Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৭ আশ্বিন ১৪২৫, ১১ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

পয়লা বৈশাখ প্রাণ ও প্রকৃতির উৎসব

প্রকাশের সময় : ১৩ এপ্রিল, ২০১৬, ১২:০০ এএম

আলী এরশাদ হোসেন আজাদ
প্রাণ ও প্রকৃতির চিরায়ত উৎসব পয়লা বৈশাখ। লোকায়ত এ উৎসবে আনন্দের দোলা লাগে গ্রাম-গ্রামান্তর, মাঠ-মাঠান্তর পেরিয়ে শহুরে ব্যস্ত বিপণী বিতান ও আধুনিক মননে। যাতে থাকে না ব্যবস্থা-বৈষয়িক সীমা বা বয়স বৃত্তি ও বিশ্বাসের ব্যবধান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ২০ ফাল্গুন ১৩৩৩ (৪ মার্চ ১৯২৭ খ্রি.) রচনা করেন “এসো হে বৈশাখ... মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা...”।
মুসলিম বাঙালি মেহনতি কৃষাণ-কৃষাণীর আর্থসামাজিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে বাংলা নববর্ষের সম্পর্ক সুনিবিড়। মুসলমানদের ‘ফসলি কর’ (উশর) ও অমুসলিমদের ‘ভূমি কর’ (খারাজ) আদায়ের সুবিধার জন্য স¤্রাট আকবর বাংলা সন প্রবর্তন করেন। ১৫৮৪ খ্রি. ১০ মার্চ এর সূচনা হলেও তা গণনার কার্যকারীতা ১৫৫৬ সাল বা ৯৯২ হিজরি থেকে ধার্য হয়। ‘বাংলা সন’কে বলা হয় বঙ্গাব্দ। এমনি প্রচলিত সন হলো খ্রিস্টাব্দ, হিজরি, ফসলি, আমলি, মগি, বগড়ি, ত্রিপুরাব্দ, চৈতন্যাব্দ, ভারতীয় শকাব্দ।
মুসলিম ফসলি সন বা বঙ্গাব্দ প্রবর্তনের আগে অগ্রাহায়ণ থেকে বছর গণনা করা হতো। ‘অগ্র’ অর্থ শুরু ‘হায়ণ’ অর্থ বছর। অন্যমতে ‘অগ্র’ অর্থ শ্রেষ্ট ‘হায়ণ’ অর্থ ধান। এসময় প্রধান ফসল আমন বা শ্রেষ্ট ‘হৈমন্তিক’ ধান কৃষকের ঘরে উঠতো। বর্ষা শেষে স¤্রাটের খাজনা আদায়কারী কর্মচারীদের অসুবিধার কথা বিবেচনা করে তা শুষ্ক মৌসুমে আদায়ের নির্দেশ দেয়া হয়।
১৯৫৪ সালে ‘যুক্তফ্রন্ট সরকার’ প্রতিষ্ঠিত হলে বাঙালির জনপ্রিয় নেতা এ কে ফজলুল হক (মুখ্যমন্ত্রী) বাংলা নববর্ষে ছুটি ঘোষণা করেন এবং দেশবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। বঙ্গাব্দের সূচনা ১৪ এপ্রিল পয়লা বৈশাখ ঠিক রাখবার জন্য ১৯৬৬ খ্রি. ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বছরের শুরুর পাঁচ মাস ৩১ দিন এবং শেষ মাসগুলো ৩০ দিন নির্ধারণ করেন এবং আশির দশকে বাংলা একাডেমি ৮ ফাল্গুন (২১ ফেব্রুয়ারি) ১৪ এপ্রিল (পয়লা বৈশাখ) ঠিক রাখবার জন্য খ্রিস্টাব্দের সঙ্গে মিলিয়ে অধিবর্ষ নির্ধারণ করে ফাল্গুন মাস ৩১ দিন প্রচলন করে।
বঙ্গাব্দ ও ভারতীয় শকাব্দ গণনা রীতিতে তারতম্য রয়েছে। শকাব্দ বা ‘সনাতন সন’ জ্যোতিষ শাস্ত্র মতে নির্ধারিত। এতে মাসের দিনগুলো অনির্ধারিত। ১৪১৮ সনের জ্যৈষ্ঠ মাস ৩১ দিন, ১৪১৯এ জ্যৈষ্ঠ মাস ৩২ দিন, ১৪১৮-তে আষাঢ় ৩২ দিন হলেও ১৪১৯ এ তা ছিল ৩১ দিন !
বর্ষ পরিক্রমা মহান আল্লাহর অনুগ্রহ। পবিত্র কোরআনে আছে “তিনি সূর্যকে প্রচ- দীপ্তি দিয়ে, চাঁদ বানিয়ে দিলেন ¯িœগ্ধতা ভরে, বছর গণনা ও হিসাবের তরে” (কাব্যানুবাদ : সূরা ইউনুসÑ৫)। বারো মাসে এক বছর এ কথাও পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে- “সৃষ্টির সূচনা লগ্ন থেকেই আল্লাহ বারোটি মাস নির্ধারণ করেছেন” (তওবা-৩৬)।
নববর্ষও আমাদের ইহ-পারলৌকিক কল্যাণের মাধ্যম হতে পারে। যেমন : ১. নববর্ষকে আল্লাহর নিয়ামত মনে করে শুকরিয়া আদায়। ২. নববর্ষের আনন্দ দুঃস্থ-দরিদ্রদের সঙ্গে ভাগ করা। ৩. নববর্ষে অভাবী মানুষের খোঁজ-খাতির, তাদের খাদ্য, পোশাক দান করা। ৪. পয়লা বৈশাখ নতুন আঙ্গিকে জীবন গড়ার শপথের দিন। ৫. পয়লা বৈশাখ রাষ্ট্রীয় কর পরিশোধের অঙ্গীকার গ্রহণের দিন। ৬. পয়লা বৈশাখ দেনা-পাওনা বা হালনাগাদ করবার দিন। ৭. পয়লা বৈশাখ পারস্পরিক সম্প্রীতি ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টির প্রেরণার দিন। ৮. ফসলি কর পরিশোধের সঙ্গে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাবোধ জাগানোর দিন হতে পারে।
পয়লা বৈশাখের অনুষঙ্গ ‘হালখাতা’। উদ্দেশ্য ছিল ‘উশর’ ‘খারাজ’ বা ফসলি কর পরিশোধের আনন্দ প্রকাশ করা এবং ব্যবসায়ের হিসাব ও খাজনা ‘রাজকীয় খাতায় হাল নাগাদ’ রাখা। এ উপলক্ষে রাজা-জমিদারকে, প্রজাগণ তাদের সৃজনশীল পণ্য, সূচিকর্ম উপহার দিতেন। রাজা-জমিদারগণ ও প্রজাদেরকে ‘কর রেয়াৎ’ ও ‘ইনাম’ দিতেন। মানুষের নৈপণ্য প্রদর্শন ও সাংবাৎসরিক প্রয়োজনীয় অথবা সৌখিন পণ্যের বেচাকেনার জন্য বৈশাখী মেলা লোকবাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য। মেহনতি কৃষক খাজনা আদায়ের আগ্রহে বলতো ‘আর কটা দিন সবুর কর রসুন বুনেছি...’ কিন্তু বর্তমানে তা হয়েছে একদিনের সস্তা বিনোদন। এতে নেই মেঠো বাঙালির ‘সোনা ছোঁয়া মাটির’ সৌরভ। বরং ব্যান্ড ও ব্রান্ডিংয়ের কল্যাণে বসছে বাণিজ্যিক পশরা। হাড়ভাঙা শ্রমেক্লান্ত যে কৃষক ঋণে জর্জড়িত তার কাছে বাংলা নববর্ষের আবেদন কতটুকু? খাদ্যের সঙ্গে মিশে থাকা কাঁকড়-ময়লা যেমন অখাদ্য। সংস্কৃতির মধ্যে অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ তেমনি যৌক্তিক কিনা ভাবতে হবে।
উৎসবের আবহে নারী-পুরুষের অবাধ-অবাধ্য মেলামেশা ইসলামে অনুমোদিত নয়। ‘চোখের হেফাজত’ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহর নির্দেশ- “হে রাসূল (সা.) মু’মিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে...” (নূর : ৩০)। পর্দা বজায় রাখা নারী-পুরুষ সবার জন্যই ‘দায়েমি ফরজ’ বা সার্বক্ষণিক বাধ্যতামূলক বিধান। এসব বিষয়ে সূরা আহযাব, নূর ইত্যাদিতে বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়।
বিনোদন যেন অপচয়ের কারণ না হয় তাও খেয়াল রাখা জরুরি। মহান আল্লাহ বলেন- “আর কিছুতেই অপব্যয় করবে না। যারা অপব্যয় করে তারা শয়তানের ভাই এবং শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ” (বানি ইসরাইল : ২৬, ২৭)।
আমরা মুসলমান। আমরা সব কিছুর ব্যাখ্যা বুঝবো ইসলামের আলোকে। ইসলামে বিজাতীয় অনুকরণ সমর্থিত নয়। প্রিয়নবী (সা.) বলেন- “যে অন্য কোনো সম্প্রদায়ের অনুকরণ বা সাদৃশ্য গ্রহণ করবে সে তাদেরই অন্তর্র্ভুক্ত গণ্য হবে” (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৫১২)। ইসলামের দৃষ্টিতে নবোদ্ভাবনকে বলে ‘বিদ’আত’ বা ধর্মীয় নতুনত্ব। আমাদের কোনো তৎপরতায় ক্ষতিকর ‘বিদ’আতে’র বিস্তার হোক তা কাম্য নয়। প্রিয়নবী (সা.) বলেন- “যে ব্যক্তি আমার দ্বীনের মধ্যে এমন কোনো নতুন প্রথা সৃষ্টি করে, যা আসলে এর মধ্যে নেই, তবে তা প্রত্যাখ্যাত বা বাতিল” (বুখারি)। প্রিয়নবী (সা.) আরো বলেন- “যে ‘বিদ’আতি’কে সম্মান দেখিয়েছে সে নিশ্চয়ই ইসলামের ধ্বংস সাধনে সাহায্য করেছে” (বায়হাকি)।
পরিশেষে বলব, বাংলা নববর্ষের ক্রমবির্তনেও রয়েছে মুসলিম ঐতিহ্য। আমরা ভাগ্যবান; আমাদের বর্ষপুঞ্জি আছে। ইংরেজদের নেই। তারা ব্যবহার করে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। নববর্ষের আবাহনে ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’য় আছেÑ
বৈশাখ মাসেতে গাছে আমের কড়ি
পুষ্প ফুটে পুষ্প ডালে ভ্রমর গুঞ্জরি
(কমলা পালা)।
ষ লেখক : বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, গাজীপুর



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।