Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ০৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

গল্প : মন মানে না

আবুল কালাম আজাদ | প্রকাশের সময় : ১৫ জুন, ২০১৮, ১২:০০ এএম

আল্লাহ্ সর্বদা সচেতন আর যা কিছু করেন তার সবই সঠিক। কথাটি সম্পূর্ণই যৌক্তিক, প্রমাণিত সত্য। কখনও আমাদের ক্ষতির মধ্য দিয়েও প্রমাণিত হয় যে, সেটাও আসলে মঙ্গলজনক ছিল। কেননা ছোট ক্ষতি হয়তো ছিল অনেক বড় ক্ষতির হাত থেকে মুক্তির এক অসিলা। অনেক ক্ষেত্রেই যার স্পষ্ট প্রমাণ পেয়ে থাকি। অধিক ব্যথায় কাতর হয়ে কেউ কেউ আল্লাহকে দায়ী করি। কিন্তু প্রায়শই প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ যা করেন তা আসলে ভালোর জন্যই করেন। কিন্তু আমরা কষ্টগুলো নিয়ে এতই কাতর থাকি যে, সেগুলো যে অধিক কষ্ট দূরীকরণের কারণ ছিল তা ভেবে দেখার মানষিক স্থিরতা হারিয়ে ফেলি। তা না হলে সিকতার বিলাপগুলো প্রলাপের মত মনে হত না!
হ্যাঁ, বলছিলাম সিকতার কথা। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর সাত বান্ধবী বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ঘুরে বেড়ানোর পরিকল্পনা দীর্ঘদিনের। সিকতা, রিক্তা, অনুরাধা, শ্রাবন্তি, অবন্তী, মালবিকা আর মৌ।
সকলেই সচ্ছল পরিবারের সন্তান। লেখাপড়া কেউ যেন কারো চেয়ে কম নয়। চঞ্চলা হরিণী বা ক্ষিপ্র বাঘিনীর দুর্দান্ত গ্রæপ। গ্রæপ নেত্রী সিকতা। যেমন স্মার্ট, তেমনি সাহসী ও ধর্মপরায়ণ। “আলোর শিখা “মহাবিদ্যালয়ের আশার আলো --নতুন আলো এই সিকতা। সে ও তার প্রিয় বান্ধবীদের কল্যাণে সম্পূর্ণ ইভটিজিংমুক্ত এই প্রতিষ্ঠান। শুধু এই প্রতিষ্ঠানই নয়, ইভটিজাররা এর চৌহদ্দির ভিতরে একেবারে ভালমানুষ। লেখাপড়ার পাশাপাশি শরীরচর্চাসহ সব রকম খেলাধুলায় সামনের কাতারে সিকতার টীম। অত্যন্ত আকর্ষণীয় চেহারা হলেও চেনা কোন কুপ্রবৃত্তির গোলাম সাক্ষাৎ হিংস্র সিংহী মনে করে তাদেরকে নতমস্তকে এড়িয়ে চলে। সেই সিকতার দুরন্ত টীম উচ্চ মাধ্যমিক ফাইনাল পরীক্ষা শেষে যার যার বাড়ি গেলেও মে মাসের সাত তারিখ সকালে হযরত শাহজালাল বিমান বন্দরে মিলিত হওয়ার কথা। সকাল সাড়ে দশটায় ইউএস বাংলার ফ্লাইট। যথাসময়ে সকলেই হাজির। অথচ সিকতা নিজেই পৌঁছতে ব্যর্থ হয়। ভিআইপি মুভমেন্টের কারণে কাকলীতে ট্রাফিক জ্যামে। বারবার বান্ধবীদের উৎকণ্ঠিত কল।
সিকতার জবাব, “এইতো আমি কাকলীতে, আর সামান্য সময়”।
সিকতার সেই সামান্য সময় শেষ হওয়ার আগেই ইউএস বাংলা ফ্লাই করে। সিকতা সেখানেই নেমে পড়ে। সে-ই দলনেত্রী, অথচ তার ফ্লাইট মিস! ক্ষোভে, দুঃখে, লজ্জায় নিজের চুল নিজেই ছিঁড়তে থাকে। বান্ধবীরা আকাশে, সিকতা কাকলীতে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। সহসা আকাশে জমে ঘনকালো মেঘ। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় ভয়াবহ কালবৈশাখী। সেইসাথে কালবৈশাখী শুরু সিকতার অন্তরেও। কারণ পরিবহণ ধর্মঘটের জন্য তার চট্টগ্রাম যাওয়ার বিকল্প পথও এখন বন্ধ।
চট্টগ্রামে বিমান থেকে নেমেই অনুরাধা সিকতাকে কল করে। সিকতা তখনও তাদের পুরাতন ঢাকার ওয়ারির বাসায় পৌঁছেনি।
অনুরাধা বলল, “আমরা আজ সিতাকুন্ড পাহাড়, ইকোপার্ক আর কৈবল্যধাম থেকে বেড়িয়ে আসি। এরপর কাল তুই এলে নতুন পরিকল্পনা করা যাবে”।
মানুষ যদি ভবিষ্যত জানতো, তাহলে হয়তো দুনিয়াটা হতো স্বর্গের অপরূপ প্রতিচ্ছবি। হায়, কে জানত সিকতার ব্যর্থতার মাঝেই লুকানো ছিল সফলতা আর বান্ধবীদের সফলতাই হবে কাল! সন্ধ্যা পর্যন্ত ওদের সাথে সিকতার যোগাযোগ ছিল প্রায় সার্বক্ষণিক। বারবার ম্যাসেঞ্জারে ভিডিও কনফারেন্স, অডিও কলে গালগল্প ইত্যাদি,- মোটকথা ইন্টারনেটের কল্যাণে দইয়ের স্বাদ ঘোলে মেটানোর চেষ্টা। ফ্লাইট মিস করার ব্যর্থতা দিনভর তাকে কুরেকুরে খাচ্ছিল। অতঃপর অনেক কসরত করে রাতের ট্রেনে চট্টগ্রাম যাওয়ার জন্য একটা সিঙ্গেল কূপের রিজার্ভেশন সম্ভব হয়। সঙ্গী ডাক্তার তারিন নন্দিনীর আপার বার্থ, তার লোয়ার। পারস্পরিক পরিচয় শেষে ডাক্তারের অনুরোধে তাকে লোয়ার বার্থ দিয়ে সিকতা ওঠে আপারে। কমলাপুর থেকে ট্রেন ছাড়ার পর শুরু করে বান্ধবীদের সাথে যোগাযোগের ব্যর্থ চেষ্টা। নেট-এ অন্য সকলকে পেলেও বান্ধবীদের কাউকে ‘কানেক্ট’ করতে না পেরে বিরক্তির চেয়ে চিন্তিত হয় বেশি। কিন্তু শত চিন্তায়ও কোন কূলকিনারা হয় না।
রাতের নিঝুম নিস্তব্ধতা ভেদ করে ছুটে চলছে আন্তঃনগর ট্রেন তূর্ণা এক্সপ্রেস। তারই সাথে এলোপাথাড়ি গতিতে দিগি¦দিক ছুটছে তার চিন্তা এক্সপ্রেস। সারাদিনের নানারূপ ধকলে ক্লান্ত হলেও শান্ত হতে পারছে না সে। ছয়জনের একজনও নেট-এ নাই, সকলের সেল ফোন একসাথে বন্ধ, এ কেমন রসিকতা! কেমন এ রহস্য? রাগ, অভিমান, রসিকতা -কোন কিছুই তো ওদের কাউকে কোনদিন এভাবে দূরে ঠেলেনি, তাহলে রহস্যটা কী? ফেসবুক দেখতে দেখতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম ঠিক নয়, তন্দ্রা। তন্দ্রাঘোরেই ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখে ধড়মড়িয়ে উঠে পড়ে। স্বপ্নে দেখে তার ছোঁড়া এলোপাথাড়ি গুলিতে তিন বান্ধবী পাড়ি জমিয়েছে পরপারে! বাকি তিনজন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। কী নির্মম সেই দৃশ্য! সন্ত্রস্ত হয়ে তটস্থ আঙ্গুল চালায় মোবাইল স্ক্রিনে। ফেসবুকে ভাইরাল এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার সংবাদ! সীতাকুন্ড থেকে ফেরার পথে দ্রুতগামী এক ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়েছে অটোরিকশা। অটোর চালক ও তিন আরোহী তরুণী ঘটনাস্থলেই নিহত। মারাত্মক আহত অবস্থায় তিন তরুণী হাসপাতালে। সিকতা লাফিয়ে নীচে নেমে ডাক্তার নন্দিনীকে পাগলের মত ডেকে তোলে।
-- ডোন্ট মাইন্ড ডাক্তার, প্লিজ হেল্প মি।
-- কী হয়েছে আপনার? এমন প্রলাপ বকছেন কেন?
-- প্রলাপ নয় ম্যাডাম, সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমার সব শেষ হয়ে গেছে! হায় আল্লাহ্ একি করলে!
সিকতার ক্রন্দনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় ডাক্তার।
শান্তনা দেওয়ার সব প্রয়াস ব্যর্থ হয়।
-- দেখুন মিস সিকতা, এভাবে প্রলাপ বকলে তো আমি কিছুই বুঝব না। আপনার কী হয়েছে খুলে বলুন, তাছাড়া হেল্প করব কেমনে?
সিকতা ফোঁপাতে ফোঁপাতে ডাক্তার নন্দিনীকে সবকিছু বিস্তারিত বলে আবার হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। ডাক্তার নন্দিনী চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যোগাযোগ করে এক্সিডেন্টের বিষয়ে নিশ্চিত হন। অতঃপর বলেন, “মিস সিকতা, সংবাদ সঠিক। আপনার আহত তিন বন্ধুর যখম মারাত্মক হলেও তারা আশঙ্কামুক্ত। অটোচালক আর আপনার অপর তিন বন্ধুর মৃতদেহ হাসপাতালের মর্গে আছে। ট্রাকচালককে পুলিশ আটক করেছে।
ট্রেন থেকে নেমে ডাক্তার নন্দিনী সিকতাকে নিয়ে সরাসরি হাসপাতালে যান। হাসপাতালে পৌঁছে সে একেবারে ভেঙে পড়ে। “সুচিকিৎসার সার্থে এই মুহূর্তে কাউকে আহতদের কাছে যেতে দেওয়া হচ্ছে না”- বলে এড়ানো গেলেও মৃতদের দেখতে সে রীতিমত চিৎকার শুরু করে। ডাক্তার নন্দিনী শান্তনার সব অস্ত্র প্রয়োগ শেষে বলেন, “মিস সিকতা, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ যা কিছু করেন, মঙ্গলের জন্যই করেন। সেই মঙ্গল কিছু তাৎক্ষণিক ভাবে দৃষ্টিগোচর হয়, কিছু হয় দেরীতে। গতকাল আপনার ফ্লাইট মিস করার মধ্যেও কল্যাণ নিহিত ছিল। ঐ মিসিং-এর ঘটনা না ঘটলে হয়তো হতাহতের কাতারে আজ আপনাকেও দেখা যেত”।
সিকতা চিৎকার করে বলে --“মিথ্যে কথা। তাই যদি হয় তাহলে বলুন এই ‘কিলিং মিশন’-এ কার কী মঙ্গল আছে?”
-- ‘আছে, অবশ্যই আছে। যখন কোন অঘটন ঘটে তখন আমরা বিগড়ে যাই। ভাবি না যে হতে পারে এই ক্ষতির দ্বারা হয়ত আরও অনেক বড় ক্ষতি থেকে বাঁচার পথ সুগম হয়েছে অথবা তিন-চারটা প্রাণের বিনিময়ে আরো অনেক প্রাণ রক্ষা পেয়েছে। মূলত আমাদের সাথে যেটা হচ্ছে সেটা আমাদের বা অন্য কারো ভালোর জন্যেই হচ্ছে। আপাতঃ মনে হতে পারে তা খারাপ কিছু, কিন্তু সেটাই যে আমাদের জন্য মঙ্গল তা কখনো বুঝি, কখনো বুঝি না। বিপদে ধৈর্য্য ধারণই সত্যিকার বিবেকের পরিচায়ক।
-- কিন্তু এত বড় বিপর্যয়ের পরে ধৈর্য্য ধারণের মত পাষাণ হৃদয় কোন মানুষ এই দুনিয়াতে আছে কি?
-- কিন্তু মিস সিকতা, ভেবে দেখুন, গতকাল বিমান মিস করার মত খারাপ কিছু না ঘটলে আজ আপনি এই আবেগ বা অনুভূতি প্রকাশ করার মত অবস্থায় থাকতেন না। কাল হোঁচট খেয়েছিলেন বলেই আজ সুস্থ আছেন। আর এই যে মৃত্যু, এর মাঝেই হয়ত লুকায়িত আছে কত জীবন রহস্য যা এই মুহূর্তে আপনার আমার কল্পনার বাইরে। অথচ আল্লাহ্ ঠিকই তা অবগত বিধায় যা কল্যাণকর তাই করেছেন। নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য আর তাঁর কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে।
বিপর্যয়ের পর বারংবার মনে হয় এই বুঝি সব শেষ, কিন্তু পরক্ষণে হয়ত দেখা যায় ঐটা মোটেই শেষ ছিল না, বরং তা ছিল অন্য ভাল কোন কিছুর শুরু।
--যাই বলেন ম্যাডাম, আমার আশা, আমার স্বপ্ন, আমার জীবনের ইতিবাচক অধ্যায় শেষ হয়ে গেল। এখন যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন আমি এক জীবন্ত লাশ।
-- জীবনের অধ্যায় জীবদ্দশায় শেষ হয় না। এক অধ্যায় শেষে শুরু হয় আরেক অধ্যায়। আপনার জীবনে হয়ত এক অধ্যায় শেষ হয়ে গেল, এখন শুরু হবে নতুন অধ্যায়। মৃত্যুতেও তা শেষ হয় না। মৃত্যু হলো অনন্ত জীবনের সূচনা মাত্র। মৃত্যু পরবর্তী জীবন অধ্যায়ের ব্যপ্তি অনন্তকাল। সুতরাং কেউ মানি বা মানি এটাই চিরন্তন সত্য যে, আল্লাহ যা করেন তা ভালর জন্যই করেন।
--হ্যাঁ ম্যাডাম, সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি আমারও অগাধ আস্থা আছে। কিন্তু দৃশ্যত কোন কারণ ছাড়াই এত বড় বিপর্যয় কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। আপনার কথাগুলো যৌক্তিক সত্য হলেও আমার জীবনের নির্মম নৃশংস পরাজয়, যে পরাজয় কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। জীবন যুদ্ধে আমি আজ সম্পূর্ণ ব্যর্থ এক পরাজিত সৈনিক! এই পরাজয় বাস্তব যেখানে কারো কোন হাত নাই তা ভাল করেই বুঝি ম্যাডাম, কিন্তু কী করবো বলুন, কিছুতেই যে মন মানে না।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর