Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫, ৯ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

তুরস্কে নির্বাচন আজ

ইনকিলাব ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ২৩ জুন, ২০১৮, ১১:৪২ পিএম

তুরস্কে উৎসব মুখর পরিবেশে আজ রোববার ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দেশের প্রায় ৬ কোটি ভোটদাতা পার্লামেন্ট ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন। গোটা বিশে^র দৃষ্টি আজ তুরস্কের দিকে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক এলিটগণ ও চীনা বিনিয়োগকারীরা অধীর আগ্রহ ও ঔৎসুক্য নিয়ে এ নির্বাচনের ফলাফলের অপেক্ষা করছেন। বিভিন্ন জনমত জরিপে সুস্পষ্ট যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বর্তমান প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান জয়ী হবেন এবং পার্লামেন্ট নির্বাচনে তার নেতৃত্বাধীন পিপলস অ্যালায়েন্স পার্লামেন্টের অধিকাংশ আসন লাভ করবে। এদিকে তুরস্কের নির্বাচনে ধর্মপ্রাণ জনগণের গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধ হতে দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এ নির্বাচন তুরস্ক ও তুরস্কবাসীর জন্য এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। খবর আল সাবাহ ও হুররিয়েত ডেইলি নিউজ ।
তুরস্কে বর্তমানে প্রচলিত পার্লামেন্টারি ব্যবস্থা থেকে প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতিতে রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট এরদোগান ২০১৭ সালের এপ্রিলে গণভোটের আয়োজন করেন। প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতির প্রতি ম্যান্ডেট লাভের পর এ বছরের এপ্রিলে তিনি হঠাৎ করেই তিনি ২৪ জুন আগাম নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। তদনুযায়ী আজ পার্লামেন্ট ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তুরস্কের ইতিহাসে একই সঙ্গে পার্লামেন্ট ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঘটনা এটাই প্রথম। তুরস্কের স্থানীয় সময় সকাল ৯টায় ভোটগ্রহণ শুরু হবে ও বিকেল ৫টায় তা শেষ হবে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) ও ন্যাশনাল মুভমেন্ট পার্টির সমন্বয়ে গঠিত পিপলস জোটের প্রার্থী বর্তমান প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান। অন্যদিকে রিপাবলিকান পিপলস পার্টির (সিএইচপি) প্রার্থী হচ্ছেন মোহররেম ইন্স, গুড পার্টির (আইপি) প্রার্থী হলেন মেরাল আকসেনার, পিকেকেপন্থী পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির (এইচডিপি) প্রার্থী সালাহাতিন ও ফেলিসিটি পার্টির (এসপি) হয়েছেন তেমেল কারামুলাগøু।
২০০২ সাল থেকে তুরস্ক শাসন করছেন এরদোগান। তিনি প্রেসিডেন্ট পদের শক্তিশালী প্রার্থী। তার প্রতি রয়েছে ৪৫ শতাংশ জনগণের সমর্থন। তার প্রধান প্রতিদ্ব›দ্বী হচ্ছেন প্রধান বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টির (সিএইচপি) মোহররেম ইন্স। তিনি বিপুল জনসমর্থন লাভে সক্ষম হয়েছেন। তিনি ২৫ শতাংশ ভোট পাবেন বলে মনে করা হচ্ছে। আরেকজন উল্লেখযোগ্য প্রতিদ্ব›দ্বী হলেন আইওয়াইআই (গুড) নেত্রী মেরাল আকসেনার। তার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে নি¤œ আয়ের মানুষের মধ্যে। তিনি ১০ শতাংশের মত ভোট পেতে পারেন বলে ধারণা। পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এইচডিপি) প্রার্থী সালাহতিন ডেমিরতাস জেলখানায় বন্দী অবস্থায় নির্বাচন করছেন। তিনিও ১০ শতাংশ ভোট পাবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
পার্লামেন্ট নির্বাচনে ৮টি দল অংশগ্রহণ করছে। দলগুলো হল ঃ একে পার্টি, সিএইচপি, এইচডিপি, ফ্রি কজ পার্টি (এইচইউডিএ-পিএআর), আইপ, এমএইচপি, এসপি ও বিপি। তুরস্কের ইতিহাসে এই প্রথম জোট গঠন করে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন করছে। একে পার্টি ও এমএইচপি মিলে পিপলস অ্যালায়েন্স নামে জোট গঠন করেছে। সিএইচপি , আইপি ও এসপি মিলে গঠন করেছে নেশন অ্যালায়েন্স।
ভোটগ্রহণ শেষে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের ভোট আগে গণনা করা হবে।
প্রথম দফায় প্রয়োজনীয় ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন নাকি সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত দু’প্রার্থী দ্বিতীয় দফা ভোটে যাবেন তা এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। এরদোগান যদি প্রথম দফায় জয়ী না হন তাহলে বিরোধী দল ৮ জুলাই দ্বিতীয় দফা নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সে পরাজয়কে তাকে পরাজিত করার চেষ্টায় ব্যবহার করবে।
নির্বাচন নিয়ে গত দু’মাসে বহু জনমত জরিপ হয়েছে। এগুলোতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এরদোগান সবার চেয়ে এগিয়ে আছেন বলে দেখা গেছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার জন্য প্রার্থীকে ৫০ শতাংশ ভোট পেতে হবে। প্রথম দফা নির্বাচনে তা পেতে সক্ষম না হলে দ্বিতীয় দফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। একে পার্টি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এরদোগানের নেতৃত্বে প্রতিটি নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছে।
এরদোগান জয়ী হলে তুরস্ক নতুন শাসন পদ্ধতির দিকে অগ্রসর হবে। এরদোগান ইতিমধ্যে নয়া শাসন পরিকল্পনা উন্মোচন করেছেন। এটা হচ্ছে তুরস্কের রাষ্ট্র কাঠামো ও শাসন ব্যবস্থা পুনর্গঠনের এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা।
মন্ত্রনণালয় ছাড়াও নয়া প্রশাসনের পররাষ্ট্র নীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতির মত বিষয়গুলো সামাল দেয়ার জন্য বিভিন্ন পরিষদ থাকবে। নির্বাচনের পরপরই এ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু হবে। সরকার মসৃণ ভাবে নয়া রূপান্তর ব্যবস্থা বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে।
আমলাতান্ত্রিক অচলাবস্থা প্রতিরোধের পাশাপাশি নয়া ব্যবস্থা একটি কার্যকর নির্বাহী ও শক্তিশালী পার্লামেন্ট প্রদানের বিষয়টি দেখবে যা আইন প্রণয়ন করে। নির্বাচন পরবর্তী সরকার তুরস্কের অর্থনীতি ও রাজনীতির জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার সম্পন্ন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তুরস্কের শাসন ব্যবস্থা নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সাথে সরকারীভাবে ও কার্যকরভাবে নির্বাহী প্রেসিডেন্সিতে রূপান্তরিত হবে। প্রেসিডেন্ট পুঞ্জীভ‚ত ক্ষমতার অধিকারী হবেন।
নতুন ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী পদ বিলুপ্ত হবে। পার্লামেন্ট নির্বাচনোত্তর কালে নয়া সরকারী ব্যবস্থার সাথে সংগতি রেখে নিজস্ব কর্ম আইন প্রণয়ন করবে। প্রশ্ন হচ্ছে, নয়া ব্যবস্থায় এ সব ক্ষমতা কে ব্যবহার করবেন।
এদিকে তুরস্কের বিরোধী দল অবশেষে এ সুস্পষ্ট সত্যটি মেনে নিয়েছে যে তুরস্ক একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। সেখানকার মানুষ ধর্মপ্রাণ। তারা তাদের এ নতুন উপলব্ধির প্রেক্ষাপটে রক্ষণশীল ভোটার ও পশ্চিমা মিডিয়ার সমর্থন লাভের চেষ্টায় সময় নষ্ট করেনি।
বহু বছর ধরেই পশ্চিমা মিডিয়া তুরস্ক সম্পর্কে প্রতিবেদনে এরদোগানের জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টিকে (একে পার্টি) ইসলামপন্থী বলে আখ্যায়িত করে আসছে। পশ্চিমের মত তুরস্কে ইসলামবাদ সহিংসতার সাথে সংশ্লিষ্ট নয় এবং এক পার্টি কখনো নিজেকে ইসলামপন্থী বলে আখ্যায়িতও করেনি। তা সত্তে¦ও পশ্চিমা মিডিয়া একে পার্টিকে ইসলামপন্থী হামাসের মত একটি দল বলে চিত্রিত করার চেষ্টা করে আসছে। তারা তুর্কি জনগণের স্বাভাবিক ধর্মপ্রবণতা ও প্রকাশ্য ধর্মনিষ্ঠাকে মারাত্মক সমস্যা বলে গণ্য করে যা দেশটিকে ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে সরিয়ে নিয়ে ইসলামীকরণের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মোহররেম ইন্স ও মেরাল আকসেনারের মুসলিম ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠির সমর্থন লাভের চেষ্টায় প্রকাশ্য ধর্মীয় কর্মকান্ড দেখে অনেক পশ্চিমা মিডিয়া শেষ পর্যন্ত উপলব্ধি করেছে যে তুরস্ক একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ।
ইন্স তার নির্বাচনী প্রচারণায় প্রতি জুমআর নামাজে নিয়মিত যোগদান, নামাজ পড়া ও তার উমরাহ পালনের কথা বলেন। মহিলা প্রেসিডেন্ট প্রার্থী আকসেনার প্রতিটি নির্বাচনী সমাবেশে হাতে স্কার্ফ জড়িয়ে রাখেন এবং বক্তৃতার সময় নিজের ধর্মনিষ্ঠার উপর জোর দিয়ে থাকেন।
একটি মুসলিম দেশ হিসেবে এসব বিষয় তুরস্কে স্বাভাবিক ব্যাপার। যা অস্বাভাবিক তা হচ্ছে তুরস্কের রাজনৈতিক প্রবাহে কৃত্রিম ধর্মনিরপেক্ষতার সীমারেখা আরোপ করা যা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে তাদের ধর্মবিশ^াস গোপন করতে বাধ্য করে। দশকের পর দশক ইসলাম ধর্মীয় আচার পালনকারী রাজনীতিকদের ধর্ম ব্যবহারকারী গোঁড়া মুসলিম বলে চিত্রিত করা হয়েছে।
যারা এরদোগানকে ইসলামপন্থী হিসেবে কোণঠাসা করার চেষ্টা করেন তারা শেষপর্যন্ত এ সত্য মেনে নিয়েছেন যে তুরস্ক একটি মুসলিম দেশ এবং সে দেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ হবে এটাই স্বাভাবিক। জনগণ তাই ইন্সের জুমআর নামাজে অংশগ্রহণ ও আকসেনারের হজে গমনের প্রশংসা করে। আজ এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে বিরোধী দল অবশেষে বুঝতে পেরেছে যে তুরস্কের সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মপ্রাণ মানুষকে হিসেব না করলে বিরাট ভুল হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজিৈনতিক নেতৃত্ব পরিবর্তনের মাধ্যম অথবা সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তনের মাধ্যমেই হোক, ২৫ জুন থেকে তুরস্কের রাজনীতি ও তুরস্কের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সূচিত হতে যাচ্ছে।



 

Show all comments
  • জহির উদ্দিন ২৪ জুন, ২০১৮, ৪:০৪ এএম says : 0
    এরদোগানই জিতবে
    Total Reply(0) Reply
  • কচি ২৪ জুন, ২০১৮, ৯:৫১ এএম says : 0
    ইনশাআল্লাহ হাফেজ এরদোগান অবশ্যই জিতবেন
    Total Reply(0) Reply
  • রমিজ উদ্দিন ২৪ জুন, ২০১৮, ৫:১৭ পিএম says : 0
    এরদোগান শুধু তুরস্কের নয় বিশ্বের অন্যতম সেরা মুসলীম নেতা
    Total Reply(0) Reply
  • Jahidul islam ২৪ জুন, ২০১৮, ৭:৪৯ পিএম says : 0
    বিশ্বের নির্যাতিত মুসলিমের কন্ঠ এরদোগান
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ