Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৭ আশ্বিন ১৪২৫, ১১ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

মানবতার কবি আল মাহমুদ

সা হে দ বি প্ল ব | প্রকাশের সময় : ২০ জুলাই, ২০১৮, ১২:০৩ এএম

 

আল মাহমুদ গ্রাম আর আধুনিক নগরকে যেমনভাবে সেতুবন্ধন করতে পেরেছেন এমনটি আমাদের বাংলা সাহিত্যে আর তেমন কেউ করতে পারেনি। যদি আরও একটু এগিয়ে বলি তাহলে পঞ্চাশের দশকের যে ক’জন কবি শেষ পর্যন্ত সাহিত্য হাল ধরে রাখতে পেরেছেন, তাদের চেয়ে আল মাহমুদের হাত দিয়ে বেশ কিছু কালজয়ী লেখা এসেছে, তার প্রমাণ ‘সোনালি কাবিল’ আমাদের বাংলা সাহিত্যের অমর সোনেট, আল মাহমুদকে কেউ কেউ পছন্দ করে না, সেটা ভিন্ন ব্যাপার কিন্তু তার লেখা নিয়ে খুব একটা বিতর্ক নেই আমাদের বাংলা সাহিত্য।
৯৪ সালের দিকে সবে মাত্র ঢাকা গিয়েছি বড় লেখক হবার স্বপ্ন নিয়ে, যেখানে সাহিত্যের গন্ধ পেয়েছি ছুটেছি সেখানে, ইত্তেফাক, জনকণ্ঠ, আজকের কাগজ, দৈনিক বাংলা, দৈনিক সংগ্রাম, দৈনিক সংবাদ এমন কোনো দৈনিক পত্রিকা অফিস ছিলো না সেখানেই ছুটেছি।
মাঝে মাঝে দৈনিক সংগ্রামে লেখা জমা দিতে গেলে আল মাহমুদের সাথে দেখা হতো, আমি শুধু সালাম এমনকি কেমন আছেন এই বলে ইতি টেনেছি, একদিন হঠাৎ আমাকে ডেকে বলে, বসো কি নাম তোমার।
যাযাবর বিপ্লব, অনেক বার নামটা পরিবর্তন করে এখন এই নামে লেখছি,আমার
কথাটা শুনে আল মাহমুদ বেশ কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে, বলে তুমি
সেই ছেলে! এইভাবে নাম পরিবর্তন করলে কিভাবে চলবে বলো? আগে তো বিপ্লব উজ্জামান বাকী নামে লেখেছো!
এই কথা শুনে আমি তো অবাক, আমার নিয়ে অনেক খবর তার কাছে আছে, তুমি কবি হলে তোমাকে এই সমাজের ভেতর চলবে হবে, তুমি যেভাবে ভাবছো, পৃথিবীর মানুষ সেইভাবে না, এখনও সময় আছে নামটা পরিবর্তন করে লেখ, অন্য টেবিলে বসে দেখলাম সংগ্রামের সম্পাদক মাথা ঝুলিয়ে সায় দিচ্ছে, তোমার লেখা অনেক পড়েছি, প্রতিদিন দৈনিক পত্রিকায় তোমার লেখা থাকে, এতো লেখা কিভাবে লেখ?
আমি একটু হাসলাম কিন্তু মুখে কিছু বললাম না, তোমার লেখার ভেতর বিদ্রোহী বিদ্রোহী ভাব আছে, এই জন্য মনে হয় বিপ্লব রেখেছো কিন্তু বিদ্রোহীরা তো কোনো দিন যাযাবর হয় না, তুমি নামটা পরিবর্তন করে নিতে পারো এখন অনেক সময় আছে।
আমি কিছু বলছি না, দেখলাম আল মাহমুদ কাগজের উপর বেশ কিছু নাম লেখছে, তার পর এক সময় বলে আজ থেকে সাহেদ বিপ্লব নামে লেখবে, নাম বড় হলে পাঠক মনে রাখতে পারে না, তার পর অনেক কথা হলো, এক সময় ফিরে এলাম সংগ্রাম অফিস থেকে, তার পর থেকে সাহেদ বিপ্লব নামে লেখছি।
একদিন আমি মহিউদ্দীন আকবর, আহমেদ কায়ছার, গোলাম নবী পান্না আরও কিছু কবি এই মুহূর্তে সবার নাম মনে পরছে না, আমরা গিয়েছিলাম মহিউদ্দীন আকবার ভাই ছড়া উৎসব করবে, আল মাহমুদ থাককে প্রধান অতিথি।
অনেক কথা হলো, এক সময় আল মাহমুদ বলে কায়সার ভাইকে আপনার লেখা ‘পাগল মনরে মন কেনো এতো কথা বলে’ আমাকে অনেক আনন্দ দিয়েছে, আমি ভাবতে পারিনি এতো বড় মাপের কবি, এতো সরল সহজ মানুষ হলো কি ভাবে, এতো সুন্দর মনের মানুষ বাংলা সাহিত্যে খুব একটা বেশি নেই।
মাঝে মাঝে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ অফিসে গিয়ে দেখা করতাম। আল মাহমুদ ভাই তখন দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকা অফিসে বসতেন, সেটা ১৯৯৭-৯৯ সালের কথা বলছি, সাহিত্যের এটা সেটা নিয়ে কথা হতো একে বারে খোলা মেলা ভাবে হতো, আমি আর আরিফ নজরুল একবার ভেবে ছিলাম আল মাহমুদ ভাইকে নিয়ে বড় একটা কিছু করবো কিন্তু আমি হঠাৎ করে বিদেশ চলে আসার কারণে আর কিছু হয়ে উঠলো না।
সংগ্রাম পত্রিকা অফিসে কি সব কথা হতো সেই কথা তুলে ধরলেন তাঁর বক্তব্যের ভেতর দিয়ে। কবি আল মাহমুদ তার বক্তব্যে বললেন, এই কণিষ্ঠ কবি (আমাকে উদ্দেশ্য করে) বিদেশ গিয়ে মানুষ সারাদিন কাজ করে, বাংলা সাহিত্যের থেকে অনেক দূরে তারপর সে যে লিখছে এই জন্য আমি সাহেদ বিপ্লবকে ধন্যবাদ না দিয়ে পারি না।
আমি দুবাই গিয়েছি এবং দেখেছি দুবাইতে বাংলাদেশের মানুষ কত কষ্টে থাকে তার ভেতর সে যে লিখছে তাই বা কম কিসের।
আল মাহমুদ বলেছেন, বাংলা সাহিত্যের কবি খ্যাতি খুব একটা কপালে জোটে না সবার। কেনো না আমাদের দেশের মানুষ কবিতা তেমন একটা পড়ে না, আমি মনে করি আল মাহমুদ উপন্যাসিক হিসেবে সফল। তাঁর লেখা ‘কাবিলের বোন’ উপন্যাস আমাকে বার বার কাছে টানে, আমার কাছে মনে হয় তার লেখা ‘কাবিলের বোন’ উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের উপর একটা শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। আমি বিদেশে আসার আগে পর্যন্ত উর্দু জানতাম না। সেই সময় উর্দু কথা বুঝতে পারিনি, এখন যখন বুঝতে পেরেছি আল মাহমুদ কত সুন্দর করে উর্দু বলতে পারেন। নায়িকা রোকছানা কাবিলকে তার মনের কথাগুলো বলে লজ্জায় ঘাসের উপর বসে পরেছিলো কিছু বাংলা কিছু উর্দু মিলে কথা বলে।
আমি একদিন ফোন করে জানিয়ে ছিলাম আপনার প্রকাশিত কিছু নতুন বই পাঠিয়ে দিবেন, আমার বিদেশ ঠিকানায় কিছু দিন পর দেখলাম ডাক পিয়ন আল মাহমুদের কিছু নতুন বই দিয়ে গেলো, এই তো কবির প্রতি কবির ভালোবাসা, এই ভালোবাসার তুলো না হতে পারে না, মানসুর মুজাম্মিল, আরিফ নজরুল, মঈন মুরসালিন, সানজিত নিশান চৌধুরী, অঞ্চন শরীফসহ আরও অনেক ঢাকার কবি বন্ধু আমার কাছে বই পাঠিয়ে ঢাকা সাহিত্যে খবর জানিয়ে দিয়েছে, তাদেরকে ধন্যবাদ জানার ভাষা আমার জানা নেই।
আল মাহমুদ মাটি আর মানুষের কবি এমন কি সমকালীন বাংলা কবিতার অগ্রকবিদের অন্যতম এই কথা বলতে আমার একটু দ্বিধা নেই, তার হাত দিয়ে অনেক ভালো কবিতা এসেছে সোনালি কাবিল মধ্যদিয়ে কাব্যশক্তি দেখিয়েছে, তার মত আর কেউ দেখাতে পারেনি।
আমি মনে করি আল মাহমুদ নোবেল পাবার মত কবি, তার লেখা সে দাবি রাখে কিন্তু আমার কাছে মনে হয় নোবেল কমিটি বার বার ভুল করেছে আল মাহমুদকে নোবেন না দিয়ে, ১৯১৩ সালে রবি ঠাকুরের পর বাংলা সাহিত্যের আর নোবেল আসেনি, তবে আমি এই কথা বলতে একেবারে রাজি না যে রবি ঠাকুরের পর আর নোবেল পাবার মত বাংলা সাহিতিক জন্ম হয়নি তা কিন্তু নয়, অনেক হয়েছে কিন্তু কেনো নোবেল কমিটি বাংলা সাহিত্যের দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে দেখছে না, তা আমার মাথায় আসছে না, আমার মনে হয় আমাদের বাংলা সাহিত্যের উপর এক ধরনের অবিচার করা হচ্ছে, এমন একটা প্রশ্ন নোবেল কমিটির কাছে রাখতে চাই, ‘ছলনা জানি না বলে কোনো ব্যবসা শিখিনি আর’ এই ধরনের কথা কত জন কবি মুখে এসেছে, অন্য একটি ছড়ায় বলেছেন।
নিয়ম মাফিক চলে যারা / নিময় মাফিক খায় / তাদের সাথে এই শহরে
বাস করা খুব দায়।
আল মাহমুদ একদিন বলেছিলো আমাদের ভালো চিন্তা যদি পৃথিবীর উপকার হয়, তাহলে ভালো চিন্তা করতে আপত্তি কিসের এমন চিন্তা আমরা কতজন করি, এই কবির সুদীর্ঘজীবী কামনা করি।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর