Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৫, ১৪ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

আফ্রিকা বিজয়ের বিস্ময়কর কাহিনী

কে. এস. সিদ্দিকী | প্রকাশের সময় : ৬ জুলাই, ২০১৮, ১২:০৮ এএম

বহুদেশের সমন্বয়ে গঠিত আজকের আফ্রিকার বিচিত্র ইতিহাস রয়েছে। সেখানে কীভাবে ইসলাম প্রচারিত হয়েছিল সে এক অদ্ভুত কাহিনী। উমাইয়া শাসন আমলের প্রাথমিক যুগে এটি ছিল এক বিস্ময়কর বিজয়। হজরত আমীর মোয়াবিয়া (রা.)-এর বিজয়-অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী কীর্তি ছিল আফ্রিকায় ইসলাম প্রচারের সূচনা। এ সম্পর্কে ঐতিহাসিক বর্ণনা সুদীর্ঘ যা সংক্ষেপে নি¤œরূপ:
আল্লাহর দীন ধর্ম প্রচার এবং সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামদ্রোহী বিধর্মীদের মোকাবেলা করতে গিয়ে যেসকল বীর মুসলমান সেনা বিজয় অথবা শাহাদত লাভের উদ্দেশ্যে রণাঙ্গনে অবতীর্ণ হতেন তাদের মধ্যে ওকবা ইবনে নাফে ছিলেন অন্যতম। ‘মুসলিম আলেকজাÐার’ নামে খ্যাত এই বীর সেনাপতির আফ্রিকা বিজয়ের কাহিনী কালের অক্ষয় কীর্তি হিসেবে ইসলামের ইতিহাসকে গৌরবমÐিত করে রেখেছে। উমাইয়া যুগের বিজয় অভিযানগুলোর মধ্যে তাঁর অসাধারণ কৃতিত্ব-অবদান যুগে যুগে মুসলিম সৈনিকদের অন্তরে অনুপ্রেরণা ও উৎসাহের সঞ্চার করতে থাকবে।
উমাইয়া শাসনের প্রতিষ্ঠাতা হজরত আমীর মোয়াবিয়া (রা.)-এর গোটা যুগটাই রাজনৈতিক দিক থেকে সম্পূর্ণ বিতর্কিত হলেও তাঁর আমলে মুসলিম সা¤্রাজ্যের প্রভূত বিস্তৃতি লাভ করেছিল, তা একটি ঐতিহাসিক সত্য। বিধর্মী বিদ্রোহীদের সাফল্যজনকভাবে দমন করে বিজিত এলাকাগুলোসহ সর্বত্র শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তিনি প্রশংসনীয় ভ‚মিকা পালন করতে একটুও দ্বিধাবোধ করেননি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সামরিক অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রদ্রোহী ও মোনাফেকদের উৎখাত করে আফ্রিকা ও এশিয়ার এক বিরাট এলাকা মুসলিম সা¤্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর এসকল বিজয়ের পেছনে ছিল তাঁরই দুঃসাহসী বীর সেনাদের অবদান।
হজরত আমীর মোয়াবিয়া (রা.)-এর শাসন আমলে তিনি সমগ্র মুসলিম রাষ্ট্রকে দশটি প্রদেশে বিভক্ত করেছিলেন এবং প্রত্যেক প্রদেশের জন্য পৃথক পৃথক শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন। মিসর ও উত্তর আফ্রিকার শাসনকর্তা ছিলেন যথাক্রমে হজরত আমর ইবনে আস ও হজরত ওকবা ইবনে নাফে। উল্লেখযোগ্য যে, তখন আরবগণ নীলনদের নি¤œ উপত্যকায় অবস্থিত মিসর, আধুনিক লিবিয়া ও তিউনিসিয়াকে ‘ইফরিকিয়া’ এবং আধুনিক আলজিরিয়া ও মরক্কোর মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে ‘আল-মাগারেব’ নামে অভিহিত করতেন। হজরত উমর (রা.)-এর মুসলিম বাহিনী সর্বপ্রথম মিসর জয় করে ‘ইফরিকিয়া’ অঞ্চলে প্রবেশ করে। হযরত উসমান (রা.)-এর খেলাফতের সময় সৈন্যগণ বার্কা পর্যন্ত অগ্রসর হয় এবং প্রাচীন কার্থেজের অনতিদূরে বাইজানটাইন শাসক গ্রেগরিয়াসকে পরাজিত করে উত্তর আফ্রিকা দখল করে নেয়। রোমকগণ বার্ষিক কর আদায় করতে সম্মত হলে মুসলিমগণ জাবিলা ও বার্কা ঘাটিতে ক্ষুদ্র সৈন্যদল রেখে দেশে ফিরে আসে। কিন্তু অচিরেই রোমকগণ পরিত্যাক্ত অঞ্চলগুলো পুনর্দখল করে নেয় এবং সেখানে তাদের অত্যাচারে স্থানীয় বার্কার অধিবাসীগণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠে। তারা পাশর্^বর্তী মিসরের শাসনকর্তা আমর ইবনে আসের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। আমর ইবনে আস হজরত আমীর মোয়াবিয়া (রা.) কে এই ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করেন। এই খবর পেয়ে আমীর মোয়াবিয়া (রা.) তাঁর বিশিষ্ট সেনাপতি হজরত ওকবা ইবনে নাফে’র নেতৃত্বে দশ হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী আফ্রিকার দিকে প্রেরণ করেন। এই বাহিনী সকল প্রতিবন্ধকতার অপসারণ করে এই দেশ আরবদের করতলগত করেন।
হিজরী ৫০ সালে ওকবা দুঃসাহসী বার্বারদের দমন ও সমুদ্র পথে রোমকদের অতর্কিত আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য ‘কায়রোওয়ান’ নামক স্থানে এক বিরাট সেনানিবাস প্রতিষ্ঠা করেন। যে সকল রোমক মরক্কো দখল করে রেখেছিল, তারা বার্বারদের সাহায্যার্থে উত্তর আফ্রিকার উপর আক্রমণ চালাত। এসকল হানাদারকে সময়োচিত শিক্ষাদানের জন্য হজরত ওকবা ইবনে নাফে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। কোন প্রতিদ্ব›িদ্বতা ছাড়া তিনি অরক্ষিত একটি শহর দখল করে নেন। শহরবাসী তাঁর আনুগত্য স্বীকার করে। অতঃপর তিনি রোমক অধিকৃত আরও কতিপয় এলাকা দখল করে আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে গিয়ে উপনীত হন।
এই বিশাল সমুদ্র হজরত ওকবার বিজয় যাত্রার পথে এক বিরাট প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। সমুদ্রের তীরে পদার্পণ করে তিনি খুবই নিরাশ হলেন। গতিপথে তিনি সমুদ্রের এই প্রতিবন্ধকতাকেও তুচ্ছ মনে করলেন। সেনাপতি ওকবা তাঁর ঘোড়া আটলান্টিক মহাসাগরে নামিয়ে দিলেন এবং পানি যখন তাঁর গলায় গলায় পৌঁছে, তখন তিনি সমুদ্র থেকে প্রত্যাবর্তন করে সমুদ্রের তীরে অবতরণ করেন। এই সময় তিনি অত্যন্ত নিরাশ হয়ে পড়েন। আল্লাহর দরবারে হাত তুলে মোনাজাত করেন; ‘আল্লাহু আকবর। এই সমুদ্র যদি আমার যাত্রাভিযানে প্রতিবন্ধক না হতো তাহলে আমি আরও দূর দূরান্তের দেশগুলিতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতাম। হে খোদা! তোমার শ্রেষ্ঠত্ব মহিমা তোমার গুণকীর্তণ প্রচার করে চলতাম এবং তোমার দুশমনদের উৎখাত করে সর্বত্র তোমর দীন প্রতিষ্ঠা করতাম।’ এই ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করেই মহাকবি আল্লামা ইকবাল তাঁর ‘শেকওয়া’ এ বলেছেন, ‘দশত তু দশত হেঁ, দরিয়াভী নাছোড়ে হামনে, বাহরে জুলমাত মে, দৌড়াদিয়ে ঘোড়ে হামনে।’
হজরত ওকবার এই সাফল্যজনক সামরিক অভিযান ও বার্বারদের শোচনীয় পরাজয়ের পর ৬৬৯ খ্রিস্টাব্দে তাকে উত্তর আফ্রিকা প্রদেশের শাসনকর্তা নিযুক্ত করা হয়। সেখানে তিনি কায়রোয়ান শহর প্রতিষ্ঠা করে তাকে আফ্রিকার রাজধানী করেন। তাছাড়া সেখানে তিনি একটি জামে মসজিদও কায়েম করেন। কিন্তু বিজিত এলাকাগুলো সুসংহত করার পর রোমক ও বার্বারগণ কায়রোয়ান শহরে যৌথ আক্রমণ চালায়। রাজধানী কায়রোয়ানের একজন বার্বারনেতা ‘কোসাইলা’ মুসলমান হয়েছিল। হজরত ওকবার (রা.)-এর সাথে তিনি বিভিন্ন জেহাদেও অংশগ্রহণ করেছিলেন। কোসাইলা মুসলমানদের সাথে বিশ^াসঘাতকতা ও মোনাফেকি করে রোমকদের সাথে মিলে যান এবং অতর্কিত মুসলমানদের উপর আক্রমণ চালান। তারা সদর মোকাম ঘিরে ফেলে। হজরত ওকবা (রা.) মুসলিম বাহিনীকে নির্দেশ দেন, ‘মৃত্যু অথবা বিজয় এই দুইয়ের মধ্যে তোমাদেরকে একটি বেছে নিতে হবে, কেউ পশ্চাদপসরণ করতে পারবে না।’ এই বলে তিনি শত্রæর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং অত্যন্ত বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে শাহাদত বরণ করেন। মাত্র কয়েকজন মুসলমান ব্যতীত তাঁর প্রায় সকল সঙ্গীকেই এই যুদ্ধে প্রাণ হারাতে হয়। অতঃপর কায়রোয়ান আবার বার্বারদের দখলে চলে যায়। এটি ৬৮২ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা। এর মাত্র সাত বছর পর আফ্রিকা আবার আরবদের দখলে চলে আসে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর