Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ২৩ জুলাই ২০১৮, ৮ শ্রাবণ ১৪২৫, ৯ যিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী

ঈদুল ফিতরের তাৎপর্য ও আমাদের করণীয়

| প্রকাশের সময় : ১৪ জুন, ২০১৮, ১২:০০ এএম

ইসলাম ধর্মে ঈদের সূচনা: ঈদ শব্দটি আরবি, যার অর্থ হলো আনন্দ, উৎসব, পুনরাগমন, পুনরাবৃত্তি ইত্যাদি। প্রতি বৎসর পর্যায়ক্রমে এই ঈদের পুনরাগমন হয় বলে ইহাকে ঈদ বলা হয়। দুনিয়াতে প্রতিটি ধর্মে আনন্দ উদযাপনের জন্য রয়েছে কয়েকটি দিন, সেভাবে মদিনাবাসীও বছরে দুটি নির্দিষ্ট দিনে আমোদ প্রমোদে মেতে ওঠতো, তারা বসন্ত ও হেমন্তের রজনীতে নওরোজ এবং মিহরিজান নামে দুটি উৎসব পালন করতো। এই দুইটি উৎসবে যেই আচার-অনুষ্ঠান হতো ইসলামে তা সম্পূর্ণ নিষেধ ছিল। মদিনায় আসার পর হুজুর সা. যখন এটা দেখলেন, তখন তাদেরকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন এই নির্দিষ্ট দিনে তোমাদের আনন্দ উৎসবের কারণ কি? মদিনার নবমুসলিম সাহাবাগণ বললেন- আমরা জাহেলি যুগে এই দিন দু’টিতে এভাবে আনন্দ উৎসব করতাম। যা আজ পর্যন্ত আমাদের মধ্যে প্রচলিত। তখন হুজুর সা. ইরশাদ করলেন- আল্লাহ পাক তোমাদের জন্য এই দুটি দিনে আনন্দ উৎসবের পরিবর্তে আরও উত্তম দুটি দিন নির্ধারণ করে দিয়েছেন। একটি ঈদুল ফিতর অন্যটি ঈদুল আযহা। মুসলমান জাতির ঈদ ও উৎসব হবে ইবাদত-বন্দেগীর উৎসব, ঈমানী ও রুহানী উৎসব। অন্য জাতির সংস্কৃতি, নাচ-গান, বাদ্য-বাজনা, আনন্দ, উৎসবের মত হতে পারে না। কেননা এগুলি নফসানি ও শয়তানি উৎসব যা কোন অবস্থাতে ইসলাম ধর্ম সমর্থন করে না। দ্বিতীয় হিজরিতে হুজুর সা. প্রথম ঈদের নামাজ আদায় করেন। একই হিজরিতে শা’বান মাসে রমজানের রোযা ফরজ হয় এবং সদকায়ে ফিতর, ঈদুল আযহা ও কুরবানি ওয়াজিব হয়। (হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগা, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ. ২০)
ঈদের রাতে বিশেষ আমল : যে ব্যক্তি ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার রাত্রে ইবাদতের মাধ্যমে জাগ্রত থাকবে, তার দিল ঐ দিন মৃত হবে না, যে দিন (কিয়ামতের দিন) ইসরাফিল আ. প্রথমবার শিংগায় ফুঁক দিবেন। সে সময় তার দিল আল্লাহর স্মরণে জীবিত থাকবে। তাই উভয় ঈদের রাতে ইবাদতের বিশেষ গুরুত্ব দেয়া ঈমানি দায়িত্ব। (তাবরানি শরিফ)
ঈদের দিনের সুন্নতসমূহ : ১। প্রত্যুষে ঘুম থেকে উঠা। ২। মিসওয়াক করা । ৩। গোসল করা। ৪। পবিত্র ও উত্তম কাপড় পরিধান করা। ৫। সুগন্ধি ব্যবহার করা। ৬। শরিয়ত মত সু-সজ্জিত হওয়া। ৭। ঈদগাহে এক পথ দিয়ে যাওয়া ও অন্য পথ দিয়ে আসা। ৮। ঈদগাহে তাড়াতাড়ি যাওয়া। ৯। কোন ওজর না থাকলে ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়া। ১০। ঈদের নামাজ ঈদগাহে পড়া। ১১। ঈদগাহে যাওয়ার পথে তাকবির পড়া, ঈদুল ফিতরে নিম্মস্বরে ও ঈদুল আযহায় উচ্চস্বরে পড়া। ১২। ঈদুল ফিতরে যাওয়ার সময় বেজোড় সংখ্যক খেজুর বা মিষ্টান্ন দ্রব্য খাওয়া এবং ঈদুল আযহার পূর্বে কিছু না খেয়ে নামাজের পর কুরবানির গোস্ত দিয়ে প্রথমে আহার করা।
ঈদের নামাজ আদায় করার নিয়ম : মৌখিক নিয়ত ওয়াজিব নয় বরং মুস্তাহাব, কিন্তু অন্তরে নিয়ত করা জরুরি। জন সাধারনের জন্য আরবিতে নিয়ত উচ্চারণ করা ঠিক নয়। কেননা, তারা আরবি ব্যাকরন না জানার কারণে এমন বড় ভুল করে বসে যা নিজে অনুধাবন করতে পারেনা। আর নবি করিম (সা.) তার নবুওয়াতের পুরা জীবনে কোন নামাজের আগে নিয়তের শব্দ উচ্চারন করেন নি। এমনকি কোন দুর্বল হাদিসেও তার প্রমাণ নেই। যদি বাংলায় নিয়ত করে, তাহলে এভাবে বলতে হবে যে, আমি একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য ঈদুল ফিতরের বা ঈদুল আযহার দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ ছয় তাকবিরের সাথে এই ইমামের পিছনে আদায় করছি। অতঃপর তাকবীর বলে নামাজ শুরু করতে হবে।
ঈদের নামাজ অন্য নামাজের ন্যায় পড়তে হবে, কেবল প্রথম রাকাতে সানা পড়ার পরে এবং আউযুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহর পূর্বে তিনবার আল্লাহ আকবর বলবে এবং প্রত্যেক তাকবিরের সময় কান পর্যন্ত হাত ওঠিয়ে প্রথম দুটিতে হাত ছেড়ে দিবে এবং তৃতীয়টিতে হাত বেঁধে নিবে, অতঃপর অন্যান্য নামাজের ন্যায় প্রথম রাকাত শেষ করবে। দ্বিতীয় রাকাতে কিরাত শেষে রুকুর পূর্বে তিনটি অতিরিক্ত তাকবির বলবে এবং কান পর্যন্ত হাত ওঠিয়ে ছেড়ে দিবে, অতপর চতুর্থ তাকবির বলে রুকুতে চলে যাবে এবং অন্যান্য নামাজের ন্যায় নামাজ শেষ করতে হবে।
ঈদের নামাজ সংক্রান্ত জরুরী মাসায়েল:
১নং মাসাআলা: ঈদের নামাজান্তে ইমাম সাহেব মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে যাবেন, বসবেন না।
২নং মাসআলা: ঈদুল ফিতরের খুৎবায় সদকায়ে ফিতরের আহকাম সম্পর্কে বয়ান
করবে এবং ঈদুল আযহার খুৎবায় তাকবিরে তাশরিক ও কোরবানির আলোচনা করবে।
৩নং মাসআলা: নামাজাস্তে খুৎবা পাঠ করা সুন্নত, তবে শ্রবণ করা ওয়াজিব। প্রথম খুৎবায় নয় বার ও দ্বিতীয় খুৎবার শুরুতে সাত বার তাকবির বলা মুস্তাহাব, এমনিভাবে দ্বিতীয় খুৎবা শেষে মিম্বার থেকে নামার পূর্বে চৌদ্দ বার তাকবির বলা মুস্তাহাব। তবে উলে­খ্য যে, উক্ত তাকবির ‘তাকরিব তাশরিক’ নয়; বরং সাধারণ তাকবির।
৪নং মাসআলা: ঈদের নামাজের প্রথম রাকাতে সূরায়ে আলা এবং দ্বিতীয় রাকাতে সুরাতুল গাশিয়াহ পড়া মুস্তাহাব।
৫নং মাসআলা: ঈদের নামাজের পূর্বে ঘরে, মসজিদে বা ঈদগাহে এবং ঈদের নামাজের পর ইদগাহে ঐ দিন কোনো নফল নামাজ পড়া মাকরূহ।
৬নং মাসআলা: মহিলাগণ ও যাদের উপর ঈদের নামাজ ওয়াজিব নয়, তাদের জন্যও ঈদের নামাজের পূর্বে নফল নামায পড়া মাকরূহ।
৭নং মাসআলা: কোন ব্যক্তির ঈদের নামাজ ছুটে গেলে তার জন্য একাকি নামায পড়া বৈধ হবে না, কেননা, ঈদের নামাজের জন্য জামাত শর্ত।
৮নং মাসআলা: জামাতে নামাজ আদায় করার পর কারণ বশত কোন লোকের নামাজ ভেঙ্গে গেলে তা ক্বাযা করতে হবে না। অবশ্য যদি কিছু সংখক লোকের ঈদের নামাজ ফাসেদ হয়, তবে অন্য কোন ইমাম দ্বারা নামাজ আদায় করে নিবে।
৯নং মাসআলা: কোন ওজরের কারণে ১লা শাওয়াল দ্বি-প্রহরের পূর্ব পর্যন্ত ঈদুল ফিতরের নামাজ পড়তে না পারলে দ্বিতীয় তারিখেও পড়তে পারবে, তারপর আর পড়া যাবে না। এরূপ ঈদুল আযহার নামাজও ওজরের কারণে ১০ই জিলহজ্ব পড়তে না পারলে ১১, ১২ ই জিলহজ্ব পর্যন্ত পড়তে পারবে।
১০নং মাসআলা: যদি ঈদের নামাজ বড় জামাতে হয়, তখন সেজদায়ে সাহুর কারণ পাওয়া গেলেও সেজদায়ে সাহু দেওয়া ওয়াজিব নয়। (ফতোয়ায়ে শামী)
১১নং মাসআলা: দ্বিতীয় রাকাতে ক্বেরাতের পূর্বে ভুলবশত অতিরিক্ত তাকবিরগুলো বলে ফেললেও নামাজ আদায় হয়ে যাবে।
১২নং মাসআলা: প্রথম ও দ্বিতীয় রাকাতে ভুলবশত তিনের অধিক তাকবির বললেও নামাজ পুনরায় পড়তে হবে না।
১৩নং মাসআলা: ইমাম দাঁড়ানো অবস্থায় তাকবির বলতে ভুলে গিয়ে রুকুতে চলে গেলে রুকুতে স্মরণ হওয়ার সাথে সাথে সে অবস্থায় তাকবিরগুলো আদায় করে নিবে। তবে তাকবিরের জন্য দাঁড়ালেও কোন ক্ষতি নেই। (ফতোয়ায়ে শামী)
১৪নং মাসআলা: যদি ইমাম প্রথম রাকাতে তাকবির বলতে ভুলে যায় এবং সূরায়ে ফাতেহা আংশিক কিংবা পরিপূর্ণ পড়ার পর স্বরণ হয়, তাহলে স্মরণ হওয়ার সাথে সাথে অতিরিক্ত তাকবির বলে পুণরায় সুরায়ে ফাতিহা প্রথম থেকে পড়ে নিবে, তবে ক্বেরাত পড়ার পর যদি স্মরণ হয়। তাহলে স্মরণ হওয়ার সাথে সাথে তাকবির বলে নিবে, দ্বিতীয়বার ক্বেরাতের প্রয়োজন নেই।
১৫নং মাসআলা: যদি কেউ ইমামের রুকু অবস্থায় নামাজে শরিক হয়, এমতাবস্থায় প্রথমে নিয়ত করে সোজা দাঁড়িয়ে তাকবিরে তাহরিমা বলে তারপর ঈদের অতিরিক্ত তাকবিরগুলো বলবে।
১৬নং মাসআলা: যদি এরূপ আশংকা হয় যে, অতিরিক্ত তাকবির বলতে গেলে ইমামকে রুকুতে পাওয়া যাবে না। তাহলে রুকুতে চলে যাবে এবং রুকুর তাসবিহের পরিবর্তে ঈদের তাকবির বলবে, তবে এমতাবস্থায় হাত উঠাতে হবে না।
১৭নং মাসআলা: যদি তার তিন তাকবির বলার পূর্বে ইমাম রুকু থেকে উঠে যায়, তাহলে সেও উঠে যাবে, বাকি তাকবির আদায় করতে হবে না।
১৮নং মাসআলা: যদি কেউ ইমামের সাথে এক রাকাত পায়। তাহলে ইমাম সাহেব নামাজ শেষ করার পর সে অতিরিক্ত তাকবিরসহ উক্ত রাকাত পড়ে নিবে তবে অতিরিক্ত তাকবির ক্বেরাতের পর রুকুর পূর্বে আদায় করবে।
১৯নং মাসআলা: কেউ যদি ইমাম সাহেবকে তাশাহুদ বা সিজদায়ে সাহুর মধ্যে পায় তাহলে সে ইমামের সালাম ফিরানোর পর দাঁড়িয়ে নিয়মানুযায়ী ঈদের নামাজ পড়ে নিবে।
২০নং মাসআলা: যদি চারজন বা ততোধিক লোক ঈদের নামাজ না পায়, তাহলে তাদের জন্য জামাতের সাথে ঈদের নামাজ পড়া ওয়াজিব। (ফতোয়ায়ে শামি)
২১নং মাসআলা: দুই ঈদের খুৎবা ঈদের নামাজের পর পড়তে হবে, পূর্বে পড়ে নেওয়া সুন্নত পরিপন্থি। কিন্তু পূর্বে পড়ে নিলেও পুণরায় পড়া জরুরী নয়।
২২নং মাসআলা: যদি কেউ স্বীয় স্থানে নামাজ পড়ে অন্য কোন স্থানে যায় এবং সেখানেও ঈদের নামাজ শুরু হয়, তাহলে সে নফল নামাজের নিয়তে দ্বিতীয়বার ঈদের নামাজ পড়তে পারবে। (ফতোয়ায়ে সিরাজিয়া পৃ. ১৮)
২৩নং মাসআলা: ঈদের নামাজের পর মুছাফাহা, মুয়ানাকা করা সুন্নাহ এবং এগুলোকে আবশ্যক জরুরী মনে করা বোকামী । (মেরকাত, খ-৪, পৃ. ৫৭৫)
২৪নং মাসআলা: খুৎবার পর সকলে মিলে হাত উঠিয়ে দোয়া করা নামাজের অংশ নয়, সুতরাং দোয়াকে নামাজের অংশ মনে করা ভূল বিদআত। অবশ্য সে সময় সম্মিলিতভাবে মুস্তাহাব হিসেবে দোয়া করা যায় এবং করা শ্রেয়।
২৫নং মাসআলা: হানাফি মুক্তাদি যদি আহলে হাদিছ তথা লা-মাযহাবি বা শাফেয়ী মাযহাবের কোন ইমামের পিছনে ইক্তেদা করে, তাহলে প্রত্যেক রাকাতে ইমাম সাহেবের সাথে তিন তাকবিরই বলবে। তার অতিরিক্ত তাকবির বলবে না। (শামি খ-৫, পৃ. ৫৫৯)



 

Show all comments
  • তানঈম শামস ১৫ জুন, ২০১৮, ৩:৩৯ পিএম says : 0
    ঈদ সংক্রান্ত সঠিক মাসআলা গুলো রেফারেন্স সহ উল্লেখ করার জন্য আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি
    Total Reply(0) Reply
  • নাম ১৬ জুন, ২০১৮, ১২:৪৮ এএম says : 0
    জাযাকাল্লাহ
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ