Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ৬ রবিউস সানী ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ অন্ধকার কার কারণে?

মোহাম্মদ আবদুল গফুর | প্রকাশের সময় : ১৪ জুন, ২০১৮, ১২:০০ এএম

সরকার কি খালেদা ফোরিয়ায় ভুগছেন? নইলে অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনে তিন তিনবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে ঠুনকো অভিযোগে জেলে আটকিয়ে রেখে নির্বাচন করতে উন্মুত্ত হয়ে উঠেছেন কেন? শুধু তাই নয়। একটি নির্বাচিত সরকারকে সামরিক ক্যুর মাধ্যমে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলকারী জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদই বা তাঁর বিশেষ রাজনৈতিক দূত এবং জেনারেল এরশাদের স্ত্রী বেগম রওশন এরশাদ তাঁর নেতৃত্বাধীন জাতীয় সংসদের গৃহপালিত বিরোধী দলী নেত্রী হবেন কেন?
সংবাদপত্র পাঠক মাত্রই জানেন, ৫ জানুয়ারীর যে নির্বাচন দেশের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের অন্যতম বিএনপি কর্তৃক বর্জিত হওয়ায় সাধারণ ভোটাররা সে নির্বাচনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল, জনগণের কাছে ভোটারবিহীন নির্বাচন নামে পরিচিত সেই নির্বাচনের ফসল বর্তমান সরকার ও বর্তমান সংসদ। তবে প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা ভোটারবিহীন নির্বাচনের ফসল জাতীয় সংসদকে নিয়ে সামান্যতম অনুতপ্ত নন, বরং আনন্দিত। তার প্রমাণ তিনি রেখেছেন সংসদে তাঁর এক বক্তৃতার মাধ্যমে, যেখানে তিনি বলেছেন, বিএনপি নির্বাচন বয়কট করায় এক হিসাবে ভালই হয়েছে, সংসদে তাদের বকরানি শুনতে হচ্ছে না।
এর অর্থ হলো, জাতীয় সংসদে প্রকৃত বিরোধী দলীয় সদস্যদের বক্তব্যকে বকবকানির চাইতে ভাল কিছু বলে মনে করেন না তিনি। বলা বাহুল্য, এটা তাঁর গণতন্ত্র-প্রীতির প্রমাণ বহন করে না। গণতন্ত্রের মোদ্দা কথাই হলো বিরোধী দলীয় নির্বাচিত সদস্যদের বক্তব্যকেও যথাযথ সম্মান দেয়া। প্রধানমন্ত্রীর মত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের পক্ষে জনগণের নির্বাচিত বিরোধী দলীয় সদস্যদের প্রতি এ ধরনের অসম্মানজনক উক্তি প্রমাণ করে তিনি আদৌ গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নন।
প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগ যে আদৌ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না তার অসংখ্য প্রমাণ আছে। বেশী দূর যেতে হবে না এর প্রমাণের জন্য। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের আমলেই গণতন্ত্রের টুটি চেপে ধরে দেশের সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে একটি মাত্র সরকারী দল রেখে দেশে একদলীয় বাকশালী শাসনব্যবস্থা কায়েম করা হয়। পরবর্তীকালে কিছু দু:খজনক ঘটনার মধ্যদিয়ে দেশে বহু দলীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুন:প্রবর্তিত হলেও এক পর্যায়ে একটি নির্বাচিত সরকারকে সামরিক ক্যুর মাধ্যমে তদানীন্তন সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ উৎখাত করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে বসলে সারা দুনিয়াকে অবাক করে দিয়ে সেই ক্যুর প্রতি সমর্থন জানিয়ে বসেন দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল জানেন, এরপর শুরু হয় জেনারেল এরশাদের দীর্ঘ স্বৈরশাসন। পাশাপাশি শুরু হয় বিএনপি ও অন্যান্য দলের এরশাদ বিরোধী আন্দোলন। আওয়ামী লীগ প্রথম দিকে দীর্ঘদিন এসব আন্দোলন থেকে দূরে থাকলেও পরবর্তীকালে এক পর্যায়ে এ আন্দোলন অংশ গ্রহণ করে। কিন্তু ততদিনে জেনারেল এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে আপোষহীন নেত্রী হিসাবে খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন রাজনীতিতে অপেক্ষাকৃত নবাগতা বিএনপি চেয়ারপাসন বেগম খালেদা জিয়া। এর প্রমাণ মেলে পরবর্তীকালে দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুন:প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে।
এ নির্বাচন যাতে অবাধ নিরপেক্ষ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় সে লক্ষ্যে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তদানীন্তন সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন নির্দলীয় তত্তাবধায়ক সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রশ্নে একমত হয়। যেমনটা আশা করা গিয়েছিল, নির্বাচন খুব সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়।
দেশের প্রাচীনতম ও সর্বাপেক্ষা সুসংগঠিত দল হিসাবে আওয়ামী লীগই নির্বাচনে জয়ী হবে এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল। নির্বাচন চলাকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতাকালে এক পর্যায়ে তিনি বলেন, আমি সকল জেলার খবর নিয়েছি। নির্বাচন অত্যন্ত সুষ্ঠু হয়েছে। আপনারা লক্ষ্য রাখবেন, ভোট হেরে গিয়ে এর মধ্যে কেউ যেন আবার ‘কারচুপি’ আবিষ্কার না করে। ভোট গননা শেষ হলে যখন জানা গেল, আওয়ামী লীগ নয়, নির্বাচনে জয়ী হয়েছে বিএনপি, শেখ হাসিনা অবলীলাক্রমে বলে ফেললেন, নির্বাচনে সূক্ষ কারচুপি হয়েছে।
কিন্তুু সংশ্লিষ্ট কেউ তাঁর এ বক্তব্যের গুরুত্ব না দেয়ায় স্বাভাবিক নিয়মে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া হন নতুন সরকারের প্রধান মন্ত্রী, আর শেখ হাসিনা হন জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রী। প্রধান মন্ত্রী হিসাবে খালেদা জিয়ার মেয়াদ শেষ হলে প্রধানত বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার দাবীর মুখেই দেশের সকল জাতীয় নির্বাচন নির্দলীয় তত্তাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে, এই মর্মে বিধান রেখে সংবিধান সংশোধন করা হয়।
এই নিয়ম গণতন্ত্রের নিরিখে অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়। দেশে এই বিধান মোতাবেক বেশ কটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে পালাক্রমে দেশের দুই প্রধান দল জয়ী হয়ে দেশ পরিচালনারা সুযোগ লাভ করে। কিন্তুু এক পর্যায়ে কিছু রাজনীতিকের ক্ষমতার অতিরিক্ত ক্ষুধা এই সুন্দর ব্যবস্থাটিকে পচিয়ে ফেলে। এরপর এক পর্যায়ে শেখ হাসিনার শাসনকালে সংবিধান পুনরায় সংশোধন করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান গৃহীত হয়। একে অতীতে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যকার সমঝোতার লংঘন এই অভিযোগে বিএনপি সে নির্বাচন বয়কট করে।
দেশের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের অন্যতম বিএনপি নির্বাচন বয়কট করায় এ নির্বাচন তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। বিরোধী দল (বিএনপি) তো দূরের কথা, সরকারী দল আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মীও ভোট প্রদানের লক্ষ্যে ভোট কেন্দ্রে যাবার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। কারণ তারা জানতেন তারা না গেলেও তাদের ভোট প্রদানের ব্যবস্থা ঠিকই করা হবে দলীয় নেতাকর্মীদের মাধ্যমে।
বাস্তবে হয়ও সেটাই। বিরোধী দলের নেতা কর্মীদের অনুপস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করে সরকারী দলের অল্পসংখ্যক নেতাকর্মীই বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র ইচ্ছামত দলীয় প্রার্থীদের ব্যালটপত্রে সীলমেরে দলীয় প্রার্থীদের স্বপক্ষে প্রদত্ত ভোট সংখ্যা বহুগুনে বাড়িয়ে দেখাতে সক্ষম হন। এভাবে আওয়ামীলীগের প্রার্থীরা ‘বিপুল ভোটে জয়লাভ’ করার সুযোগ লাভ করেন, যদিও ভোট দানের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে অধিকাংশ ভোট কেন্দ্র ছিল ফাঁকা ও প্রায় জনশূণ্য। পরবর্তী দিনে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রের সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে জনগণ আসল অবস্থা জানতে সক্ষম হয়।
ও তো ছিল যেসব আসনে ভোটের মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় সংসদের মোট ৩০০ আসনের অধিকাংশ ১৫৩ আসনে এ ধরনের নির্বাচনী মহড়ার অনুষ্ঠিত হয়নি। কারণ সেখানে সরকারী দলের প্রার্থীরা ছাড়া কোন প্রার্থীই ছিল না। সেই ১৫৩ আসনে সরকারী দলের প্রার্থীরা বিনাপ্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত হয়ে আমাদের দেশের নির্বাচন তথা গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক নতুন কলংকজনক অধ্যায় যোগ করেন। একথা এজন্য বলতে হল যে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ ভোট ও নির্বাচনে অত্যন্ত আগ্রহী। সাধারণত ভোটের দিন সব কাজ ফেলে সকালে উঠে ভোটের লাইনে দাঁড়াতে তারা অভ্যস্ত।
আগেই বলেছি, প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক ইতিহাসে ভোটারবিহীন নির্বাচনের ব্যাপারে এই কলংকের ইতিহাসে মোটেই লজ্জিত বা অনুতপ্ত বোধ করেননি। বরং বিএনপি কর্তৃক নির্বাচন বর্জনে তৃপ্তি প্রকাশ করে তিনি সংসদে ভাষণ দিয়েছেন। যদি তিনি গণতন্ত্রে প্রকৃত শ্রদ্ধাশীল হতেন তিনি বিরোধী দলের নির্বাচন বর্জ্যনের কারণ খতিয়ে দেখে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে যথাসাধ্য ত্রুটিমুক্ত করে সকল দলের গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচন জাতিকে উপহার দিতে চেষ্টা করতেন।
দু:খের বিষয়, প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকে ত্রটিমুক্ত করতে কোন চেষ্টাই করেননি। বরং ভবিষ্যতেও যে তিনি সেরকম চেষ্টা করবেন না, তা জানিয়ে তিনি বলেছেন যথাসময়ে নির্বাচন হবে। কারা সে নির্বাচনে আসবে, বা আসবে না তা নিয়ে আমার করার কিছু নেই। একজন গণতন্ত্রের দাবীদার রাজনৈতিক নেতার মুখে এরকম কথা মোটেই মানায় না। কারণ তিনি মানুষ, ফেরেশতা নন, তারও কোন চিন্তা দেশও জনগণের জন্য অকল্যাণকর হতে পারে। সে ক্ষেত্রে তাঁর কোন সিদ্ধান্ত অপরিবর্তনীয়ভাবে জনগণের উপর চাপিয়ে দেয়া মোটেই গণতন্ত্র সম্মত হবে না।
বিশেষ করে এরশাদ-পরবর্তী আমলের প্রথম জাতীয় সংসদে খালেদা জিয়ার শাসনকালে তিনি যখন সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রী ছিলেন তখন প্রধানত তাঁর দাবীর মুখেই দেশে নির্দলীয় তত্তাবধায়ক সরকারের অধীনে সকল জাতীয় নির্বাচনে অনুষ্ঠানের বিধানের আলোকে সংবিধান সংশোধন করা হয় এবং সে ব্যবস্থার ভিত্তিতে পরবর্তীকালে বেশ কয়েকটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা হয়। যার ফলে দেশের দুই প্রধান দল পালাক্রমে ক্ষমতায় গিয়ে দেশ চালাবার সুযোগ লাভ করে।
পরবর্তীকালে সংবিধান পুনরায় সংশোধন করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করে দেশ থেকে গণতন্ত্র নির্বাসনের যে ব্যবস্থা করা হয়েছে, তার ফলে বাংলাদেশে সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে গণতন্ত্র নিধনের ব্যবস্থা করেছেন তিনি, এ অভিযোগ যদি জনগণ উত্থাপন করে তার কোন সদুত্তর তিনি দিতে পারবেন বলে মনে করেন কি? সুতরাং সংকীর্ণ ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থে এভাবে গণতন্ত্র নিধনের স্থায়ী ব্যবস্থা না করাই কি তাঁর জন্য অধিকতর সম্মানজনক হতো না?



 

Show all comments
  • লাভলু ১৪ জুন, ২০১৮, ৭:৫০ এএম says : 0
    অত্যান্ত যৌক্তিক ও দিক নির্দেশনামুলক লেখা
    Total Reply(0) Reply
  • বশির ১৪ জুন, ২০১৮, ৭:৫০ এএম says : 0
    সংকীর্ণ ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থে এভাবে গণতন্ত্র নিধনের স্থায়ী ব্যবস্থা না করাই কি তাঁর জন্য অধিকতর সম্মানজনক হতো
    Total Reply(0) Reply
  • বাতেন ১৪ জুন, ২০১৮, ৭:৫১ এএম says : 0
    এখন দেশে সত্য বলার সুযোগ খুবই কম
    Total Reply(0) Reply
  • আবুল কাসেম ১৪ জুন, ২০১৮, ৭:৫১ এএম says : 0
    গণতন্ত্র বলতে আদৌ দেশে কিছু আছে ?
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর