Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৫, ১৪ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

রাসূলুল্লাহ (সাঃ)’র যুগে সরকারী পদ

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান | প্রকাশের সময় : ২০ জুলাই, ২০১৮, ১২:০৪ এএম

সরকারী পদ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের যথাযথ ব্যবহার এশটি রাষ্ট্রের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান উপাদান। সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ওপর রাষ্ট্র পরিচালনার ভার থাকে বিধায় তাদের মধ্যে স্বচ্ছতা, দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহিতা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। মহানবী (সাঃ) সরকারি পদ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার শিক্ষা দিয়েছেন।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর শিক্ষা ও জীবন চরিতকে সকল মানুষের জন্য উত্তম আর্দশ হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। জীবনের প্রতিটি শাখায় সীরাতে নবনীর মৌলিক নির্দেশনা বর্তমান রয়েছে। যা সকল যুগের দাবী ও চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যর্পূণ হওয়ার স্থান, কাল ও পাত্র ভেদে সর্ব যুগে ও সকল সমাজে এর প্রয়োগ সম্ভব। মানব সমাজের উত্থান-পতন,পরিবর্তন-পরিবর্ধনের মধ্যেও সীরাতে নববী মানব জীবনের প্রতিটি ও ক্ষেত্রে পরির্পূণ প্রতাপ ও প্রভাবের সাথে মানবতাকে তার আলোকময় নির্দেশনা পৌছে দিচ্ছে। এ প্রবন্ধে আমরা সরকারি পদ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের বন্টন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের জন্য একান্ত অনুসরণীয় রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর অনুপম শিক্ষা ও নির্দেশনাসমূহ আলোচনার প্রয়াস পাবো।
মহান আল্লাহ তার রাসূল (সাঃ) সম্পর্কে বলেন ঃ নিশ্চয় তোমাদের জন্যে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর জীবনে উত্তম আদর্শ রয়েছে, এমন ব্যক্তির জন্য, যে আল্লাহ ও আখেরাত দিবসের প্রতি ঈমান রাখে এবং আল্লাহকে বেশি পরিমাণে স্মরণ করে। মুফাসসিরগণের মতে, এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে পঞ্চম হিজরীতে আহযাব যুদ্ধের সময়। এর তাফসীরে হাফিয ইবনে কাছীর বলেন, আয়াতটি রাসূলে কারীম (সাঃ) এর উত্তম আর্দশ অনুসরণের মৌলিক নীতি। তার কথা ও কাজ সকল মানুষের জন্য উত্তম নমুনা। এ কারণেই মহান আল্লাহ আহযাব যুদ্ধ কালীন সময়ে রাসূলে কারীম (সাঃ) এর ধৈর্য্য ও অবিচলতা প্রদর্শন, জিহাদের প্রস্তুতি, কষ্ট স্বীকার এবং আল্লাহ তা‘আলার কাছে সাহায্য ও বিজয় প্রার্থনা ইত্যাদি বিষয়কে আমাদের জন্যে উত্তম আর্দমরুপে সাব্যস্ত করেছেন।
মোটকথা, এ আয়াতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর শিক্ষা ও জীবন চরিতকে সকল মানুষের জন্য উত্তম আর্দশ হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। জীবনের প্রতিটি শাখায় সীরাতে নবনীর মৌলিক নির্দেশনা বর্তমান রয়েছে। যা সকল যুগের দাবী ও চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যর্পূণ হওয়ার স্থান, কাল ও পাত্র ভেদে সর্ব যুগে ও সকল সমাজে এর প্রয়োগ সম্ভব। মানব সমাজের উত্থান-পতন,পরিবর্তন-পরিবর্ধনের মধ্যেও সীরাতে নববী মানব জীবনের প্রতিটি ও ক্ষেত্রে পরির্পূণ প্রতাপ ও প্রভাবের সাথে মানবতাকে তার আলোকময় নির্দেশনা পৌছে দিচ্ছে।
ইসলাম পদ ও সম্পদ সংক্রান্ত যে ধারণা পেশ করেছে তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, জবাবদিহিতা। রাষ্ট্রপ্রধানের অন্যতম কর্তব্য হলো, নিজ দায়িত্বাধীনদের তদারকি করে তাদের ত্রæটি ও মন্দকর্মের জন্যে কৈফিয়ত তলব করা। অবশ্য ইসলামের প্রকৃত দাবি হলো, ব্যক্তি নিজ অবস্থা ও কর্ম সম্পর্কে নিজেই পরিপূর্ণ হিসাব করবে। এর মাধ্যমে সে মূলত মহান প্রভুর দরবারে উপস্থিত হয়ে হিসাব দেয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। আল্লাহ বলেন: সাবধান! যাবতীয় কতৃর্ত্ব কেবল তারই, আর তিনি দ্রæত হিসাব গ্রহণকারী।
অতএব সরকারি দায়িত্বশীলদেরকে অবশ্যই এ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, তাদেরকে আল্লাহর দরবারে হিসাবের মুখোমুখি হতে হবে।সাথে সাথে রাষ্ট্রপ্রধান এমনকি সাধারণ জনগণও এ ব্যাপারে জবাবদিহিতা গ্রহণ করতে পারে।তবে এর অর্থ যথেচ্ছা আচরণ করার অধিকার প্রদান নয়। আবু ফিরাস হারিছা(রাঃ) বর্ণনা করেন, একবার উমার(রাঃ) নিজ বক্তব্যে বলেন: আমি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের এ জন্য নিযুক্ত করিনি যে, তারা বিনা কারণে তোমাদেরকে প্রহার করবে ও অন্যায়ভাবে তোমাদের সম্পদ নিয়ে যাবে।যার প্রতি এই জুলুম করা হবে, সে যেন এর সংবাদ নিয়ে আমার কাছে আসে, যাতে আমি ঐ পদাধিকারী বা বিচারক থেকে বদলা নেয়ার ব্যবস্থা করতে পারি। আমর বিন আস (রাঃ) বলেন, যদি কোন কর্মকর্তা নিজের কতৃত্বাধীন কোন ব্যক্তিকে শিক্ষামূলক শাস্তি প্রদান করে তাহলেও কি আপনি তার কাছ থেকে বদলা নেয়ার ব্যবস্থা করবেন? তখন উমার (রাঃ) বললেন, হ্যাঁ, আল্লাহর শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! আমি অবশ্যই বদলা নেয়ার ব্যবস্থা করব। এর কারণ হলো আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে নিজের কাছ থেকে বদলা নিতে দেখেছি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর যুগে বিচার ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে বিশেষ কোন পার্থক্য ছিলো না। উমার (রাঃ)এ দুই বিভগকে সর্ম্পূণ পৃথক করেন। যার ভিত্তিতে রাষ্ট্রের সর্বস্তরের কর্মকর্তা কর্মচারী সুচারুরুপে নিজ দায়িত্ব আঞ্জাম দেয়ার ব্যাপারে আদালতের সামনে জবাব দিতে বাধ্য হন।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর যুগে সব বিষয় ও সমস্যার সমাধানে তিনি ছিলেন মূল কেন্দ্র। তিনি মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্রের যে রুপরেখা পেশ করেন, তাতে বর্তমানের মত নিয়মতান্ত্রিক অফিস, দারোয়ান ও রাষ্ট্রীয় আইন ছিলো না। বরং তিনি ইসলামী রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিমালা প্রদান করেন। তিনি শাসক ও শাসিতের সম্পর্ক, শাসক ও জনগণের অধিকার, মুসলিম ও অমুসলিমদের অধিকার নির্ধারণ করেন। যদিও বাহ্যত মদীনা রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা ছিলো অতি সাধারণ, তথাপি গভীরভাবে মনোযোগ দিলে বুঝা যায়, এ রাষ্ট্রের মৌলিক তিনটি গুরুত্বর্পূণ শাখা ছিলো- ১. নির্বাহী ২. আইন প্রণয়ন ৩.বিচার বিভাগ।
এই তিনটি শাখা মদীনা রাষ্ট্রে কার্যকরভাবে সক্রিয় ছিলো; যদিও তার কাঠামো বর্তমান সময়ের মত ছিল না। যেহেতু তখন সব সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন আল্লাহ এবং তার রাসূলুল্লাহ (সাঃ), তাই নির্বাহী পরিষদের স্বরুপ তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর খেলাফত ব্যবস্থার আকারে বিদ্যমান ছিল। খলীফার এ সম্মানিত পদ আল্লাহ তাআলা তার নবীকে দান করেছিলেন। রাষ্ট্রীয় বিষয়দি পরিচালনার জন্যে তিনি একেক জনকে একেক পদ দিয়েছিলেন। নির্বাহী পরিষদের গুরুত্বর্পূণ দায়িত্বগুলো ছিল, গভর্নর, সেনাপতি, কাতিববৃন্দ ও সেক্রেটারি। ‘সারায়া’(যুদ্ধ) পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ৭৪ জন ব্যক্তি। যেমন তিনি হামযা বিন আবদুল মুত্তালিব (রাঃ) কে সীফুল বাহর ( সমুদ্র উপকুলের ) যুদ্ধে আমীর নিযুক্ত করেছিলেন। মুআয বিন জাবাল (রাঃ) কে ইয়ামানের গর্ভনর নিযুক্ত করেছিলেন।নির্বাহী পরিষদের দায়িত্বের মধ্যে আরো ছিল অঞ্চলভিত্তিক শাসক রাষ্ট্রদূত। যেমন ইমাম বুখারী তার সহীহ-তে এই শিরোনামে অধ্যায় রচনা করেছেন: নবী (সাঃ) একের পর এক শাসক ও দূত পাঠাতেন।নির্বাহী বিভাগের অধীনে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক বিভাগ হলেঅ বায়তুল মাল। বায়তুল মালে যাকাত সংগ্রহকারী, উৎপন্ন ফসলের যাকাতের পরিমাণ নির্ণায়ক ও কর্মকর্তা ইত্যাদি পদ ছিল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) একদিকে যেমন দ্বীনের প্রতি আহŸানকারী ছিলেন, আবার রাষ্ট্রপ্রধানও ছিলেন। তিনি ইসলামের দাওয়াত ও ব্যবস্থাপনাগত বিষয় পরিচালনার জন্যে চিঠি ও দোভাষী পাঠাতেন। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী (সাঃ) দিহয়া কালবী(রাঃ) কে চিঠিসহ বুসরার শাসকের কাছে পাঠিয়েছেন যেন তিনি তা রোমের স¤্রাট কায়সারের কাছে পৌছান। এছাড়াও নির্বাহী পরিষদে আরও কিছু পদ ছিল। যেমন যুদ্ধলব্ধ ও প্রোথিত সম্পদে রাষ্টের প্রাপ্য একপঞ্চমাংশ সম্পদের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, টহল বাহিনী, অস্ত্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত, স্থানীয় ব্যবস্থাপক, শিক্ষক, মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিন এবং হজ্জের দায়িত্বে নিযুক্ত কর্মকর্তা। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর যুগে আইন প্রণয়ন বিভাগের কার্যকর ছিল। সে সময়ে অধিকাংশ বিষয়ের সমাধান অহীর মাধ্যমে হত। কিছু কিছু ক্ষেত্রে নবী করীম (সাঃ) মজলিসে শুরা আহŸান করে পরামর্শ করার মাধ্যমেও ফয়সালা দিতেন। যেমন বদর যুদ্ধে বন্দীদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সাহাবায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ করেন।
উক্ত পরামর্শ সভার কিছু সাহাবী উপদেষ্টা এবং মন্ত্রীর পদে উত্তীর্ণ ছিলেন। আইন প্রণয়ন বিভাগের অধীন দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে সেক্রেটারী বা কাতিবের পদ। নুকূশ পত্রিকার রাসূল সংখ্যায় কাতিবীনদের সংখ্যা ৪৩ জন পর্যন্ত গুনা করা হয়েছে। কাতেববৃন্দ (লেখক) পুরো মানবজাতির জধবন- বিধান পবিত্র কুরআন অবতীর্ণের সাথে সাথেই লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। আর কিছু সাহাবী রাসূলে আকরাম (সাঃ) এর চুক্তিনামা ও চিঠিপত্র লেখার দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। মদীনা রাষ্ট্রের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ হলো বিচার বিভাগ।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর