Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ আগস্ট ২০১৯, ০৮ ভাদ্র ১৪২৬, ২১ যিলহজ ১৪৪০ হিজরী।

হেলসিংকিতে ট্রাম্প-পুতিন শীর্ষ বৈঠকে কতটা ঐকমত্য হবে

আল জাজিরা | প্রকাশের সময় : ১০ জুলাই, ২০১৮, ১২:০০ এএম | আপডেট : ১২:১৭ এএম, ১০ জুলাই, ২০১৮

১৬ জুলাই বিশ্বের দুই মহাশক্তিধর রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিন ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকিতে বৈঠকে মিলিত হতে যাচ্ছেন। এদের মধ্যে সিরিয়ার যুদ্ধে সবে আরেকটি বিজয় অর্জন ও ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজন করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে পুতিন বিজয়ীর মুডে আছেন।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট তার দু’টি প্রধান লক্ষ্য রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্ত করা এবং সিরিয়ায় একক ভাগ্যনিয়ন্তা হয়ে উঠতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান বিরোধ এবং ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে প্রতিদ্ব›িদ্বতা জোরদার করে ফায়দা লুটতে চাইবেন।
কিন্তু ট্রাম্পের সাথে চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে পুতিন তার প্রতিপক্ষ ট্রাম্পের বৈধতার জন্য অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ভাবে বৃহত্তম হুমকি। মার্কিন সরকার ও গোয়েন্দা সমাজ ব্যাপক ভাবে বিশ্বাস করে যে ২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনে ক্রেমলিন ট্রাম্পের প্রতি আনুক‚ল্য প্রদর্শন করেছে এবং এ কথিত রুশ হস্তক্ষেপের ব্যাপারে এখনো তদন্ত চলছে।
এই সাথে ট্রাম্প রাশিয়ার আগ্রাসী মনোভাবে ক্রমবর্ধমান ভাবে ক্ষুব্ধ মিত্রদের সাথেও দ্ব›েদ্বর সম্মুখীন হচ্ছেন। তিনি ব্রাসেলসে ন্যাটো শীর্ষ বৈঠকে যোগদান এবং যুক্তরাজ্য সফরের পর পুতিনের সাথে বৈঠকে মিলিত হবেন যা তাদের কাউকেই খুশি করবে না।
পুতিনের সাথে বৈঠকের জন্য হেলসিংকিকে বেছে নেয়া কাকতালীয় ঘটনা নয়। ফিনল্যান্ডের রাজধানী আগেও দু’বার দুই পরাশক্তির নেতাদের বৈঠকের স্থান হয়েছে। ইরাকের কুয়েত অভিযানের একমাস পর ১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডবিøউ বুশ উপসাগর সংকট নিয়ে সোভি?য়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভের সাথে হেলসিংকিতে বৈঠকে মিলিত হন।
বার্লিন দেয়ালের ভাঙ্গসের পর পূর্ব ইউরোপীয় জোটের বিলোপ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের আসন্ন পতনের মুখে গর্বাচেভ দুর্বল অবস্থানে ছিলেন। বুশ ইরাকের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপে তার প্রতিশ্রুতি চাইলেন ও তা পেয়েও গেলেন। বিনিময়ে তিনি গর্বাচেভের সংস্কার পরিকল্পনাকে সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি দেন।
১৯৯৭ সালের মার্চে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণসহ নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বেষয়ে আলোচনার জন্য প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন রুশ প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলতসিনের সাথে হেলসিংকিতে বৈঠক করেন। এ বৈঠকে রুশ প্রেসিডেন্টের হাতে খেলার জন্য কোনো ট্রাম্প কার্ড ছিল না।
রাশিয়ার অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি ঘটছিল সে সময় সরকার চেচনিয়ায় ভীষণ অজনপ্রিয় যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। মার্কিন আর্থিক সহায়তা ও সমর্থনের জরুরি প্রয়োজনে মার্কিন সাহায্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে রাশিয়ার একীকরণের বিনিময়ে ইয়েলতসিন পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর সম্প্রসারণ মেনে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এই বিপর্যয়কর সিদ্ধান্তের জন্য তার বিরোধীরা তাকে মার্কিন পুতুল বলে আখ্যায়িত করেন।
১৬ জুলাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট পুতিনের সাথে বৈঠক করবেন। কিন্তু এ সময় প্রেসিডেন্টদের ভ‚মিকা পরিবর্তিত হয়ে গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট দেশে তার বৈধতার ব্যাপারে ক্রমবর্ধমান সংকটের সম্মুখীন। অন্যদিকে তার রুশ প্রতিপক্ষ অত্যন্ত শক্তিশালী।
২০১৭ সালে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে পুতিনের সাথে এটা হবে তার চতুর্থ বৈঠক। এর আগে তারা গত বছর জুলাইতে জার্মানিতে জি২০ বৈঠকে দু’বার ও গত নভেম্বরে ভিয়েতনামে এশিয়া-প্যাসিফিক অর্থনৈতিক সম্মেলনের (অ্যাপেক) ফাঁকে বৈঠকে মিলিত হন।
পুতিনের সাথে সর্বশেষ বৈঠকের পর ট্রাম্প ঘরোয়া চাপের শিকার হন এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে কয়েক দফা ব্যবস্থা নেন যার মধ্যে রয়েছে ডিসেম্বরে ইউক্রেইনে প্রাণঘাতী অস্ত্র বিক্রয় অনুমোদন, মার্চে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রুশ ক‚টনীতিক বহিষ্কার, সিরিয়ার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা ও এপ্রিলে রুশ কর্মকর্তাদের উপর অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপ।
পুতিন ১ মার্চ উস্কানিমূলক বক্তব্য রেখে পরিস্থিতির অবনতি ঘটান। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অস্ত্র প্রতিযোগিতার প্রকাশ্য হুমকি দেন। এরপর তিনি উত্তপ্ত মার্কিন-ইইউ বাণিজ্য যুদ্ধের এবং ফ্রান্স ও জার্মানির সাথে আলোচনার জন্য ইরানের সাথে পারমাণবিক সংকটের সুযোগ নেন। অন্যদিকে সিরিয়া যুদ্ধের প্রধান উদ্বেগজনক দিক নিয়ে সিরিয়ার সাথে আলোচনা করছেন।
পুতিনের পদক্ষেপ ট্রাম্পকে বৈঠকে বসা এবং তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনকে তার প্রস্তুতির জন্য মস্কোতে পাঠানো ছাড়া আর পথ রাখেনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট পুতিন ও তার অনুবাদকের সঙ্গে একা বৈঠকের পরিকল্পনা করেছেন । তিনি একা কী না কী করে বসেন, তা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
তবে এসব আশংকা সত্তে¡ও বিশেষ কৌঁসুলি রবার্ট মুলার তার তদন্ত চূড়ান্ত করার আগে রুশ-মার্কিন সম্পর্কে প্রকৃত কোনো উন্নতি আশা করা যায় না। রাশিয়ার উপর থেকে অবরোধ তুলে নেয়া, ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্তির বিষয় মেনে নেয়া এবং পূর্ব ইউরোপ থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার- এ সবই হেলসিংকিতে দু’নেতার মধ্যে আলোচনার টেবিলে থাকবে। মার্কিন ঘরোয়া রাজনীতির দ্বারা ট্রাম্পের হাত বাঁধা।
যে একমাত্র বিষয়ে ট্রাম্প রুশ প্রেসিডেন্টকে প্রলুব্ধ করতে পারেন তা হচ্ছে সিরিয়া যুদ্ধ। গর্বাচেভ যেমন ১৯৯০ সালে ইরাককে বুশের হাতে তুলে দেন তেমনি ট্রাম্প পুতিনের কাছে সিরিয়াকে তুলে দেবেন।
এ চুক্তির জন্য পূর্বশর্তগুলো তৈরি। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতম মিত্র ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সাথে হেলসিংকি শীর্ষ বৈঠকের মাত্র পাঁচ দিন আগে ১১ জুলাই পুতিনের বৈঠক হবে। এ বছরে তাদের মধ্যে এটা হবে তৃতীয় বৈঠক।
রাশিয়া ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনা করছে যার উদ্দেশ্য হচ্ছে ইসরাইল অধিকৃত গোলান হাইটসের কাছে কুনেইত্রা প্রদেশে ডেরা ঘটনার পুনরাবৃত্তি করা যায়। ট্রাম্প দক্ষিণপশ্চিম সিরিয়া থেকে ইরানি বাহিনী ও তাদের অনুগত গ্রæপগুলোকে দূরে রাখার বিনিময়ে জর্দান-ইরাকি-সিরিয়া সীমান্ত থেকে মার্কিন সৈন্য অপসারণকে সুন্দর ধারণা বলে মনে করছেন।
ট্রাম্পের লক্ষ্য সিরিয়া নয়। তিনি চ‚ড়ান্তভাবে চান যে ইরান বিষয়ে মার্কিন ক‚টনৈতিক অভিযানের ব্যাপারে পুতিন যেন নিরপেক্ষ থাকেন। হোয়াইট হাউস আশা করছে যে রাশিয়া সউদী আরব ও ওপেকের সাথে প্রাথমিক চুক্তি অনুসরণ করবে এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পুনরায় অবরোধ আরোপের ফলে তেলের ঘাটতি পূরণে নিজের উৎপাদন বৃদ্ধি করবে।
ইতিমধ্যেই মনে হচ্ছে যে বৈঠকের আগেই দু’ নেতার মধ্যে মতৈক্য দৃঢ় হয়েছে । রাশিয়া নীরবে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউর মধ্যকার বিরোধ নিরীক্ষণ করছে । ইইউ দেশগুলো ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি রক্ষা করতে চায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ার সরকার বিরোধী বিদ্রোহী গ্রুপগুলোকে সাহায্যের জন্য কিছুই করেনি।
এ সবের বাইরে এ শীর্ষ বৈঠকে অদূর ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন-মস্কো সম্পর্ক কতটা উন্নত হবে তার ইঙ্গিত পাওয়া যাবে। দু’দেশের মধ্যে কি যোগাযোগের সরাসরি লাইন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে, বিশেষ করে অস্ত্র নিয়ন্ত্রন আলোচনার জন্য?ওয়াশিংটনে রুশ রাষ্ট্রদূত কি মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে অধিকতর প্রবেশাধিকার পাবেন? হেলসিংকি শীর্ষ বৈঠক-উত্তর সময়ে রুশ নীতিতে বাস্তব পরিবর্তন না হলেও মার্কিন সরকার মস্কোর সাথে বিভিন্ন বিষয়ে অধিকতর সাড়া পাবে? এসব ক্ষেত্রের একটি বা একাধিক বিষয়ে যদি পরিবর্তন আসে তবে তা রুশ-মার্কিন সম্পর্কে অধিকতর গতিশীলতা আনতে পারে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ট্রাম্প

২০ আগস্ট, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন