Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ ২০১৯, ০৫ চৈত্র ১৪২৫, ১১ রজব ১৪৪০ হিজরী।

যানজট নিরসনে নেয়া উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে

| প্রকাশের সময় : ১৪ জুলাই, ২০১৮, ১২:০২ এএম

রাজধানীর যানজট নিরসনে যুগের পর যুগ ধরে অনেক পরিকল্পনা নেয়া হলেও তার যথাযথ এবং কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগের অভাব বরাবরই পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। নগরবিদ থেকে শুরু করে সড়ক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞরা বহু পরামর্শ দিয়েছেন এবং এখনও দিচ্ছেন। এ নিয়ে পত্র-পত্রিকায় বহু লেখালেখিও হয়েছে। তাদের পরামর্শ এবং লেখালেখি কোনো কাজে আসছে না। ফলে রাজধানীর যানজট দিন দিন বেড়েই চলেছে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোরও তেমন কোনো মাথাব্যথা আছে বলে প্রতীয়মাণ হয় না। অথচ তুলনামূলক কম খরচে কিছু কিছু উদ্যোগ নিলে বহু উপকার পাওয়া যায়। যেমন রাস্তার গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিংয়ে ইউলুপ, আন্ডারপাস, ওভারপাস-এর মতো কম খরচের উদ্যোগ নিলে যানজট এড়ানো এবং স্মুথ চলাচল করা যায়। রামপুরাস্থ বাংলাদেশ টেলিভিশন সেন্টারের ক্রসিংয়ে একটি ইউলুপ কীভাবে সেখানের যানজট এবং চলাচল অনেকটাই স্বস্তিদায়ক করেছে, তা তার প্রকৃত উদাহরণ। একটি ইউলুপ বনশ্রী, বাড্ডা, রামপুরা এবং হাতিরঝিল এলাকায় যাতায়াত অনেকটাই সহজ করে দিয়েছে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, ইউলুপের যুগান্তকারী এই পরিকল্পনা নিয়েছিলেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মরহুম আনিসুল হক। রামপুরা থেকে একেবারে জয়দেবপুর পর্যন্ত তিনি সাতটির মতো ইউলুপ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। এগুলোর কাজও শুরু হয়েছিল। তবে তিনি তা শেষ করে যেতে পারেননি। তার মৃত্যুর পর এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়নও ঝিমিয়ে পড়ে। আনিসুল হক যানজট নিরসনে আরও বেশ কিছু কার্যকর উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছিলেন। সাত রাস্তার মোড়ে দীর্ঘদিনের ট্রাক স্ট্যান্ড তুলে দিয়ে এবং গাবতলির অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে যানজট অনেকটাই দূর করেছিলেন। দুঃখের বিষয়, তার অন্যান্য পরিকল্পনাগুলো পরবর্তীতে আর গতি পায়নি। ফলে রাজধানীতে দিনের পর দিন যানজট বেড়েই চলেছে।
যানজটে প্রতিদিন এবং বছরে কী পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি এবং কর্মঘন্টা, শারিরীক ও মানসিক ক্ষতি হচ্ছে, তার হিসাব প্রায়ই পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশ বিনিয়োগ বোর্ডেরই এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যানজটের কারণে বছরে কর্মজীবী মানুষের যে পরিমাণ কর্মঘন্টা নষ্ট হয় তার আর্থিক মূল্য ৪৩ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা। উৎপাদন খাতে এ ক্ষতির পরিমাণ ৩০ হাজার ৬৮২ কোটি, স্বাস্থ্যগত ক্ষতি ২১ হাজার ৯১৮ কোটি, জ্বালানি ও মেরামত বাবদ ১ হাজার ৩৯৩ কোটি এবং দুর্ঘটনায় ক্ষতি হয় ১৫৪ কোটি টাকা। প্রতিবেদনে বলা হয়, যানজটের কারণে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি বা জিডিপি’র ক্ষতির পরিমাণ ৭ শতাংশ। বছরের পর বছর এত বড় ক্ষতি নিয়েই আমাদের অর্থনীতি চলছে। অথচ পরিকল্পিতভাবে কিছু ছোট ছোট উদ্যোগ নিলে যানজট যেমন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তেমনি অর্থনীতির এ ক্ষতির পরিমাণও কমানো যায়। অস্বীকার করার উপায় নেই, একটি রাজধানীতে যে পরিমাণ সড়ক থাকা প্রয়োজন, তা ঢাকায় নেই। ২৫ শতাংশের জায়গায় আছে মাত্র ৭ শতাংশ। এ জায়গাটুকুর অনেক অংশ বিভিন্নভাবে দখল হয়ে আছে। আবার বিআরটিএ-এর হিসাবে প্রতিদিন রাস্তায় নামছে প্রায় আড়াইশ’ গাড়ি। এ অবস্থায় যানজট নিরসন দূরে থাক ন্যূনতম নিয়ন্ত্রণও সম্ভব নয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই যানজটের কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগও স্থবির হয়ে পড়ছে। বিনিয়োগকারিরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। দ্রæত ও নিরাপদে যদি চলাচল করা না যায়, তবে আগ্রহ না থাকারই কথা। রাজধানীর সড়কগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে, এখানে কোনো ধরনের নিয়ম-নীতি ও সড়ক ব্যবস্থাপনার বালাই নেই। যে যেভাবে খুশি সেভাবে চলছে। এখানে গাড়ির গতিবেগ ঘন্টায় ৭ কিলোমিটার, অন্যদিকে মানুষের হাঁটার গতিবেগ ৫ কিলোমিটার। অর্থাৎ গাড়ি ও মানুষের গতিবেগ প্রায় সমান হয়ে পড়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, ঢাকা কতটা স্থবির অবস্থার মধ্য দিয়ে চলছে। যানজট নিরসনে সরকারের আগ্রহ বেশি ফ্লাইওভার নির্মাণের প্রতি। অথচ দেখা যাচ্ছে, এ ব্যবস্থাও কোনো সমাধান দিচ্ছে না। ক্ষেত্র বিশেষে যানজট ফ্লাইওভার পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা অনেক আগেই প্রেডিক্ট করেছিলেন, এক সময় ফ্লাইওভারগুলো আকার্যকর হয়ে পড়বে এবং তা কনক্রিটের জঞ্জালে পরিণত হবে। সেটাই এখন সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে। তবে এ যানজট কিছুটা সহনীয় করতে বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিংগুলোতে স্বল্প খরছে, ইউলুপ, আন্ডারপাস, ওভারপাস নির্মাণের পরামর্শ দিয়েছেন। কোথায় কোথায় এবং কোন এলাকায় এগুলো নির্মাণ করতে হবে, তাও নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। যেমন আজিমপুর, নিউ মার্কেট, মিরপুর রোড, ধানমন্ডি ২৭, গাবতলি, মিরপুর, আগারগাঁও, শ্যামলি, বিজয় সরণী, আমিন বাজার, মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়াসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এসব জায়গায় উল্লেখিত পদক্ষেপগুলো নিলে যানজট অনেকটাই সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে।
যেহেতু রাজধানীতে সড়কের পরিমাণ বৃদ্ধি করার কোনো সুযোগ নেই, তাই যতটুকু রয়েছে ততটুকু যদি পরিকল্পিত উপায়ে ইউলুপ, আন্ডারপাস, ওভারপাস নির্মাণ করা যায়, তবে যানজট যে অনেকটাই সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে, তাতে সন্দেহ নেই। যা আছে, তার মধ্যেই সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। কেবল পরিকল্পনা করলে হবে না, তা দ্রæত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া সড়ক ব্যবস্থাপনা এবং যানবাহণের শৃঙ্খলা বিধানে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। মেয়র আনিসুল হক রাজধানীর যাত্রী পরিবহন সংস্থাগুলোকে পাঁচটি কোম্পানির অধীনে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেছিলেন। পরিবহন মালিকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা অনেক দূর এগিয়েও নিয়েছিলেন। তার মৃত্যুতে এ পরিকল্পনাটিও ভেস্তে যায়। বরং আরও বেশি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছে। একদিকে পরিবহন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা, অন্যদিকে বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর যেমন খুশি তেমন খোঁড়াখুঁড়িতে সড়কগুলোর অবস্থা করুণ হয়ে পড়ছে। সড়ক সরু হয়ে যানবাহন চলাচলের জায়গা কমে অসহনীয় যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। একবার সড়ক খোঁড়া হলে তা কবে ঠিক করা হবে, তার কোনো ঠিকঠিকানা থাকে না। তার উপর অনিয়ন্ত্রিত রিক্স, ভ্যান, থ্রি হুইলারের বেপরোয়া চলাচল তো আছেই। মহাসড়কগুলোরও বেহাল দশা এবং সেখানেও কোনো শৃঙ্খলা নেই। ফলে রাজধানীসহ সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা এক প্রকার অচলাবস্থার মধ্য দিয়ে চলছে। এ থেকে কবে নিস্তার পাওয়া যাবে, তা কেউ বলতে পারে না। তবে এ অবস্থা চলতে দেয়া যায় না। সড়ক-মহাসড়ক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাদের পরিকল্পনা এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে অনতিবিলম্বে যানজট ও যাতায়াত ব্যবস্থা সহনীয় পর্যায়ে আনার জন্য কার্যকর উদ্যোগ এবং তার বাস্তবায়ন করতে হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: যানজট

১২ এপ্রিল, ২০১৮

আরও
আরও পড়ুন