Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

উন্নয়নের মহাসড়কে গণতন্ত্র কোথায়

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন | প্রকাশের সময় : ২২ জুন, ২০১৮, ১২:০০ এএম

একটি দেশের উন্নয়নের পাশাপাশি স্থিতিশীল গণতন্ত্র বেশি প্রয়োজন। যে দেশে গণতন্ত্র নেই সে দেশে উন্নয়নশীল তকমা অর্থহীন। কারণ এটি জনগণের কাজে আসে না। যেসব দেশে গণতন্ত্র আছে, সেখানে অবধারিতভাবে নির্বাচনও আছে। গণতন্ত্র আছে অথচ নির্বাচনের প্রয়োজন হয়নি- এমন কথা শোনা যায়নি।
কোনো দেশে গণতন্ত্র তো আর এমনি এমনি আসেনি, তার জন্য চাপের প্রয়োজন পড়ে। আর সেই চাপটা দিতে পারে কেবল দেশটির জনগণ। শাসকের কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অনুশীলনে বাধ্যও করতে পারে জনগণ। গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বলেছেন, ‘গণতন্ত্রের অর্থ হলো জনসমূহের মধ্যে ঐকমত্য, বন্ধুত্ব এবং সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা।’ গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে মতবিরোধ থাকবেই। কিন্তু এই মতবিরোধ যদি ক্ষমতাসীন মহলের তরফে বিরোধীপক্ষের ওপর দমন-পীড়ন হয়, তাহলে কাক্সিক্ষত গণতন্ত্র, নির্বাচন, রাজনীতি সবকিছুই অজানা গন্তব্যে হারিয়ে যায়। পশ্চিমের উন্নত দেশগুলোতে যখন গণতন্ত্রের গ-ও ছিল না তখন বঙ্গে জনগণ রাজা নির্বাচন করতেন। জনগণ দ্বারা প্রথম নির্বাচিত রাজা ছিলেন পাল বংশের গোপাল। ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও রাজা নির্বাচনের তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়। মধ্যযুগে রাজারা জনগণ দ্বারা নির্বাচিত হলেও বিরোধী দলের অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছু জানা যায় না। তবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে শাসকদের বিরুদ্ধে ভারতের জনগণ বিভিন্ন আন্দোলন ও বিদ্রোহের মাধ্যমে নিজেদের বিরোধীপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। বিশ শতকের সূচনায় সেই আন্দোলন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। ১৮৮৫ সালে জাতীয় কংগ্রেস এবং ১৯০৫ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর শাসক দল মুসলিম লীগ বিরোধী দলের অস্তিত্বকে স্বীকার করতে চায়নি। আমরা যদি বাংলাদেশের গত ৪৭ বছরের রাজনীতি বিশ্লেষণ করি তাহলে কী দেখতে পাই? দেখতে পাই যখন যাঁরাই ক্ষমতায় থাকে, তখন তাঁরা নিজেদের রাষ্ট্র মনে করে। দল ও রাষ্ট্রের ফারাকটি মুছে ফেলে। এটি অনেকটা ফরাসি রাজা ষষ্ঠ লুইয়ের সেই উক্তির মতো, আমিই রাষ্ট্র। অনির্বাচিত স্বৈরশাসকেরা এ ধরনের আচরণ করতে পারে। কেননা জনগণের প্রতি তাঁদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। কিন্তু গণতান্ত্রিক সরকারগুলোও কেন সেই পথে হাঁটবে?
বাংলাদেশের গণতন্ত্র কোনোকালেই শক্তিশালী ছিল না। গণতন্ত্রের যে উপাদান থাকে তা আমাদের এখানে অনেকটা অনুপস্থিত। নির্বাচন নামের একটি মাত্র উপাদান ছিল। তাও আজ ভেঙে পড়েছে। নির্বাচনের কোনো বিধানই আর কার্যকর নেই। গণতন্ত্র কার্যকর হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। সামনে শুধু অমাবশ্যার অন্ধকার। আলোর কোনো নিশানা নেই। গণতন্ত্র এখন একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার খোরাকে পরিণত হয়েছে। যে কারণে মানবাধিকার, নাগরিক সমাজের নিরাপত্তা, মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়গুলো আর্ন্তজাতিক গণমাধ্যমে আলোচিত হচ্ছে। শুধু উন্নয়নের মাপকাঠি দিয়ে একটি রাষ্ট্রকে মূল্যায়ন করা হয় না। এত উন্নয়ন হয়েছে তারপরও কেন একনায়কতান্ত্রিক দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম ওঠে এসেছে, এই বিষয়টি ক্ষমতাধরদের ভেবে দেখার প্রয়োজন। জার্মানভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি যে প্রতিবেদন দিয়েছে তা অমূলক তা বলা যাবে না। বাস্তবতার নিরিখে বিশ্লেষণ করলে মনে হবে, এর ভিত্তি আছে। প্রধানমন্ত্রী জনসমাবেশ করে ভোট চাইছেন। অথচ বিরোধী মতালম্বীরা হামলা, মামলা, জেল, জুলুমের নিষ্ঠুরতার শিকার। বিরোধী শিবিরের কর্মী সমর্থক কেউ আর নিরাপদ নেই। বিএপির নেত্রী কারগারে বন্দি। সরকারি দলের বা সরকারপক্ষের কেউ খুন হলে বা আক্রান্ত হলে সঙ্গে সঙ্গে বিরোধীমতালম্বীরা গণগ্রেপ্তার হচ্ছে। আর বিরোধী দলের কেউ খুন হলে পুলিশ বছরের পর বছর আসামি খুঁজেই পাচ্ছে না। এটি তো একটি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার ধারা হতে পারে না।
দেশ যখন উন্নয়নের মহাসড়কে তখন বীতশ্রদ্ধ হয়ে এদেশের কর্মহীন যুবসমাজের এক বিশাল অংশ বিপদসংকুল পথে বিদেশে পা বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া, লিবিয়া ও ইরাকের নাগরিকেরা যখন জীবনের মায়া ত্যাগ করে ইউরোপের মৃত্যুকূপে পাড়ি জমাচ্ছে তখন বাংলাদেশি নাগরিকেরাও উত্তাল সমুদ্রে ভাসছে। সেখানে বাংলাদেশি যুবকরা ইউরোপীয় পুলিশের সামনে প্লাকার্ড ধরে জানাচ্ছে, ‘শুট আস, উই নেভার গো ব্যাক বাংলাদেশ’Ñ আমাদের গুলি কর, আমরা কখনো বাংলাদেশে ফেরত যাব না। শুধু কি তাই! মধ্যপ্রাচ্যের নির্যাতিত পলায়নকারী নাগরিকদের সাথে বাংলাদেশি নাগরিকেরাও ঠোঁট সেলাই করে রেখেছে যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে অভিনব প্রতিবাদের শিরোনাম হয়েছে। শুধুমাত্র উন্নয়নের চাকা আর গালভরা ভুলি দিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়া যায় না। দেশকে সত্যিকার অর্থে উন্নয়নের মহাসড়কে নিতে হলে প্রয়োজন সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ। গণতন্ত্রবিহীন উন্নয়ন বর্ষার বাদলে ডুবে যায়। তবে যেসব দেশে গণতন্ত্র আছে সেখানে উন্নয়নের ভাটা পড়েছে এমন কথা শোনা যায়নি। উন্নয়ন ও গণতন্ত্র একটি অপরটির পরিপূরক। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিকে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। দুর্নীতি আর উন্নয়ন একসাথে চলতে পারে। কিন্তু গণতন্ত্র আর স্বৈরতন্ত্র এক সাথে চলতে পারে না। দেশে যে হারে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর লুটপাট হচ্ছে, তাতে করে জিডিপি বাড়ে কীভাবে, এই প্রশ্নের উত্তর সাধারণ মানুষের জানার কথা নয়। কারণ আমাদের দেশের সব মানুষই জিডিপি সর্ম্পকে জ্ঞান রাখে তা কিন্তু নয়! তবে প্রতিটি মানুষের জানা উচিত বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু আয় বা ঋণের পরিমাণ কত! ৯ জুন প্রকাশিত এক খবরে জানা গেছে, বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ৬০ হাজার টাকা। আজ যে শিশু জন্ম নেবে তার মাথায় ৬০ হাজার টাকা ঋণের দায় চাপবে। অনেকের ধারণা, দুর্নীতি হলে জিডিপি বাড়ার সুযোগ নেই। অথচ অর্থনীতিতে লেনদেন বাড়লেই জিডিপি বাড়ে। রাস্তা, কালভার্ট, ফ্লাইওভার নির্মাণে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় বাংলাদেশে। গেøাবাল কম্পেটিটিভ ইনডেক্স বলছে, এশিয়ার মধ্যে নেপালের পরেই সবচেয়ে খারাপ রাস্তা বাংলাদেশের। অন্যান্য দেশের তুলনায় দ্বিগুণ-তিনগুণ অর্থ ব্যয়ে রাস্তা নির্মাণ করা হলেও বছরের মাথায় ভয়াবহ দুর্গতি হচ্ছে রাস্তাগুলোর। দ্রæত পুনর্নিমাণ করতে হচ্ছে বছরে কয়েকবার। অর্থাৎ আবারও নতুন বাজেট, নতুন লেনদেন, নতুন ভাগ-বাটোয়াারা, নতুন চুরি। প্রকল্প ব্যয় বা চুরির পরিমাণ যত বাড়বে জিডিপির পরিমাণও তত লাফিয়ে বাড়বে। যেমন এক রাস্তা অনর্থক কাটাকাটি, ভাঙ্গাভাঙ্গি করলে টাকা যেমন বেশি ব্যয় হয় তেমনি জিডিপিও বাড়ে। দেশের অর্ধেক মানুষ পানিদূষণ, বায়ুদুষণ বা সিসাদূষণের কারণে ভয়াবহ অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেও জিডিপি বাড়ে। আইনের শাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে হাইড করে শুধুমাত্র জিডিপি বা মাথাপিছু আয়ের হিসাব দিয়েই উন্নয়ন হয় না। উন্নয়নের মহাসড়কে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে সবার আগে দেশে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর