Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার ১৬ জুন ২০১৯, ২ আষাঢ় ১৪২৬, ১২ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী।

ফুটপাথে থাকা পরিবারের ঠাঁই পাঁচগাছিতে

কুড়িগ্রাম থেকে শফিকুল ইসলাম বেবু : | প্রকাশের সময় : ১৪ জুলাই, ২০১৮, ১২:০১ এএম

ঢাকায় ওভারব্রীজে আশ্রয় নেয়া অসুস্থ্য মা, তার স্বামী ও সন্তানদের অবশেষে ঠাঁই হলো কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পাঁচগাছি ইউনিয়নে। জেলা প্রশাসক মোছা: সুলতানা পারভীনের ব্যক্তিগত উদ্যোগে গতকাল শুক্রবার সকাল সোয়া ১০টায় পরিবারটিকে সদর ইউএনও আমিন আল পারভেজ, এনডিসি সুদীপ্ত কুমার সিংহ এবং কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতি অ্যাড. আহসান হাবীব নীলু তাদেরকে পাঁচগাছিতে নিয়ে যান।
এর আগে রাতের কোচে ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেন ঢাকাস্থ কুড়িগ্রাম সমিতির মহাসচিব সাদুল আবেদীন ডলার। সকাল সাড়ে ৭টায় পরিবারটি কুড়িগ্রাম শহরে পৌঁছলে তাদেরকে কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবে নিয়ে আসা হয়। এখানে নিজের জীবনের কথা শোনান ফরিদা বেগম (৪০) ও তার স্বামী আনছার আলী (৬০)। জেলার উলিপুর উপজেলার প্রত্যন্ত বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের ইসলামপুর মৌজার মরাকাটি গ্রামে বাড়ি ছিল ফরিদার স্বামী আনছার আলীর। ছিল ২ একর ধানি জমি। দুধের ব্যবসা করে ভালই চলছিল পরিবারটি। চরের মধ্যে প্রতিদিন ২ মণ করে দুধ সংগ্রহ করে ১৫ কিলোমিটার সাইকেল মাড়িয়ে কুড়িগ্রাম শহরে হোটেলগুলোতে দুধ সরবরাহ করত সে। এভাবেই চলছিল তাদের সংসার। কিন্তু ব্রহ্মপুত্র নদের করাল গ্রাসে ২০১৬ সালে একমাসের মধ্যে বাড়ি-ঘর, আবাদি জমি গ্রাস করে ফেলে। গৃহহীন হয়ে পরে পরিবারটি। তাদের সাথে দেড়শ পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে ফেলে। শেষে আশ্রয় মেলে ইসলামপুরে জ্যাঠাত ভাইয়ের গোয়ালঘরে। সেখানে একমাস থাকার পর ঢাকায় চলে আসে পরিবারটি।
ফরিদা বেগম জানান, ‘বাবারে অনেক কষ্টের জীবন মোর। জন্মিয়া শোনং মোর বাপ জন্মের আগোত মরি গেইছে। জন্মের ৭দিনের মাথাত মোর মাও বলে মরি যায়। বাপ-মা মরা এতিম ছওয়ার কাঁইয়ো দায়ভার নেয় নাই।’ এই হলো ভাঙন কবলিত আনছার আলী আর ফরিদা বেগমের জীবন কাহিনী। অভাব-অনটন আর মাথা গোজার ঠাঁই না পেয়ে তারা নভেম্বর মাসে ঢাকায় পাড়ি দেয়। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে শেষে আশ্রয় নেয় কলাবাগান ওভারব্রীজের নীচে পলিথিন বিছিয়ে। এখানে ধানমন্ডি ক্লাবে দারোয়ান জামালের সহযোগিতায় মাঠের পাতা কুড়ার কাজ করে দিনে আয় হয় ২শ’ থেকে আড়াইশত টাকা। মাঝখানে কাজটাও বন্ধ হযে যায়। এসময় প্রায় না খেয়ে থাকতে হচ্ছিল পরিবারটিকে। সন্তানদের দু:খ-কষ্ট সহ্য করতে না পেরে অসুস্থ্য শরীর নিয়ে নিজেই ভিক্ষাবৃত্তি করতে বেড়িয়ে পরেন ফরিদা বেগম।
ফরিদা বেগম জানান, ‘ঘটনার দিন দু’সন্তানকে নিয়ে কলাবাগান থেকে ল্যাব এইডের দিকে ভিক্ষা করতে বের হন। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় চোখমুখ আন্ধার দেখি সেটেই উল্টি পড়ং। বড় বেটি মোক ধরি থাকে। আর ছোট বেটা মাথাত পানি ঢালে। তারপর কি হইল কাই জানে। মোক পরদিনোত লোকজন হাসপাতালোত নিয়ে যায়।’
ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া কুড়িগ্রামের এই পরিবারটির ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেন জেলা প্রশাসক মোছা: সুলতানা পারভীন। সন্তানসহ পুরো পরিবারটি কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবে আসলে তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ঔষধপত্র দেন সিভিল সার্জন ডা: এসএম আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি মেডিকেল টিম। এ সময় প্রাথমিকভাবে পরিবারটির খাবারের জন্য প্রয়োজনীয় চাল, ডাল, তেল, লবণসহ সমস্ত উপকরণ সরবরাহ করেন কুড়িগ্রাম গণকমিটির সভাপতি তাজুল ইসলাম। গণকমিটির সভাপতি তাজুল ইসলাম বলেন, আমাদের ১২টি দাবির সাথে সকল ভূমিহীনদের পুনর্বাসন চাই দাবিটি সংযুক্ত করছি।
কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতি এড. আহসান হাবীব নীলু জানান, বন্যা আর নদী ভাঙনে প্রতিবছর শত শত পরিবার বাড়িভিটা হারাচ্ছে। এসব মানুষদের পুনর্বাসন করা জরুরি। সিভিল সার্জন জানান, নিয়মিত খাদ্য আর পুষ্টির অভাবে পুরো পরিবারটি স্বাস্থ্যহীনতায় ভুগছে। খাবার ও প্রযোজনীয় ঔষধপত্র পেলে আস্তে আস্থে সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমিন আল পারভেজ জানান, জেলা প্রশাসনের নির্দেশে উপজেলা প্রশাসন এ পরিবারটিকে অস্থায়ীভাবে আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মোছা: সুলতানা পারভীন জানান, সরকার প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের সকলের উচিৎ সরকারের এ কাজে সহযোগিতার হাত বাড়ানো। অসহায় ফরিদার পরিবারকে জমিসহ স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করে দেয়া হবে। একই সাথে দেয়া হবে কর্মসংস্থানের সুযোগ।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ফুটপাথ

৮ মার্চ, ২০১৯
১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯
২০ জানুয়ারি, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ