Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ২ রবিউস সানী ১৪৪০ হিজরী

এসো হে বৈশাখ এসো এসো

প্রকাশের সময় : ১৪ এপ্রিল, ২০১৬, ১২:০০ এএম

আফতাব চৌধুরী

কাল নিরন্তর বয়ে চলেছে। মানুষ এই কালকে নানা ঋতুতে ভাগ করে নিয়েছে নিজেদের প্রয়োজনের তাগিদে। এইভাবেই বছর ঘুরে যায়, আসে আর একটি নতুন বছর। কাল বাংলা ১৪২২ সাল শেষ হয়ে গেল আমাদের সকলের জীবন থেকে হারিয়ে গেল একটি বছর। এইভাবেই আমরা চলতে থাকব। আজকে আমরা বরণ করছি ১৪২৩ বঙ্গাব্দকে, পুরনোকে বিদায় জানিয়ে। গত বছর হয়ে গেছে আমাদের জীবনের আনন্দ-বেদনার ইতিহাস নিয়ে। এখনও আমার মনে আছে, চৈত্র মাস তখনও শেষ হত না, বাবা সকলকে জিজ্ঞেস করতেন নতুন বছরের পঞ্জিকা বেরিয়েছে কি না। আমরাও উৎসুক থাকতাম নিজেদের রাশিফল দেখার জন্য। পঞ্জিকা মানেই সেই সময় মনে হত ‘নববর্ষ এসে গেছে। কেননা, পঞ্জিকা নববর্ষের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। সেই সময় যে কয়টি বাংলা পঞ্জিকা ছিল তার মধ্যে বোধহয় সবচেয়ে প্রাচীন ছিল ডিরেক্টরি পঞ্জিকা। ১৮৮৩ সালে প্রথম পিএম বাগচী পঞ্জিকা বের হয় দুই খ-ে, প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কিশোরীমোহন বাগচী। তবে পঞ্জিকার মূল্য যে শুধুমাত্র নববর্ষ বা ধর্ম জীবনে নিবদ্ধ ছিল তা কিন্তু নয়। পঞ্জিকার আদিপর্বে অন্য কোন বই এত বেশি সংখ্যায় বিক্রি হত না। সেই জন্য মুদ্রণে, প্রকাশনায় এবং বইয়ের ব্যবসায়ে পঞ্জিকার দান গুরুত্বপূর্ণ। পঞ্জিকার এত বিক্রি দেখে অনেকে সেই সময় বইয়ের ব্যবসায় নেমে পড়েছিল। পঞ্জিকাতেই শিল্পীদের ছবি আঁকা বা ছাপার কাজ ব্যাপকভাবে শুরু হয় বলা যায়। পঞ্জিকা অবাধে সকল পরিবারেই প্রবেশ করতে পারত। সেই সময় নানা ধরনের বিজ্ঞাপনেরও অবাধ প্রবেশাধিকার ঘটেছিল। দেশীয় প্রথায়, সহজ ভাষায় পণ্যকে জনসাধারণের নিকট পরিচিত করার ব্যবস্থা পঞ্জিকার বিজ্ঞাপনই প্রথম করেছিল। আরও একটি কারণে পঞ্জিকার দান আমরা অস্বীকার করতে পারি না যেমন- দুই শতাব্দী ধরে পঞ্জিকার মূল অংশ ডিরেক্টরি ও বিজ্ঞাপনের পাতায়, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যিক বিবর্তনের সূত্র পাওয়া যায়।
চৈত্রের শেষে বৈশাখের প্রথমে সূর্য মীনরাশি থেকে মেষরাশিতে প্রবেশ করে। এর জন্য বৈশাখের যে প্রথম ক্ষণ, সেই সময় থেকে শুরু হয় সৌরমাস ও নববর্ষ। এই সৌর বছরের প্রথম দিনটি আমাদের কাছে এক বিশেষ দিন। দিনটি নববর্ষ।’ এই নববর্ষের সূচনা কীভাবে কেমন করে হয়েছিল তা নিয়ে অনেক বির্তক, তবে আমি এই সব বিতর্কের মধ্যে যেতে চাই না-কারণ দিনটি আমাদের কাছে এক আনন্দের দিন, ভাল লাগার দিন। নববর্ষ বলতে আমরা বুঝি বসন্তের বিদায়, গ্রীষ্ণের আগমন, নতুন জীবন, নতুন আশা। আজ আমাদের নববর্ষ বলতে শষ্য ঘরে তোলার হিসাব নেই, বসন্তও বুঝতে পারি না নগরায়নের দৌলতে চারদিকে অট্টালিকা, সবুজের দেখা নেই, বসন্ত এল না গেল তাও আমরা বুঝতে পারি না। এখন তো আমার মনে হয় বসন্ত যেন একঝলক রুক্ষতার হাওয়া নিয়ে আসে। তবুও পয়লা বৈশাখ যা এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, যা এখনও আমরা বহন করে চলেছি আমাদের জীবনের বইয়ে, মনে হয় জীবনের এক নতুন পাতা উল্টালাম। এই দিনটি শুধু আমাদের কাছেই নয় ভারতসহ বিভিন্ন জায়গায় এই দিনটি ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। আমাদের যেমন নববর্ষ, আসামে বিহু, পাঞ্জাবে বৈশাখী, বিহারে ও উত্তরপ্রদেশে সতুয়া সংক্রান্তি, ইত্যাদি। ছোটবেলায় পয়লা বৈশাখ মানেই নতুন কাপড়, বিকেলবেলায় বড়দের হাত ধরে দোকানে দোকানে গিয়ে ‘হালখাতার’ মিষ্টি খাওয়া সে কী আনন্দ। আজও সেসব দিনের কথা মনে পড়ে।
বর্ষশেষ ও বর্ষারম্ভ কবি রবীন্দ্রনাথের কাছে ‘এক তীব্র মানসিক উদবোদনের পর্ব।’ একসময় শান্তিনিকেতনে পয়লা বৈশাখেই রবিন্দ্রনাথের জন্মদিন পালন করা হতো। পঁচিশে বৈশাখ হতো গ্রীষ্মের বন্ধে, তখন অনেকেই শান্তিনিকেতনের বাইরে চলে যেতেন। কবির কাছে নতুন বছর ‘নানা রকম বিচিত্র ভাবনা’ নিয়ে দেখা দিয়েছে। যেমন চিত্রায় নববর্ষ’ কবিতায় কবি আহ্বান জানিয়েছেন এইভাবে নব অতিথির কভু---ফিরাইতে নাই কভু-/এস এস নতুন দিবস।/ ভরিলাম পুণ্য অশ্রুজলে/আজিকার মঙ্গল কলস। (নববর্ষ ১৩০১)। তবে দুঃখের খবরও পাই আমরা গানে। নতুন বছরের আনন্দের চাইতে বিলীন হয়ে যাওয়া বছরের গ্লানি আর অচরিতার্থতা তাকে বেদনা ও দুঃখ দিয়েছে। তাই তিনি গেয়েছেন-‘বর্ষ গেল, বৃথা গেল, কিছুই করিনি হায়,/ আপন শূন্যতা লয়ে জীবন বহিয়া যায়।’ আবার কখনও কখনও বর্ষশেষের প্রবল কালবৈশাখী তার কাছে নতুন জীবনের বার্তা নিয়ে আসে, যেমন ‘কল্পনা’-র (১৯০০) ‘বর্ষশেষ’ কবিতা-‘হে কুমার, হাস্যমুখে তোমার ধনুকে দাও টান/ঝনন রনন।’ ১৯০২-এ শান্তিনিকেতনে নববর্ষ (ভারতবর্ষ) বলে কত যে প্রবন্ধ পাঠ করেছিলেন তাতে তিনি বলেছিলেন, ‘আজকার এই নববর্ষের মধ্যে ভারতের বহু সহ¯্র পুরাতন বর্ষকে উপলব্ধি করতে পারলে তবেই আমাদের দুর্বলতা, আমাদের লজ্জা, আমাদের লাঞ্ছনা, আমাদের দ্বিধা দূর হয়ে যাইবে নব বল, নবসৌন্দর্য আমরা যদি অন্যত্র হইতে ধার করে লইয়া সাজিতে যাই, তবে দুই দ- বাদেই তাহা কদর্যতার মাল্যরূপে আমাদের ললাটকে উপহাসিত করিবে; ক্রমে তা হতে বন্ধন রজ্জুটুকুই থাকিয়া যাইবে-যা প্রচ্ছন্ন, যা বৃহৎ, যা উদার, যা নির্বাক, তারই জয় হবে; আমরা যারা ইংরেজি বলছি, অবিশ্বাস করছি, মিথ্যা বলছি, আস্ফালন করছি, আমরা বর্ষে বর্ষে-মিলি মিলি যাব সাগরলহরী সীমানা।’
আজ নববর্ষ বাঙালি জীবনে একটা আইটেম মাত্র। বাঙালির সবকিছুই এখন ইভেন্ট হয়ে পড়েছে, যার মানে হল আর কিছুদিন পর নববর্ষের মধ্যে বাঙালিত্ব খুঁজতে গোয়ান্দা পুলিশ লাগবে। টরেন্টোর ইর্য়ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা এবং লেখিকা জেসমিন চৌধুরী বলেছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতার কথা। হাফ ডজন ছাত্রছাত্রী সেখানে রবীন্দ্রনাথ পড়ছে বাংলা নয়, ইংরেজিতে। তারা কিন্তু বাঙালি। তাতে অবশ্য বাঙালি এগোচ্ছে না পিছোচ্ছে বোঝার উপায় নেই। নববর্ষে আরও একটা জিনিস টের পেলাম যে বাঙালির পোড়া কপাল-কেননা সাহেবদের নববর্ষে (প্রথম জানুয়ারি) কি মাঠে আমেজ ভরা শীত। আর আমাদের গ্রীষ্মের দাবদাহ, তাই আমাদের নববর্ষ আজকাল এক্সপোর্ট হয়ে পাড়ি দিচ্ছে বিলেত আমেরিকায়। ওখানে নাকি বাঙালিরা খুব হই-হুল্লোড় করে নববর্ষের পার্টি দেয়।
আমার এখনও মনে আছে ছোটবেলায় নববর্ষে কত ভাল-মন্দ রান্না হত। এখন যে নতুন জমানা এসেছে, সকল ছেলেমেয়ে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে, নিজেদের ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত, রান্না তো আর তাদের হাতে নেই। সময় কোথায়? তা হলে নিশ্চয় আমাদের সকলের মনে প্রশ্ন আসে, মা-চাচিদের আমলের রান্নাগুলো কাদের হাতে যাবে? আমি জানি না আপনাদের কী উত্তর হবে, তবে আমার উত্তর হবে বইয়ের পাতায় বা টিভির পর্দায়। এখানে প্রিয় উদ্ধৃতি, কবি মালার্মে থেকে ‘ঊাবৎু ঃযরহম বহফং ঁঢ় রহ ধ নড়ড়শ’ সব কিছুই শেষ অবধি স্থান করে নেয় বইয়ে। তাই ‘নববর্ষ’- এই আনন্দের দিনটি ধীরে ধীরে আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। কোথায় গেল সেই আনন্দ, সেই উত্তেজনা। আমাদের ছোটবেলায় আমরা বড়দের নববর্ষের সালাম জানিয়ে চিটি লিখতাম আর ছোটদের নববর্ষের ভালবাসা ও আদর দিয়ে চিঠি লিখতাম। এখন চিঠি ইতিহাস হয়ে গেছে। হয়তো বা একদিন চিঠির উপর গবেষণা হবে কে সূচনা করেছিল, কোন যুগে চিঠি লেখা হত, কীভাবে অতীত হয়ে গেল?
আমাদের পরের প্রজন্মের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা আরও মর্মান্তিক, কারণ ওদের জীবনের সাফল্যের সঙ্গে এ শহর, এ দেশ ত্যাগের ঘটনা জড়িয়ে আছে। আপনি যদি কাউকে বলেন, ‘আমার ছেলেটি তো খুব বড় চাকরিতে এখন।’ সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন শুনতে হচ্ছে, ‘কোন দেশে আছে ও?’ সন্তানের সাফল্য উপভোগ করার মতো বৃদ্ধ বয়স আর নেই আমাদের। এখন বাড়ি বসে টেলিফোনের অপেক্ষা কখন ছেলে বা মেয়ের ফোন আসে, যদি দেরি হয় তা হলে ভয়, ভাল আছে তো? এই জায়গাতেই আমরা এখনও সেই আগেকার দিনের মা-চাচির-বাবা-চাচার মতোই বাঙালি থেকে গেলাম। আজকাল ফোনে নববর্ষের সালাম, ঈদের সালাম বা ই-মেলে নববর্ষে একটু পযধঃ করে সংসার করছি আমরা। আমার সৌভাগ্য কি দুর্ভাগ্য জানি না ব্যাঙ্গালোর ও কলকাতার কর্পোরেট জগৎটাকে দেখবার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে লক্ষ্য করলাম, এই জগতের ছেলে বা মেয়েরা ইংরেজি ভাষার জন্য কত কম বাংলা জানে। লক্ষ্য করলাম নিজেদের মধ্যে আলোচনার বিষয়বস্তু হল, কোম্পানি কেমন, মোবাইল হ্যান্ডসেট পাল্টানো, গাড়ির ব্যান্ড বদলানো, ফ্ল্যাট পাল্টানো, কে কতটা প্রজেক্ট করল, কোম্পানির কাছে কে কতটা গুরুত্ব পায়-এই সব। তাদের কাছে নববর্ষ বলতে পয়লা জানুয়ারি (ইংরেজি নববর্ষ)। এই দিনটি তারা খুব হই-হুল্লোড় করে কাটায়। তাদের দেখে মনে হয়, রবীন্দ্রনাথের ‘নববর্ষ’ (ভারতবর্ষ) প্রবন্ধের লাইন নববল, সবসৌন্দর্য---অন্যত্র হতে ধার করে লয়ে সাজতে তারা চায়। ওদের দেখে আমি ভাবছিলাম এরাই কি আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম। তবে ব্যতিক্রম যে নেই তাও বলছি না, তবে সংখ্যায় তারা নগন্য। এ সবের মধ্যেও নববর্ষ আসে আমাদের জীবনে আবার চলেও যায়। এই দিনটি আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনের এক সুরভিত দিন। জানি না বহু যুগ ধরে এই দিনটি কী রূপ নিয়ে আসবে আমাদের জীবনে। হয়তো বা হারিয়ে যাওয়া আনন্দের দিনগুলোর মতো বা নববর্ষ বলে আর কিছুই থাকবে না-সে এক ইতিহাস হয়ে যাবে। তবুও আমরা সকলে মিলে আহ্বান করি। ‘জীর্ণ পাতা যাবার বেলায় বারে বারে ডাক দিয়ে যায় নতুন পাতার দ্বারে দ্বারে--।’
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।