা হয়। এখানেও হাটহাজারী উপজেলার এবং প্রতিবেশী উপজেলাগুলোর সকল দলের রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। ষষ্ঠ এবং শেষ জানাযা অনুষ্ঠিত হয় লালিয়ার হাটের প্রধান সড়কের পাশেই মাদ্রাসা প্রাঙ্গনে। উল্লেখ্য যে, এটাই মরহুমের নিজ বাড়ি। সেই জানাযাতেই হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত ছিলেন এবং নামাজের কারণে প্রধান সড়ক প্রায় ২০ মিনিট বন্ধ ছিল। আমি নিজে হাটহাজারীতে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখি; লালিয়ার হাটে উপস্থিত থাকি, বক্তব্য রাখি এবং জানাযায় অংশগ্রহণ করি। মীর নাসির, ব্যারিস্টার আনিস এবং সম্মানিত উপজেলা চেয়ারম্যান, তাঁরাও হাটহাজারীতে বক্তব্য রাখেন।
আমি নিজে হাটহাজারী উপজেলার সন্তান। এলাকার জনগণের নিকট আমার পরিচিতি ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে বা ভিন্ন ভিন্ন সুবাদে যথা কেউ চেনেন রণাঙ্গণের মুক্তিযোদ্ধা বীর প্রতীক হিসেবে, কেউ চেনেন কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে, কেউ চেনেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা হিসেবে যিনি রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে সততার সঙ্গে ও সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, কেউ চেনেন ২০ দলীয় জোটের একজন শীর্ষ নেতাদের মধ্যে একজন যিনি ম্যাডাম খালেদা জিয়ার আস্থাভাজন, কেউ চেনেন শহীদ জিয়ার অনুসারী ও ভক্ত হিসেবে একজন, কেউ চেনেন তারুণ্য-বান্ধব একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে, কেউ চেনেন পত্রিকার একজন জনপ্রিয় কলাম লেখক হিসেবে, কেউ চেনেন টেলিভিশন টকশোতে স্পষ্টবাদী সৌজন্যপ্রিয় বক্তা হিসেবে, কেউ চেনেন একজন ইসলামী চিন্তাবিদ ও বক্তা হিসেবে, কেউ চেনেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক হিসেবে এবং সর্বশেষ বিশেষত হাটহাজারীতে কেউ চেনেন সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের ভাগিনা হিসেবে। গত ছয় বছর আট মাস আমি রাজনৈতিকভাবে আমার সময়, সম্পদ ও মেধাকে দুই জায়গায় বিনিয়োগ করেছি। প্রথম জায়গা হলো হাটহাজারী উপজেলা তথা চট্টগ্রাম-৫ নির্বাচনী আসন। এবং দ্বিতীয় জায়গা হলো ঢাকাসহ অবশিষ্ট বাংলাদেশ, ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে, ২০ দলীয় জোটেরই অনুকূলে এবং ম্যাডাম খালেদা জিয়ার প্রতি আনুগত্যে। ছয় বছর আট মাস আগে যখন বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি নতুন গঠনতব্য ১৮ দলীয় জোটে প্রবেশ করছিল, আমার রাজনৈতিক জীবনের সেই গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে, দেশনেত্রী বেগম জিয়া নির্দেশ দিয়েছিলেন, আমি যেন আমার সময়, মেধা ও সম্পদ আমার জন্মস্থানে ব্যয় করি।
আমার মামা সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম হাটহাজারীতে আমার রাজনৈতিক কর্মজীবনের সূচনাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। ১১ নভেম্বর ২০১১ ওয়াহিদুল আলমের সম্মানিত মাতা তথা আমার নানী ইন্তেকাল করেছিলেন; তার ছয়দিন পর চট্টগ্রামের ধর্মীয়-সামাজিক রেওয়াজ অনুযায়ী নানীর সম্মানে মেজবান (মেজ্জান) অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই সময় মামার সঙ্গে অনেক ইন্টারঅ্যাকশন হয়। আবেগ মিশ্রিত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘ভালোই হলো, মামা-ভাগ্নে একসঙ্গে থাকবো, মামা না থাকলে ভাগিনা থাকবে।’ এবং মামা তাঁর অভিজ্ঞতা আমার চিন্তা চেতনায় ধাবিত করার জন্য সর্বদাই আগ্রহী ও তৎপর থাকতেন। সেই সুবাদে হাটহাজারী উপজেলার জাতীয়তাবাদী ঘরানার সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সাথে আমার নিবিড় ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে, কারো সাথে কম কারো সাথে বেশি। এই অভিজ্ঞতার আলোকে এই প্রেক্ষাপটে আমি ২৭-২৮-২৯ মে ২০১৮, এই তিনদিনের দৃশ্যপটগুলোকে মূল্যায়ন করলাম। সকল পর্যায়ের সকল রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী জানাযার মাঠে মাইকে হোক অথবা আলাপচারিতার সময় হোক, একবাক্যে স্বীকার করেছেন অনেকগুলো কথা। সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম সকল মানুষকে তাৎক্ষণিকভাবেই আপন করে নিতে পারতেন এবং করতেনও। তিনি সকল ধর্মের মানুষকে নিয়ে চলতেন, প্রত্যেককেই নিজ নিজ মর্যাদা দিয়ে। তিনি সকল রাজনৈতিক দলের মানুষকে স¤প্রতীর বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন; মারামারি, সন্ত্রাস, প্রতিহিংসামূলক কর্মকান্ড কোনোদিনই উৎসাহিত করেননি বা কোনো প্রকারের প্রশ্রয় দেননি। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক বিরোধী দলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেননি। তিনি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে দুর্নীতি প্রশ্রয় দেননি। হাটহাজারী উপজেলায় অবস্থিত কওমী শিক্ষাধারার দেশবিখ্যাত ও অন্যতম বৃহৎ মাদ্রাসা, দারুল উলুম মইনুল ইসলামসহ সকল কওমী মাদ্রাসার প্রতি সম্মানের মনোভাব রাখতেন ও সহযোগিতা করতেন। অনুরূপভাবে এবং যুগপৎ, হাটহাজারী উপজেলারই ছিপাতলী ইউনিয়নে অবস্থিত, পীর-এ-তরীকত হযরত মাওলানা আজিজুল হক আল-কাদেরী (মা. জি. আ.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ছিপাতলী জামেয়া গাউসিয়া মঈনীয়া বহুমুখী কামিল মাদ্রাসাসহ অন্যান্য আলিয়া মাদ্রাসার প্রতিও সম্মানের মনোভাব রাখতেন এবং সহযোগিতা করতেন। বহু জননেতা নিজ নিজ এলাকায় স্কুল কলেজ মাদ্রাসা স্থাপন করেন। স্কুল কলেজের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠাকারীরা সাধারণত প্রতিষ্ঠানের নামের সাথে নিজের নাম যুক্ত রাখেন। কিন্তু সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম নিজ উদ্যোগে নিজের ইউনিয়নে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন যেটির নাম তিনি তাঁর প্রিয় নেতার নামে দেন; কলেজটির নাম: কে.সি. জিয়াউর রহমান কলেজ। এটি একটি বিরল অনুকরণীয় ঘটনা।
মামার সঙ্গে প্রচুর গল্প হয়েছে, প্রচুর রাজনৈতিক আলাপ হয়েছে, কিন্তু বেশিরভাগই একান্তে বা সামাজিক পরিবেশে। গল্পচ্ছলে আলাপের সময় মামা সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম তাঁর রাজনৈতিক কর্মজীবনের অনেক মিষ্টি অভিজ্ঞতা, অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন এবং আমাকে বলতেন, রাজনীতি করতে গেলে অনেক রকমের অপ্রত্যাশিত বিপদ-আপদ আসে, সেগুলো ধৈর্যের সঙ্গে বুদ্ধি দিয়ে মোকাবিলা করতে হয়। মামা বলতেন, প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের ভেতরেই সংসদীয় আসনভিত্তিক এলাকায় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্ব›িদ্বতা থাকতে বাধ্য। মামা বলতেন, প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বিদ্বতা যেন কোনো দিন সামাজিক ও আত্মীয়তার সম্পর্কে প্রভাব না ফেলে সেটা খেয়াল রাখতে হবে। মামা আমাকে উৎসাহিত করতেন, কারণ তিনি আমার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির ব্যস্ত জীবনের সঙ্গে এবং সফল কর্মকান্ডের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। মামা বলতেন, ‘পাহাড়ী মানুষকে তুমি আপন করে নিয়েছিলে, তোমার জন্মস্থানের মানুষকে আপন করে নেওয়া তোমার জন্য কোনো ব্যাপারই না। পাহাড়ে যেমন ছেলেমেয়েদেরকে আদর করতা, পাহাড়ী মুরুব্বীদেরকে যেমন সম্মান করতে, তেমনভাবেই হাটহাজারী এলাকাবাসীকেও সম্মান করবে, আপন করে নেবে। অবশ্যই এলাকার মানুষকে বুকের ভেতরে ধারণ করবে। আমি দোয়া করি তোমার সাফল্যের জন্য।’
সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের রাজনৈতিক কর্মময় জীবন শুরু হয় হাটহাজারী উপজেলার প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে, ১৯৮৫ সালে। তখন তাঁর বয়স ছিল ৩৮ বছর। নির্বাচনের আগে নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে যেমন প্রতি পাড়ায় মহল্লায় গিয়েছেন, তেমনই নির্বাচিত হয়ে যাওয়ার পরেও তিনি সর্বত্র যে কোনো প্রয়োজনে, যে কোনো অনুষ্ঠানে, বড়-ছোট নির্বিশেষে, সব জায়গায় যাতায়াত করতেন। এই সুবাদে উপজেলাব্যাপী মানুষের সাথে তাঁর নিবিড় পরিচয় ও হৃদ্যতা ছিল। এই কারণে তাঁর প্রতি মানুষের সম্মান, মানুষের ভালোবাসা এবং তাঁর রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা সর্বদাই বাজতে থাকে। যার প্রতিফলন দেখা গিয়েছে ২৭, ২৮ ও ২৯ মে’র অনুষ্ঠানগুলোতে। এই পৃথিবী থেকে তাঁর বিদায় যাত্রায় মানুষ অশ্রুসজল নয়নে আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে প্রার্থনা করে তাঁকে বিদায় দিয়েছে। ১৯৯১ সালে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন; ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের জুনে তৃতীয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বিরোধী দলীয় হুইপ মনোনীত হয়েছিলেন। চতুর্থবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ২০০১ সালে এবং সরকারদলীয় হুইপ মনোনীত হন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর তারিখের নির্বাচনটি যদি হস্তক্ষেপবিহীন হতো, তাহলে তিনি আবারও নির্বাচিত হতেন এবং বিপুল ভোটে নির্বাচিত হতেন বলেই আমার বিশ্বাস এবং জনগণের বিশ্বাস।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে, ফেনী নদীর দক্ষিণে এবং নাফ নদীর উত্তরে যেই জনপদ, যার নাম বৃহত্তর চট্টগ্রাম, সেই জনপদে সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম একজন সফল জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা হিসেবে, মাটি ও মানুষের নেতা হিসেবে, মানুষের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন উজ্জ্বল থাকবেন। ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরীক দল, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক নিজেও মরহুম ওয়াহিদুল আলমের রাজনৈতিক জীবন থেকে কিছু শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং তরুণ স¤প্রদায়ের প্রতি আহ্বান রাখছেন, তারাও যেন সেই পথে আগ্রহী হন। সাধারণ মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ার পথ এমনই হওয়ার কথা, মাটি ও মানুষের সাথে রাজনীতির সম্পর্ক যাঁর।
লেখক: চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
www.generalibrahim.com



 

Show all comments
  • নাঈম ৯ জুন, ২০১৮, ২:৫০ এএম says : 0
    এমন মানুষ আমাদের অনুপ্রেরনা হওয়া উচিত
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।