Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ০১ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

অমূল্য রতন

গল্প

বা সা র তা সা উ ফ | প্রকাশের সময় : ২৯ জুন, ২০১৮, ১২:০৪ এএম

দেশটা ভারতীয় উপ-মহাদেশ, রাজ্যটা পূর্ব পাকিস্তান, সময়টা প্রায় সত্তর বছর আগের কোনো এক বসন্তকাল। অনন্তপুর নামের এক গ্রামে তিনজন লোক বাস করতো। একটি গ্রামে কি শুধু তিনজন লোকই বাস করে? সংখ্যাটা তিনশো থেকে তিন হাজারও হতে পারে। এখানে যে তিনজন লোকের কথা উল্লেখ করেছিÑ তাদের মধ্যে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে এবং সেগুলো দোষ নাকি গুণ তা বোঝা না গেলেওÑ তারা যে গ্রামের অন্য লোকজন থেকে একটু আলাদা- সেটা সহজেই বোঝা যায়। কাকতালীয়ভাবে তিনজনেরই নাম ছিল রাজা। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, তাদের চরিত্রে ছিল অ™ু¢ত মিল। তিনজনেরই কোঁকড়া কোঁকড়া বাবরি চুল, তিনজনেরই গোঁফ আছে; কিন্তু দাড়ি নেই কারো মুখেই। তিনজনেই শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে চেষ্টা করে। তিনজনেই নারী জাতি বিয়ে না করার পণ করে রেখেছে। তিনজনেই প্রাণেমন বন্ধু। তিনজনেই ভীষণ অলস ও অকর্মণ্য এবং তিনজনেই কোনো গুপ্তধন কুড়িয়ে পেয়ে হঠাৎ বড়লোক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে দিনযাপন করছে। তারা শুনেছে, ঝিনুকের ভেতরে মুক্তো, সাপের মাথায় মণি এবং ব্যাঙের মুখে এক ধরনের দামি পাথর থাকে। সেগুলি খুঁজে পেলে বিক্রি করে সাত রাজার ধন-দৌলত পরিমাণ টাকা-পয়সা পাওয়া যাবে। তারা এমন কথাও শুনেছে, যে সাপের মাথায় ঐ মণিটা থাকে সেটি নাকি মানুষের আড়ালে চলে যায়। বন-বাদাড়ে মাটির গর্তে কিংবা গাছের খোড়লে লুকিয়ে থাকে। ব্যাঙের মুখে সেই দামি পাথরটা থাকলে ব্যাঙ সেটা মুখ থেকে বের করে মাটিতে রেখে রাতের আঁধারে তার আলোয় খাবার খুঁজে ফিরে আর ঝিনুকের ভেতরের মুক্তো হলে সে মুখ বন্ধ করে চলে যায় জলের গভীরে। কোথায় পাওয়া যাবে সেই মুক্তো, মণি কিংবা দামি পাথর? সেই অমূল্যধন খুঁজে পেতে হলে অহর্নিশি জল-জঙ্গলে খুঁজতে হবে। তাই তারা তিনজনে ঘর থেকে বেড়িয়েছে। মনেপ্রাণে দৃঢ় পণ করেছে, যতদিন এই গুপ্তধন খুঁজে না পাবে ততদিন বাড়ি ফিরবে না। 

এই তিনজন রাজাকে গল্পের প্রয়োজনে ভিন্ন তিনটি নামে সম্বোধন করবোÑ রাজু, রাজিব ও রাজন। 
এখন থেকে এই তিনটি নামেই হবে তাদের পরিচয়। 
অন্ধকারাচ্ছন্ন একটা জঙ্গলে বসে আছে তিনজন। সারা জঙ্গলে শিয়াল আর ঝিঁঝিঁপোকার হল্লা। তাদের মুখে কোনো কথা নেই। চুপচাপ বসে সিগারেট ফুঁকছে। জঙ্গলের ভেতরে নীরবতা ভেঙ্গে একটা গাছের ডালে শব্দ ফুটেছিলÑ রাতজাগা পাখির ডানা ঝাঁপটানির শব্দ বোধহয়। জঙ্গলের গহিন থেকে একটা শিয়াল দৌড়ে এসে তাদের দেখে থমকে দাঁড়ায়। অন্ধকারে তিনজন মানুষের অস্তিত্ব টের পেয়ে যেদিক থেকে এসেছিল পিঠটান দিয়ে সেদিকেই দৌড় দেয়। জঙ্গলের ভেতরে বসে কয়েকটা সিগারেট শেষ করে ফেলেছে তারা। হঠাৎ এক চিলতে আগুনের ফুলকির মতো চোখে পড়ে সামনে। তিনজনেই চমকে উঠে দৌড়ে যায় সেখানে। কুড়াতে গিয়ে হাতে পায় একটা জোনাকী পোকা। এতে তারা হতাশ হয় এবং এই হতাশা তাদের ক্ষত-বিক্ষত করে। তবু তারা জঙ্গলের ভেতরে বসে থাকে। জঙ্গলের ভেতরের অন্ধকার কিংবা শিয়ালের কোলাহল তাদের ছুঁতে পারে না। এক চিলতে আগুনের ফুলকির অস্পষ্ট ঝিলিক যেন তাদের উস্কে দিয়েছে আরও। জঙ্গলের ভেতরে ঝোপের আড়ালে বসে এ মুহূর্তে নিজেদের মনে হচ্ছে পুরনো অশত্থ কিংবা প্রাচীন বটবৃক্ষ। সেই কবে থেকে আশার শিকড় মেলে, ডালপালা ছড়িয়ে বসে আছে তো, আছেই। যেখানে আগুনের ফুলকির মতো দেখেছিল সেখানে আবার তাকায় তারা। না, তাদের সেই আকাক্সিক্ষত বস্তুটার দেখা পায় নাÑ যার জন্য এত অপেক্ষা, এত আকাক্সক্ষা। না জানি বস্তুটা দেখতে কী রকম? 
তিনজনই অবিচল বসে আছে। স্থির তাদের চোখের দৃষ্টি। তারা স্থির চোখে তাকিয়ে জোনাকী না-কি জঙ্গলের অন্ধকার দেখে বোঝা যায় না। তারা গভীর অন্ধকারে চুপচাপ বসেই থাকেÑ যেন বসে থাকা ছাড়া তাদের আর কোনো পথ জানা নেই। তারা ভেতরে ভেতরে আশাহত হতে থাকে যখন- তখনই রাজন বলে, ‘আর কত দিন এভাবে জঙ্গলে বসে থাকলে গুপ্তধন খুঁজে পাব?’
রাজু বলে, ‘ধৈর্য হারালে চলবে না।’ 
রাজিব বলে, ‘ধৈর্য ধারণ করার ধৈর্যও তো হারিয়ে ফেলেছি, আর কত দিন?’ 
রাজন বিরক্তমাখা গলায় ফের বলে, ‘এভাবে বসে থেকে কী হবে?’ 
অন্য দু’জনের টনক নড়ে এবার। তিনজনেই একসঙ্গে গা ঝাড়া দিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। তারা জঙ্গলের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসে। তখনও সাপের মাথার মণি, ব্যাঙের মুখের দামি পাথর কিংবা ঝিনুকের ভেতরে অসংখ্য মুক্তো ভাসতে থাকে তাদের চোখের সামনে, যা এবং কিছুতেই সরাতে পাওে না। বরং তাদের বুকের ভেতরে যন্ত্রণাকে দাহ করে, উষ্ণ করেÑসেই দহনে, সেই উষ্ণতায় তারা সিদ্ধ হয়; কিন্তু আশাহত হয় না। তারা জঙ্গলের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে ক্রমশ আলোর মধ্যে আসতে থাকে। আশেপাশে তখন কোনো জন-মানবের কোলাহল নেই। তারা একে অপরের মুখের দিকে তাকায়Ñবিষাদকাতর, উ™£ান্ত প্রত্যেকেরই মুখ। রাত বেড়ে যাচ্ছে বলে তারা আরও বিষাদগ্রস্থ, আরও উ™£ান্ত হয়ে পড়ে। তাদের সেই গুপ্তধন পাওয়ার আশা গুঁড়ো হয়ে যেন শূন্যে ধূলো হয়ে উড়ে যায় কিংবা জঙ্গলের অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। তারা তিনজনেই অচঞ্চল, স্থির। যেন পাতাশূন্য বৃক্ষের মতো ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে থাকে। সত্যিই তো, এভাবে আর কত দিন! তাদের গুপ্তধন পাওয়া না পাওয়া নিয়ে সময় তো থেমে থাকে না। রাত বাড়তে থাকে। হয়তো রাত বাড়তে থাকে বলেই বাড়ি ফেরার তাগদা দিয়ে রাজন আবার বলে, ‘চল, বাড়ি চলে যাই এভাবে আর কত দিন?’
রাজু বলে, ‘এক কাজ করি, তিনজনে একই জায়গায় না থেকে আলাদা আলাদা জায়গায় আরেকটু খুঁেজে দেখা যাক।’
তার এ কথাটা রাজন ও রাজিবের মনে ধরে। একই জায়গায় তিনজনে অযথা সময় নষ্ট করে কিছু হবে না। তাই তিনজন মিলে সিন্ধান্ত নেয়, রাজু জঙ্গলের ভেতরে সাপের মণি খুঁজবে, রাজন খুঁজবে ব্যাঙের মুখের সেই দামি পাথরটা আর রাজিব চলে যাবে নদীর ধারেÑসেখানে যত ঝিনুক আছে সব ক’টার খোলস খুলে খুলে মুক্তো খুঁজে ফিরবে। বলা তো যায় না কোথায় কী আছে? হয়তো কেউ একজন পেয়েও যেতে পারে অমূল্য রতন। 
এরপর চোখের সামনে যত বন-জঙ্গল, ঝোপ-ঝাড় পেয়েছে, পেয়েছে যত সাগর-নদী, খাল-বিল, পুকুর-নালা, সরোবর কিংবা উপত্যকা সবখানে হন্যে হয়ে তন্ন তন্ন করে খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত-শ্রান্ত, ত্যাক্ত-বিরক্ত এবং হতাশ হয়ে যখন তারা বাড়ি ফিরে আসতে উদ্যত হয়, তখনই একটা বাজারের সামনের ছোট একটা জঙ্গলে দেখতে পায় একটা গোলাকার বস্তুÑ যা বরফের খÐের মতো সাদা। তবে রোদে চক্চক্ করে এবং অন্ধকারে দেয় আলোর ঝিলিক। তারা ধরে নেয় এটাই সেই গুপ্তধনের অংশ কিংবা ব্যাঙের মুখের সেই পাথরটা অথবা সাপের মাথার মণিটা। আর তখনই তাদের আনন্দের সীমা থাকে না। তারা একেকজন একেকবার বস্তুটি নিয়ে লোফালুফি করে। একজন শূন্যে ছুড়ে আরেকজন ক্রিকেট খেলায় ক্যাচ ধরার মতো সেটা ধরে উল্লাসে চিৎকার দেয়। লোকজন তাদের এ ক্ষুদ্র বস্তুটি নিয়ে এতটা আনন্দিত হবার মর্মার্থ বুঝতে পারে না। সবাই তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি মেলে তাকায়। কেউ কেউ অনুচ্চ স্বরে বলেও ফেলে, ‘লোকগুলি কি পাগল!’
তিনজনের মধ্যে কোনো হুশ নেই। কে কী বলে কিংবা কে কী ভাবে তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। তারা তখন আর গ্রামের অন্যদের নেই। তাদের হাতের মুঠোয় আছে সদ্য পাওয়া অমূল্য রতন! যার জন্য কয়েক বছর ধরে জল-জঙ্গলে ঘুরে বেড়িয়েছে। তারা আত্মভোলা হয়ে আনন্দে নাচতে থাকে। তাদের ঘিরে মানুষের ভিড়, কোলাহল বেড়ে যায়। এই ভিড়ের মধ্য থেকে একজন প্রৌঢ় ব্যক্তি তাদের সামনে এগিয়ে এসে ছুঁ মেরে বস্তুটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে কিছুক্ষণ। তারপর তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে, ‘এ তো দেখছি একখÐ পাথর!’ 
‘এ্যাঁ!’ তিনজনেই হাহাকার করে ওঠে। নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে। দেহের রক্তসঞ্চালন যেন থেমে গেছে। মানুষের কোলাহলে তাদের সেই সোচ্চার হাসি আর আনন্দ নিমিষেই মিলিয়ে যায়।

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।