Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৮ আশ্বিন ১৪২৫, ১২ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

আসছে ই-পাসপোর্ট

০ আবারো বেড়েছে পদ্মা সেতু প্রকল্পের ব্যয় ০ একনেকে ১৮ হাজার ৩৭২ কোটি টাকার ১৫ প্রকল্প অনুমোদন

প্রকাশের সময় : ২২ জুন, ২০১৮, ১২:০০ এএম | আপডেট : ১২:২৬ এএম, ২২ জুন, ২০১৮

অর্থনৈতিক রিপোর্টার : বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট ছাড়া ভিসা দেয় না। এ নিয়ে নানা জটিলতায় পড়তে হয় বিদেশগামীদের। আর তাই জটিলতা এড়াতে এবং নাগরিকদের হাতে ই-পাসপোর্ট তুলে দিতে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। সম্পূর্ণ দেশিয় অর্থায়নের এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে চার হাজার ৬৩৫ কোটি ৯১ লাখ টাকা।
‘বাংলাদেশে ই-পাসপোর্ট ও স্বয়ংক্রিয় বর্ডার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন’ শীর্ষক প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। রাজধানীর শের ই-বাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় এছাড়াও পদ্মা সেতুর নির্মান ব্যয় বৃদ্ধিসহ মোট ১৫ প্রকল্প অনুমোদন দেয়। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৭২ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ১১ হাজার ২২৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা, বাস্তবায়নকারী সংস্থার তহবিল থেকে ৫৮৮ কোটি ৪৬ লাখ এবং বৈদেশিক সহায়তা থেকে ৬ হাজার ৫৫৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপার্সন শেখ হাসিনা। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল। ব্রিফিং এ পরিকল্পনা সচিব জিয়াউল ইসলাম, সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম এবং আইএমইডির সচিব মফিজুল ইসলাম, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য শামীমা নারগিস এবং পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব সৌরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী উপস্থিত ছিলেন।
পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানান, অনেক দেশে ই-পাসপোর্ট ছাড়া ভিসা দেয় না। এটি বাস্তবায়িত হলে এসব জটিলতা থাকবে না। ই-পাসপোর্ট বাস্তবায়ন হলে বিদেশে বাংলাদেশের ইমেজ বৃদ্ধি পাবে। তবে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট থাকবে বলে জানান মন্ত্রী। পরিকল্পনা মন্ত্রী জানান, বহির্বিশ্বের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সর্বশেষ উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন পাসপোর্ট ইস্যু, পাসপোর্টের নিরাপত্তা বৃদ্ধি, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশি পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে বাংলাদেশি নাগরিক ও আগত বিদেশি নাগরিকদের সুষ্ঠুভাবে গমনাগমন নিশ্চিত করতেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে সরকার। যদিও দেশের প্রধান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট এখনো সেকেলে।
পরিকল্পনা কমিশন ও পাসপোর্ট সংশ্লিষ্টরা জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর প্রকল্পটি আগামী জুলাই থেকে এই প্রকল্পটির কাজ শুরু হবে। ৩৮টি নিরাপত্তা ফিচার নিয়ে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ই-পাসপোর্টের প্রবর্তন করা হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশীদের হাতে যে পাসপোর্ট রয়েছে তা মেশিন রিড্যাবল পাসপোর্ট। পাসপোর্টের ভেতর কী রয়েছে তা মেশিনের মাধ্যমে একজন ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা দেখতে পারেন। ই-পাসপোর্ট তার চেয়ে অত্যাধুনিক। এটি নিরাপত্তার দিক থেকেও অনেক নিশ্চিদ্র।
একনেক বৈঠকের কার্যপত্রে ই-পাসপোর্ট নিয়ে আরও বলা হয়, ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইসিএও) গাইডলাইন অনুযায়ী বাংলাদেশ মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) ও মেশিন রিডেবল ভিসা (এমআরভি) পদ্ধতি চালু করে। কিন্তু এমআরপি ব্যবস্থায় দশ আঙ্গুলের ছাপ ডেটাবেজে সংরক্ষণ না থাকায় একাধিক পাসপোর্ট করার প্রবণতা ধরা পড়ে। এর ফলে ই-পাসপোর্টের প্রয়োজনীয়তা ব্যাপকভাবে অনুভব করে সরকার। এই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ২৪ এপ্রিল পাসপোর্ট সেবা সপ্তাহ উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ই-পাসপোর্ট প্রবর্তনের নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর জার্মানি সফরের সময় ২০১৭ সালের ১৮ ফেব্রæয়ারি সে দেশের প্রতিষ্ঠান ভ্যারিডোস জিএমবিএইচ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ই-পাসপোর্ট চালুর বিষয়ে একটি সমঝোতা চুক্তি হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পাসপোর্ট অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে ই-পাসপোর্ট চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জার্মানির রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ‘ভেরিডোস জিএমবিএইচ’-এর কারিগরি সহায়তায় এ পাসপোর্ট চালুর করা হবে। এই পাসপোর্টের মেয়াদ হবে ৫ ও ১০ বছর। প্রাথমিকভাবে জার্মানি থেকে তৈরি করে ২০ লাখ ই-পাসপোর্ট আনা হবে। পরে দেশে যন্ত্রপাতি স্থাপন করে আরো দুই কোটি ৮০ লাখ ই-পাসপোর্ট তৈরি করা হবে।
ঢাকাসহ ৬৪টি জেলায় অবস্থিত ৭২টি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস; বিদেশে অবস্থিত ৮০টি বাংলাদেশ মিশন; যশোরে অবস্থিত ডিজাস্টার রিকভারি সেন্টার; দেশের অভ্যন্তরে ৩টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ২৪টি স্থলবন্দর; ৭২টি এসবি/ডিএসবি অফিস; জার্মানীর মিউনিখের রেফারেন্স পয়েন্টকে প্রকল্প এলাকা হিসেবে নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের (বিকল্প দায়িত্ব) সদস্য শামীমা নার্গিস বলেন, বাংলাদেশি পাসপোর্টকে বিশ্বায়ন করার উদ্দেশ্যেই এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সরকার। পাসপোর্টের বিশ্বায়নের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ধরুন যুক্তরাষ্ট্রে একজন বাংলাদেশির পাসপোর্টের বিষয়ে জানতে চাইলে ওই পাসপোর্টের নম্বরটা সার্চ দিলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সকল তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে পেয়ে যাবেন।
একনেকে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পদ্মা বহুমুখি সেতু প্রকল্পের ভ‚মি অধিগ্রহণ প্রকল্প। পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানান, পদ্মা বহুমুখি সেতু নির্মান প্রকল্পের জন্য নতুন করে জমি অধিগ্রহণ করবে সরকার। অতিরিক্ত ১ হাজার ১৬২ দশমিক ৬৭ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণের জন্য অতিরিক্ত ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। এজন্য পদ্মা সেতু নির্মানের ব্যয় বাড়ছে এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এ নিয়ে চার দফায় এ প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো হলো।
পরিকল্পনা মন্ত্রী জানান, একনেক বৈঠকে হাওর এলাকায় আগামীতে যেসব রাস্তা তৈরি করা হবে সেগুলো এলিভেটেড করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, এ রকম উড়াল রাস্তা নির্মাণ করা হলে এর নীচ দিয়ে নৌকা বা সাম্পান চলতে পারবে। উপর দিয়ে চলবে গাড়ী। তাহলে আলাদা করে ব্রীজ তৈরি করতে হবেনা। এক খরচেই সব কাজ হবে। আ হ ম মুস্তফা কামাল জানান, ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম সড়ক নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এ নির্দেশনা দিয়েছেন।
একনেকে অনুমোদিত অন্যান্য প্রকল্পগুলো হচ্ছে, কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন, যাতে ব্যয় হবে ৬১১ কোটি টাকা। দেশব্যাপী ডিজিটাল টেরিস্ট্রিয়াল সম্প্রচার প্রবর্তন, ব্যয় ২৫০ কোটি টাকা। ৯৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ২১ জেলায় সুবিধাবঞ্চিত নারী ও শিশুর প্রাথমিক স্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেবা প্রদান প্রকল্প নেয়া হয়েছে। বøু গোল্ড প্রোগ্রাম ফর ইন্ট্রিগ্রেটেড সাসটেইনেবল ইকনোমিক ডেভলপমেন্ট ইপ্রোভিং দ্যা ওয়াটার এন্ড প্রোডাকটিভ সেক্টরস ইন সিলেকটেড পোল্ডারস ফিন্যানসিয়াল প্রকল্প, ব্যয় ৬৬৩ কোটি টাকা। ইস্টাবলিশমেন্ট অব ডিজিটাল ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম থ্রো ডিজিটাল সার্ভে এন্ড সেটেলমেন্ট অপারেশনস অব থ্রি সিটি করপোরেশনস ওয়ান পৌরসভা এন্ড রুরাল উপজেলা অব বাংলাদেশ, ব্যয় ৩৫১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। লোকাল গর্ভামেন্ট ইনিশিয়েটিভ অন ক্লাইমেট চেঞ্জ, ব্যয় ১৬৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ট্রান্সমিশন গ্রীড সম্প্রসারণ, ব্যয় ৩ হাজার ২৭৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। ডিপিডিসির আওতায় ঢাকার কাওরানবাজারে ভ‚-গর্ভস্থ উপকেন্দ্র নির্মাণ, ব্যয় ৯৫০ কোটি ৪০ লাখ টাকা। লং টার্ম সার্ভিস এগ্রিমেন্ট ফর ভেড়ামারা কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্ল্যান্ট, ব্যয় ৬৫২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। লাকসাম এবং চিনকী আস্তানার মধ্যে ডাবল লাইন ট্র্যাক নির্মাণ, ব্যয় ১ হাজার ৮১৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। সিগন্যালিংসহ টংগী ভৈরব বাজার সেকশনে ডাবল লাইন নির্মাণ, ব্যয় ২ হাজার ১৭৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম সড়ক নির্মাণ, ব্যয় ৮৭৪ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের জন্য লজিস্টিকস ও ফ্লীট মেইনটেন্যান্স ফ্যাসিলিটিস গড়ে তোলা প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৪৪৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ