Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৭ আশ্বিন ১৪২৫, ১১ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

নিজ ক্যাডারের হাতেই খুন বাড্ডা আ.লীগের ফরহাদ

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ১৬ জুলাই, ২০১৮, ১২:০৩ এএম

রাজধানীর বাড্ডা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ আলী হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। বিদেশে থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসীর নির্দেশ আসার পর তার ক্যাডাররা ফরহাদকে হত্যা করে। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, অটোরিকশা স্ট্যান্ড ও ডিশ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চাঁদার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়েই সৃষ্ট বিরোধ থেকেই ফরহাদকে সরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বাড্ডার শীর্ষ সন্ত্রাসী মেহেদী।
গতকাল শনিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার মো. আব্দুল বাতেন আওয়ামী লীগ নেতা ফরহাদ হত্যায় জড়িত ৫ ভাড়াটে খুনিকে গ্রেফতার করার তথ্য জানান। তিনি ওইসব তথ্য জানিয়ে গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে ৪টি বিদেশি পিস্তল, ৪টি ম্যাগাজিনসহ ১২ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করার কথা জানান।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ফরহাদকে হত্যার সাথে জড়িত তারই দুই শিষ্য রমজান ও জাকির। ফরহাদ আলীর বাড়ি বাড্ডার সাঁতারকুল এলাকার ২১৩, শেখ পিরু সরণীতে। এই বাড়ির পাশাপাশি দুইটি বাড়িতে থাকেন রমজান ও জাকির। ফরহাদের বাসায় তাদের যাতায়াত ছিল। এক পর্যায়ে ফরহাদ পরিবার নিয়ে বাড্ডার আলীর মোড়ে মদিনা ম্যানশনে চলে যান। এর পরই গত ১৫ জুন জুম্মার নামাজ আদায় শেষে মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর দুর্বৃত্তদের গুলিতে ফরহাদ খুন হন।
এ ঘটনায় গত ৪ জুলাই বাড্ডা এলাকায় গোয়েন্দা পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নুরুল ইসলাম ও অমিত নামে দু’জন নিহত হয়। গত শুক্রবার রাতে গোয়েন্দা পুলিশ রাজধানীর গুলশান ও শাহ আলী এলাকায় অভিযান চালিয়ে জাকির হোসেন, আরিফ মিয়া, আবুল কালাম আজাদ ওরফে অনির, বদরুল হুদা ওরফে সৌরভ ও বিল্লাল হোসেন ওরফে রনি নামে পাঁচজনকে গ্রেফতার করে।
গ্রেফতার পাঁচজনের মধ্যে জাকির ও আরিফ বাড্ডায় বহুল আলোচিত চার খুনের পলাতক আসামি। ২০১৫ সালের ১৩ আগস্ট বাড্ডার আদর্শনগরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান গামাসহ চার আওয়ামী লীগ নেতা খুন হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ঘটনার দিন সকালে উত্তর বাড্ডার সুবাস্তু টাওয়ারের সামনে একত্রিত হয় অমিত, নুর ইসলাম, অনির, সৌরভ ও সাদ। অমিতের নির্দেশে নূর ইসলাম, অনির ও সৌরভ মূল কিলিং মিশনে অংশ নেয়। তাদের পেছনে সাদকে নিয়ে আলাদাভাবে অবস্থান নেয় অমিত। এরপর দুপুর ১২টার দিকে রমজানের ছোট ভাই সুজন কিলিং মিশনে অংশগ্রহণকারী তিনজন শ্যুটার ও ব্যাকআপ সাদকে জাকিরের সঙ্গে অস্ত্র বহনের জন্য একটা রিকশা গ্যারেজে পাঠায়। চারজনকেই অস্ত্র বুঝিয়ে দেয় শীর্ষ সন্ত্রাসী মেহেদীর অন্যতম আস্থাভাজন পুলক ওরফে পলক। এরপর জাকির তাদের নিয়ে আরিফের কাছে পৌঁছে দেয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী আরিফ শ্যুটারদের মসজিদের কাছে নিয়ে গিয়ে বাইরে থেকে টার্গেট ফরহাদকে চিনিয়ে দেয়। নামাজ শেষে ফরহাদ মসজিদ থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই শ্যুটাররা প্রকাশ্যে উপর্যপুরি গুলি বর্ষণ করে পালিয়ে যায়। তারা পালানোর সময় পুলিশ চেকপোস্ট লক্ষ্য করেও গুলি করে। পরে শ্যুটাররা তাদের অস্ত্রগুলো পল্লবীতে শীর্ষ সন্ত্রাসী মেহেদীর সামরিক কমান্ডার অমিতের কাছে বুঝিয়ে দেয়। সেখানে অমিত ও রমজানের ভাই সুজন অস্ত্রগুলো গ্রহণ করে এবং শ্যুটারদের মধ্যে ১ লাখ টাকা ভাগ করে দেয়। হত্যাকান্ডের পরপরই দেশ ত্যাগ করে রমজান ও তার ভাই সুজন।
অপরদিকে, গত বছরের ২৬ জুলাই উত্তর বাড্ডা এলাকা থেকে পুলিশ রমজানকে ৭০টি ইয়াবাসহ গ্রেফতার করে। রমজান গ্রেফতারের পরপর তাকে থানা থেকে ছাড়িয়ে নিতে তদবির করেন ফরহাদ আলী। এ ব্যাপারে গতকাল কদমতলী থানার ওসি এম এ জলিল বলেন, আমি ওই সময় শীর্ষ সন্ত্রাসী রমজানকে গ্রেফতার করেছিলাম। ঘটনার দিন রাতে ফরহাদ আলী থানায় এসে তাকে ছেড়ে দেয়ার অনুরোধ করেছিলেন। ফরহাদ আলী পুলিশকে জানিয়েছিলেন, রমজান তার দলের লোক। তার আত্মীয়ও বটে। কিন্তু পুলিশ রমজানকে ইয়াবা মামলায় দুই দিনের রিমান্ডে নেয়। এরই মধ্যে বাড্ডা থানা থেকে জানানো হয় যে রমজান চার খুনের মামলায় বাদীর নারাজি পিটিশন দেয়া আসামি। চার খুনের মামলাটি তদন্ত করছেন সিআইডির পরিদর্শক জিয়াউর রহমান। তিনি ওই মামলায় রমজানকে রিমান্ডে নিতে গেলেই ওপর থেকে চাপ দেয়া হয়। গতকাল জিয়াউর রহমান বলেন, চার খুনের মামলাটি এখন আমার কাছে তদন্তের দায়িত্ব নেই। অন্য কর্মকর্তা এই মামলাটি তদন্ত করছেন।
গোয়েন্দারা আরো জানান, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, কাঁচাবাজার নিয়ন্ত্রণ ও ডিশ ব্যবসায় চাঁদাবাজির টাকার ভাগ-বাটোয়ারার জেরেই বাড্ডায় একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী মেহেদী ও মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত ডালিম-রবিন এই দুই গ্রুপের পরিকল্পনায় এসব খুন ভাড়াটিয়া কিলার বাহিনী দিয়ে ঘটানো হচ্ছে। বাড্ডা এলাকার চাঁদাবাজির দুইটি অংশ যুক্তরাষ্ট্র ও মালয়েশিয়ায় চলে যায়।
ডিবির যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেন জানান, গ্রেফতারকৃত ৫ জন জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে যে তারা আরও এক ব্যবসায়ীকে খুনের পরিকল্পনা করেছিল। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে ওই ব্যবসায়ীর নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। তার নিরাপত্তায় সব ধরনের ব্যস্থা নেয়া হয়েছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ