Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৪ আশ্বিন ১৪২৫, ৮ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

অহঙ্কার ছাড়-আত্মশুদ্ধি করো

গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির | প্রকাশের সময় : ২১ জুন, ২০১৮, ১২:০০ এএম


আত্মশুদ্ধি অর্থ নিজেকে সংশোধন করা অন্তরকে পাক পবিত্র করা। আরবীতে একে “তাযকিয়া” বা “তাযকিয়াতুন নাফ্স” বলা হয়। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে এরশাদ হচ্ছে, “নিশ্চয়ই সাফল্য লাভ করবে সে, যে শুদ্ধ হয়।” সূরা: আল-আ’লা : ১৪) আলোচ্য আয়াতে ঈমানগত ও চরিত্রগত শুদ্ধি এবং আর্থিক জাকাত প্রদান সবই অন্তর্ভূক্ত। আমরা যে ধন-সম্পদের জাকাত আদায় করি, সেই “জাকাত” শব্দের অর্থ শুদ্ধ করা। নামাজ, রোজা, হজ্ব, জাকাত এগুলো ফরজ কিন্তু আত্ম শুদ্ধি করা যে ফরজ তা অনেকেই জানি না।
আত্মশুদ্ধি ব্যতীত আল্লাহ তায়ালার সকল আদেশ নিষেধ মেনে চলা সম্ভব নয়। দরুন একজন নামাজ পড়ে না তবে মনে মনে পাক্কা নামাজী হওয়ার খুব বাসনা। সে প্রতিদিনই মনে মনে নামাজ পড়ার ইচ্ছা করে কিন্তু অলসতা আর শয়তানের ধোকা তাকে প্রতিদিনই নামাজ থেকে বিরত রাখে। আবার কেউ হয়ত নামাজ, রোজা, হজ্ব, জাকাত সবই আদায় করে কিন্তু তার রোজী-রোজগার হালাল নয়, মানুষের হক সঠিকভাবে আদায় করে না ইত্যাদি। এগুলো সবই ঘটে আত্ম শুদ্ধির অভাবে। আত্মশুদ্ধি করলে এগুলো হবে না। আমাদের আচরণ হতে হবে ঐ শিশুর মত যে কেবল হাসতে শিখেছে। দেখবেন ঐ শিশুকে খারাপ বললেও হাসবে, ভালো বললেও হাসবে। আত্মশুদ্ধি করলে আমাদের আচরণও অনুরোপ হবে। অর্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্থাৎ,তাকে কেউ খারাপ বললেও তাতে তার রাগ হবে না বরং কেউ তার দোষ ধরে দিলে সে আরো খুশি হবে। কারণ, সে সেই দোষ সংশোধন করে নিতে পারবে। হযরত সাহাবায়ে কেরামগণ ইসলাম গ্রহণের পূর্বে কত রকম জঘন্য কাজে জড়িত ছিল; ইসলাম গ্রহণের পর আত্ম শুদ্ধি করে তাঁরাই হয়ে গেছেন সোনার মানুষ অর্থাৎ পূত পবিত্র। বর্তমানে বিশ্বময় যত মারামারি, হত্যা, অশান্তি অরাজকতা সব কিছুর মূলে রয়েছে একে অপরকে দোষারোপ করা। আমরা মনে করি আমি ভালো, সে খারাপ। আমরা যদি অন্যের দোষ বর্ণনা করতে শুরু করি তাহলে সহজে শেষ করতে চাই না কিন্তু নিজের দোষের দিকে তাকাতে সময় কই। যার ফলে শুরু হয় ঝগড়া, গীবত বা অভিযোগ। আমরা যদি আত্ম শুদ্ধি করি তাহলে নিজের দোষ দেখতে পাব। অন্যের দোষ খুঁজে পাব না। তখন দুনিয়াটা শান্তি আর স্বস্তিতে ভরে উঠবে। আত্মশুদ্ধি করলে আমাদের অন্তরের ব্যাধিসমূহ যেমন-রাগ, হিংসা, অহংকার, দুনিয়ার মোহ-দূর হয়। আমাদের দুনিয়ার সফর সফল হবে। আল্লাহ তায়ালার প্রিয় বা মু’মিন হওয়ার জন্য কতগুলো শর্ত আছে। ১. “নিশ্চয়ই মু’মিনরা সফল হয়ে গেছে। ২. যারা তাদের নামাজে বিনয়ী। ৩. যারা অহেতুক (অপ্রয়োজনীয়) বিষয় থেকে বিরত থাকে। ৪. যারা জাকাত সম্পাদন করে।” (সুরা মুমিনুন :১-৪) আর এ সূরার ৪র্থ আয়াতে বলা হয়েছেঃ- “যারা জাকাতের উপর আমল করে তারা মু’মিন।” এ আয়াতের দু’টি অর্থ। একটি হল ধন সম্পদের জাকাত দেওয়া আর দ্বিতীয় অর্থ হল নিজের স্বভাব চরিত্রকে পাক-পবিত্র করা অর্থাৎ আত্মশুদ্ধি করা। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে বিভিন্নভাবে আত্মার পরিশুদ্ধির কথা বলেছেন। যেমন সে সফলতা লাভ করলো যে “তাযকিয়া” (আত্মশুদ্ধি) করলো। আর সে ব্যর্থ হলো যে নিজেকে কলুষিত করলো”। (সূরা: শামস- ৯-১০) “নিশ্চয় সফল হবে সে, যে নিজেকে শুদ্ধ করবে।” (সূরা আলা : ১৪) আল্লাহর রাসুল (দ:) বলেনঃ “ভালো করে শুনে নাও। নিঃসন্দেহে দেহের মধ্যে একটি মাংস পিন্ড রয়েছে, তা ঠিক হলে পুরো দেহ ঠিক হয়ে যায়। আর তা খারাপ হলে পুরো দেহ খারাপ হয়ে যায়। খুব ভালো করে শোনো সেই মাংসপিন্ডটি হলো “কলব” অন্তর বা আত্মা। আত্মা অসুস্থ বলেই ভালো কাজে মন বসে না। আত্মার ডাক্তারের কাছে যেতে হয়। তাহলেই ভালো কাজে মন বসে, মনে প্রশান্তি আসে, জীবন স্বার্থক হয়। আর এ চিকিৎসাকেই আত্মশুদ্ধি বা আত্মা চিকিৎসা বলে। এ চিকিৎসার জন্য আমাদেরকে আল্লাহ তায়ালার প্রিয় বান্দাদের কাছে যেতে হবে, তাদের সাথে মিশতে হবে। ইরশাদ হচ্ছে,” হে ঈমানদারগন ঃ তাকওয়া অবলম্বন কর। আর তাকওয়া অবলম্বনের সহজ পন্থা হলো সাদিকীন অর্থাৎ মুত্তাকীদের সাথে থাকা। (সূরা আত-তাওবাহ্ : ১১৯)। তাকওয়া অর্থ ভয় করা, গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা। আর মুত্তাকি অর্থ-যে গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে। এছাড়া সূরা ফাতিহাতে এসেছে যে সকল মানুষ আপনার নিয়ামত বা অনুগ্রহ লাভ করেছে আমাদেরকে তাদের পথ দেখান। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এই আয়াতে বলে দিয়েছেন যে, যদি সীরাতে মুস্তাকীম (সফল পথ) চাও তবে ঐ সমস্ত লোকদের তালাশ কর (খুজে) তাঁদের পথ অবলম্বন কর। কেননা, রাসুল (দ:) চিরকাল অবস্থান করবেন না। তাই নিয়ামত প্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে আল্লাহ্ তায়ালার সিদ্দীক, শহীদ, ও সালিহীন বা সৎকর্মশীল বান্দাদেরকে অর্ন্তভূক্ত করে দিয়েছেন। কারণ, কেয়ামত পর্যন্ত তাঁদের অস্তিত্ব দুনিয়াতে থাকবে। মানুষের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা কেবল মাত্র কিতাব (বই) পড়ে অর্জিত হয় না, বরং দক্ষ ব্যক্তির সাহচর্য সংশ্রবের মাধ্যমেই তা সম্ভব হয়। বাস্তবেও শুধু বই পড়ে কেউ কোনদিন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, বিচারক পাইলট হতে পারে না। সাইকেল চালাতে হলেও অন্যের সাহায্য বা দেখে শিখতে হয়। আত্ম শুদ্ধির জন্য দু’টি বিষয় প্রয়োজন। এক আল্লাহর কিতাব যাতে মানব জীবনের সকল দিকের পথ নির্দেশ রয়েছে। অপরটি হচ্ছে আল্লাহর প্রিয় বান্দা বা আল্লাহর অলিগণের সান্নিধ্য। তাঁদের নিকট থেকে ফায়দা (উপকার) হাছিল করার মাপকাঠি হচ্ছে, আল্লাহর কিতাবের নিরিখে তাঁদেরকে পরীক্ষা করতে হবে। এ পরীক্ষায় যারা টিকবে না তারা আল্লাহর প্রিয় পাত্র নয়। যারা টিকবে তাদের কাছে গিয়ে আত্মশুদ্ধি করতে হবে।
আমরা এখন, নবী-রাসূল, সাহাবী-তাবেয়ীদের মত সোনার মানুষ পাব না। তাই বলে আমরা যদি মনে করি তাদের মত মানুষ তো এখন নেই, তাই কারো কাছে যাব না, সেটা হবে মারাত্মক ভুল। এখনতো আপনি কোন কিছুই খাঁটি পাবেন না। খাবারে ভেজাল, মানুষে ভেজাল, জিনিসে ভেজাল সব কিছুতেই ভেজাল। তাই কি আমরা সব কিছু বাদ দিয়ে দিয়েছি। আগের মত আন্তরিক ও দক্ষ দেহের ডাক্তার নেই তাই কি আমরা দেহের অসুখ হলে ডাক্তার দেখানো বাদ দিয়ে দিয়েছি? তাহলে আমরা কেন আমাদের অন্তরের চিকিৎসা থেকে দূরে থাকব? শয়তান আমাদেরকে এ পথ থেকে দূরে রাখতে চায়। তাই আমাদেরকে শয়তানের জাল ছিন্ন করে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের খুঁজতে হবে এবং তাদের পথে থাকতে হবে। এ পথে চলতে গিয়ে এবং ভাল কিছু পেতে হলে কঠোর সাধনা এবং ধৈর্য্যের দরকার। বোখারী শরীফের একটি হাদীসের সারমর্মঃ- এক ব্যক্তি ৯৯ জন মানুষকে খুনের পর অনুশোচনা হল, তাই সে একজন (আলেম) খুঁজে তার কাছে বললঃ আমি এখন ভাল হতে চাই, আল্লাহ আমাকে মাফ করবেন কী? অজ্ঞ সেই আলেম তাকে নিরাশ করে বললেন ঃ না, আল্লাহ তোমাকে মাফ করবেন না। ঐ ব্যক্তি উত্তর শুনে ঐ আলেমকে খুন করে। খুনের সংখ্যা ১০০ হল। তারপর সে অনুতপ্ত হয়ে আরো বড় আলেমের সন্ধান করে পেয়ে গেল! এই আলেম তাকে বলল ঃ আল্লাহ তোমাকে মাফ করবেন তবে শর্ত হল তোমাকে তওবা করতে হবে এবং খারাপ কাজ বাদ দিয়ে সুন্দর পথে আসতে হবে। সেই ব্যক্তি তাই মেনে ভাল পথে আসতে শুরু করলো। পথেই তার মৃত্যু হল: আর এ মৃত্যুই তাকে জান্নাতে পৌছে দিল। সুবহানাল্লাহ্ ঃ সুরা আনকাবুতে এসেছে, “যদি কোন ব্যক্তি আমাকে পেতে চেষ্টা করে তবে আমি তাকে অবশ্যই আমার নিকট পৌছে দিব।” সুতরাং আমাদেরকে সাহসের সাথে অগ্রসর হতে হবে, একবার ভুল হলে শতবার চেষ্টা করতে হবে। চেষ্টা করতে করতে যদি আমাদের জীবন শেষ হয়ে যায় তবু আমরা সফল। হযরত সালমান ফারসী (রা:) প্রথমে ভুল লোকের পাল্লায় পড়েছিলেন পরে আল্লাহ তাঁকে রাসুল (দ:) নিকট পৌছে দিয়েছিলেন। আত্মশুদ্ধির পথে যা জানা জরুরীঃ নিজের ভিতর থেকে অহংকার দূর করার মানসিকতা থাকতে হবে। হাদীস শরীফে আছে,“ যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ অহংকার আছে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” অহংকার এমন একটি সুক্ষè বিষয় যা আমাদের অন্তরে ঘাপটি মেরে বসে থাকে, আমরা বুঝতে পারি না, আমার অন্তরে অহংকার আছে। যা আমাদেরকে তিলে তিলে ধ্বংস করছে। আত্মার চিকিৎসকের নিকট গেলে এ রোগ ধরা পড়ে। আমরা যে কোন ব্যক্তির উপর হঠাৎ করে রেগে যাই; এ রাগ আসলে অহংকার থেকে আসে। অহংকার না থাকলে মানুষ ক্রোধে ফেটে পড়বে না। আর নিরহংকার ব্যক্তি কখনোই নিজেকে অন্যের চেয়ে ভাল এবং মর্যাদাবান ভাববে না। নবী, রাসুল এবং সাহাবীদের কথাতো অনেক উর্দ্ধে; পরবর্তী যুগের বুযুর্গরাও ছিলেন নিরহংকার। তারা কারো দ্বারা কষ্ট পেলে সেটাকে নিজের অপরাধের শাস্তি মনে করে খুশি হতেন। বিখ্যাত অলী হযরত যুননূন মিসরী (রাহ:) একদিন কোথাও যাচ্ছিলেন। এক লোক তাঁকে অযথা কষ্ট দিতে হযরত যুননূন (রাহ:) এর মাথায় লাঠি দিয়ে পিটাতে শুরু করল। তখন হযরত যুননূন (রাহ:) এর মুখ থেকে যে কথাটি বের হয়েছিল তা ছিল: পিটাও এ মাথাকে; কারণ, এ মাথা বহুদিন আল্লাহর নাফরমানী করেছে”। আরেকটি ঘটনা : একবার মিশরে মারাত্মক অনাবৃষ্টি দেখা দিল। তখন হযরত যুননূন (রাহ:) এর নিকট কিছু লোকজন এসে তাকে বলল ঃ হুজুর, বৃষ্টির জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করুন। তখন তিনি বললেন, “এ খরা মানুষের পাপাচারের ফল। আর আমার চেয়ে কঠিন পাপী এই জনপদে কেউ নেই। আমি শীঘ্রই এখান থেকে চলে যাব; তখন আল্লাহ তায়ালার রহমত এসে যাবে এবং বৃষ্টি আসবে।” এ সব গুনাবলী নিজে নিজে অর্জন সম্ভব নয়। তাই আমাদেরকে আত্মশুদ্ধির পথ গ্রহণ করতে হবে। তাফসীরে মা’আরেফুল কোরআনে বলা হয়েছে ঃ যতদিন আত্মশুদ্ধি করানোর জন্য কাউকে না পাওয়া যায় ততদিন প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর বিশ বার করে ইস্তেগফার করলে অনেক উপকার পাওয়া যায়।

 

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ